সাগরতলে শৈবালের রহস্যময় জঙ্গল

কি বন্ধুরা, সামনেই তো পুজোর ছুটি আসছে, প্ল্যান কী? পাহাড়, সমুদ্র না জঙ্গল? তবে এইবারের ছুটিটা যদি একটু অভিনব করতে চাও, তাহলে আমার সাথে বেড়িয়ে পড়ো সমুদ্রের জঙ্গলে। না না সমুদ্রের পাড়ে ঝাউ গাছের জঙ্গল বা ঐ জাতীয় কিছু নয়, একেবারে জলের তলার গহীন অরণ্যে নিয়ে যাব তোমাদের। ‘বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী’র হাত ধরে ঢুকে পড়া যাক সমুদ্র তলদেশের এক অজানা রোমাঞ্চের খোঁজে।
গভীর জঙ্গল বলতে প্রথমেই কী মনে পড়ে বলোতো? বিশাল বিশাল গাছ, ঘন ঝোপঝাড় আর বাঘ, সিংহ, ভালুক , ভয়ঙ্কর সব প্রাণী। হ্যাঁ এখানেও সেসব আছে, তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানো? সামুদ্রিক বন কিন্তু গাছ দিয়ে তৈরি নয়। ভাবছো তো গাছ ছাড়া আবার জঙ্গল হয় নাকি? গাছ নয় বটে, তবে গাছের মত একধরণের সামুদ্রিক শৈবাল আছে যার পোশাকি নাম কেল্প (Kelp)। সমুদ্রের তলদেশে এই কেল্প-এরই জঙ্গল আছে যা প্রায় ১৫০০-এরও বেশি সামুদ্রিক প্রজাতির আশ্রয়স্থল। চলো তাহলে একটা জঙ্গল সাফারি হয়ে যাক।
এই কেল্প আসলে কী?
কেল্প হল সালোকসংশ্লেষকারী বিশালাকার এক ধরণের বাদামী রঙের সামুদ্রিক শৈবাল, অনেকটা Coral বা প্রবালের মত। নাতিশীতোষ্ণ সাগরের উপকূল সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত অগভীর জলের তলদেশে এদের বসবাস। সমগ্র পৃথিবীর উপকূলরেখার প্রায় ২৫-৩০% জুড়ে এই কেল্প-এর বিস্তৃতি। Laminariales গোত্রের এই শৈবাল মূলত উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে উপকূল বরাবর আলাস্কা থেকে বাজা ক্যালিফোর্ণিয়া অবধি ঘন জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে।




সারা বিশ্বের আরও বহু জায়গার সাগরের তলাতেই এই জঙ্গল পাওয়া যায়। এখনো পর্যন্ত কেল্প-এর প্রায় ৩০টি প্রজাতির খোঁজ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে Bullwhip Kelp (Nereocystis luetkeana), Giant Kelp (Macrocystis pyrifera), Bladder chain Kelp, Bladderwrack, Grapestone (Mastocarpus papillatus), Kombu, Nori, Sea Cabbage (Hedophyllum sessile), Sea Lettuce, Sea Palm (Postelsia palmaeformis), Ribbon Kelp- এগুলি নানা কারণে খুবই জনপ্রিয়। সেই বিষয়ে বিশদে পরে বলছি। তবে এদের মধ্যে Bull Kelp আর Giant Kelp খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।




এরা একদিনে প্রায় ২০ ইঞ্চি বাড়তে পারে এবং সমগ্র জীবনকালে এরা প্রায় ২৬০ ফুট অবধি লম্বা হতে পারে। আর বটগাছের মতই মাথায় চওড়া শামিয়ানার মত আকৃতি তৈরি করে বিশাল জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। এরা একসাথে এমনভাবে থাকে যে রীতিমত ঘন জঙ্গলের মত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। খুব বেশি উষ্ণতার জলে এরা থাকতে পারেনা, ৬°-১৪° সেলসিয়াস উষ্ণতার পুষ্টিসমৃদ্ধ নোনা জলই এদের আদর্শ বাসস্থান।




