পৃথিবী ও মহাবিশ্বের রেখাচিত্র – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
পরিবেশ বদলালে বদলায় আচরণ
হাতি: খরা বাড়লে বদলে যায় চলাফেরার মানচিত্র

আফ্রিকান হাতি (Loxodonta africana)-র জীবন অনেকটাই নির্ভর করে জল, খাদ্য এবং উপযুক্ত habitat-এর উপর। বিশাল শরীরের এই প্রাণীকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতে হয় এবং নিয়মিত জলও প্রয়োজন। ফলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে এবং পরিবেশ ক্রমশ শুষ্ক হয়ে উঠলে হাতির সামনে শুধু “কোথায় খাবার আছে?” প্রশ্ন থাকে না। বদলে “কোথায় জল আছে, কোথায় ছায়া আছে এবং কোথায় তুলনামূলকভাবে নিরাপদে থাকা যাবে?” এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
GPS tracking-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এখন দেখতে পারছেন, পরিবেশের এই পরিবর্তনের সঙ্গে হাতির চলাফেরার মানচিত্র কীভাবে বদলে যায়।
১৯ বছরের GPS তথ্য বলছে অন্য গল্প
২০২৬ সালে Journal of Animal Ecology-তে প্রকাশিত একটি গবেষণায় Botswana-র Chobe National Park এবং আশপাশের অঞ্চলে থাকা ৫৭টি আফ্রিকান হাতির ১৯ বছরের GPS data বিশ্লেষণ করা হয়। ২০০৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সংগ্রহ করা এই তথ্যভাণ্ডারে ছিল ৫,০৪,২২৪টি GPS location record। গবেষকরা খরাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট বছরের বৃষ্টিপাত দিয়ে বিচার করেননি; বরং Standardized Precipitation-Evapotranspiration Index (SPEI) ব্যবহার করে এক মাস, তিন মাস এবং ১২ মাসের সময়সীমায় পরিবেশ কতটা শুষ্ক হয়েছে তা পরিমাপ করেন। ফলাফলটি বেশ চমকপ্রদ।
স্বল্পমেয়াদি, অর্থাৎ প্রায় এক মাসের খরা বাড়লে হাতির home range এবং দৈনিক/মাসিক চলাচলের দূরত্ব, দুটিই কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভেজা থেকে শুষ্ক অবস্থায় এক মাসের drought timescale-এ হাতিদের home range-এর আকার গড়ে প্রায় ২.৫ গুণ কমে। অর্থাৎ পরিবেশ শুকিয়ে গেলেই হাতি যে আরও বেশি এলাকা ঘুরে খাবার খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে, তা নয়। স্বল্পমেয়াদি খরার সময় তারা বরং নিজেদের চলাফেরার এলাকা ছোট করে ফেলতে পারে।
জল যেখানে, হাতিও সেখানে — অন্তত শুরুতে
এর একটি সম্ভাব্য কারণ হল জলের অবস্থান। স্বল্পমেয়াদি খরার সময় হাতিরা inland water বা প্রাকৃতিক স্থায়ী জলাশয়ের কাছাকাছি অবস্থান করতে বেশি পছন্দ করেছে। কারণ বৃষ্টির জল ধরে রাখা ছোট জলাধার বা seasonal water source শুকিয়ে যেতে শুরু করলে স্থায়ী জলাশয়ের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
এখানে হাতির আচরণটা যেন এমন:-
বৃষ্টি কমল → ছোট জলাধার শুকোতে শুরু করল → জল পাওয়ার নির্ভরযোগ্য জায়গা কমল → হাতি চলাফেরার এলাকা ছোট করল → স্থায়ী জলের কাছাকাছি থাকল।
অর্থাৎ খরার শুরুতে হাতির “ঘোরাঘুরির মানচিত্র” সংকুচিত হয়ে যায়।
কিন্তু খরা দীর্ঘস্থায়ী হলে ছবিটা আবার বদলে যায়
