Life Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানই-পত্রিকা জুলাই-অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা

মজারুদের মজার কান্ডকারখানা

নিজের দেহের পেছনে আলো জ্বালা জোনাকির এক বিচিত্র স্বভাব। তবে এই আলো কোনও উত্তাপের কারণে আসে না তাই হাজার জোনাকি জ্বললেও পরিবেশ উত্তপ্ত হয় না। এখন প্রশ্ন হল জোনাকি এই আলো কীভাবে জ্বালে আর কেন জ্বালে।

জোনাকির দেহের পেছন দিকে একটি অংশ থাকে যাকে বলা হয় লুমিনিসেন্ট অর্গান (Luminescent organ) যার থেকে লুসিফারিন নামে একটি রাসায়নিক নিঃসৃত হয়। এর সঙ্গে জোনাকির শরীরের এটিপি আর বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে লুসিফারেজ নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ উৎপন্ন হয়।

এই লুসিফারেজ দ্রব্যটি থেকেই আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকে। তবে এই আলো হলুদ, নীলাভ সবুজ এই ধরনের হয়। তা একটানা বিচ্ছুরিত হয় না, থেমে থেমে ছন্দে ছন্দে হয়। তাই জোনাকির আলো একটানা হয় না। আকাশের তারার মত মিট মিট করে। এইভাবে শরীর থেকে আলো উৎপন্ন করার পদ্ধতিকে বলে বায়োলুমিনেন্স বা Bioluminescence. এটি একমাত্র জোনাকি ছাড়া আর কেউ পারে না।

এই আলোয় উত্তাপ থাকে না কিন্তু ঊজ্জ্বলতা থাকে। এই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ ৫১০ থেকে ৬৭০ ন্যানোমিটার হয়। তার মানে এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ। এই সীমার মধ্যে পড়ছে সবুজ, হালকা সবুজ, হলুদ, কমলা আর লাল।

উদ্দেশ্যঃ

জোনাকি কিন্তু বনের অন্ধকারে পথ দেখার প্রয়োজনে এই আলো সৃষ্টি করে না। সেটা সম্ভবও নয় বা প্রয়োজনও নেই। কারণ এই আলো জোনাকির পেছন দিকে সৃষ্টি হয় আর জোনাকি তো ওড়ে সামনে দিকে। দ্বিতীয়ত পশুপাখি বা কীটপতঙ্গের অন্ধকারে দেখার ক্ষমতা আছে।

তবে এই আলো সৃষ্টির কারণ? বিনা কারণে সে এমন ভাবে মিটমিট করা আলো তৈরি করবে কেন? আর প্রকৃতিরই বা কী প্রয়োজন?

জোনাকির এই আলো সৃষ্টির কারণ তার যৌনসঙ্গী অন্বেষণ। অর্থাৎ এই আলোর মিট মিটে নির্দেশ যৌন আমন্ত্রণ করা। অন্য কোনও স্থানের জোনাকিও যদি এক রকম সিগন্যাল উৎপন্ন আর প্রদর্শন করে তবে সে বোঝে দ্বিতীয়টিও তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে।

সবাই জানে প্রজাপতির পাখার উজ্জ্বল রং। একেবারে চমৎকার রঙ-বাহার। কিন্তু এর কারণ হয়ত জানে না। একটা প্রজাপতিকে দেখে কিছুতেই মনে হয় না যে সে একটা সর্বাঙ্গে বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত শুঁয়োপোকা থেকে তৈরি হয়েছে। শুঁয়োপোকাকে মানুষ যেমন ঘৃণা করে তেমনি ভয় করে। কিন্তু প্রজাপতির সৌন্দর্য মানুষকে প্রীত করে আর কত কবির কাব্যে যে প্রজাপতি মস্ত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।

ছবিঃ www.pexels.com

এখন কথা হল প্রজাপতির এই রং-বাহারে ডানার আসল রহস্য কী। প্রজাপতি হল খুব ছোট্ট প্রাণী। সে খায় যেমন অল্প তেমন তার পরিপাক পদ্ধতি তাকে বেশি খাবার হজম করাতে পারে না। তাই খাদ্য গ্রহণ করে যে শক্তি সে অর্জন করে তা খুব সামান্য। অথচ তাকে নিত্য মধু সংগ্রহ করতে হয় বিশাল জায়গায় উড়ে উড়ে।

এই শক্তি সে পাবে কোথা থেকে?