ক্যালিফোর্ণিয়া অঞ্চলে এই কেল্প-এর ফসিলস থেকে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আজ থেকে প্রায় ২৩ মিলিয়ন বছর আগে, মিয়োসিন যুগেও পৃথিবীতে কেল্প-এর অস্তিত্ব ছিল।
কেল্প কিন্তু আদৌ কোনো গাছ নয়
ভাবো তো পুকুরঘাটে জমে থাকা সবুজ শ্যাওলার আস্তরণ দেখে আমরা সাবধানে পা ফেলি, যাতে পিছলে না যাই। আর সেই শ্যাওলারই এক দূর সম্পর্কের জ্যাঠাতুতো ভাই কিনা সমুদ্রের তলায় আস্ত জঙ্গল বানিয়ে বসে আছে?
অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। কেল্প কিন্তু প্রকৃত উদ্ভিদ নয়, জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় এদের বলে ‘Stramenopile’। এদের দেহ বা থ্যালাসে গাছের মতই চ্যাপ্টা পাতার আকৃতির কিছু গঠন দেখা যায়, যার নাম Lamina বা Blades। এই ল্যামিনাগুলো উৎপন্ন হয় কাণ্ডের ন্যায় দেখতে Stipes থেকে। মূলের মতও কিছু বিন্যাস দেখতে পাওয়া যায়, যার নাম Holdfast। এগুলোর সাহায্যে মহাসাগরের তলদেশের পাথুরে জমিতে কেল্পগুলি আটকে থাকে, অনেকটা জাহাজের নোঙরের মত।

কিছু কিছু প্রজাতির কেল্প-এ Blade-এর গোড়ার দিক থেকে গ্যাস ভর্তি ব্লাডারের মতো একটি অংশ থাকে যার নাম Pneumatocysts। এই অংশটি কেল্প-এর Blade গুলিকে জলের উপরিস্তরের কাছাকাছি রাখতে সাহায্য করে যাতে সূর্যালোকের মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
Stipes অংশটিতে মোটা মোমজাতীয় কিউটিকলের পরিবর্তে চটচটে মিউকাইলেজের আবরণ থাকে। শুধু তাই নয়, স্থলজ উদ্ভিদের জাইলেম, ফ্লোয়েমের মতই এদের দেহেও সংবহনতন্ত্র বর্তমান এবং নানা জৈব ও অজৈব পদার্থ সংবাহিত হয়।
কেল্প-এর জীবনচক্র মূলত দুটি দশার মধ্যে দিয়েই আবর্তিত হয়- ডিপ্লয়েড বা Sporophyte দশা ও হ্যাপ্লয়েড বা Gametophyte দশা। Sporophyte দশায় প্রাপ্তবয়স্ক কেল্প-এর ব্লেডের উপর Sporongia নামক অংশ থেকে লক্ষ-লক্ষ spores বা রেণু জলে নিঃসৃত হয়। এই রেণুগুলো নানান পদ্ধতিতে স্রোতের মাধ্যমে ভেসে অন্য জায়গায় সমুদ্রের তলদেশে পাথুরে জমির খাঁজে আটকে যায়। সেখান থেকে পুরুষ বা স্ত্রী গ্যামেটোফাইট বিকশিত হয়। পুরুষ থেকে শুক্রাণু ও স্ত্রী থেকে ডিম্বাণু নিষিক্ত হলে তাদের মিলনে একটি নতুন ডিপ্লয়েড জাইগোট তৈরি হয় যা থেকে পুনরায় একটি নতুন কেল্প-এর জন্ম হয়।
তবে স্থলজ উদ্ভিদের থেকে এদের জীবন কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জে ভরা। এদের প্রতি মূহুর্তে সমুদ্রের স্রোত বা ঘূর্ণির সাথে মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়। সমুদ্রস্রোতের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে নিজেদের অঙ্গের পরিবর্তন করতে হয়। নতুন বসতি গড়ার লক্ষ্যে মাইলের পর মাইল স্রোতের সাথে ভেসে যেতে হয়।
এহেন কেল্প-এর জঙ্গল কিন্তু জলজ জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য ভাণ্ডার। নরওয়ে উপকূলে প্রায় ৫৮০০ বর্গকিমি এলাকা জুড়ে রয়েছে এমন কেল্প-এর বনভূমি। লক্ষ-লক্ষ জলজ প্রাণী এই কেল্প কে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে জীবনধারণ করে। শুধু তাই নয়, কেল্পনির্ভর খাদ্যশৃংখলের অন্তর্ভুক্ত প্রাণীরাও পরোক্ষভাবে এই জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল। তাদের দলে আমরা মানুষরাও আছি।
উপকূল অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন অধিবাসী এই কেল্প-এর উপর ভিত্তি করেই তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। অসংখ্য sessile প্রাণী যেমন-স্পঞ্জ, ব্রায়োজোয়া, অ্যাসিডিয়ান গোত্রের প্রাণী, সীলমাছ, সি-লায়ন, ১ লক্ষেরও বেশি অমেরুদণ্ডী প্রাণী, ছোট ও বড় মাছ, তিমিমাছ, পাখি ও আরও অনেক প্রজাতিই এই কেল্প থেকে খাদ্য, আশ্রয় ও সুরক্ষা পেয়ে থাকে। আবার প্রচুর মাছ ও Sea urchin-er অতিরিক্ত ভক্ষণে অনেকসময় কেল্প-এর জঙ্গল পুরো ফাঁকা হয়ে যায়। তখন সেই বিপদ থেকে কেল্পকে উদ্ধার করে সামুদ্রিক ভোঁদড়, তারামাছ প্রভৃতি। এরা আবার মাছ ও সামুদ্রিক অর্চিনদের খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখে।




