বিজ্ঞানের টুকিটাকি – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
বাড়ির পোষা বিড়াল কেন বাক্স ভালোবাসে?
– রীয়া অধিকারী চট্টোপাধ্যায় –

আপনার বাড়িতে কি পষা বিড়াল আছে আর তার জন্যে কি বাড়িতে নতুন কোনও খেলনা, নরম বিছানা কিংবা দামি ক্যাট-হাউস এনে দিয়েছেন? বেশ! কিন্তু তোমার বিড়ালটির চোখে সেসবের কোনও মূল্য নেই। সে দিব্যি গিয়ে বসবে পাশের ফেলে দেওয়া কার্ডবোর্ডের বাক্সটায়! কখনও তার ভিতরে গুটিসুটি মেরে ঘুমোবে, কখনও আবার বাক্সের আড়াল থেকে তোমার দিকে এমনভাবে তাকাবে, যেন সে কোনও গোপন অভিযানে বেরিয়েছে।
বিড়ালের বাক্সপ্রেমকে অনেকেই নিছক কৌতূহল বা খেলার ছলে করা কাণ্ড বলে মনে করেন। তবে বিড়ালের বাক্সের প্রতি এই অদ্ভুত আকর্ষণের পেছনে কেবল কৌতূহল নয়, বরং গভীর বৈজ্ঞানিক ও বিবর্তনীয় কারণ লুকিয়ে আছে।
বাক্স মানেই নিরাপদ আশ্রয়
নতুন জায়গায় গেলে আমাদের যেমন একটু অস্বস্তি হতে পারে, বিড়ালের ক্ষেত্রেও অপরিচিত পরিবেশ যথেষ্ট চাপের কারণ হতে পারে। আর তখন একটি ছোট বাক্সই হয়ে উঠতে পারে তার নিজের ছোট্ট ‘নিরাপদ ঘর’।
নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের (Utrecht University) গবেষক ক্লদিয়া ভিঙ্কে (Claudia Vinke) এবং তাঁর সহযোগীরা ২০১৪ সালে একটি বিড়াল আশ্রয়কেন্দ্রে নতুন আসা বিড়ালদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন, যেসব বিড়ালকে বাক্স দেওয়া হয়েছিল, তারা নতুন পরিবেশের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে দ্রুত মানিয়ে নিতে পেরেছিল (Vinke et al., 2014)।
গবেষণায় ‘ক্যাট-স্ট্রেস-স্কোর’ (CSS) ব্যবহার করে দেখা যায়, বাক্সের আশ্রয় পাওয়া বিড়ালদের মধ্যে মানসিক চাপের মাত্রা কম ছিল। অর্থাৎ, বাক্সটি তাদের কাছে শুধু বসে থাকার জায়গা নয়, একটি ছোট্ট ‘সেফ জোন’। বাইরের অপরিচিত শব্দ, মানুষ কিংবা অন্য প্রাণী থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকা তাদের দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই তোমার বিড়ালটি বাক্সের ভিতরে ঢুকে যদি তোমাকে পাত্তা না দেয়, মনে রেখো—সে হয়তো তোমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে না, বরং একটু ‘নিজের সময়’ কাটাচ্ছে!
বিড়াল একটু বেশি উষ্ণতা পছন্দ করে
বাক্সের প্রতি বিড়ালের ভালোবাসার আর একটি কারণ হতে পারে তাপমাত্রা।
২০০৬ সালে ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল (National Research Council) বিড়ালের পুষ্টি ও শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে বিড়ালের থার্মোনিউট্রাল জোন বা এমন তাপমাত্রার পরিসরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে শরীরকে নিজের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে অতিরিক্ত শক্তি খরচ করতে হয় না (National Research Council, 2006)।
গৃহপালিত বিড়াল মানুষের তুলনায় তুলনামূলক উষ্ণ পরিবেশ পছন্দ করে। তাই সাধারণ ঘরের তাপমাত্রা তাদের কাছে কখনও কখনও একটু ঠান্ডা লাগতে পারে। এখানেই কাজে আসে সেই সাধারণ কার্ডবোর্ডের বাক্স!
কার্ডবোর্ড তাপের একটি খারাপ পরিবাহক। ফলে ছোট্ট বাক্সের ভিতরে বিড়ালের শরীরের উৎপন্ন তাপ কিছুটা আটকে থাকতে পারে। বাক্সের চারপাশের দেয়ালও ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি প্রবাহ কিছুটা আটকায়। অর্থাৎ, তোমার চোখে যে বাক্সটা নিছক ফেলে দেওয়ার জিনিস, বিড়ালের কাছে সেটাই হয়ে উঠতে পারে একেবারে ছোট্ট উষ্ণ কুঠুরি!
আড়াল থেকে নজর রাখা বিড়ালের পুরনো অভ্যাস
এবার আসা যাক বিড়ালের স্বভাবের আর একটি মজার দিকের কথায়।
বিড়াল একইসঙ্গে শিকারি এবং শিকার হতে পারে। প্রকৃতিতে তাদের অনেক সময় নিজেদের থেকেও বড় প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে হয়। তাই এমন জায়গা যেখানে বাইরে থেকে তাকে সহজে দেখা যায় না, কিন্তু সে নিজে বাইরে নজর রাখতে পারে—সেটি বিড়ালের কাছে বেশ সুবিধাজনক।
আর বাক্স ঠিক সেই কাজটাই করে!
বিড়ালরা মূলত ‘অ্যামবুশ প্রিডেটর’ বা অতর্কিত আক্রমণকারী শিকারি। অর্থাৎ, খোলা জায়গায় দীর্ঘক্ষণ দৌড়ে শিকার ধরার বদলে তারা অনেক সময় আড়ালে লুকিয়ে থেকে উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষা করে। তারপর আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার ধরে ফেলে।
তোমার ঘরের বাক্সটি অবশ্য কোনও জঙ্গলের ঝোপ নয়। তবুও তার ভিতরে বসে বিড়ালটি দরজার ফাঁক দিয়ে বাইরে নজর রাখতে পারে, আর সুযোগ পেলেই তোমার পায়ের দিকে ‘হামলা’ চালাতে পারে!
বাক্স তাই শুধু বাক্স নয়!
একটি সাধারণ কার্ডবোর্ডের বাক্স একইসঙ্গে বিড়ালকে দিতে পারে নিরাপত্তা, কিছুটা উষ্ণতা এবং লুকিয়ে থাকার সুযোগ। আর এই তিনটি বিষয়ই বিড়ালের স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিলে যায়।
তাই পরের বার তোমার নতুন কেনা খেলনাটিকে একপাশে সরিয়ে রেখে বিড়ালটি যখন বাক্সের ভিতরে ঢুকে পড়বে, তখন রাগ করার কিছু নেই। তার কাছে হয়তো সেই বাক্সটাই পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক জায়গা—একটু নিরাপদ, একটু উষ্ণ, আর বাইরে কী হচ্ছে তা দেখার জন্য একেবারে আদর্শ!
শেষ পর্যন্ত, বিড়ালকে খুশি করতে সবসময় দামি খেলনা লাগে না। কখনও কখনও একটা সাধারণ বাক্সই যথেষ্ট!