এই শক্তি পাবার জন্যে সে তার বিরাট পাখনাগুলো মেলে ধরে। সেই বিস্তৃত পাখনা প্রচুর পরিমাণ সূর্যরশ্মিকে ধরতে সক্ষম। এই সূর্যরশ্মি যেমন তার শক্তি জোগায় তেমনি তার পাখনায় সৃষ্টি করে ঊজ্জ্বল রঙ।

প্রজাপতির খাদ্যগ্রহণঃ

প্রজাপতির দাঁত নেই সে চিবোতে পারে না তাই কঠিন বা অর্ধকঠিন কিছু খাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে খায় শুধু তরল পদার্থ। প্রকৃতি তার জন্যে ব্যবস্থা করে রেখেছে। তার লম্বা শুড় দিঁয়ে সে ফুলের ভেতর থেকে মধু টেনে নেয়। আর এই কাজের সময় ফুলের পুং কেশর থেকে পরাগ তার দেহে আটকে যায়। এগুলো সূক্ষ্ম গুঁড়ো গুঁড়ো পদার্থের মতো। আবার যখন সে স্ত্রী ফুলে মধু খেতে বসে তখন এই পরাগ স্ত্রী ফুলের গর্ভকেশরে প্রবেশ করে আর এইভাবে ফুলের পরাগ মিলন সুসম্পন্ন হয়। আর ফুল থেকে ফল। ফল থেকে বীজ আবার বীজ থেকে গাছ।

পিঁপড়েরা ভীষণ রকম সমাজবদ্ধ প্রাণী। তাই তাদের নিজেদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রত্যেক পিপড়েকেই পালন করতে হয়। পৃথিবীতে প্রায় বারো হাজার প্রজাতির পিঁপড়ে আছে। এরা প্রত্যেকেই কর্মঠ আর খুবই দায়িত্বশীল। এরা এত শক্ত চেহারার যে নিজের ওজনের প্রায় পঞ্চাশগুণের বেশি মাল অনায়াসেই বহন করতে পারে।

পিঁপড়ের দাঁত অত্যন্ত শক্ত আর লোহা বা অন্য ধাতু বাদে মাটি এমন কি পাথরেও পর্যন্ত গর্ত করতে পারে। তাই মাটির নিচেই হোক, গাছের কান্ডেই হোক বা ইঁটের দেওয়ালের ভেতরে এরা সুড়ঙ্গ করে তার ভেতর নিজেদের থাকার বাসা নির্মাণ করতে পারে। মাটির নিচে গর্ত করে সেই মাটি ওপরে তুলে তারা পিঁপড়ের ঢিবি তৈরি করতে পারে।

ছবিঃ www.pexels.com

পিঁপড়েরা ভারি অদ্ভুত প্রাণী। এদের খাওয়ার উপযোগী হোক বা না হোক এরা যদি তাদের পক্ষে বহনক্ষম হয় তবে তারা কোথাও পড়ে থাকতে দেখলেই সেটা বয়ে নিয়ে চলে যায় তাদের বাসায়। যদি একজনের পক্ষে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না হয় তবে এরা একসঙ্গে অনেকে মিলে বয়ে নিয়ে চলে যাবে মানুষের দৃষ্টির অলক্ষে। এরা পরিবেশ রক্ষায় যেমন পারঙ্গম তেমনি মানুষের খাদ্যসংরক্ষণ প্রচেষ্টায় বিরূপ ও বিরক্তিকর প্রভাব ফেলে। নিয়ম আর শৃঙ্খলা দুটোই এদের মজ্জাগত।

