বিজ্ঞানের আবিষ্কার – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
পশু-পাখি ও উদ্ভিদের মজার আচরণ মানুষেরও উপকারে লাগে
ক্ষুদ্র উদ্ভিদের “মলিকিউলার ভেলক্রো” বাড়াতে পারে ফসলের ফলন

গাছ কীভাবে সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাবার তৈরি করে, তা আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি। এই প্রক্রিয়ার নাম সালোকসংশ্লেষণ। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করে তোলা গেলে ভবিষ্যতে একই জমিতে আরও বেশি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। সেই লক্ষ্যেই বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির কাছ থেকেই খুঁজে পেয়েছেন এক চমকপ্রদ কৌশল।
হর্নওয়ার্ট নামে ছোট এক ধরনের উদ্ভিদে বিজ্ঞানীরা এমন একটি বিশেষ প্রোটিন অংশের সন্ধান পেয়েছেন, যা অনেকটা “মলিকিউলার ভেলক্রো” বা অণুস্তরের ভেলক্রোর মতো কাজ করে। এটি সালোকসংশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎসেচক রুবিসকোকে এক জায়গায় জড়ো করে রাখে। গবেষকদের ধারণা, এই কৌশল ভবিষ্যতে ধান, গম, ভুট্টার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের সালোকসংশ্লেষণ আরও দক্ষ করে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
রুবিসকো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণে রুবিসকোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বায়ু থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে সেটিকে উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এই উৎসেচক মূল ভূমিকা পালন করে।
সমস্যা হল, রুবিসকো খুব দ্রুত কাজ করে না। তার থেকেও বড় সমস্যা, এটি কখনও কখনও কার্বন ডাই-অক্সাইডের বদলে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফেলে। তখন শক্তির অপচয় হয় এবং সালোকসংশ্লেষণের দক্ষতা কমে যায়। ফলে গাছের বৃদ্ধিও ততটা কার্যকর হয় না।
কিছু জীব অবশ্য এই সমস্যা মোকাবিলার উপায় বের করেছে। অনেক শৈবাল তাদের কোষের মধ্যে পাইরেনয়েড নামে ছোট কাঠামোর ভিতরে রুবিসকোকে জমা করে রাখে। সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব বেশি থাকায় রুবিসকো আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই ভাবছেন, এই ধরনের ব্যবস্থা যদি খাদ্যশস্যের গাছের মধ্যে তৈরি করা যায়, তাহলে সালোকসংশ্লেষণ আরও দক্ষ হতে পারে। কিন্তু শৈবালের এই জটিল ব্যবস্থা অন্য গাছে বসানো বেশ কঠিন।
হর্নওয়ার্ট দেখাল অন্য পথ
এই সমস্যার সমাধানের সূত্র মিলল হর্নওয়ার্ট উদ্ভিদে। স্থলজ উদ্ভিদের মধ্যে হর্নওয়ার্টের কিছু প্রজাতির কোষেও শৈবালের মতো কার্বন-ঘনীভবনকারী কাঠামো রয়েছে।
গবেষকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হর্নওয়ার্টও হয়তো শৈবালের মতো কোনও আলাদা প্রোটিন ব্যবহার করে রুবিসকোকে এক জায়গায় জড়ো করে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, ব্যাপারটি আরও চমকপ্রদ।
হর্নওয়ার্টের রুবিসকোর একটি ছোট প্রোটিন অংশে STAR নামে একটি অতিরিক্ত অংশ রয়েছে। গবেষকেরা এই বিশেষ অংশটির নাম দিয়েছেন RbcS-STAR।
এই অতিরিক্ত অংশটি অনেকটা ভেলক্রোর মতো কাজ করে। এটি রুবিসকোর বিভিন্ন প্রোটিনকে পরস্পরের সঙ্গে আটকে দিয়ে কোষের ভিতরে ঘনভাবে জমা হতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ, আলাদা কোনও জটিল যন্ত্রের সাহায্য নেওয়ার বদলে হর্নওয়ার্ট নিজের রুবিসকোকেই এমনভাবে বদলে নিয়েছে, যাতে সেটি এক জায়গায় জমা হতে পারে।
