Life Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানই-পত্রিকা জুলাই-অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা

বালানোফোরা: গাছ না ছত্রাক?

Balanophora fungosa | ছবিঃ powo.science.kew.org

Balanophora নামটির অর্থ হল “অ্যাকর্ন বহনকারী” (bearing an acorn)। স্ত্রী পুষ্পবিন্যাসের আকৃতি দেখতে অনেকটা ওক গাছের অ্যাকর্ন বা ফলের মতো হওয়ায় এই নামকরণ করা হয়েছে।

Balanophoraceae পরিবারটি অত্যন্ত বিরল হলেও তাইওয়ানের পাহাড়ি অঞ্চল এবং ওকিনাওয়ার ঘন উপক্রান্তীয় অরণ্যে এদের লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়। এরা এক ধরনের পরজীবী উদ্ভিদ। গাছের শিকড়ের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে এরা বেঁচে থাকে এবং আশ্রয়দাতা উদ্ভিদ যে পুষ্টি শোষণ করে, সেখান থেকেই নিজেদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে।

সবচেয়ে বিস্তৃত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, Balanophoraceae পরিবারে ১৬টি গণ (genus) রয়েছে। তবে বিকল্প শ্রেণিবিন্যাসে এর মধ্যে তিনটি গণকে আলাদা করে Mystropetalaceae নামে পৃথক একটি পরিবার হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই উদ্ভিদগুলি সাধারণত আর্দ্র, অভ্যন্তরীণ অরণ্যে গাছের শিকড়ের ওপর বা শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় জন্মায়। মাটির ওপরে এদের যে পুষ্পবিন্যাস (inflorescence) দেখা যায়, সেটি দেখতে অনেকটা ছত্রাক বা মাশরুমের মতো। অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুল একসঙ্গে গুচ্ছবদ্ধ হয়ে এই অদ্ভুত আকৃতির পুষ্পবিন্যাস তৈরি করে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, এই পুষ্পবিন্যাস প্রথমে মাটির নিচে থাকা উদ্ভিদের কন্দসদৃশ অংশের (tuberous underground part) ভেতরেই তৈরি হয়। পরে সেটিকে ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে মাটির ওপরে উঠে আসে। এদের পাতাগুলিও প্রায় ‘পাতা’ বলে মনে হয় না কারণ সেগুলো সবুজ, প্রশস্ত পাতা নয়; বরং ছোট ছোট আঁশের মতো। সালোকসংশ্লেষণের প্রয়োজনই যখন নেই, তখন বড় সবুজ পাতারও বিশেষ প্রয়োজন নেই।

এই উদ্ভিদগুলি উভলিঙ্গধারী (monoecious) অথবা একবিবরীয়/দ্বিবাসী (dioecious) হতে পারে। অর্থাৎ কোনও কোনও প্রজাতিতে একই উদ্ভিদের মধ্যেই পুরুষ ও স্ত্রী ফুল থাকে, আবার কোনও কোনও প্রজাতিতে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা আলাদা উদ্ভিদে জন্মায়। এদের ফল সাধারণত এমন ধরনের ড্রুপ বা বাদামজাতীয় ফল, যা পাকলে নিজে থেকে ফেটে বীজ ছড়িয়ে দেয় না (indehiscent)।

মাটির নিচে থাকা যে অংশটি আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সেটি দেখতে অনেকটা কন্দের মতো। কিন্তু এটি প্রকৃত অর্থে একটি স্বাভাবিক মূলতন্ত্র বা শিকড়ের ব্যবস্থা নয়। বরং এই বিশেষ অংশের মাধ্যমেই পরজীবী উদ্ভিদটি তার আশ্রয়দাতা গাছের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে।

এই অস্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে Balanophora কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে তা বোঝার জন্য গবেষকেরা তাইওয়ান ও জাপানের ১২টি পৃথক জনসংখ্যা থেকে Balanophoraceae পরিবারের সাতটি প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করেন।

