Mathematics-গণিতPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

গণিতভীতি ও তার প্রতিকার

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘গণিতভীতি’ বিষয়টি বহুদিন ধরে বহু আলোচিত একটি বিষয়। বলা ভাল বিষয়টি এখনও পর্যন্ত অমীমাংসিতও বটে। বিভিন্ন গণিতবিদ বিভিন্ন সময়ে ‘গণিতভীতি’ সম্বন্ধে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা গণিতভীতির কারণে সৃষ্ট শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থাকে panic, helplessness ও paralysis বলে ব্যাখ্যা করেছেন। এখন প্রশ্ন হল এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে কেন? কেন শিক্ষার্থীর সুস্থ, সবল, তরতাজা মন গণিতভীতির শিকার হবে? চলো দেখা যাক।

প্রথম কারণ- গণিতভীতির জন্য যেসব কারণ দায়ী তার মধ্যে প্রথম ও প্রধান কারণ হল অঙ্ক না বুঝে করা। এটা খুব বাজে একটা ব্যাপার। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা অঙ্ক না বুঝে সেটা মুখস্থ করে নেয়। অন্য বিষয়ের মতো অঙ্কেও মুখস্থবিদ্যা তাদের প্রধান অস্ত্র হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় যখন সেই অঙ্কটিই একটু ঘুরিয়ে আসে (হয়ত অঙ্কের ডিজিটগুলো পালটে দিল) তখন কিন্তু অঙ্কটি সে আর করতে পারছে না। না পারাটাই অবশ্য স্বাভাবিক কারণ সে তো অঙ্কটা না বুঝে করছে। ফলে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করতে শুরু করে। তার মনে ভয় ঢুকে যায়। সে ভাবে আমার দ্বারা অঙ্ক হবে না। তৈরি হয় ‘গণিতভীতি’।

দ্বিতীয় কারণ- যান্ত্রিকভাবে অঙ্ক করা। অধিকাংশ শিক্ষকই শুধু শেখান প্রশ্নে কী থাকলে উত্তরে কী লিখতে হবে। কেউ শেখান না কোত্থেকে এসব এল আর এসব শিখেই বা জীবনে কী হবে। ফলে গণিত ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায় কিছু নিয়ম (Formula) মুখস্থ করে যাওয়ার মতো। শিক্ষার্থীরা না পায় খুঁজে কোনো আনন্দ, না পায় রস। তাই সকলেই গল্পের বই পড়তে চায়। অঙ্ক করতে চায় খুব কম জন।

তৃতীয় কারণ- শিক্ষার্থীর পূর্বজ্ঞান (Previous knowledge) ঠিকমত না থাকা। কোনো একটি অধ্যায় শুরু করার আগে সেই অধ্যায়টির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বজ্ঞান থাকা অত্যন্ত দরকার যেটা অনেক শিক্ষার্থীর থাকে না। থাকে না তার কারণ, পূর্বের অধ্যায় বা আগের শ্রেণির পড়া তারা ঠিকমত পড়েনি। ফলে সেই সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান থেকে গেছে অসম্পূর্ণ, ভাসা-ভাসা। ফলে নতুন অধ্যায় যখন সে শুরু করছে তখন তার কাছে তা বোধগম্য হচ্ছে না, নতুন অধ্যায়ের অঙ্কগুলোও করতে পারছে না। স্বভাবতই অঙ্কের প্রতি একটা ভয়, আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

চতুর্থ কারণ- অনেকসময় ছোটথেকেই শিক্ষার্থীদের মনের মধ্যে অঙ্কের প্রতি একটা ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়-অঙ্ক খুব কঠিন, ভাল করে করো, অঙ্কে ফুল মার্কস পেতে হবে, একটু ভুল হলেই জিরো ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব শুনে একটি বাচ্চা বুঝে যায়, অঙ্ক হল আর পাঁচটা বিষয় থেকে আলাদা। তখন থেকেই সে অঙ্ককে অন্য চোখে দেখতে শুরু করে। তাই কোনো কারণে অঙ্কে খারাপ ফল করলে সে খুব ভয় পেয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে অঙ্ককে ভয় পেতে শুরু করে।