কিছু কিছু প্রাণীর নামও এই কেল্প-এর সহযোগেই রাখা হয় কারণ এরাও কেল্প নির্ভর। Kelp Crab, Kelpfish (Heterostichus rostratus), Kelpgoose, Kelp Pigeon, Reticulate Kelp Louse ইত্যাদি। এরা সকলেই সরাসরি কেল্পকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে বেঁচে থাকে।
এগুলো তো গেল বিভিন্ন প্রাণীর সাহায্যপ্রাপ্তির কথা। আমরা মানবজাতিও কিন্তু এই কেল্প থেকে অগুণতি সাহায্য পেয়ে থাকি।
মানবজাতির কাছে কেল্প-এর উপকারিতা
১) Kelp ash বা কেল্প-এর ছাই

ছবিঃ www.facebook.com

ছবিঃ www.instagram.com
উনিশ শতকের আগের জমানায় ইণ্ডাস্ট্রিয়াল জগতে Kelp ash বা কেল্প-এর ছাই খুব জনপ্রিয় ছিল কারণ এটি আয়োডিন ও ক্ষারীয় পদার্থে ভরপুর। সাবান ও কাঁচ তৈরিতে তাই বহুল পরিমাণে এটি ব্যবহৃত হত। সেইসময় স্কটল্যাণ্ডে সোডিয়াম কার্বোনেটের ব্যবসায়িক উৎপাদনের প্রধান উৎস ছিল এই কেল্প। পরবর্তীকালে Leblanc process চলে আসার পর এই পদ্ধতি নিষিদ্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ লবণ থেকে সোডিয়াম কার্বোনেট উৎপাদন শুরু হয়। তবে আয়োডিন ইণ্ডাস্ট্রিতে এর পরেও উত্তর ও পশ্চিম স্কটল্যাণ্ড, উত্তর-পশ্চিম আয়ারল্যাণ্ড ও Guernsey প্রদেশে Saccharina latissima প্রজাতির কেল্প ব্যবহৃত হত কারণ এতে সবচেয়ে বেশি আয়োডিন পাওয়া যায় (প্রতি ১ টনে ১০-১৫ পাউণ্ড) এবং Guernsey-তে এই প্রজাতির কেল্পও প্রচুর পাওয়া যায়।
২) কেল্প থেকে প্রাপ্ত কার্বোহাইড্রেট