পিঁপড়েরা যেমন দীর্ঘায়ু তেমনই এরা পৃথিবীতে দীর্ঘকাল প্রায় ১৩০ মিলিয়ন বা ১৩ কোটি বছর ধরে আছে। পিঁপড়েরা দল হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন কলোনিতে বাস করে। সৈনিক পিঁপড়েরা অন্য কলোনি থেকে ডিম চুরি করে আনে। বাচ্চা বেরোলে তাদের দাস হিসেবে ব্যবহার করে।

পিপড়েদের কান নেই। তারা কম্পনের মাধ্যমে শোনে। এদের ফুসফুস বলে কিছু নেই। কিন্তু সেখানে একটি ছিদ্র আছে আর সেই ছিদ্রপথে তারা অক্সিজেন প্রবেশ করায় আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড বার করে।

ছোট্ট কীটটি ছোটদের তো বটেই এমন কি বেড়ালের কাছেও খুব মজার আর খেলার জিনিস। ছোটোরা ফড়িং খুব পছন্দ করে কারণ ফড়িং যখন ফুলের ওপর বসে তখন তার দুটি ডানা এক করে মাটির সমান্তরালে রেখে চুপ করে মধু খায়। কিন্তু কেউ সামনে গেলেই বা কোনও শব্দ বা আন্দোলন মাত্রই তারা উড়ে পালিয়ে যায়। আর এত দ্রুত যে তাদের পেছনে ধাওয়া করতে ছোটোদের তো বটেই আবার বেড়ালরাও খুব মজা পায়। বেড়ালদের এমনিতে দৌড়োদৌড়ি করতে হয় না যদি না তাড়া খায়। কিন্তু তারা দৌড়োদৌড়ি করতে কম ভালোবাসে না। তাই এই লাফিয়ে ফড়িং ধরার সুযোগ তারা ছাড়ে না। ফড়িং যত আঁকা বাঁকা পথে উড়ে উড়ে চলে ততই এদের ছোটার মজা বাড়ে।

ছবিঃ www.pexels.com

বাচ্চা ছেলেদেরও কতকটা ঠিক তাই। ফড়িং লাফাতে খুব ভালবাসে। লাফাতে মানে মানুষের মতো লাফাতে নয়। ডানায় ভর করেই লাফিয়ে লাফিয়ে উড়ে চলে এরা। আর এই গতি বেশ দ্রুতই। তাই তো কেউ খুব লাফাই-ঝাঁপাই করলে সবাই বলে একেবারে যেন ফড়িং-এর ম্তো উড়ে বেড়াচ্ছে।

মানুষের থেকে অনেক বেশি দৃষ্টিসম্পন্ন হল ফড়িং। ৩৬০ ডিগ্রি স্থানের দৃশ্য এরা দেখতে পায়। মানুষের থেকে অনেক বেশি রঙ দেখতে পায়। স্ত্রী ফড়িং শ্যাওলা বা জলজ উদ্ভিদের ওপর ডিম পাড়ে আর সেই ডিম ফুটে ফড়িং-এর যে বাচ্চা বেরোয় তাদের বলে নিম্ফ। এই নিম্ফ তাদের পায়ুপথ বা Anus ব্যবহার করে শ্বাসকার্য চালানোর জন্যে। মাছের মতই ফুলকার সাহায্যে শ্বাসকার্য চালায় এই নিম্ফরা। এই পথেই অক্সিজেন গ্রহণ করে আবার ত্যাগ করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এই পায়ুপথই থাকে ফুলকা। তারা ব্যবহার করে জলগ্রহণ আর জলত্যাগের জন্যেও ব্যবহার করে এই পায়ুপথ। ফড়িং-এর জীবনকাল খুবই কম।