পঞ্চম কারণ- অঙ্কের শিক্ষক যদি ভীষণ রাগী হন, একটু ভুল হলেই খুব বকাঝকা করেন, তিরস্কার করেন তবে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভয় পেতে শুরু করবে। স্যারকে ভয় পেতে পেতে শেষপর্যন্ত অঙ্ক বিষয়টাই তাদের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ষষ্ঠ কারণ- বেশিরভাগ সময় দেখা যায় ছোটদের গল্প, উপন্যাসে যদি কোনো অঙ্কের শিক্ষকের উল্লেখ থাকে তবে লেখক তাঁকে রাশভারী, গুরুগম্ভীর, কাটখোট্টা ব্যক্তি হিসাবে বর্ণনা করেন। শিশুরা জানছে অঙ্কের শিক্ষক মানেই যেন ভয়ের একটা ব্যাপার।

বেশ, এবার আমরা দেখব কীভাবে গণিতের প্রতি ভয় কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলা যায় গণিতপ্রীতি। শিক্ষার্থীরা অঙ্ককে ভয় না পেয়ে, এড়িয়ে না গিয়ে তাকে ভালবাসতে শিখবে। ‘গণিত ভীতি’ বা ‘অঙ্কভীতি’ কাটাতে শিক্ষক মহাশয়রা যেমন এগিয়ে যাবেন, তেমনি শিক্ষার্থীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। দুই পক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হবে। কীভাবে? চলো এক এক করে দেখি।

প্রথমত:
অঙ্কটাকে ভালভাবে বুঝতে হবে তারপর কষতে হবে। না বুঝে করলে হবে না। অঙ্কভীতি কাটানোর এটাই হল প্রথম ও প্রধান উপায়। বোঝাটাই আসল। বাকিটা তো সিম্পল ক্যালকুলেশনের ব্যাপার। সুতরাং বুঝে অঙ্ক করো।

দ্বিতীয়ত:
অঙ্কের প্রতিটি ধারণা (Concept) পরিষ্কার থাকতে হবে। ধারণায় কোনো গণ্ডগোল থাকলে চলবে না। একটু বড়দের জন্য বলা যায় তোমরা group study (গ্রুপে পড়াশুনা) করো। এটা খুব কার্যকরী তোমাদের জন্য। প্রশ্ন করো, জেনে নাও- লজ্জা পেলে চলবে না।

তৃতীয়ত:
ফর্মুলা মুখস্থ করলাম, অঙ্ক করলাম- ব্যাস হয়ে গেল, তা নয়। এরকম করলে অঙ্ক শুধু কষাই হবে, বোঝা হবে না। আর বুঝতে না পারলে অঙ্কের প্রতি ভালবাসা জন্মাবে না। সূত্র অবশ্যই মুখস্থ করতে হবে। তবে সেটি কী বোঝাচ্ছে, তার জ্যামিতিক ব্যাখ্যা কী- তা ভালভাবে জানতে হবে।

যেমন, (a + b)2 এর সূত্র আমরা প্রত্যেকেই জানি, মুখস্থ করি এবং এই সূত্র প্রয়োগ করে অঙ্ক করি। কিন্তু আমরা এটা জানি কি যে- এই সূত্রটা আসলে কী বোঝায়? এর জ্যামিতিক ব্যাখ্যা কী?

যদি কোনো পূর্ণসংখ্যার অঙ্কগুলোর যোগফল 3 দ্বারা বিভাজ্য হয় তাহলে পুরো সংখ্যাটি 3 দ্বারা বিভাজ্য হবে। এটা হল 3 দ্বারা বিভাজ্যতার নিয়ম। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম কেন হল?

4 দ্বারা, 5 দ্বারা বিভাজ্যতার নিয়মটিই বা অন্যরকম কেন? এগুলো জানতে হবে, বুঝতে হবে। তাহলেই দেখবে অঙ্ক বুঝতে পারছ, করতে পারছ, ভাল লাগছে। আর এই ভাল লাগা থেকেই অঙ্কের প্রতি ভালবাসা জন্মাবে।

