বিজ্ঞানের আবিষ্কার – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
পশু-পাখি ও উদ্ভিদের মজার আচরণ মানুষেরও উপকারে লাগে
হেজহগ আল্ট্রাসাউন্ড শব্দ শুনে নিজেকে বিপদ থেকে বাঁচায়

হেজহগ – সজারুর মতো কাঁটাযুক্ত ইঁদুরজাতীয় মিষ্টি দেখতে একটা প্রাণী। ইউরোপীয় হেজহগ ইউরোপের সবচেয়ে পরিচিত বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে একটি। কিন্তু বর্তমানে এদের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে International Union for Conservation of Nature (IUCN) এই প্রাণীটিকে ‘Near Threatened’ বা ‘বিপন্ন হওয়ার কাছাকাছি’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। হেজহগের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হল রাস্তায় গাড়ির ধাক্কা। কিছু স্থানীয় হেজহগের গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে হিসাব অনুযায়ী, প্রতি তিনটি হেজহগের মধ্যে একটি পর্যন্ত গাড়ির ধাক্কায় মারা যেতে পারে।
হেজহগের শ্রবণক্ষমতা পরীক্ষা
হেজহগ কত ধরনের শব্দ শুনতে পারে তা জানার জন্য University of Oxford-এর গবেষকেরা ডেনমার্কের কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে মিলে পরীক্ষা করেন। এর জন্য তাঁরা auditory brainstem response পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
এই পদ্ধতিতে প্রাণীটির শরীরে ছোট ইলেকট্রোড লাগিয়ে কানের ভেতর থেকে মস্তিষ্কে যাওয়া বৈদ্যুতিক সংকেত রেকর্ড করা হয়। একই সময়ে একটি ছোট স্পিকারের মাধ্যমে অল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের শব্দ শোনানো হয়। শব্দ শুনে মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, তা থেকেই প্রাণীটি সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছে কি না বোঝা যায়।
পরীক্ষায় দেখা যায়, হেজহগের মস্তিষ্ক ৪–৮৫ কিলোহার্টজ (kHz) কম্পাঙ্কের শব্দে সাড়া দিচ্ছে। তাদের প্রায় ৪০ kHz-এ শব্দ শোনার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ছিল। এর ফলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে হেজহগ আল্ট্রাসাউন্ডও শুনতে পারে। ২০ kHz-এর বেশি কম্পাঙ্কের শব্দকে আল্ট্রাসাউন্ড বলা হয়। অর্থাৎ, হেজহগ অন্তত ৮৫ kHz পর্যন্ত উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে সক্ষম।
গবেষকেরা উচ্চ-রেজোলিউশনের মাইক্রো-CT স্ক্যান ব্যবহার করে একটি মৃত হেজহগের কানও পরীক্ষা করেন। এই স্ক্যানের সাহায্যে গবেষকেরা হেজহগের কানের একটি বিস্তারিত, ত্রিমাত্রিক (3D) মডেল তৈরি করেন। এতে কানের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, যা আগে জানা ছিল না।
মডেলটি থেকে দেখা যায়, হেজহগের মধ্যকর্ণের হাড়গুলো খুব ছোট ও ঘন। এছাড়া কানের পর্দা এবং ওই হাড়গুলোর প্রথমটির মধ্যে একটি অংশে আংশিকভাবে জোড়া লাগা সংযোগ রয়েছে। এই ধরনের গঠন কানের হাড়গুলোর পুরো শৃঙ্খলকে আরও শক্ত করে এবং খুব উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ আরও দক্ষভাবে ভেতরের কানে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। আল্ট্রাসাউন্ড শনাক্ত করতে পারে এমন কিছু প্রাণী, যেমন প্রতিধ্বনির সাহায্যে পথ খুঁজে নেওয়া বাদুড়ের কানেও এই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
স্ক্যানে আরও দেখা যায়, হেজহগের স্টেপিস (stapes) নামের হাড়টি বেশ ছোট। এটি মধ্যকর্ণের সবচেয়ে ছোট হাড় এবং কানের হাড়গুলোর শৃঙ্খলকে ভেতরের কানের তরলভরা ককলিয়া (cochlea)-র সঙ্গে যুক্ত করে। স্টেপিস যত ছোট ও হালকা হয়, সেটি তত দ্রুত কম্পিত হতে পারে। ফলে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ আরও ভালোভাবে ভেতরের কানে পৌঁছাতে পারে।
গবেষকেরা আরও দেখতে পান যে হেজহগের ককলিয়াও তুলনামূলকভাবে ছোট ও আঁটসাঁট (compact)। এই গঠন তাদের কানের ভেতরে তৈরি হওয়া আল্ট্রাসোনিক কম্পন শনাক্ত ও প্রক্রিয়া করতে সাহায্য করে।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সোফি লুন্ড রাসমুসেন-এর বক্তব্য অনুযায়ী নতুন গবেষণার ফলাফল থেকে মনে করা হচ্ছে, গাড়ি শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতা করে আল্ট্রাসোনিক রিপেলেন্ট ব্যবহার করে হেজহগকে রাস্তা বা অন্য বিপজ্জনক জায়গায় ঢোকা থেকে দূরে রাখা যেতে পারে।