নির্জন নিশিথে দূর জঙ্গল থেকে ভেসে আসে একটানা কর্কশ শব্দ। সেই শব্দ কিছুটা যেন করাত টানার মতো। তবে মাঝে কিছু বিরতি দিয়ে আবার শব্দটা ওঠে। শব্দটা বেশ তীব্র আর তীক্ষ্ণ। শব্দটা সৃষ্টি হয় একটা ছোটো পোকার থেকে যাকে বলে একটানা ঝিঁ ঝিঁ শব্দ হয় বলে পোকাটাকেও বলা হয় ঝিঁ ঝিঁ পোকা। অন্যান্য পোকারাও কেউ কেউ মুখ দিয়ে ডাকলেও ঝিঁ ঝিঁ পোকার এই ডাক কিন্তু তার মুখের ডাক নয়। বস্তুত এটা কোনও ডাকই নয়। এটি পোকার দেহের একটা অংশ থেকে উৎপাদিত শব্দ। সেই অংশটা হল তার ডানা।

ছবিঃ Google

ঝিঁ ঝিঁ পোকা তার দুটি ডানার বিশেষ অংশ বিশেষ এক পদ্ধতিতে ঘষে ঘষে এই শব্দ উৎপন্ন করে। উৎপন্ন শব্দটি ডানার ভেতরের একটি ফাঁকা অংশে অনুরণিত হতে থাকে আর শব্দের তীক্ষ্ণতা আর তীব্রতা ভয়ানক বেড়ে যায়। তাই খুব ছোট্ট একটা পোকা হয়েও ঝিঁ ঝিঁর ডাক এত তীক্ষ্ণ। কান যেন ঝালাপালা করে দেয়। এই বিশেষ পদ্ধতির নাম স্ট্রীডুলেশন বা stridulation।

ঝিঁ ঝিঁ পোকার এই ডাক কিন্তু বিনা উদ্দেশ্যে নয়। তার এই ডাক তার যৌনসঙ্গির উদ্দেশ্যে। পুরুষ পোকা এইভাবে শব্দ সৃষ্টি করে তার স্ত্রী সঙ্গিনীকে আকর্ষণ করে।

ঝিঁ ঝিঁ পোকা যখন এমনভাবে শব্দ উৎপন্ন করে তখন ঘাস ফড়িং কীভাবে শব্দ উৎপন্ন করে? সেও তার ডানার সাহায্যেই শব্দ তৈরি করে তবে সে ডানার সাহায্যে মড় মড় ফর ফর করে শব্দ করে। এই শব্দ তৈরি হয় ডানার অতি দ্রুত কম্পনের দ্বারা। কিন্তু মজার ব্যাপার সে এই শব্দ করে সঙ্গিনীর সঙ্গে প্রণয় ভ্রমণে ওড়ার সময়। তারা দুজনে একসঙ্গে উড়তে থাকে এমন শব্দ করতে করতে।

ছবিঃ www.pexels.com

উচ্চিংড়ে আবার ভারি মজার কৌশলে ডাকে। সে তার পাঁজরের বিশেষ এক মাংসপেশী যাকে টিম্বাল বলে তাদের টিপে টিপে শব্দ তৈরি করে (clicking sound)। গ্রীষ্মের শেষে বা বর্ষার প্রথমে জঙ্গল বা ঘাসের ফাঁকে ঝাঁকে ঝাঁকে যে সব কীটপতঙ্গরা থাকে যেমন ঝিঁ ঝিঁ পোকা, ঘাসফড়িং, উচ্চিংড়ে প্রভৃতির যৌনকাল শুরু হয়। তাই তখন বিশেষ সন্ধ্যার পর থেকে তারা তাদের যৌনসঙ্গিনীদের কাছে আসার জন্যে বিশেষ বিশেষ প্রকারে ডাকতে থাকে। এরা প্রাকৃতিক নিয়মে ডাকলেও আমাদের প্রচন্ড বিরক্তি উৎপাদন করে এটা তো ঠিক।


ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়

বিভিন্ন ওয়েব ম্যাগাজিনের (গল্প ও উপন্যাস) লেখক ও গ্রন্থকার।