চতুর্থত:
অঙ্ক বুঝে করতে হবে।

কিন্তু আমি তো বুঝতেই পারছি না। করব কীভাবে? এরকম চিন্তা যদি কারও মাথায় আসে তাহলে তার উত্তরে আমি বলব— সে যদি সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ হয় তবে অঙ্ক বুঝতে না পারার একটাই কারণ হতে পারে- পূর্বজ্ঞান (previous knowledge) ঠিকমত না থাকা। কোনো একটি অধ্যায় পড়তে গেলে সেই অধ্যায়টি পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বজ্ঞান তার থাকতে হবে। তা না থাকলে নতুন অধ্যায়টি সে ঠিকমত বুঝতে পারবে না।

যেমন, “বীজগাণিতিক সমাধান” অধ্যায় পড়তে গেলে যে পূর্বজ্ঞান থাকা প্রয়োজন তা হল- বীজগাণিতিক যোগ,বিয়োগ, গুণ ও ভাগের ধারণা। 3-2= 1 হয়। এটা সহজেই সকলে বলে দেয়।

কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় 2-3 = কত হবে? দেখা যায় অনেকেই এটার ভুল উত্তর দিচ্ছে। বলে 1হবে।

কিন্তু না, এর উত্তর হবে -1। তার মানে বোঝা যাচ্ছে তার এখনও বিয়োগের ধারণায় ঘাটতি আছে, ঠিকমত বোঝেনি।

সুতরাং পূর্বজ্ঞান থাকাটা একান্ত আবশ্যক।

পঞ্চমত:
অঙ্ককে চোখে দেখতে হবে।

যেমন, a.(b+c)=a.b+a.c ( a,b,c হল মূলদ সংখ্যা)। এটাকে আমরা বলি বিচ্ছেদ নিয়ম (Distributive Law)। এটা তো হয় আমরা জানি। কিন্তু কেন এমন হয়? এটা কী বোঝাচ্ছে? তা জানি কি? এগুলো জানতে হবে। নিচের চিত্রটি ভাল করে দেখো। জ্যামিতিকভাবে এটা ঠিক কী বোঝায় তা দেখানো হয়েছে।

a.(b+c)=AEFD আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল
=ABCD আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল+
BEFC আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল
= a.b+a.c
সুতরাং আমরা পেলাম,
a.(b+c)=a.b+a.c

আমরা জানি, আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল = দৈর্ঘ্যx প্রস্থ অর্থাৎ দৈর্ঘ্যের সাংখ্যমানকে প্রস্থের সাংখ্যমান দিয়ে গুণ করলে তবেই আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের মান পাব। যোগ করলে কেন নয়, কেন গুণই করতে হচ্ছে— তা বুঝতে হবে। তার জন্য জ্যামিতির সাহায্য নিতে হবে। একটি আয়তক্ষেত্রের দৈর্ঘ্য 6 মিটার ও প্রস্থ 4 মিটার হলে আয়তক্ষেত্রটির ক্ষেত্রফল যে 24 বর্গমিটার হয়- তা চিত্রের সাহায্যে খুব সহজে,সুন্দরভাবে বোঝানো যায়। অঙ্ককে visualise করতে হবে। কোনো কিছু জানা আর কোনো কিছু দেখতে পাওয়া- দুটো এক ব্যাপার নয়। দেখতে পাওয়ার মধ্যে অনেক বেশি আনন্দ আছে। সুতরাং অঙ্ককে চোখে দেখো।

ষষ্ঠত:
শিক্ষার্থীদের খেলার মাধ্যমে অঙ্ক শেখাতে হবে। একটি শিশু নামতা শিখুক, মুখস্থ করুক। সেই সঙ্গে নামতাকে চিনতে (visualise) শিখুক। কীভাবে?
যেমন, 3×3=3+3+3=9
সে জানল, একই সংখ্যার বারবার যোগ করার সহজ পদ্ধতি হল গুণ করা। (multiplication is a repeated
addition)।
3 কে 3 দিয়ে গুণ করলে যে 9 হয়—এবার তা শিক্ষার্থীদের চিত্রের সাহায্যে দেখাতে হবে।

ছেদ বিন্দু ৯টি

তিনটি অনুভূমিক ও তিনটি উলম্ব সরলরেখাংশ নেওয়া হল (কারণ 3×3=কত তা বের করতে হবে)। এদের মোট ছেদবিন্দুর সংখ্যাই হল গুণফল। চিত্রে দেখা যাচ্ছে, মোট ছেদবিন্দুর সংখ্যা হল 9টি।
তাই 3×3=9।
একইভাবে 3×2 = কত হবে, তা জানতে গেলে তিনটি অনুভূমিক ও দুটি উলম্ব সরলরেখাংশ নিতে হবে (অবশ্য উল্টোটাও নেওয়া যায়)।এবার এদের ছেদবিন্দুগুলো গুণতে হবে।

ছেদ বিন্দু ৬টি

মোট ছেদবিন্দুর সংখ্যা হল 6 টি।
তাই 3×2=6।
এইরকমভাবে শেখালে শিক্ষার্থীরা খুব মজা পাবে এবং ধীরে ধীরে অঙ্কের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে।
এবার একটা মজার জিনিস দেখো।
9 -এর ঘরের নামতা শেখানো যায় খুব মজা করে।
প্রথমে লিখতে হবে এইভাবে—
9×1 =
9×2 =
9×3 =
9×4 =
9×5 =
9×6 =
9×7 =
9×8 =
9×9 =
9×10=
এবার, উপর থেকে নীচ পর্যন্ত 0,1, 2,3,…,9 পরপর লিখে যাও।তাহলে সেটা হবে এইরকম —
9×1 =0
9×2 =1
9×3 =2
9×4 =3
9×5 =4
9×6 =5
9×7 =6
9×8 =7
9×9 =8
9×10=9

এবার, নীচ থেকে উপর পর্যন্ত 0,1, 2,3,…,9 পরপর লিখে যাও।
9×1 =0 9
9×2 =1 8
9×3 =2 7
9×4 =3 6
9×5 =4 5
9×6 =5 4
9×7 =6 3
9×8 =7 2
9×9 =8 1
9×10=9 0

ব্যাস, হয়ে গেল 9-এর ঘরের নামতা।
এটাকে হাতের আঙুলের সাহায্যেও খুব মজা করে দেখানো যায়।
আরও মজা আছে।
9×1= 09 ➡️0+9=9
9×2= 18 ➡️1+8=9
9×3= 27 ➡️2+7=9
9×4= 36 ➡️3+6=9
9×5= 45 ➡️4+5=9
9×6= 54 ➡️5+4=9
9×7= 63 ➡️6+3=9
9×8= 72 ➡️7+2=9
9×9= 81 ➡️8+1=9
9×10=90➡️9+0=9
ডানপাশে তাকিয়ে দেখো প্রতিক্ষেত্রে যোগফল হচ্ছে 9।

আরেকটি মজা,

এইরকম বিভিন্ন প্যাটার্নের খোঁজ দিতে হবে। খেলাচ্ছলে অঙ্ক শেখাতে হবে। শিক্ষার্থীরা অবশ্যই মজা পাবে এবং তারা ধীরে ধীরে অঙ্ককে ভালবাসতে শিখবে।

সপ্তমত:
গল্পের সাহায্য নিতে হবে।কোনো অধ্যায় পড়ানোর সময় যদি সেই অধ্যায় সম্পর্কিত কোন গল্প থাকে তা শিক্ষার্থীদের জানাতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

যেমন, নবম শ্রেণির “বাস্তব সংখ্যা” অধ্যায়ের মূলদ, অমূলদ সংখ্যার জায়গাটা যখন পড়ানো হবে তখন অমূলদ সংখ্যার সঙ্গে জড়িত হিপ্পাসাস (Hippasus)- এর কথা বললে খুব ভাল হয়। প্রায় 400 B.C.তে গ্রিসের একজন বিখ্যাত দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ ছিলেন পিথাগোরাস, যার নামে ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য’ আজও পড়ানো হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত উপপাদ্য এটি। উপপাদ্যটির 341 এর বেশি রকমের প্রমাণ আছে। 12 বছরের নিউটন পর্যন্ত এটি নিয়ে মাথা ঘামান।

যাইহোক, এই বিখ্যাত গণিতবিদ পিথাগোরাস মনে করতেন পৃথিবীর সব সংখ্যাই হল মূলদ সংখ্যা। এই মনে করাতেই ঝামেলা ছিল। আসলে সব সংখ্যা মূলদ সংখ্যা নয়। যেমন, √2। একে কখনোই দুটি পূর্ণ সংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যাবে না। এটা একটা অমূলদ সংখ্যা। আর এই কথাটাই প্রথম যিনি বলেছিলেন তিনি হলেন হিপ্পাসাস (Hippasus), পিথাগোরাসের একজন শিষ্য। তিনি দেখালেন যে, কোন বর্গক্ষেত্রের একটি বাহুর দৈর্ঘ্য যদি 1 একক হয়, তবে বর্গক্ষেত্রটির কর্ণের দৈর্ঘ্য হবে √2 একক (পিথাগোরাসের উপপাদ্য অনুসারে)। √2 একটি অমূলদ সংখ্যা। অথচ পিথাগোরাসের মতে সব সংখ্যাই মূলদ।

দুজনের মধ্যে তৈরি হল মতবিরোধ।

শুরু হল গুরু শিষ্যের মধ্যে জ্ঞানের লড়াই। পিথাগোরাসের অন্যান্য শিষ্যরা এটাকে ভালভাবে মেনে নিল না।একদিন ঘুমন্ত অবস্থায় হিপ্পাসাসকে তুলে নিয়ে গিয়ে তারা মাঝসমুদ্রের জলে ফেলে দিল। হিপ্পাসাসের সলিল সমাধি ঘটল। এরপর শিষ্যরা রটিয়ে দিল যে, ও একটা অশুভ সংখ্যা আবিষ্কার করেছিল।সেই অশুভ সংখ্যার অশুভ শক্তিই তাকে মেরে ফেলেছে।এইভাবে অমূলদ সংখ্যার আবিষ্কারক হিপ্পাসাসের মুখ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হল। হিপ্পাসাসকে বলা যেতেই পারে গণিতের ইতিহাসে প্রথম শহিদ।

এরকম গল্প শিক্ষার্থীদের বললে তারা খুব মন দিয়ে শুনবে এবং অঙ্কের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে।

অষ্টমত:
শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে সঠিক নিয়ম শেখাতে হবে।
যেমন, 32 x 25=?
এইরকম গুণ আগে শেখানো হত এইভাবে—

এই যে গুণের দ্বিতীয় লাইনে x চিহ্ন দিয়ে এক ঘর বাম দিকে সরে গেলাম—প্রশ্ন হচ্ছে কেন সরলাম?
x চিহ্নটি এখানে কী বোঝাচ্ছে? 0-এর সঙ্গে x যোগ করে 0 হল। সংখ্যার সঙ্গে সংখ্যা যোগ হয় জানি। কিন্তু চিহ্নের সঙ্গে সংখ্যা যোগ হয় কী করে? হয় না।এখানে যোগ হচ্ছেও না। 0 কে সরাসরি নিচে নামিয়ে আনা হয়।অবশ্য গুণের এই পদ্ধতি বর্তমানে অচল। এখন গুণ শেখানো হয় আরও সায়েন্টিফিকভাবে নিচের পদ্ধতিতে।

প্রথমে 25 -কে (20+5) -এ ভেঙে নেওয়া হল।এবার 32-এর সঙ্গে 5 গুণ করে হল 160। এরপর 32-এর সঙ্গে 20 গুণ করে হল 640, যা 160-এর নিচে বসল।দুটোকে যোগ করে বেরল 800।
দেখো, এই পদ্ধতিতে ‘x’ এর জায়গায় ‘0’ এসেছে। কেন এসেছে তার কারণও খুব স্পষ্ট। কোন বিভ্রান্তি নেই এবং এটাই সঠিক পদ্ধতি।

আরেকটা কথা বলি। ভাগের ক্ষেত্রে যখন ভাগ মিলে যায় তখন ভাগশেষ 0 দেওয়াটাই সঠিক। অনেককে ওখানে x চিহ্ন দিতে দেখেছি- যা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, কোনো সংখ্যা থেকে সেই সংখ্যা বিয়োগ করলে বিয়োগফল 0 হয়, x নয়।
ভুল পদ্ধতি :

সঠিক পদ্ধতি :

একইভাবে বলা যায়, মৌলিক সংখ্যার বর্তমান সংজ্ঞা,ট্র্যাপিজিয়াম কারা, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রফলের সঠিক ধারণা, চিত্রের সঙ্গে ক্ষেত্রের পার্থক্য, ক্ষেত্রফল কার হয়- চিত্রের নাকি ক্ষেত্রের, সর্বসমতা, সদৃশতা —প্রতিটি ধারণা যেন সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়, সেদিকে খুব সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে।

নবমত:
পাঠ্যবইকে হতে হবে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত। সেখানে কোন ভুল থাকলে চলবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের সরকারি পাঠ্যবই এখনও সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়, বেশ কিছু জায়গায় অসঙ্গতি আমাদের নজরে এসেছে। সেগুলি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি। এগুলো থাকলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে যা কখনোই কাম্য নয়। নির্ভুল পাঠ্যবই অত্যন্ত আবশ্যক।

দশমত:
হাতে-কলমে অঙ্ক শেখাতে হবে। যতটা পারা যায় মডেলের সাহায্য নিতে হবে। বিভিন্ন ঘনবস্তুর (যেমন আয়তঘন, ঘনক, চোঙ, শঙ্কু, প্রিজম, পিরামিড ইত্যাদি) ধারণা দেবার জন্য কাঠের ব্লক পাওয়া যায়। সেগুলি হাতের কাছে রেখে শিক্ষাদান করতে হবে।এর ফলে ধার, শীর্ষবিন্দু, তলসংখ্যা ইত্যাদি সম্বন্ধে শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট ধারণা পাবে।

কাগজ ভাঁজ করে বা কাগজ কেটে জ্যামিতির বিভিন্ন উপপাদ্যগুলি প্রমাণ করা যায়। সেগুলো শিক্ষার্থীদের করে দেখাতে হবে।

যেমন, কাগজ ভাঁজ করে খুব সহজেই ত্রিভুজের মধ্যমা বের করা যায়। সেখান থেকে হাতে কলমে দেখানো যায় ত্রিভুজের মধ্যমা তিনটি সমবিন্দু।

একইভাবে, কাগজ ভাঁজ করে ত্রিভুজের উচ্চতা বের করা যায় এবং সেখান থেকে দেখানো যায় ত্রিভুজের উচ্চতা তিনটি সমবিন্দু। ত্রিভুজের বাহুগুলোর লম্ব-সমদ্বিখণ্ডক তিনটি সমবিন্দু- এটাও দেখানো যায়।

এছাড়া,

(1) কোনো ত্রিভুজের দুটি বাহুর দৈর্ঘ্য সমান হলে তাদের বিপরীত কোণগুলির পরিমাপ সমান হবে।
(2) কোনো ত্রিভুজের দুটি কোণের পরিমাপ সমান হলে তাদের বিপরীত বাহুগুলির দৈর্ঘ্য সমান হবে।
(3) সামান্তরিকের কর্ণদুটি পরস্পরকে সমদ্বিখণ্ডিত করে।
(4) 30° কোণ, 60° কোণ।
(5) পিথাগোরাসের উপপাদ্য।
—এ সবই কাগজ ভাঁজ করে হাতে-কলমে দেখানো যায়।

তাছাড়া কাগজ কেটে দেখানো যায় নিচের উপপাদ্যগুলি—
(1) ত্রিভুজের তিনটি কোণের সমষ্টি 180°।
(2) সামান্তরিকের বিপরীত কোণগুলি পরস্পর সমান।
(3) ত্রিভুজের কোনো একটি বাহুকে বর্ধিত করলে যে বহিঃস্থ কোণটি উৎপন্ন হয় সেটির পরিমাপ অন্তঃস্থ বিপরীত কোণ দুটির পরিমাপের যোগফলের সমান।
এইভাবে যতটা পারা যায় হাতেকলমের মাধ্যমে শিক্ষাদান করতে হবে।

আজ এই পর্যন্তই। ‘গণিতভীতি’ কেটে গিয়ে তোমাদের মধ্যে তৈরি হোক ‘গণিতপ্রীতি’। গণিতকে ভয় নয়, ভালবেসে এগিয়ে চলো। তোমার যাত্রা পথ শুভ হোক। ধন্যবাদ।


রামকৃষ্ণ পাল

সহশিক্ষক (গণিত), পিপিডি হাইস্কুল, পূর্ব বর্ধমান