পৃথিবী ও মহাবিশ্বের রেখাচিত্র – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
প্রকৃতির বিশাল বিস্ময় থেকে শুরু করে আমাদের চারপাশে প্রতিদিন ঘটে চলা ছোট ছোট পরিবর্তন। তার ওপর পশু-পাখি ও উদ্ভিদের নানা অদ্ভুত আচরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এমন অনেক রহস্য, যা বিজ্ঞানীদেরও ভাবিয়ে তোলে। কখনও কোনও প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য আশ্চর্য কৌশল বেছে নেয়, কখনও আবার গাছপালা পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের এমনভাবে মানিয়ে নেয়, যা সত্যিই অবাক করার মতো।
এই সংখ্যায় আমরা তাই পা রাখছি প্রকৃতির সেই বিচিত্র জগতে, যেখানে বুদ্ধি, অভিযোজন আর বেঁচে থাকার কৌশল মিলেমিশে তৈরি করেছে অসংখ্য আশ্চর্য আচরণ। দেখব, কীভাবে প্রাণীরা নিজেদের পরিবেশ বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়, কীভাবে পাখিরা সঙ্গী আকর্ষণ করতে অসাধারণ কৌশল ব্যবহার করে, আবার কীভাবে মহাকাশের মতো সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে গাছপালা নিজেদের বৃদ্ধির ধরন বদলে নেয়।
কখনও এই আচরণ আমাদের চোখের সামনে ঘটে, আবার কখনও তার রহস্য লুকিয়ে থাকে কোষ, জিন বা শরীরের অভ্যন্তরের জটিল প্রক্রিয়ায়। প্রকৃতির এই বিচিত্র আচরণগুলির মধ্য দিয়েই তাই আমরা খুঁজে দেখব জীবজগত আসলে কতটা বুদ্ধিমান, অভিযোজনক্ষম এবং বিস্ময়কর।
মহাশূণ্যে বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ
মহাশূণ্যে মাধ্যাকর্ষণ কমলে গাছের শরীরে কী বদলায়?

পৃথিবীতে জন্মানো গাছপালা মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই বেড়ে ওঠে। শিকড় সাধারণত মাটির গভীরে, অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচের দিকে বাড়ে। অন্যদিকে কাণ্ড ও পাতা বাড়তে থাকে তার বিপরীত দিকে, অর্থাৎ উপরের দিকে। গাছের এই মাধ্যাকর্ষণ-নির্ভর বৃদ্ধিকে বলা হয় gravitropism। কিন্তু মহাকাশে এই পরিচিত পরিবেশটি বদলে যায়। সেখানে পৃথিবীর মতো শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় গাছকে নিজের বৃদ্ধি ও শরীরের গঠন নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্য পরিবেশগত সংকেতের উপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
এই পরিবর্তনটি শুধু গাছের শিকড় বা কাণ্ড কোন দিকে বাড়বে, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মহাকাশের microgravity উদ্ভিদের কোষ, কোষপ্রাচীর, জিনের কার্যকলাপ, বিপাকীয় প্রক্রিয়া, সালোকসংশ্লেষ এবং জল ও পুষ্টি গ্রহণের মতো বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। NASA-র Plant Habitat-01 গবেষণায় পৃথিবীর স্বাভাবিক মাধ্যাকর্ষণ এবং microgravity-তে বেড়ে ওঠা Arabidopsis thaliana গাছের জিন, বিপাক, সালোকসংশ্লেষ, বৃদ্ধি এবং মাধ্যাকর্ষণ অনুভব করার প্রক্রিয়ার তুলনা করা হয়েছে।
মাধ্যাকর্ষণ না থাকলে গাছ দিক চিনবে কীভাবে?
পৃথিবীতে গাছের শিকড় ও কাণ্ডের বৃদ্ধির দিক ঠিক করার ক্ষেত্রে মাধ্যাকর্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কিন্তু মহাকাশে সেই সংকেত অনেকটাই দুর্বল হয়ে যায়। ফলে গাছকে আলোর মতো অন্য সংকেত ব্যবহার করতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, microgravity-তে কাণ্ড ও পাতার বৃদ্ধির দিক নির্ধারণে আলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পৃথিবীতে যে গাছ মাধ্যাকর্ষণের সাহায্যে ‘উপরে’ ও ‘নিচে’-র পার্থক্য বুঝতে পারে, মহাকাশে তাকে অনেকটাই আলোর দিক অনুসরণ করে নিজের বৃদ্ধির পথ ঠিক করতে হয়। এটি উদ্ভিদের এক আশ্চর্য অভিযোজন। গাছের কোনও চোখ বা মস্তিষ্ক নেই, তবু পরিবেশের পরিবর্তন বুঝে তার বৃদ্ধি ও শরীরের গঠন বদলাতে পারে।
বদলে যেতে পারে কোষপ্রাচালও
গাছের শরীরকে শক্ত ও দৃঢ় রাখার জন্য কোষপ্রাচাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব কমে গেলে এই কোষপ্রাচালের গঠন ও তৈরির প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। NASA-র গবেষণায় microgravity-তে গাছের শিকড়ের কোষপ্রাচালের বিকাশে পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শক্ত কোষপ্রাচাল শিকড়কে যান্ত্রিক দৃঢ়তা দেয় এবং তার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এখানেই আসে lignin-এর কথা।
Lignin হল উদ্ভিদের কোষপ্রাচালে থাকা একটি শক্ত জৈব পদার্থ। এটি কাণ্ড ও অন্যান্য উদ্ভিদ-অংশকে দৃঢ়তা দেয় এবং গাছকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। সহজভাবে বললে, মানুষের শরীরে হাড় যেমন শরীরকে কাঠামো ও দৃঢ়তা দেয়, গাছের ক্ষেত্রে lignin তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাহলে মহাকাশে lignin-এর কী হয়?