অন্য উদ্ভিদেও কাজ করল “ভেলক্রো”
গবেষকেরা এরপর দেখতে চাইলেন, RbcS-STAR-এর এই কৌশল অন্য উদ্ভিদেও কাজ করে কি না।
প্রথমে তাঁরা এমন একটি কাছাকাছি সম্পর্কের হর্নওয়ার্ট প্রজাতিতে এই প্রোটিন অংশটি যুক্ত করেন, যেটি স্বাভাবিকভাবে পাইরেনয়েড তৈরি করে না। পরিবর্তনের পর দেখা যায়, আগে কোষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা রুবিসকো এক জায়গায় ঘন হয়ে জমা হচ্ছে এবং পাইরেনয়েডের মতো কাঠামো তৈরি করছে।
এরপর একই পরীক্ষা করা হয় Arabidopsis নামের একটি উদ্ভিদে, যা গবেষণাগারে উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার কাজে বহুল ব্যবহৃত হয়। সেখানেও একই ফল পাওয়া যায়। ক্লোরোপ্লাস্টের ভিতরে রুবিসকো ঘন হয়ে ছোট ছোট কাঠামোর মধ্যে জমা হতে শুরু করে।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হল, গবেষকেরা Arabidopsis-এর নিজস্ব রুবিসকোর সঙ্গে শুধু STAR অংশটুকু যুক্ত করেও একই ফল পেয়েছেন। অর্থাৎ, রুবিসকোকে এক জায়গায় জমা করার ক্ষেত্রে STAR অংশটিই মূল ভূমিকা পালন করছে।
ভবিষ্যতে ফসলের ফলন বাড়ানো সম্ভব?
এই আবিষ্কার কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ RbcS-STAR যদি বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদে কাজ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এই কৌশল ব্যবহার করে ফসলের গাছের মধ্যে রুবিসকোকে আরও কার্যকরভাবে সংগঠিত করা সম্ভব হতে পারে।
তবে এখনই বলা যাবে না যে এই পদ্ধতি ব্যবহার করলেই ধান, গম বা ভুট্টার ফলন সরাসরি বেড়ে যাবে। কারণ শুধু রুবিসকোকে এক জায়গায় জমা করলেই হবে না। সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
গবেষণার অন্যতম নেতা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লরা গান বিষয়টি বোঝাতে মজার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর কথায়, বিজ্ঞানীরা রুবিসকোর জন্য একটি “ঘর” তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই ঘরকে সত্যিই কার্যকর করতে হলে তার বায়ু চলাচল ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, অর্থাৎ HVAC-ও ঠিক করতে হবে।
অর্থাৎ, রুবিসকোকে সঠিক জায়গায় জমা করার কৌশল পাওয়া গেছে, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটিকে দক্ষ করে তুলতে এখনও আরও গবেষণা দরকার।
প্রকৃতির কাছ থেকেই সমাধান
সালোকসংশ্লেষণের দক্ষতা সামান্য বাড়ানো গেলেও ভবিষ্যতে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। একই পরিমাণ জমিতে যদি গাছ আরও দক্ষতার সঙ্গে সূর্যের আলো ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে খাদ্য তৈরি করতে পারে, তাহলে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে কৃষির পরিবেশগত প্রভাবও কমানো যেতে পারে।
গবেষক ফে-ওয়েই লির মতে, এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—প্রকৃতি ইতিমধ্যেই অনেক সমস্যার সমাধান করে রেখেছে। বিজ্ঞানীদের কাজ হল সেই সমাধানগুলিকে ভালোভাবে বোঝা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানো।
হর্নওয়ার্টের এই ছোট্ট “মলিকিউলার ভেলক্রো” তাই ভবিষ্যতের আরও দক্ষ ও টেকসই কৃষির পথে একটি সম্ভাবনাময় সূত্র হয়ে উঠতে পারে।
