Life Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানই-পত্রিকা জুলাই-অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা

সোকট্রা: পৃথিবীর বুকে এক টুকরো ভীন গ্রহ 

আরব সাগরের নীল জলের মাঝে, আরব উপদ্বীপের দক্ষিণে, এমনই এক দ্বীপপুঞ্জ ছড়িয়ে আছে যার কথা প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষের জানা। বহু শতাব্দী আগে থেকেই নাবিক ও বণিকদের যাতায়াত ছিল এই অঞ্চলে; প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও আরব লেখাতেও সোকট্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু সোকট্রা শুধু প্রাচীন মানচিত্র বা সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসের অংশ নয়, প্রকৃতির এক আশ্চর্য পরীক্ষাগারও বটে।

সোকট্রার উদ্ভিদজগৎ যেন এক অপূর্ব উদ্ভিদ-স্বর্গ। এখানে ৮২৫টিরও বেশি উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই (৩৭%) এন্ডেমিক, অর্থাৎ এগুলো সোকোট্রা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে জন্মায় না। দ্বীপটির অনন্য ও বিচ্ছিন্ন বাস্তুতন্ত্র, কঠোর জলবায়ু এবং বিশেষ ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য একত্রে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ, যেগুলি পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই কারণেই ২০০৮ সালে একে ইউনেস্কো (UNESCO) ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয় এই দ্বীপটিকে।

আসুন সোকট্রার বৈচিত্রময় উদ্ভিদ জগতের সঙ্গে একটু পরিচয় হয়ে যাক।

অনেকের বাড়িতে ইনডোর বা ঘরের গাছ হিসাবে ড্রাসেনা প্রজাতির গাছ দিয়ে সাজাতে খুব ভালোবাসেন। এই প্রজাতির গাছগুলো দেখতে অনেকটা ছোট পাম বা বাঁশের মতো হতে পারে। কিন্তু Asparagaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত Dracaena গণের গাছ ‘ড্রাগনস ব্লাড ট্রি’ মোটেও ঘরে রাখার উপযুক্ত নয়। কারণ? এর বিশালাকার চেহারা দেখে সত্যিই মনে হবে যেন এক দৈত্য দাঁড়িয়ে আছে। সোকট্রা দ্বীপটির অন্যতম প্রতীকী ও সুপরিচিত উদ্ভিদ হল এই ড্রাগনস ব্লাড ট্রি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Dracaena cinnabari।

‘ড্রাগনস ব্লাড ট্রি’ | ছবিঃ www.gardenia.net

এই গাছের মোটা, অপেক্ষাকৃত মসৃণ কাণ্ড থেকে শাখাগুলি বারবার বিভক্ত হয়ে উপরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষে শাখা-প্রশাখাময় ঘন পাতার একটি প্রশস্ত ছাতা বা canopy তৈরি করে। এই branching pattern-কে গবেষণায় “dracoid” ramification বলা হয়েছে। ফলে দূর থেকে পুরো গাছটিকে অনেকটা বিশাল সবুজ ছাতার মতো লাগে। UNESCO-র সোকট্রা সংক্রান্ত নথিতেও এই গাছের evergreen woodland-কে দ্বীপটির সবচেয়ে স্বতন্ত্র উদ্ভিদসমাজগুলির একটি বলা হয়েছে। দ্বীপটিতে আগত পর্যটকদের কাছে তাই এটি একটি জনপ্রিয় আকর্ষণ।

ঘন পাতার একটি প্রশস্ত ছাতা বা canopy তৈরি করে ‘ড্রাগনস ব্লাড ট্রি’ | ছবিঃ www.travelingsocotra.com

Dracaena cinnabari একটি একবীজপত্রী বৃক্ষ (monocot tree), এবং সাধারণ চওড়া পাতার বৃক্ষ (broadleaf tree)-এর মতো নির্ভরযোগ্য বার্ষিক বৃদ্ধির বলয় (annual growth rings) তৈরি করে না। ফলে বয়স নির্ধারণ বেশ কঠিন। তবে ইনুমান করা হয় প্রাচীন এই গাছগুলির বয়স ১,০০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই গাছ অসম্ভব ধীরে বড় হয় ফলে কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক গাছ (juvenile tree)-ও প্রথম ফুল ধরার পর্যায়ে পৌঁছতে দুই শতাধিক বছর নিতে পারে বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে।