গবেষণায় একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ বিষয় সামনে আসে। Balanophora উদ্ভিদের প্লাস্টিড জিনোম অত্যন্ত সংকুচিত। প্লাস্টিডের জিনোম উদ্ভিদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে শক্তি নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন উপাদান সঞ্চয়, কোষের মধ্যে যোগাযোগ এবং সালোকসংশ্লেষণ। অবাক করার মতো বিষয় হল, প্লাস্টিড জিনোম এতটা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার পরেও এই উদ্ভিদগুলি বহু গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক কাজ চালিয়ে যেতে পারে। এমনকি তারা অ্যামাইনো অ্যাসিড উৎপাদনও করতে সক্ষম বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

এই দিক থেকে Balanophoraceae-এর সঙ্গে Plasmodium-এর গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। Plasmodium হল ম্যালেরিয়ার জন্য দায়ী পরজীবী জীব, যারও অত্যন্ত সংকুচিত প্লাস্টিড জিনোম রয়েছে। অর্থাৎ, দেখতে মাশরুমের মতো এই অদ্ভুত উদ্ভিদটি আসলে এমন এক পরজীবী উদ্ভিদ, যা বিবর্তনের পথে নিজের সবুজ রং, সালোকসংশ্লেষণের প্রয়োজন এবং প্লাস্টিড জিনোমের বহু অংশ হারিয়েও টিকে থাকার এক অসাধারণ কৌশল গড়ে তুলেছে।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে, ক্রিটেশিয়াস যুগের মধ্যভাগে এই জিনোম সংকোচনের ঘটনা ঘটেছিল। এর ফলে Balanophoraceae উদ্ভিদজগতের প্রাচীনতম পরজীবী বংশধারাগুলির (parasitic lineages) একটি হয়ে উঠেছে। পরজীবী জীবনযাপন এমন পরিবেশেও উদ্ভিদকে টিকে থাকা ও বংশবিস্তার করার সুযোগ দেয়, যেখানে আলোর পরিমাণ খুবই কম। এর ফলে উদ্ভিদ পাতার মতো সালোকসংশ্লেষণকারী অঙ্গ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে শক্তি ব্যয় না করে সেই সম্পদ মাটির নিচে থাকা পরজীবী অঙ্গ এবং প্রজননের কাজে ব্যবহার করতে পারে।

অন্যদিকে, কোনও একটি বংশধারা যখন গভীর ছায়ায় ঢাকা অরণ্যের নিচের স্তরে বসবাসকারী আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সালোকসংশ্লেষণের যন্ত্রপাতি বা জৈবিক কাঠামো বজায় রাখার সুবিধা ক্রমশ কমে যায়। অথচ সেগুলি বজায় রাখতে উদ্ভিদের বিপাকীয় খরচ থেকেই যায়।

তবে Balanophoraceae-এর অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এখানেই শেষ নয়। এই পরিবারের কিছু প্রজাতির নিজে নিজেই বংশবিস্তার করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে, উদ্ভিদজগতে যা খুব একটা সাধারণ ঘটনা নয়। এই ক্ষমতাই সম্ভবত তাদের জাপানের বিভিন্ন দ্বীপে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। কারণ বংশবিস্তারের জন্য তাদের বাইরের সাহায্য, যেমন পরাগবাহক পতঙ্গ কিংবা কাছাকাছি থাকা অন্য কোনও সঙ্গী উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করতে হয়নি।

এবার গবেষকদল তাদের গবেষণার পরিধি আরও বাড়িয়ে অন্যান্য প্রজাতির পরজীবী উদ্ভিদ নিয়েও গবেষণা করতে চান। সুয়েতসুগু-র মতে, এই বিভিন্ন পরজীবী উদ্ভিদগোষ্ঠীর তুলনা করে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে যে উদ্ভিদগুলি সালোকসংশ্লেষণের ক্ষমতা ত্যাগ করেছে, তারা কি শেষ পর্যন্ত বিবর্তনের একটি মৃতপ্রান্তে (evolutionary dead end) পৌঁছে যায়, নাকি তারা সক্রিয়ভাবে নতুন নতুন পরিবেশগত কৌশল বা জীবনযাপনের পথ অনুসন্ধান করে চলেছে।

তথ্যসুত্রঃ-

বিজ্ঞান সাধক

বিজ্ঞান লেখক