বিজ্ঞানের আবিষ্কার – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
পশু-পাখি ও উদ্ভিদের মজার আচরণ মানুষেরও উপকারে লাগে
উদ্ভিদ কোষে অক্সিজেনের টানাটানি

উদ্ভিদের বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা এবং পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অক্সিজেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উদ্ভিদের কোষের ভিতরে এই অক্সিজেনকে ঘিরে যে এক ধরনের ‘টানাটানি’ চলে, বিজ্ঞানীরা এতদিন তার পুরো ছবিটা জানতেন না। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সম্প্রতি উদ্ভিদ কোষের ভিতরে অক্সিজেনের এমনই এক অজানা ব্যবস্থার সন্ধান পেয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোষের শক্তি তৈরির কেন্দ্র মাইটোকন্ড্রিয়া প্রয়োজনে ক্লোরোপ্লাস্টের কাছ থেকে অক্সিজেন টেনে নিতে পারে। ক্লোরোপ্লাস্ট হল কোষের সেই অংশ, যেখানে সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে উদ্ভিদ খাদ্য তৈরি করে। এই নতুন তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, উদ্ভিদ কোষের বিভিন্ন অঙ্গাণু নিজেদের কাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কোষের ভিতরে অক্সিজেনের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করে।
অক্সিজেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
উদ্ভিদের বিপাকক্রিয়া, বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অক্সিজেন দরকার। এমনকি উদ্ভিদের কোনও অংশে আঘাত লাগলে ক্ষত সারানোর প্রক্রিয়া শুরু করতেও অক্সিজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদ্ভিদ কোষে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে দুটি অঙ্গাণুর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — মাইটোকন্ড্রিয়া ও ক্লোরোপ্লাস্ট। মাইটোকন্ড্রিয়া কোষীয় শ্বসনের সময় অক্সিজেন ব্যবহার করে শক্তি তৈরি করে। অন্যদিকে, ক্লোরোপ্লাস্ট সালোকসংশ্লেষের সময় উপজাত হিসেবে অক্সিজেন তৈরি করে।
সালোকসংশ্লেষ ও কোষীয় শ্বসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। কিন্তু এই দুটি অঙ্গাণুর মধ্যে অক্সিজেন কীভাবে আদান-প্রদান করে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল তুলনামূলকভাবে কম।
অ্যারাবিডপসিস নিয়ে পরীক্ষা
এই বিষয়টি বোঝার জন্য গবেষকরা Arabidopsis thaliana নামে পরিচিত একটি মডেল উদ্ভিদের জিনগতভাবে পরিবর্তিত কিছু গাছ নিয়ে পরীক্ষা করেন। এই উদ্ভিদগুলির মাইটোকন্ড্রিয়ায় কিছু ত্রুটি ছিল, যার ফলে বিকল্প ধরনের শ্বসন-এনজাইম সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে মাইটোকন্ড্রিয়া স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি অক্সিজেন ব্যবহার করতে থাকে।
গবেষণায় দেখা যায়, মাইটোকন্ড্রিয়ার এই অতিরিক্ত শ্বসনের ফলে উদ্ভিদের টিস্যুর ভিতরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। একই সঙ্গে ক্লোরোপ্লাস্ট এমন একটি রাসায়নিকের প্রভাবের বিরুদ্ধে বেশি প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, যা অক্সিজেন ব্যবহার করে ক্ষতিকর রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস (ROS) তৈরি করতে পারে।
গবেষকরা যখন উদ্ভিদগুলিকে নাইট্রোজেন গ্যাসের সংস্পর্শে এনে অক্সিজেনের মাত্রা আরও কমিয়ে দেন, তখন অক্সিজেনের দিকে ইলেকট্রন যাওয়ার পরিমাণও দ্রুত কমে যায়। এতে বোঝা যায়, ওই রাসায়নিকটির কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন তখন পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল না।
মাইটোকন্ড্রিয়ার ‘অক্সিজেন টান’
এই ফলাফল থেকেই গবেষকরা বুঝতে পারেন, মাইটোকন্ড্রিয়া বেশি অক্সিজেন ব্যবহার করলে ক্লোরোপ্লাস্টের জন্য উপলব্ধ অক্সিজেন কমে যেতে পারে। অর্থাৎ, কোষের ভিতরে মাইটোকন্ড্রিয়া কার্যত একটি ‘অক্সিজেনের ড্রেন’ তৈরি করতে পারে।
এর ফলে সালোকসংশ্লেষের কাজ এবং ROS-এর বিপাকক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে। পরিবেশের পরিবর্তন বা প্রতিকূল পরিস্থিতির সময় এই পরিবর্তনগুলি উদ্ভিদকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিক্কি ক্যাম্পাসের সেন্টার অব এক্সেলেন্স ইন ট্রি বায়োলজি-র গবেষক ড. অ্যালেক্সেই শাপিগুজভ। গবেষণার ফলাফল Plant Physiology জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
উদ্ভিদের টিকে থাকার রহস্য বুঝতে নতুন দরজা
দিন-রাতের পরিবর্তন, জলমগ্ন হয়ে পড়া বা অন্যান্য পরিবেশগত চাপের সময় উদ্ভিদ কীভাবে নিজের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তা বুঝতে এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। শ্বসন ও সালোকসংশ্লেষের মধ্যে অক্সিজেনের এই আদান-প্রদান সম্পর্কে আরও জানা গেলে উদ্ভিদের শক্তি উৎপাদন ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও আরও ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতে এই গবেষণা উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় অবস্থা মাপা ও ছবি তুলে পর্যবেক্ষণের আরও উন্নত পদ্ধতি তৈরিতেও সাহায্য করতে পারে। এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের মধ্যে প্রতিকূলতার লক্ষণ অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি নতুন ও পরিবেশ-সহনশীল ফসলের জাত তৈরির গবেষণাতেও এই জ্ঞান কাজে লাগতে পারে।
অর্থাৎ, উদ্ভিদ কোষের ভিতরে অক্সিজেনকে ঘিরে এই ‘টানাটানি’ শুধু একটি অদ্ভুত জৈবিক ঘটনা নয়—উদ্ভিদ কীভাবে নিজের ভিতরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয় রেখে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