এগুলি সর্বোচ্চ প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং মূলত সোকোত্রার মধ্যবর্তী মালভূমির ঢালগুলিতে দেখা যায়। গাছটির প্রান্তীয় প্যানিকলে ছোট, ছোট ক্রিম রঙের ফুল ধরে। এর ফল গোলাকার এবং পরিণত হওয়ার সময় কালো থেকে লাল রঙে পরিবর্তিত হয়। প্রতিটি ফলে সাধারণত ১–৩টি বীজ থাকে।

গাছটির প্রান্তীয় প্যানিকলে ছোট, ছোট ক্রিম রঙের ফুল ধরেছে | ছবিঃ www.gardenia.net

ছাতার মতো আকৃতি আসলে শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়

এই অদ্ভুত ছাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক ভূমিকা (ecological function) আছে।

সোকট্রার পরিবেশ শুষ্ক। বৃষ্টিপাত কম এবং দীর্ঘ শুষ্ক সময় থাকতে পারে। গাছটির শাখা-প্রশাখাময় ছাতার মতো আকৃতি বৃষ্টির জল ও বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা সংগ্রহ করে কাণ্ড ও শিকড়ের আশপাশে পৌঁছাতে সাহায্য করে বলে গবেষণায় আলোচনা করা হয়েছে। ড্রাগনস ব্লাড ট্রি নামক গাছগুলোর এই ধরনের অনুভূমিক বৃষ্টির জল ধারণ (horizontal rainfall capture) করার অভিযোজন seasonally dry এবং cloud-affected পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণাগুলিতে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ, দেখতে যেন এলিয়েনের ছাতা, কিন্তু আসলে সেটি তার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া একটি অত্যন্ত কার্যকর গঠন।

“Dragon’s Blood” নামটা এল কোথা থেকে?

এটাই গাছটির সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্য। গাছের বাকল বা কাণ্ডে ক্ষত হলে সেখান থেকে গাঢ় লাল resin বা রজন বের হয়। শুকিয়ে গেলে এই রজন আরও গাঢ় লাল হয়। এই রক্তের মতো লাল পদার্থের কারণেই গাছটির নাম Dragon’s Blood Tree।

গাছের বাকল বা কাণ্ডে ক্ষত হলে সেখান থেকে গাঢ় লাল resin বা রজন বের হয় | ছবিঃ www.reddit.com

রজনটি কেবল মানুষের কাছে মূল্যবান নয়; গাছের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, Dracaena প্রজাতির resin উদ্ভিদের pathogen ও herbivore-এর বিরুদ্ধে defence mechanism-এর অংশ হতে পারে। অর্থাৎ, গাছের কাণ্ডে ক্ষত হলে যে লাল পদার্থ বেরিয়ে আসে, সেটি নিছক “রক্তের মতো দেখতে” নয়, উদ্ভিদের chemical defence-এর সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।

“Dragon’s blood” অবশ্য শুধু Dracaena cinnabari-র রজনের নাম নয়। ইতিহাসে বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে পাওয়া লাল রজনকেও একই নামে ডাকা হয়েছে। এর মধ্যে Dracaena, Daemonorops, Croton এবং Pterocarpus-এর বিভিন্ন শ্রেণীর উদ্ভিদ রয়েছে।

হাজার বছর ধরে মানুষের কাছে মূল্যবান

প্রাচীন ভূমধ্যসাগর এবং আরব অঞ্চলে এই লাল রজনের রং, বার্নিশ, ওষুধ তৈরী এবং বিভিন্ন শিল্পকর্মে ব্যবহার করা হত। সোকট্রার স্থানীয় মানুষও এই রজন ব্যবহার করত উল রং করা, মাটির বাসিন সাজানো, আঠা হিসাবে এবং অন্যান্য কাজে। সোকট্রা এবং বৃহত্তর অঞ্চলের লোকচিকিৎসায় ড্রাগনস ব্লাড রজন-এর ব্যবহার ছিল বহু ধরনের সমস্যায়, যেমন ক্ষত, রক্তপাত, ডায়রিয়া, পেটের অসুখ এবং কিছু ত্বকের সমস্যায়।

২০২৪ সালের একটি সমীক্ষাতে D. cinnabari-র রজনের ঐতিহ্যগত ব্যবহার এবং তার বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

গাছটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ছাগল!

