বিজ্ঞানের আবিষ্কার – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
পশু-পাখি ও উদ্ভিদের মজার আচরণ মানুষেরও উপকারে লাগে
উদ্ভিদ এবং বিটল পোকার মধ্যে গোপন আঁতাত

কিছু উদ্ভিদ ও পতঙ্গের সম্পর্কে পতঙ্গ একই সঙ্গে গাছের ফুলে পরাগায়ন ঘটায় এবং ফলকে নিজের বাচ্চাদের বেড়ে ওঠার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে। এর পরিচিত উদাহরণ হল ডুমুর গাছ ও ডুমুরের বোলতা, এবং ইউকা গাছ ও ইউকা মথ। জীববিজ্ঞানীরা এই ধরনের সম্পর্ককে “নার্সারি পলিনেশন মিউচুয়ালিজম” বা পরাগায়ন ও বংশবৃদ্ধির পারস্পরিক সম্পর্ক বলে থাকেন।
এই ধরনের সম্পর্কে গাছ প্রায়ই এমন ফল ঝরিয়ে ফেলে, যেগুলির মধ্যে অতিরিক্ত সংখ্যক পতঙ্গের লার্ভা রয়েছে। সাধারণত ফল ঝরে পড়লে তার ভিতরের লার্ভাগুলি মারা যায়। তাই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করে এসেছেন, এটি আসলে পতঙ্গের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য গাছের এক ধরনের শাস্তি, যা গাছ ও পতঙ্গের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখে।
কিন্তু জাপানি রেড এল্ডার গাছের ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা ঠিক কি না, তা নিয়ে সন্দেহ হয় কোবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানী কেনজি সুয়েতসুগু-র। একবার তিনি জাপানি রেড এল্ডারের ফুলে অসংখ্য হেটেরহেলাস (Heterhelus) গুবরেপোকাকে মিলন করতে ও খাবার খেতে দেখেন। আবার এটাও দেখেন যে প্রচুর সংখ্যক এই ফল যাতে এই পোকার লার্ভা রয়েছে সেগুলো মাটিতে ঝটে পড়েছে। গাছ এবং পোকা দু’পক্ষেরই এত বেশি ক্ষতি হতে দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে — এটা কি সত্যিই শাস্তি? আর যদি তাই হয়, তাহলে পতঙ্গগুলি কীভাবে নিজেদের ক্ষতি এতটা সীমিত রাখে?
উদ্ভিদ ও গুবরেপোকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা
সুয়েতসুগুর এই পর্যবেক্ষণ থেকে মনে হয়, নার্সারি পলিনেশন মিউচুয়ালিজমে শাস্তির মাধ্যমে ভারসাম্য বজায় থাকে, এমন প্রচলিত ব্যাখ্যার মধ্যে হয়তো কিছু একটা বাদ পড়েছে। এই রহস্যের সমাধান করতে সুয়েতসুগু এবং তাঁর সহকর্মীরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। প্রথমত, Heterhelus Beetle বা হেটারহেলাস গুবরেপোকা কি জাপানি রেড এল্ডার (Sambucus sieboldiana) গাছের জন্য অপরিহার্য পরাগবাহক? দ্বিতীয়ত, কীভাবে এই সম্পর্কটি দুই প্রজাতিরই উপকার করে এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে বেশ জটিল পদ্ধতিতে গবেষণা করতে হয়।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য গবেষকদের মাঠে গিয়ে পরাগায়নের ঘটনা খুব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে। পাশাপাশি কিছু ফুলে পতঙ্গ ঢুকতে না দিয়ে পরীক্ষা করা, হাতে পরাগায়ন করানো এবং ফল ঝরে পড়ার পরেও পতঙ্গের লার্ভাগুলির বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, জাপানি রেড এল্ডার গাছের পরাগায়নের জন্য হেটারহেলাস গুবরেপোকার উপর নির্ভর করতে হয়। একই সঙ্গে, যেসব ফলে পোকার লার্ভা থাকে, গাছ সেগুলির প্রায় সবকটিই ঝরিয়ে দেয়। এর ফলে গাছকে ওই ফলগুলির বেড়ে ওঠার জন্য অতিরিক্ত পুষ্টি ও শক্তি খরচ করতে হয় না। তবে ফল ঝরে পড়ার পর লার্ভাগুলি মারা যায় না। বরং তারা ঝরে পড়া ফল থেকে বেরিয়ে মাটির মধ্যে ঢুকে যায়। সেখানে তারা পূর্ণবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বেড়ে উঠতে থাকে।
গবেষকেরা গাছ ও গুবরেপোকার এই সম্পর্কের লাভ-ক্ষতির হিসাবও করেছেন। তাঁদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় এই ভারসাম্য এক রকম নয়। অর্থাৎ, পরিবেশের বিভিন্ন পরিস্থিতি এই সম্পর্ক কীভাবে কাজ করবে, তার উপর প্রভাব ফেলে।
গবেষণার প্রথম লেখক কাওয়াশিমার মতে Heterhelus গুবরেপোকার সব প্রজাতিই বংশবিস্তারের জন্য এল্ডার গাছের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু উল্টোটা সবসময় সত্যি নয়। এল্ডার গাছের বিভিন্ন প্রজাতি পরাগায়নের জন্য Heterhelus-এর উপর কতটা নির্ভর করে, তার মধ্যেও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। গবেষক দলটি তাদের গবেষণার ফলাফল Plants, People, Planet জার্নালে প্রকাশ করেছে।
