পৃথিবী ও মহাবিশ্বের রেখাচিত্র – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
মহাশূণ্যে বিভিন্ন প্রাণীর আচরণ
মহাকাশে পোকামাকড়ের মজার আচরণ






পৃথিবীতে কোনও পোকামাকড়কে হাঁটতে, উড়তে বা খাবারের সন্ধানে ঘুরতে দেখে আমরা তার আচরণকে খুব স্বাভাবিক বলেই ধরে নিই। কিন্তু সেই পোকাটিকেই যদি পৃথিবীর মহাকর্ষের প্রায় অনুপস্থিত পরিবেশে পাঠানো হয়, তখন তার আচরণ অনেকটাই বদলে যেতে পারে। মহাকাশে পোকামাকড়ের উপর করা বিভিন্ন পরীক্ষায় এমনই বেশ কিছু অদ্ভুত এবং মজার আচরণ ধরা পড়েছে।
হাউস ক্রিকেট (Acheta domesticus) মহাকাশে গিয়েও মোটামুটি স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখতে পেরেছিল। তবে শরীরের অবস্থান বুঝে চলাফেরা করার ক্ষেত্রে তাদের কিছু সমস্যা হয়েছিল। কারণ, পৃথিবীতে শরীরের কোন দিকটা উপরে বা নীচে, তা বোঝার ক্ষেত্রে মহাকর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মহাকাশে সেই পরিচিত সংকেত না থাকায় তাদের অবস্থান-সংবেদী স্নায়ুতন্ত্রকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয়, মহাকাশে কিছুদিন থাকার পর ক্রিকেটের এই ব্যবস্থা নতুন মহাকর্ষীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লক্ষণ দেখায়।
মধুমক্ষিকার (Apis mellifera) ক্ষেত্রে দৃশ্যটি আরও মজার। পৃথিবীতে তারা ডানা ঝাপটে সুন্দরভাবে উড়ে বেড়ায়, কিন্তু মহাকাশে তাদের উড়ান ছিল অত্যন্ত অল্প সময়ের এবং অনিয়ন্ত্রিত। ডানা ঝাপটানোর পর তারা অনেকটা ভেসে থাকত। শরীরের কোন দিকটা উপরে বা নীচে, সেটিও তারা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। ফলে কোথাও অবতরণ করার সময় নিজেদের শরীরের অবস্থান ঠিক করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
মথের (Anticarsia gemmatalis) অবস্থাও ছিল অনেকটা একই রকম। মহাকাশে তাদের উড়ান ছিল খুব অল্প সময়ের—১০ সেকেন্ডেরও কম—এবং বেশ অনিয়ন্ত্রিত। অবতরণের সময় নিজেদের শরীরের দিক ঠিক রাখতেও সমস্যা হচ্ছিল। কিন্তু একই পরীক্ষায় থাকা ঘরের মাছি (Musca domestica) তুলনামূলকভাবে বেশ দক্ষতার পরিচয় দেয়। তারা শরীরের ঝোঁক, উড়ানের দিক এবং অবতরণ মথ ও মধুমক্ষিকার চেয়ে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। অর্থাৎ, মহাকর্ষ কমে গেলে সব পোকামাকড় যে একইভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তা নয়।
পিঁপড়েদের আচরণেও দেখা গিয়েছিল চমকপ্রদ পরিবর্তন। ফুটপাথের পিঁপড়ে (Tetramorium caespitum) সাধারণত দলবদ্ধভাবে একটি এলাকা খুঁজে দেখে। মহাকাশে তারা সেই কাজ করতে গিয়ে কম এলাকা অনুসন্ধান করেছিল এবং তাদের চলার পথ হয়ে উঠেছিল বেশি এঁকেবেঁকে। সম্ভবত পৃষ্ঠের সঙ্গে নিজেদের আটকে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মাঝেমধ্যে তারা পৃষ্ঠের সংস্পর্শ হারিয়েও ফেলত। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, আবার পৃষ্ঠের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার ক্ষমতা তাদের ছিল যথেষ্ট ভালো।
আরও অবাক করা ঘটনা দেখা গেছে চিরোনোমিড লার্ভা (Polypedilum vanderplanki)-র ক্ষেত্রে। এই লার্ভা বিশেষ এক সুপ্ত অবস্থায় শরীরের প্রায় সমস্ত জল হারিয়েও বেঁচে থাকতে পারে। মহাকাশের বাইরের পরিবেশে সরাসরি ১৮ মাস থাকার পরও তারা বেঁচে ছিল। পৃথিবীর বাইরে এমন কঠিন পরিবেশেও একটি ক্ষুদ্র লার্ভার টিকে থাকার ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর।
তবে মহাকাশে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হওয়া পোকামাকড়গুলির একটি হল ফলের মাছি (Drosophila melanogaster)। ১৯৪৭ সালে V-2 রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠানো প্রথম প্রাণীদের মধ্যেও ছিল এই ছোট্ট মাছি। পরবর্তী বহু পরীক্ষায় দেখা গেছে, ফলমাছি মহাকাশে ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে এবং এমনকি নতুন প্রজন্মও তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ, মহাকাশেও একটি সম্পূর্ণ জীবনচক্র চালিয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব।
তবে মহাকাশের পরিবেশ তাদের শরীরে কোনও প্রভাব ফেলে না, এমন নয়। ফলমাছির হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতা, স্নায়ুতন্ত্র, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জৈবিক ঘড়িতে পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবু ১৩ দিন মহাকাশে থাকার পরও তাদের দৈনিক চলাফেরার ছন্দ এবং ঘুমের স্বাভাবিক ধরন বজায় ছিল। অর্থাৎ, মহাকাশের অদ্ভুত পরিবেশেও এই ছোট্ট পোকাটি তার দৈনন্দিন জীবনের বেশ কিছু ছন্দ ধরে রাখতে পারে।
এই গবেষণাগুলি থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন, মহাকর্ষ শুধু আমাদের ওজন নির্ধারণ করে না—জীবজগতের চলাফেরা, শরীরের অবস্থান বোঝা, উড়ে বেড়ানো, বিশ্রাম নেওয়া এবং দৈনন্দিন আচরণের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হল, পৃথিবীর মহাকর্ষ হারিয়েও অনেক পোকামাকড় ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
ভবিষ্যতে মানুষ যদি চাঁদ, মঙ্গল বা অন্য কোনও মহাজাগতিক বসতিতে দীর্ঘদিন থাকতে চায়, এই ছোট্ট প্রাণীগুলির আচরণ সম্পর্কে জানা তাই নিছক কৌতূহলের বিষয় নয়। মহাকাশে তারা কীভাবে বাঁচে, কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নেয় এবং কীভাবে প্রজনন করে—এসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের খাদ্য ও জীবনধারণ ব্যবস্থা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