এই গাছের সমস্যা শুধু গাছ কাটা বা রজন সংগ্রহ নয়। পশুচারণ বিশেষত ছাগলের চরানো এর পুনর্জন্ম-এর জন্য বড় সমস্যা। বয়স্ক গাছ প্রচুর থাকলেও অনেক জায়গায় নতুন চারা ও তরুণ গাছের সংখ্যা খুব কম। কারণ ছাগল সহজেই ছোট গাছ ও চারা খেয়ে ফেলতে পারে। ফলে পুরনো গাছগুলি মারা গেলে তাদের জায়গা নেওয়ার মতো নতুন গাছ তৈরি হচ্ছে না।

সোকোট্রার আরেকটি আকর্ষণীয় উদ্ভিদ হল বটল ট্রি বা বোতল গাছ। প্রথম দেখাতেই চমকে ওঠার মতো এর চেহারা। Dorstenia gigas বা Bottle Tree দেখতে সাধারণ গাছের মতো একেবারেই নয়। এর গোড়ার দিকের কাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠে বোতল বা ফ্লাস্কের মতো আকৃতি নেয়। উপর দিকে আবার সরু শাখা-প্রশাখা বেরিয়ে আসে। ফলে দূর থেকে মনে হতে পারে, কেউ যেন বিশাল একটা বোতলের গায়ে কয়েকটি ডাল গুঁজে দিয়েছে!

Dorstenia gigas বা Bottle Tree। পাথরের গায়ে কেউ যেন বিশাল একটা বোতলের গায়ে কয়েকটি ডাল গুঁজে দিয়েছে | ছবিঃ www.ross.no

এটি Moraceae পরিবারের উদ্ভিদ। অর্থাৎ ডুমুর বা fig গাছেরই আত্মীয়। তবে সাধারণ ডুমুরগাছের সঙ্গে এর চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। Kew এটিকে caudex subshrub or shrub হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং এর প্রাকৃতিক বিস্তৃতি শুধু সোকোট্রাতেই।

Dorstenia gigas সাধারণ উর্বর মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের মতো নয়। সোকোট্রাতে এটি প্রায়ই চুনাপাথরের খাঁজে, পাথরের ভাঁজে এবং বড় চুনাপাথরের চাঁই-এর ফাটল বা আশপাশে জন্মায়। প্রায় ৫০০ মিটার উচ্চতার পাথুরে পরিবেশে এর উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। এর succulent root system পাথরের ফাঁক আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে। একই সঙ্গে পাথরের ফাটলে জমা জল এবং উপর থেকে নেমে আসা জল তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

Dorstenia গণের ফুল আসলে প্রচলিত অর্থে “ফুলের মতো” দেখায় না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুল একটি অদ্ভুত inflorescence বা ফুলের গুচ্ছ (flower cluster)-এর মধ্যে থাকে।

UC Davis Botanical Conservatory-র তথ্য অনুযায়ী D. gigas-এর ফুল বেশ অস্বাভাবিক এবং একই উদ্ভিদে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল থাকলেও স্ব-নিষেকক্ষম বা self-compatible নয়। অর্থাৎ বীজ উৎপাদনের জন্য আলাদা গাছের প্রয়োজন হতে পারে। UC Davis-এর cultivation notes-এ আরও বলা হয়েছে, পাকা ফলের বীজ জোরে ছিটকে (explosive dehiscence-এর মাধ্যমে) বেরিয়ে এসে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

এত মোটা কাণ্ড কেন?

সোকোট্রার অনেক অঞ্চল শুষ্ক এবং বৃষ্টিপাত অনিয়মিত। তাই D. gigas তার মোটা, ফুলে ওঠা caudex বা কাণ্ডের মধ্যে জল সঞ্চয় করে রাখে। গবেষণাতেও সোকোট্রার caudiciform succulent-গুলির মধ্যে Dorstenia gigas-এর কাণ্ড ও শিকড়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জল সঞ্চয়ের কথা বলা হয়েছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে সবচেয়ে বড় নমুনাগুলি প্রায় ১.২ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে এবং গোড়ার কাণ্ডের ব্যাস প্রায় ১ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। তবে প্রাকৃতিক আবাস অনুযায়ী গাছের আকৃতি যথেষ্ট বদলায়। নিরাপদ, খোলা জায়গায় জন্মানো গাছের কাণ্ড তুলনামূলক লম্বা ও মোটা হতে পারে।

Dragon’s Blood Tree-এর মতো Dorstenia gigas-এর কাণ্ড থেকে লাল রজন বের হয় না। বরং কাণ্ডে ক্ষত হলে সাদা latex বা দুধের মতো রস বেরোয়। এর পাতলা বাকল বা epidermis সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ছাগলের সঙ্গে লুকোচুরি

