বিজ্ঞানের টুকিটাকি – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
জায়েন্ট পান্ডারা কী সত্যি বোকা হয়?
– ঐন্দ্রিলা সাউ –

জায়েন্ট পাণ্ডা – পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি বন্যপ্রাণী। সাদা-কালো গোলগাল চেহারা, চোখের চারপাশে বড় কালোরঙের দাগের জন্য এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে একেবারে গোবেচারা দেখতে লাগে। এদের কার্যকলাপও হেসে গড়িয়ে পড়ার মত। গাছে উঠতে গিয়ে পড়ে যায়।, একি অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসেই থাকে। হাত-পা ছড়িয়ে বা মুখে হাত চাপা দিয়ে ঘুমের দৃশ্য তো দেখার মতন। আর সবচেয়ে মজাদার হল হাঁটার পরিবর্তে এরা ডিগবাজি খেতে খেতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়, এতটাই অলস এরা। কিন্তু এমন আজব আচরণ কেন করে এরা?
World Wildlife Fund (WWF)-এর অফিসিয়াল ম্যাসকট এই জায়েন্ট পাণ্ডা আদতে চীনের বাসিন্দা। বর্তমানে চীনের সিচুয়ান প্রদেশের মিংসাং পর্বতের ঘন বাঁশবনই পাণ্ডাদের একমাত্র প্রাকৃতিক বাসস্থান। মাত্র ১৮৬৪টি (আনুমানিক) বন্য পাণ্ডা এখন অবশিষ্ট। ভাল্লুক প্রজাতির হলেও এরা কিন্তু শীতঘুম দেয় না। প্রায় ১৯৮ পাউণ্ডের বিশাল চেহারা হলেও হাত-পা ও বাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি কিন্তু চেহারার তুলনায় বেশ ছোট। এখন প্রশ্ন হল এদের এইসব বোকাবোকা কাজকর্মের কি কোনো কারণ আছে? অবশ্যই আছে এবং কারণটি রীতিমত গুরুতর।
অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের তুলনায় এদের দেহের মেটাবলিক হার একেবারে কম, প্রায় একটা ঠাণ্ডা রক্তের সরীসৃপের সমান। সুতরাং বেঁচে থাকার জন্য এদের একেবারে নামমাত্র শক্তি খরচ করতে হয়। বহুক্ষণ ঘুমানো বা বসে থাকার পর এদের হাত-পায়ের পেশিগুলো চট করে সচল হয়না, তাই এরা অভিকর্ষকে ব্যবহার করে গড়িয়ে-গড়িয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যায়। এছাড়াও এদের হাত-পা গুলো চেহারার তুলনায় এতটাই ছোট যে এরা সহজে ব্যালান্স রাখতে পারেনা এবং গড়িয়ে যায় বেশি। এদের ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তিও দায়ী। ঘন বাঁশবনের ভিতর খুব দূরের জিনিস এরা দেখতেও পায়না। ফলে হেঁটে বা ছুটে যাওয়ার থেকে গড়িয়ে যাওয়াই সহজ মনে করে। ঘণ্টায় গড়ে এরা মাত্র ৮৮.৩ ফুট অঞ্চলেই নড়াচড়া করে।
পরবর্তী মজার বিষয় হল- মাংসাশী প্রাণী হয়েও পাণ্ডার প্রধান খাদ্য বাঁশ, তার নরম কাণ্ড, পাতা ও ছাল। কচি বাঁশে কিন্তু পুষ্টিগুণ একেবারে নেই বললেই চলে। ফলে এতবড় চেহারার চাহিদা মেটাতে দিনে প্রায় ১২-৩৮ কেজি বাঁশ খেতে হয় এদের। ১৪-১৬ ঘণ্টা তাই খেতেই কেটে যায় প্রতিদিন। এদের পাকস্থলীও কিন্তু বাঁশ হজমের জন্য একেবারেই উপযোগী নয়। ফলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ বার এদের মলত্যাগ করতে হয়। পাণ্ডার বাচ্চারা তাদের মায়ের মল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে অন্ত্রে প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়ার চাহিদা মেটায়। বাঁশ খুব একটা ভালোভাবে হজম করতে না পারলেও এরা বাঁশকেই খাদ্য হিসেবে বেছে নেয়। কারণ, খাবার জোগাড়ের জন্য অন্য কোনও প্রাণীর সঙ্গে তাদের কোনও প্রতিযোগিতা বা লড়াইয়ে যেতে হয় না। ভাবতে পারছেন?
আরও একটা অদ্ভুত আচরণ হল- ঘোড়ার গোবরে গড়াগড়ি খাওয়া। ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে পাণ্ডারা এই পদ্ধতি অবলম্বন করে। আসলে টাটকা ঘোড়ার গোবরে beta-caryophyllene(BCP) ও beta-caryophyllene oxide(BCPO) নামক দুটি রাসায়নিক পদার্থ আছে যাদের sesquiterpenes বলে, যেগুলো শরীরের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই পাণ্ডারা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই কাজ করে।
পাণ্ডা সারাজীবন একা থাকতেই পছন্দ করে। এদের শরীরে একধরণের গ্রন্থি থেকে কিছু গন্ধযুক্ত পদার্থ ক্ষরিত হয় যার সাহায্যে এরা নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করে রাখে। এরা এতটাই অলস যে প্রজননের ইচ্ছাও এদের মধ্যে প্রায় থাকেনা। সঙ্গমকালে নিজের সঙ্গীর সাথে ১ মাসেরও কম সময় এরা থাকে। একমাত্র সন্তানের সাথে মা পাণ্ডা অনেকদিন থাকে কারণ এদের বাচ্চা জন্মের সময় খুবই দুর্বল ও অন্ধ হয়। নিরীহ এই প্রাণীটি কিন্তু মূহুর্তের মধ্যেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যখন মানুষ বা অন্য প্রাণী এদের সদ্যোজাত বাচ্চার খুব কাছে চলে আসে। এর বাইরে একে রাগতে বা কাউকে আক্রমণ করতে খুব একটা দেখা যায়না। সারাদিন নিজের মত করে খেলতে, খেতে আর ঘুমাতেই এদের জীবন কেটে যায়। তবে এহেন নির্বোধ প্রাণী কিন্তু খুব ভালো গাছে চড়তে পারে এবং সাঁতারেও খুব দক্ষ হয়। তাই একেবারে বোকা বলা যাবে না এদের।
