Life Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানই-পত্রিকা জুলাই-অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা

পৃথিবী ও মহাবিশ্বের রেখাচিত্র – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬

টার্ডিগ্রেড | ছবির সূত্রঃ science.nasa.gov

টার্ডিগ্রেড, ইংরেজিতে tardigrade বা water bear, মাত্র কয়েকশো মাইক্রোমিটার থেকে প্রায় ১ মিলিমিটার আকারের অতি ক্ষুদ্র প্রাণী। দেখতে ছোট্ট ভালুকের মতো হওয়ায় তাদের এই নাম। সাধারণত স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, শ্যাওলা, লাইকেন, মাটি বা জলীয় পরিবেশে এদের পাওয়া যায়। কিন্তু এই ক্ষুদ্র প্রাণীর এমন একটি ক্ষমতা রয়েছে, যা পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাণীর কল্পনাতীত — চরম প্রতিকূল পরিবেশে গিয়ে তারা নিজেদের বিপাক প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে।

টার্ডিগ্রেডের সবচেয়ে আশ্চর্য কৌশল হল anhydrobiosis। পরিবেশে জল কমে গেলে তারা শরীরের জল প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। তখন আটটি পা ও মাথা শরীরের ভিতরের দিকে গুটিয়ে নিয়ে শরীরকে একটি ছোট, সঙ্কুচিত অবস্থায় পরিণত করে। এই অবস্থাকে বলা হয় tun state।

এই অবস্থায় তাদের বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ এতটাই কমে যায় যে প্রাণীটিকে বাইরে থেকে প্রায় মৃত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটি মৃত্যু নয়, বরং এক ধরনের অত্যন্ত গভীর suspended metabolic state। আবার জল পেলে তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।

২০০৭ সালে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার FOTON-M3 মিশনে টার্ডিগ্রেডকে সরাসরি মহাকাশের পরিবেশের সংস্পর্শে আনা হয়। পরীক্ষাটির নাম ছিল TARDIS এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণায় Richtersius coronifer ও Milnesium tardigradum প্রজাতির শুকনো অবস্থার টার্ডিগ্রেড ব্যবহার করা হয়েছিল।

প্রায় ১০ দিন Low Earth Orbit-এ তাদের এমন পরিবেশে রাখা হয়েছিল যেখানে ছিল মহাকাশের vacuum এবং মহাজাগতিক বিকিরণ। কিছু নমুনাকে আবার বিভিন্ন মাত্রার ultraviolet radiation-এর সংস্পর্শেও আনা হয়েছিল। ফলাফল ছিল অবাক করার মতো।

মহাকাশের vacuum একাই তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেনি। শুকনো অবস্থায় থাকা টার্ডিগ্রেডদের একটি অংশ পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পর আবার সক্রিয় করা সম্ভব হয়েছিল। ESA-র বর্ণনা অনুযায়ী, মহাকাশের vacuum, যার সঙ্গে তীব্র dehydration এবং cosmic radiation জড়িত মোটেও টার্ডিগ্রেডের জন্য প্রাণঘাতী হয়নি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সব ধরনের মহাকাশ বিকিরণ টার্ডিগ্রেড সহ্য করতে পারে না। তাই টার্ডিগ্রেডকে “মহাকাশের সবকিছু-সহনশীল প্রাণী” বলা ঠিক হবে না।

২০০৭-এর পরীক্ষায় দেখা যায়, vacuum এবং cosmic radiation-এর তুলনায় সরাসরি, unfiltered solar UV radiation অনেক বেশি ক্ষতিকর। অর্থাৎ মহাকাশের vacuum সহ্য করতে পারলেও সূর্যের তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ তাদের জন্য বড় সমস্যা। NASA-র গবেষণা-সংক্রান্ত নথিতেও এই পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

শরীর শুকিয়ে যাওয়ার সময় তারা বিশেষ ধরনের tardigrade-specific proteins তৈরি করে। গবেষকদের মতে, এই প্রোটিনগুলি কোষের ভিতরের পরিবেশকে এমনভাবে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করে যাতে জল হারানোর পরও গুরুত্বপূর্ণ কোষীয় অণুগুলি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