ছাগল সাধারণত এর পাতা খায়; খুব ক্ষুধার্ত হলে অন্য অংশও খেতে পারে। তবে Dorstenia gigas অনেক সময় খাড়া চুনাপাথরের গায়ে বা এমন জায়গায় জন্মায় যেখানে ছাগলের পৌঁছানো কঠিন।

আর একটি মজার ব্যাপার — এই ধরনের succulent উদ্ভিদের বয়স নির্ভুলভাবে নির্ণয় করার কোনও সহজ পদ্ধতি নেই। বড় নমুনাগুলি এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

ড্রাসেনার নানা প্রজাতির মতো গাছপ্রেমী বা বাগানীদের আরেক প্রিয় গাছ হলো অ্যাডেনিয়াম বা মরুগোলাপ। শুষ্ক পরিবেশে ছোট টবে জল ছাড়াই দীর্ঘদিন রাখা যায় এই গাছ। কিন্তু এই আজব দ্বীপেও মরুগোলাপের দেখা মেলে। সোকট্রার অদ্ভুত উদ্ভিদজগতের দিকে তাকালে Adenium socotranum যেন সেই তালিকার আর-এক আশ্চর্য সদস্য।

দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনও গাছের কাণ্ডকে কেউ ফুলিয়ে বিশাল বোতলের মতো বানিয়ে তার মাথায় কয়েকটি ডাল বসিয়ে দিয়েছে! তার উপর সেই অস্বাভাবিক মোটা কাণ্ডের মাথায় ফুটতে পারে সুন্দর গোলাপি ফুল। অর্থাৎ গাছটির নিচের অংশ যেন মরুভূমির কোনও অদ্ভুত ভাস্কর্য, আর উপরের অংশ যেন ফুলের বাগান।

Adenium socotranum | ছবিঃ orient-adenium.co

জলাভাবের সময় A. socotranum তার অনেক পাতা ঝরিয়ে ফেলতে পারে। পাতার সংখ্যা কমে গেলে উদ্ভিদের শরীর থেকে জলের অপচয়ও কম হয়। অনুকূল পরিবেশ ফিরে এলে আবার নতুন পাতা গজায়। গাছটির বিশাল, মোটা ও রুক্ষ চেহারার কাণ্ডের উপর ফুটতে দেখা যায় তুলনামূলকভাবে কোমল গোলাপি-সাদা ফুল। এই বৈপরীত্যই গাছটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

স্ফীত কাণ্ডের একেবারে উপরিভাগের কাছাকাছি অংশ থেকেই মূল ডালপালাগুলি বের হয়। ফলে বিশেষ করে পাতা ঝরে যাওয়ার সময় গাছটিকে সাধারণ গাছের মতো না দেখে বরং প্রকৃতির তৈরি কোনও অদ্ভুত ভাস্কর্যের মতো মনে হতে পারে।

Adenium socotranum এবং Dorstenia gigas দেখতে একেবারে একই রকম নয়, কিন্তু দুটির মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। দুটি গাছই সোকোট্রার শুষ্ক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিজেদের কাণ্ডকে জল সঞ্চয়ের অঙ্গে পরিণত করেছে। তবে এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্ভিদগোষ্ঠীর সদস্য।

সোকট্রায় গিয়ে যদি কেউ বলে, “ওই যে শসা গাছ!”, তাহলে তাকে খুব একটা বিশ্বাস না করাই ভালো। কারণ সামনে যে গাছটি দেখা যাবে, সেটি শসার মাচায় ওঠা লতানো গাছ নয়, সোজা দাঁড়িয়ে থাকা আস্ত একটা গাছ!

এর বৈজ্ঞানিক নাম Dendrosicyos socotranus এবং এটি Cucurbitaceae পরিবারের সদস্য। অর্থাৎ শসা, কুমড়ো, লাউ, ঝিঙে, তরমুজদেরই আত্মীয়। কিন্তু তার আত্মীয়দের অধিকাংশ যেখানে মাটির উপর লতা ছড়িয়ে বা অন্য গাছের আশ্রয় নিয়ে বেড়ে ওঠে, সেখানে এই প্রজাতি নিজের কাণ্ড শক্ত করে গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। এবং সেই কাণ্ডটি আবার সাধারণ গাছের কাণ্ড নয়। গোড়ার দিকে অস্বাভাবিক রকম মোটা, ফুলে ওঠা এবং অনেকটা লম্বাটে বোতলের মতো।

Dendrosicyos socotranus | ছবিঃ en.wikipedia.org

শসা পরিবারের উদ্ভিদ বলতে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত লম্বা লতা, সরু কাণ্ড, পাকানো tendril এবং মাটির উপর ছড়িয়ে থাকা গাছের ছবি আসে। Dendrosicyos socotranus সেই ধারণাটাকেই প্রায় উল্টে দিয়েছে।