কেল্প থেকে প্রাপ্ত এক বিশেষ কার্বোহাইড্রেট Alginate, আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত বিভিন্ন পদার্থকে ঘন করতে ব্যবহৃত হয়। আইসক্রিম, জেলি, বিভিন্ন স্যালাডের মশলা, মাজন নানা ক্ষেত্রে এটি কাজে লাগে। কুকুরের খাবারের অন্যতম একটি প্রধান উপাদানও এটি। দন্তচিকিৎসা এবং ত্বকচর্চার উপকরণ হিসাবে বিভিন্ন জেলেও এর ব্যবহার প্রচুর প্রচলিত। এই ২০২৬ সালের Frontiers in Plant Science review-তে বাদামী সিউইড বা Brown seaweed থেকে প্রাপ্ত Fucoidan এবং Alginate সম্পর্কে এক গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে এর কিছু বিশেষ উপকারিতাঃ-
- ক্ষত সারাতে — ক্ষতস্থানে আর্দ্রতা বজায় রাখা, অতিরিক্ত তরল শোষণ এবং নতুন টিস্যু তৈরিতে সাহায্য করে।
- রক্তপাত বন্ধ করতে — দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।
- ওষুধ সরবরাহে — ওষুধকে ধীরে ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা যায়।
- ক্যানসারের চিকিৎসায় — নির্দিষ্ট স্থানে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
- জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে — ক্ষতস্থানে জীবাণুর বৃদ্ধি কমাতে এবং জীবাণুনাশক উপাদান সরবরাহে ব্যবহার করা যায়।
- নতুন টিস্যু তৈরিতে — ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর পুনর্গঠনের জন্য কাঠামো বা ‘স্ক্যাফোল্ড’ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
- হাড় পুনর্গঠনে — হাড়ের কোষের বৃদ্ধি ও নতুন হাড় তৈরিতে সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
- তরুণাস্থি পুনর্গঠনে — ক্ষতিগ্রস্ত তরুণাস্থি মেরামতে কোষ ও অন্যান্য উপাদান নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা যায়।
- প্রদাহ কমাতে — শরীরের অতিরিক্ত প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া কমাতে সহায়ক হতে পারে।
- অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে — কোষকে ক্ষতিকর জারণজনিত চাপ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।
- নতুন রক্তনালি তৈরিতে — ক্ষত সারানো ও টিস্যু পুনর্গঠনের সময় নতুন রক্তনালি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
- কোষ সংরক্ষণ ও বহনে — স্টেম কোষসহ বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহৃত কোষকে আবদ্ধ করে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা যায়।
Alginate আমাদের শরীরে ফ্যাট শোষণ কম করতে কাজে লাগে। ফলে রোগা হওয়ার বিভিন্ন ওষুধ বা খাবারে কেল্প ব্যবহৃত হয় ফ্যাট শোষণ কম করে স্থূলতা কমানোর জন্য।
৩) কেল্প দিয়ে সুস্বাদু খানাপিনা