এটাই বিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পৃথিবীতে গাছকে সারাক্ষণ মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে নিজের কাঠামো ধরে রাখতে হয়। তাই শক্ত কোষপ্রাচাল এবং lignin গাছের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু microgravity-তে সেই যান্ত্রিক চাপ অনেকটাই আলাদা।
তাই বিজ্ঞানীরা জানতে চাইছেন, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব কমে গেলে গাছ কি তার শরীরকে শক্ত করার জন্য আগের মতোই lignin তৈরি করে, নাকি lignin তৈরির পরিমাণ ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই NASA-র Plant Habitat-01 গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের Arabidopsis গাছ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু গাছের ক্ষেত্রে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কোষপ্রাচালে lignin-এর পরিমাণ পরিবর্তন করা হয়েছিল। গবেষকরা সেই গাছগুলির জিন, প্রোটিন, বিপাকীয় পদার্থ এবং কোষপ্রাচালের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছেন।
অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা শুধু বাইরে থেকে গাছের চেহারা দেখছেন না। তাঁরা গাছের একেবারে ভিতরে কী ঘটছে, কোন জিন সক্রিয় হচ্ছে, কোন প্রোটিন তৈরি হচ্ছে, কী ধরনের বিপাকীয় পরিবর্তন হচ্ছে সেটিও খতিয়ে দেখছেন।
কম lignin কি ভবিষ্যতের মহাকাশ-ফসলের জন্য সুবিধাজনক?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কম lignin-যুক্ত গাছ ভবিষ্যতের মহাকাশ কৃষিতে কিছু সুবিধা দিতে পারে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।
একটি সম্ভাব্য সুবিধা হল খাবার হিসেবে ব্যবহৃত গাছের পুষ্টি শরীরে সহজে পৌঁছানো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল উদ্ভিদ-বর্জ্য। মহাকাশে দীর্ঘদিনের অভিযানে গাছের খাওয়া যায় না এমন অংশ জমতে থাকবে। সেই বর্জ্যে lignin কম থাকলে তা ভেঙে পুনর্ব্যবহার বা কম্পোস্ট তৈরির প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে, এমন সম্ভাবনা বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করছেন।
তবে এর মানে এই নয় যে কম lignin-এর গাছ ইতিমধ্যেই মহাকাশে বেশি ভালোভাবে বেড়ে ওঠে, কারণ এটি এখনও গবেষণার বিষয়। বরং বিজ্ঞানীরা বুঝতে চাইছেন, গাছের কাঠামো তৈরির এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি মাধ্যাকর্ষণ বদলে গেলে কীভাবে বদলায়।
শুধু lignin নয়, আরও অনেক কিছু বদলায়
মহাকাশে গাছের সমস্যা শুধু মাধ্যাকর্ষণের অভাব নয়। পৃথিবীতে মাটির ভিতর জল ও দ্রবীভূত পুষ্টি স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারে। কিন্তু microgravity-তে তরলের আচরণ বদলে যায়। শিকড়ের চারপাশে জল, অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। NASA-র তথ্য অনুযায়ী, microgravity-তে মাটির মতো পরিবেশে স্বাভাবিক convection বা তরলের ওঠানামা না থাকায় শিকড়ের অঞ্চলে অক্সিজেনের ঘাটতি এবং পুষ্টি গ্রহণে সমস্যা হতে পারে।
এ কারণেই মহাকাশে গাছ চাষ করতে শুধু বীজ পুঁতে দিলেই হয় না। জল, বাতাস, পুষ্টি, আলো, তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা— সবকিছুকেই খুব যত্ন করে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
গাছের শরীর যেন মহাকাশের সঙ্গে নতুন করে মানিয়ে নেয়
মহাকাশে বেড়ে ওঠা গাছের দিকে তাকালে হয়তো মনে হবে, সেটি শুধু একটি ছোট গাছ। কিন্তু তার ভিতরে তখন চলছে এক জটিল অভিযোজন প্রক্রিয়া। মাধ্যাকর্ষণের সংকেত বদলেছে, আলোর গুরুত্ব বেড়েছে, শিকড়ের চারপাশে জল ও অক্সিজেনের চলাচল বদলেছে, কোষপ্রাচালের গঠন বদলাতে পারে, এমনকি কোন জিন কখন সক্রিয় হবে তাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। NASA-র গবেষণায় microgravity-তে উদ্ভিদের gene expression বা জিনের কার্যকলাপের পরিবর্তনেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এই কারণেই মহাকাশে গাছ চাষের গবেষণা শুধু ভবিষ্যতের মহাকাশচারীদের টাটকা খাবার দেওয়ার জন্য নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আসলে বোঝার চেষ্টা করছেন—মাধ্যাকর্ষণ উদ্ভিদের শরীরকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেই মাধ্যাকর্ষণ কমে গেলে একটি গাছ নিজেকে কীভাবে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়।
পৃথিবীতে আমরা গাছকে সাধারণত স্থির জীব বলে মনে করি। কিন্তু মহাকাশে তাদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, পরিবেশ বদলালে তারাও নিজেদের শরীর, বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম বদলে নিতে পারে। এই নীরব অভিযোজনই উদ্ভিদের অন্যতম আশ্চর্য ক্ষমতা।