এটি Cucurbitaceae পরিবারের অত্যন্ত বিরল বৃক্ষরূপী (tree-form) উদ্ভিদ। অর্থাৎ একই পরিবারের লতানো উদ্ভিদের মধ্যে এটি গাছের মতো কাঠামো তৈরি করেছে। গোড়ার দিকে কাণ্ড মোটা হয়ে উঠে ধীরে ধীরে সরু হয় এবং উপর দিকে শাখা বেরোয়। Dendrosicyos socotranus ফুলও উৎপন্ন করে। ফুলগুলি ছোট এবং হলুদাভ/ফ্যাকাশে রঙের হতে পারে। পরাগায়ণের পরে ছোট ফল তৈরি হয়।

সোকোট্রার উদ্ভিদজগতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য সদস্য হল Boswellia socotrana। এটি লোবান বা frankincense উৎপাদনকারী Boswellia গণের একটি বিশেষ প্রজাতি এবং সোকোট্রার স্থানীয় উদ্ভিদ। সোকোট্রার শুষ্ক, পাথুরে পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এর শরীরেও বেশ কিছু চমৎকার অভিযোজন দেখা যায়।

Boswellia socotrana খুব বড় বা ঘন ছায়াদানকারী গাছ নয়। এর কাণ্ড তুলনামূলকভাবে খাটো এবং ডালপালাগুলি ছড়িয়ে পড়ে একটি খোলামেলা, অনিয়মিত পাতার মুকুট তৈরি করে। শুষ্ক মরশুমে পাতা ঝরে গেলে গাছটির কঙ্কালসার আকৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সোকোত্রার শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এর কাণ্ড ও শাখায় জল সঞ্চয়ের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। কাণ্ড তুলনামূলকভাবে মোটা এবং নরম-রসালো প্রকৃতির হওয়ায় অল্প সময়ের বৃষ্টিতে পাওয়া জল ধরে রাখতে পারে।

এই গাছের অন্যতম বিস্ময়কর অভিযোজন হল এর পাথুরে ও খাড়া ভূখণ্ডে বেড়ে ওঠার ক্ষমতা। যেখানে মাটির স্তর অতি পাতলা এবং জল দ্রুত নীচে চলে যায়, সেখানেও B. socotrana শিকড় বিস্তার করে টিকে থাকতে পারে। এর পাতাগুলি শাখার শেষপ্রান্তের দিকে গুচ্ছাকারে জন্মায়। শুষ্ক মরশুমে পাতা ঝরে যাওয়া উদ্ভিদটির জল সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বৃষ্টির মরশুম ফিরে এলে আবার নতুন পাতা ও কচি বৃদ্ধি শুরু হয়। অনুকূল মরশুমে গাছে ছোট ছোট ফুলের গুচ্ছ দেখা যায়। ফুলগুলি খুব বড় বা চোখধাঁধানো না হলেও শুষ্ক, পাথুরে পরিবেশের মধ্যে এগুলির উপস্থিতি গাছটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে তোলে।

Boswellia গণের গাছগুলিই বিখ্যাত Frankincense বা লোবান রেজিনের উৎস। গাছের কাণ্ড বা শাখায় ক্ষত তৈরি হলে সেখান থেকে আঠালো রেজিন বের হতে পারে। বাতাসের সংস্পর্শে এসে সেই রেজিন শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়।
এই রেজিন প্রাচীনকাল থেকেই ধূপ, সুগন্ধি এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, Boswellia socotrana এবং বাণিজ্যিকভাবে বহুল পরিচিত Frankincense-এর প্রধান উৎস Boswellia sacra একই প্রজাতি নয়। B. socotrana হল সোকোত্রার নিজস্ব একটি প্রজাতি।

ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরম জলবায়ুর কারণে এখানকার উদ্ভিদজগৎ এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। এই কারণে একে প্রায়ই “পৃথিবীর সবচেয়ে এলিয়েন বা ভিনগ্রহের মতো দেখতে স্থান” বলা হয়। তাই সোকট্রার গল্প শুধু একটি দ্বীপের গল্প নয়; এটি বিচ্ছিন্নতা, বিবর্তন এবং প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার এক অসাধারণ কাহিনি।

তথ্যসুত্রঃ-

অর্ণব

বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ, আকর্ষণীয় এবং গল্পের মতো করে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে ভালোবাসেন।