ছবিঃ www.sidechef.com

ছবিঃ seagrovekelp.com
কেল্প কিন্তু সুস্বাদু cuisine হিসাবে জাপান, চীন ও কোরিয়াতে খুবই বিখ্যাত। Kombu নামক কেল্প ভাত ও অন্যান্য খাবারে গার্নিশ করার কাজে লাগে। tsukudani নামক স্ন্যাক্সের প্রধান উপাদান এই Kombu। এছাড়াও এই কেল্প-এর স্বচ্ছ অংশগুলো ভাত ও অন্যান্য খাবার সুন্দর করে wrapping-এর কাজেও ব্যবহৃত হয়। রান্নার সময় Kombu, বিনস জাতীয় সব্জিতে উপস্থিত জটিল শর্করা Raffinose-কে ভেঙ্গে দেয়। ফলে পেটের গ্যাস বা বদহজমের সমস্যা কমে যায়। এই কারণে বহু দেশে ব্যবসায়িকভাবে সমুদ্রের তলায় কেল্পচাষ শুরু হয়েছে। জাপানে প্রথম এর চাষ শুরু হয়েছিল। এরপর ১৯৫০ সালের পর থেকে চীনে শুরু হয় এবং বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লক্ষ মেট্রিক টন কেল্প উৎপন্ন করে চীন, কেল্প উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।
রাশিয়ায় Saccharina latissima, Laminaria digitata এবং Saccharina japonica- এই তিন প্রজাতির কেল্প সাধারণত ‘Sea Cabbage’ নামে পরিচিত। শুকনো কৌটৌজাত খাবার হিসাবে এটি এই দেশে খুবই প্রচলিত। বিভিন্ন স্যালাডে বা স্যুপে এবং পেস্ট্রিতে filling হিসাবে এমনকি মিষ্টি জাতীয় খাবারেও এক বিশেষ উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
৪) ওষুধ হিসাবে কেল্প
ওষুধ হিসাবেও এটির কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্য। খুব উচ্চমাত্রায় আয়োডিন থাকায় থাইরয়েড রোগ নিরাময়ে Laminaria কেল্প ব্যবহৃত হয়। তবে বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে thyrotoxicosis রোগের উদ্ভব হতে পারে।
কেল্প-এ উপস্থিত আয়রন আমাদের শরীরের আয়রনের ঘাটতি মেটাতেও কাজে লাগে।
৫) দৈনন্দিন জীবনে কেল্পের ব্যবহার
উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার প্রজাতি Bull Kelp থেকে উপকূলে বসবাসকারী আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষরা মাছ ধরার জাল তৈরি করে।
কেল্প-এর উপকারিতার তালিকা কিন্তু এখানেই শেষ নয়। বিশাল জীববৈচিত্র্যের ধারক ও বাহক এই জঙ্গল, সমগ্র বিশ্বের নির্গত কার্বনের এক বিরাট অংশ শোষণ করে পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, ম্যানগ্রোভ অরণ্য বা প্রবাল দ্বীপের মত এই কেল্প অরণ্যও আমাদের ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলভাগের ক্ষয় রোধ প্রভৃতি নানান প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। এহেন রক্ষাকবচেরও কিন্তু সংরক্ষণের প্রয়োজন।
সমুদ্রের তলদেশে ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা, উষ্ণ সমুদ্রস্রোত, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং কৃত্রিমভাবে কেল্প-এর চাষ –এসবই কেল্প-এর ক্ষেত্রে বড় সঙ্কটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে সামুদ্রিক ভোঁদড় ও তারামাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় সামুদ্রিক অর্চিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কেল্প ধ্বংসের এক অন্যতম কারণ। খুব শীঘ্রই এই কেল্প-এর যথাযথ সংরক্ষণ শুরু না হলে এর সাথে বহু সামুদ্রিক প্রজাতিই কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাবে।
তবে সামান্য হলেও কেল্প সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। দক্ষিণ কোরিয়া সহ চিলি, ক্যালিফোর্ণিয়া, নিউজিল্যাণ্ড প্রভৃতি দেশে সমুদ্রের তলায় ‘সামুদ্রিক বাগান’ তৈরির মাধ্যমে কিছু স্বেচ্ছাসেবক ও স্কুল পড়ুয়াদের কেল্প সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরা নিজেদের অবসর সময়ে জলের তলায় বেড়ে ওঠা কেল্প প্রজাতির পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের বাঁচাতে সাহায্য করছে। এছাড়া বিজ্ঞানীরাও কেল্প-এর উচ্চতাপ সহনশীল বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন নতুন স্ট্রেন আবিষ্কারের উপর জোর দিচ্ছেন। পরিবেশবিদরাও কেল্প সংরক্ষণ আইন আনার কথা চিন্তাভাবনা করছেন। ফলে আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে কেল্প-এরও ম্যানগ্রোভ বা অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতির অরণ্য সংরক্ষণের দলে প্রোমোশন হবে।
তাহলে এত কিছু জানার পর এই কেল্পের জঙ্গল একবার চাক্ষুষ করতে ইচ্ছে করছে তো?
বাজেট যদি ভালই থাকে তাহলে নেক্সট ট্রিপ কিন্তু কেল্প-এর জঙ্গলে রাখতেই পারো। আমেরিকা, সাউথ আফিকা, আর্জেন্টিনা, জাপান, নিউজিল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি অনেক দেশেই, সমুদ্রের তলায় ডুবুরির পোশাক পড়িয়ে পর্যটকদের কেল্প অভিযানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আর যাদের পকেট পারমিট করবেনা, তাদের জন্য তো YouTube আছেই। তাহলে দেরী না করে বেড়িয়ে পড়ো, ডেস্টিনেশান- Sea Forest।
তথ্যসুত্রঃ-
- en.wikipedia.org/wiki/Kelp
- www.themarinediaries.com/tmd-blog/help-whats-kelp
- sanctuaries.noaa.gov/visit/ecosystems/kelpdesc.html
- www.youtube.com/watch?v=aFGwsRyWILE
- missionblue.org/2025/05/kelp-101-what-are-kelp-forests-and-why-do-they-matter/
- www.kelpforestfoundation.org/
- wildlife.ca.gov/Conservation/Marine/Kelp

ঐন্দ্রিলা সাউ
পেশাদার বিজ্ঞান বিষয়ক কন্টেন্ট রাইটার। Amul কোম্পানি থেকে “বিদ্যাশ্রী” পদকপ্রাপ্ত।