NASA-র Thomas Boothby ব্যাখ্যা করেছেন, এই প্রোটিনগুলির ঘনত্ব বাড়তে থাকলে কোষের ভিতরের পরিবেশ অত্যন্ত viscous বা আঠালো হয়ে যায়। আরও জল হারালে সেই উপাদান এক ধরনের glass-like state তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ cellular molecules আটকে থেকে সুরক্ষিত থাকে। পরে জল ফিরে এলে সেই অবস্থার অবসান ঘটে এবং কোষীয় কার্যকলাপ আবার শুরু হতে পারে।

অর্থাৎ সহজ ভাষায় —

জল চলে গেল → শরীর গুটিয়ে গেল → বিপাক প্রায় থেমে গেল → কোষের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি সুরক্ষিত অবস্থায় রইল → জল ফিরে এল → আবার সক্রিয় হল।

টার্ডিগ্রেডের এই ক্ষমতা কেবল মহাকাশের জন্য তৈরি কোনও বিশেষ কৌশল নয়। বরং পৃথিবীর পরিবেশেই দীর্ঘ সময় ধরে বিবর্তিত হওয়া তাদের desiccation tolerance বা শুকিয়ে যাওয়ার সহনশীলতার ফল।

এই কারণেই তারা extreme cold, heat, pressure, dehydration এবং উচ্চ মাত্রার radiation-এর মতো বিভিন্ন stress-এর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক সহনশীলতা দেখাতে পারে। তবে প্রজাতিভেদে সহনশীলতার মাত্রা আলাদা, তাই “সব টার্ডিগ্রেড সব চরম পরিবেশে বেঁচে থাকে”, এমন সাধারণীকরণ করা ঠিক নয়।

২০০৭ সালের FOTON-M3 মিশনের আরেকটি পরীক্ষায় (Macrobiotus richtersi) hydrated বা সক্রিয় টার্ডিগ্রেডকে মহাকাশে রাখা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, microgravity ও radiation তাদের survival বা DNA integrity-তে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেনি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, মহাকাশযাত্রার সময় তারা খোলস বদলেছে, স্ত্রী টার্ডিগ্রেড ডিম দিয়েছে এবং কয়েকটি ডিম ফুটে নতুন টার্ডিগ্রেড বেরিয়েছে; তাদের morphology ও behaviour স্বাভাবিক ছিল।

এটি কিন্তু vacuum-এ শুকনো অবস্থায় টিকে থাকার পরীক্ষার থেকে আলাদা বিষয়। তাই লেখায় এই দুটি ঘটনাকে আলাদা করে বলা ভালো।

২০২১ সালে NASA-র Cell Science-04 পরীক্ষায় Hypsibius exemplaris প্রজাতির টার্ডিগ্রেডকে International Space Station-এ পাঠানো হয়। এবার বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন শুধু “টার্ডিগ্রেড মহাকাশে বাঁচতে পারে কি?” ছিল না।

এই নতুন গবেষণায় টার্ডিগ্রেডের gene expression এবং পরবর্তী প্রজন্মগুলিতে পরিবর্তন পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করা হয়। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা খুঁজছিলেন কোন জিনগুলি তাদের stress adaptation এবং survival-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এটি ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশযাত্রায় মানুষের শরীরকে radiation ও microgravity-র ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার উপায় খুঁজতে সাহায্য করতে পারে।

টার্ডিগ্রেডকে দেখে মনে হতে পারে তারা বুঝি মহাকাশে বেঁচে থাকার জন্যই তৈরি। আসলে তা নয়। তাদের মহাকাশ-সহনশীলতা সম্ভবত পৃথিবীর অত্যন্ত শুষ্ক, ঠান্ডা বা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার বিবর্তিত ক্ষমতার ফল। অর্থাৎ, পৃথিবীর চরম পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তৈরি একটি কৌশলই তাদের মহাকাশের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশেও কিছুটা টিকে থাকার ক্ষমতা দিয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ-