বিজ্ঞানের আবিষ্কার – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
পশু-পাখি ও উদ্ভিদের মজার আচরণ মানুষেরও উপকারে লাগে
রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করে আত্মরক্ষা করে উদ্ভিদ

নিজেদের রক্ষা করার জন্য গাছপালা নানা ধরনের অ্যালকালয়েড নামের কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করার জন্যে। এর মধ্যে অনেক যৌগই পরে মানুষের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ তৈরিতে কাজে লেগেছে।
সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের গবেষকেরা Flueggea suffruticosa নামের একটি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করেন। এই গাছ securinine নামের একটি শক্তিশালী অ্যালকালয়েড তৈরি করে। এই রাসায়নিকটি কীভাবে তৈরি হয়, তা খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা একটি চমকপ্রদ তথ্য পান। Securinine তৈরির জন্য দায়ী গুরুত্বপূর্ণ জিনটি উদ্ভিদের জিনের চেয়ে বরং সাধারণত ব্যাকটেরিয়ায় পাওয়া জিনের মতো দেখতে।
এই আবিষ্কার থেকে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, গাছপালা শুধু নিজেদের জিন ও রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করেই সব কাজ করে না। বিবর্তনের পথে তারা হয়তো ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবাণুর কিছু জিন বা জৈবিক কৌশলও নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে শিখেছে। এগুলোর সাহায্যে তারা নিজেদের রক্ষা করার জন্য বিশেষ ধরনের রাসায়নিক তৈরি করতে পারে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, এই জিনটি অন্য পরিচিত উদ্ভিদ-রাসায়নিক তৈরির পদ্ধতির থেকে একেবারেই আলাদা উপায়ে securinine তৈরি করে।
ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের জীববিজ্ঞান বিভাগের ড. বেঞ্জামিন লিচম্যান বলেন, গাছপালা এবং ব্যাকটেরিয়া দুটি আলাদা ধরনের জীব। তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ-রাসায়নিক তৈরি করতে ব্যাকটেরিয়ার মতো দেখতে একটি জিন কাজ করছে, সেটি সত্যিই অবাক করার মতো বিষয়।
ওষুধ তৈরি ও নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা
উদ্ভিদ কীভাবে অ্যালকালয়েড তৈরি করে, সেই প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারলে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে পরীক্ষাগারে এগুলো তৈরির নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করতে পারবেন। আবার কোনো উদ্ভিদে বিষাক্ত অ্যালকালয়েড থাকলে, সেই রাসায়নিক তৈরির প্রক্রিয়া বন্ধ বা পরিবর্তন করে উদ্ভিদটিকে কম বিষাক্ত করার উপায়ও খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্ভিদ-জিন ব্যবহার করে পরীক্ষাগারে গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক তৈরি করা যেতে পারে। এতে বিরল উদ্ভিদ সংগ্রহ করে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করার প্রয়োজন কমবে। ড. লিচম্যান আরও জানান, অ্যালকালয়েড অনেক সময় বিষাক্ত হতে পারে। তাই ওষুধে ব্যবহার করার সময় এগুলোকে খুব সতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তনও করতে হয়।
কৃষি ও পরিবেশের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব
New Phytologist জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফল থেকে বিজ্ঞানীরা গাছপালা কীভাবে বেড়ে ওঠে এবং প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে টিকে থাকে, সে সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন। ভবিষ্যতে এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে আরও শক্তিশালী ও প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে এমন ফসলের জাত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির কাছ থেকে এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি। উদ্ভিদ নিয়ে করা মৌলিক গবেষণা থেকে এমন অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার হতে পারে, যা ভবিষ্যতে চিকিৎসা, কৃষি এবং পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটাতে সাহায্য করবে।