এই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই। তিন মাস বা ১২ মাসের মতো দীর্ঘ সময় ধরে খরা চললে হাতিদের habitat selection আর স্বল্পমেয়াদি খরার মতো থাকে না। অর্থাৎ এক মাসের খরার প্রতিক্রিয়া দেখে দীর্ঘস্থায়ী খরার আচরণ অনুমান করা যায় না।
দীর্ঘস্থায়ী খরায় জলাশয়ের আশপাশের vegetation-ও কমে যেতে পারে। ফলে প্রথম দিকে যে জলাশয়ের কাছাকাছি থাকা সুবিধাজনক ছিল, দীর্ঘ সময় পরে সেই এলাকাতেই পর্যাপ্ত খাদ্য নাও থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী খরার ক্ষেত্রে হাতিরা কিছু পরিস্থিতিতে inland water থেকে আরও দূরের এলাকা বেছে নিতে শুরু করে।
অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদি খরা → জলাশয়ের কাছে থাকা
কিন্তু, দীর্ঘস্থায়ী খরা → জলাশয়ের আশপাশের খাদ্য কমে গেলে অন্য habitat-এর সন্ধান
এটাই এই গবেষণার সবচেয়ে মজার ফল।
গাছপালার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ
খরার সময় হাতিরা শুধু জল নয়, গাছপালার ঘনত্বের দিকেও বেশি নজর দেয়; অবশ্যই “নজর” কথাটি এখানে মানুষের মতো সচেতন সিদ্ধান্ত বোঝাচ্ছে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, তিন ধরনের drought timescale-এই হাতিরা তুলনামূলকভাবে বেশি tree-covered area বেছে নিয়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে খাদ্যের পরিবর্তন। খরার সময় হাতির খাদ্যতালিকায় woody vegetation বা কাঠজাত উদ্ভিদের অংশ বাড়তে পারে। আবার গাছপালা বেশি থাকা এলাকায় ছায়াও পাওয়া যায়, যা উষ্ণ ও শুষ্ক পরিবেশে শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
অর্থাৎ খরা যেন হাতির সামনে নতুন একটি হিসাব তৈরি করে: জল + খাদ্য + ছায়া + চলাচলের খরচ = কোথায় থাকবে?
আরও একটি গবেষণায় জলের গুরুত্ব
২০২৪ সালের Biological Conservation গবেষণায় দক্ষিণ আফ্রিকার ছয়টি reserve-এ ১০১টি GPS-collared elephant-এর movement data বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে surface water কমে গেলে হাতির landscape use জলের প্রাপ্যতার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। যেখানে accessible water source কম, সেখানে হাতিদের ব্যবহার অপেক্ষাকৃত ছোট এলাকায় কেন্দ্রীভূত হয় এবং সেই এলাকার vegetation-এর উপর চাপও বাড়ে। অর্থাৎ একটি জলাশয় শুধু হাতিকে সেখানে টেনে আনে না, অনেক হাতি যদি একই জলাশয়ের আশপাশে আটকে থাকে, তাহলে সেই এলাকার গাছপালার উপর অতিরিক্ত চাপও পড়তে পারে।
তাই হাতির “মজার আচরণ” আসলে কী?
এখানে মজাটা হল—হাতিরা খরার প্রতিক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট আচরণ বারবার করে না। বরং খরা কতদিন ধরে চলছে তার উপর তাদের আচরণ বদলে যায়।
খরা শুরু: জল কমছে → চলাফেরার এলাকা ছোট → স্থায়ী জলের কাছে থাকা।
খরা দীর্ঘস্থায়ী: জলের আশপাশের vegetation কমছে → অন্য habitat-এর সন্ধান → দীর্ঘমেয়াদে মানুষের বসতির কাছাকাছি সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ছে।
তাই পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে হাতির “চলার পথ” শুধু বদলায় না—খরার সময়কাল অনুযায়ী সেই মানচিত্র বারবার নতুন করে তৈরি হয়।
