বিজ্ঞানের টুকিটাকি – জুলাই-অক্টোবর ২০২৬
গ্রেটার হানিগাইড:
যে পাখি মানুষের কাছে সাহায্য চায়
– বিজ্ঞান সাধক –

পোষা টিয়া বা কাকাতুয়া তার মালিকের কাছে খাবার, খেলনা বা অন্য কোনও জিনিস চাইতে পারে, এমন ঘটনা আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু বন্য পাখির ক্ষেত্রে কোনও বন্যপ্রাণী নিজে থেকে মানুষের কাছে এসে সাহায্য চাওয়া অত্যন্ত বিরল।
আসলে বন্য অবস্থায় এমন আচরণের সবচেয়ে আশ্চর্য উদাহরণগুলির একটি হল গ্রেটার হানিগাইড (Indicator indicator)।
পাখিটির সমস্যা কোথায়?
আফ্রিকায় দেখতে পাওয়া এই ছোট বাদামি রঙের পাখিটি বুনো মৌমাছির বাসা থেকে খাবার সংগ্রহ করে। বিশেষ করে মৌমাছির লার্ভা এবং মোম তার পছন্দের খাবার। কিন্তু সমস্যা হল, মৌমাছির বাসা বেশ শক্তপোক্ত এবং তা সহজে ভাঙা যায় না। তার ওপর বাসার ভেতরে থাকা মৌমাছিরা অত্যন্ত আক্রমণাত্মকভাবে নিজেদের বাসা রক্ষা করে। তাই হানিগাইডের দরকার এমন একজন সহযোগী, যে মৌচাক খুলে দিতে পারবে। আর সেই সহযোগী হল… মানুষ!
“আমার সঙ্গে আসুন!”
হানিগাইড যখন কোনও গাছের মধ্যে মৌমাছির বাসা খুঁজে পায়, তখন সে আশেপাশে থাকা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। সে একটি বিশেষ কিচকিচে ডাক দেয়। মানুষ তার দিকে তাকালে পাখিটি অল্প দূরত্ব পর্যন্ত উড়ে যায়, আবার ফিরে এসে ডাক দেয়। তারপর আবার সামান্য এগিয়ে যায়।
এইভাবে বারবার উড়ে যাওয়া → ডাক দেওয়া → অপেক্ষা করা → আবার এগিয়ে যাওয়া — এই আচরণের মাধ্যমে সে মানুষকে মৌচাকের দিকে নিয়ে যায়।
দৃশ্যটা অনেকটা এমন, যেন ছোট্ট পাখিটি নিজের পালকের তৈরি GPS navigator হয়ে মানুষকে পথ দেখাচ্ছে!
শেষ পর্যন্ত মানুষ যখন তার পিছু নিয়ে মৌচাকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তারা গাছে উঠে মৌচাক খুলে মধু সংগ্রহ করে। আর কাজ শেষ হলে হানিগাইডও তার প্রাপ্য পেয়ে যায়, মৌচাকের মোম, লার্ভা এবং অবশিষ্ট অংশ।
দুজনেরই লাভ
এখানেই ঘটনাটি এত বিশেষ।
মানুষের সাহায্য ছাড়া শক্তপোক্ত মৌচাক থেকে নিজের পছন্দের খাবার বের করা হানিগাইডের পক্ষে কঠিন। আবার মানুষও হানিগাইডের অসাধারণ মৌচাক খুঁজে বের করার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত বুনো মৌচাকের সন্ধান পেয়ে যায়। অর্থাৎ এটি নিছক পাখির মানুষের প্রতি কৌতূহল নয়।
এটি একটি চমৎকার পারস্পরিক সহযোগিতা—
হানিগাইড দেখায় কোথায় মৌচাক।
মানুষ মৌচাক খুলে দেয়।
মানুষ পায় মধু।
হানিগাইড পায় মোম ও লার্ভা।
বন্য প্রাণী ও মানুষের মধ্যে এমন সক্রিয়, পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা পৃথিবীতে অত্যন্ত বিরল। আর তাই গ্রেটার হানিগাইড শুধু “মধু দেখিয়ে দেওয়া পাখি” নয়, এটি এমন একটি পাখি, যে প্রয়োজনে মানুষকে নিজের কাজে সহযোগী হিসেবে নিয়োগ করে!
তবে আফ্রিকার সর্বত্র এই পাখির একই আচরণ দেখা যায় না। কেনিয়া, তানজানিয়া ও মোজাম্বিকের কিছু অঞ্চলে হানিগাইড মানুষের সঙ্গে এক অসাধারণ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যেখানে মানুষ এবং পাখি, দুজনেই লাভবান হয়।
