আকাশের ক্ষুদ্র মহাযাত্রীরা

পাখিদের মহাদেশ-পেরোনো উড়ান, তিমিদের মহাসাগরব্যাপী যাত্রা কিংবা আফ্রিকার তৃণভূমিতে জেব্রা ও ওয়াইল্ডবিস্টের অগণিত খুরধ্বনি — এই ধরণের পরিযানের কথা উঠলেই এইসব দৃশ্যই আমাদের মনে পড়ে। অথচ প্রকৃতির এই মহাযাত্রার বর্ষলিপিতে আর-একদল ক্ষুদ্র অভিযাত্রীর কথা আমরা প্রায় রাখিই না। কয়েক গ্রাম ওজনের একটি প্রজাপতি, ফড়িং বা ধানক্ষেতের চোষক পোকাও প্রতিবছর পাড়ি দেয় শত শত, কখনও হাজার হাজার কিলোমিটার। বিশ্রামের জন্য নেই কোনো দ্বীপ, নেই কোনো নিরাপদ আশ্রয়; তবু তারা উড়ে চলে অনন্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে, অদৃশ্য আকাশপথ ধরে।
শরতের আকাশে কখনও শুকনো পাতার মতো ভেসে যেতে দেখতে পারেন হাজার হাজার প্রজাপতিকে। আবার সমুদ্রের মাঝখানে নাবিকেরা হঠাৎ দেখতে পান ফড়িংয়ের বিশাল ঝাঁক — চারদিকে শুধু জল, তবু তাদের যাত্রা থামে না। বিস্ময় আরও গভীর হয় যখন জানা যায়, অনেক পতঙ্গই এক প্রজন্মে পুরো পথ সম্পূর্ণ করতে পারে না। তাদের সন্তান, নাতি কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম সেই যাত্রা এগিয়ে নিয়ে যায়। কে তাদের পথ দেখায়? কীভাবে তারা গন্তব্য চিনে নেয়? এর সব উত্তর এখনও বিজ্ঞানের জানা নেই।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই খুলে যায় প্রকৃতির এক বিস্ময়কর অধ্যায় — পতঙ্গদের দীর্ঘপথের পরিযান।
তবে, এদের সবার কথা নয়, আজ আমরা বলব এক দল পতঙ্গের পরিযান কাহিনী; যারা ভারতের ভেতর বা ভারতকে ছুঁয়ে তাদের পরিযান চালায়।
পেইন্টেড লেডি বা রংচঙে রানি প্রজাপতি (Vanessa cardui)

আফ্রিকার তৃণভূমি থেকে শুরু হওয়া তাদের মহাপরিযান ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়া জুড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে রংচঙে রানি (পেইন্টেড লেডি, Vanessa cardui) প্রজাপতির দল। সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত বালি, ভূমধ্যসাগরের বিস্তৃত জলরাশি; কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারে না। বহু প্রজন্ম ধরে চলা এই যাত্রার মোট দৈর্ঘ্য কখনও কখনও পনেরো হাজার কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। মানুষের চোখে একটা ছোট্ট প্রজাপতি, কিন্তু প্রকৃতির কোলে সে এক আন্তঃ-মহাদেশীয় অভিযাত্রী।
এদের ডানা ৫-৭ সেন্টিমিটার, ওপরের অংশ কমলা বাদামি (তামাটে), ডানার সামনের অংশে কালোর ভেতর সাদা ছোপ; ডানার নীচের অংশ অপেক্ষাকৃত ফ্যাকাশে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে পেইন্টেড লেডি প্রজাপতিরা অনুকূল বায়ুপ্রবাহের সাহায্যে আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে প্রায় ৪,২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যা প্রজাপতিদের মধ্যে অন্যতম বিস্ময়কর দীর্ঘ-পথের যাত্রা।
এদের পথচক্র (সংক্ষেপে):

ভারতে এদের উপস্থিতি নিয়মিত হলেও, ভারতে এদের সংখ্যা মূলত পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত; ইউরোপ–আফ্রিকার মহা-পরিযানের মতো নাটকীয় ঝাঁক এখানে সাধারণত দেখা যায় না।
ভারতের আকাশেও প্রতি বছর এমন বহু পরিযানের গল্প লেখা হয়। দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাটের মধ্যে লক্ষ লক্ষ প্রজাপতি যাতায়াত করে।
ব্লু টাইগার বা নীল-বাঘ প্রজাপতি (Tirumala limniace)

ভারতে পরিযায়ী প্রজাপতিদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নীল-বাঘ প্রজাপতি। গাঢ় বাদামি থেকে কালচে-বাদামি ডানার ওপর আকাশি-নীল বা সাদাটে নীল দাগের জালিকার মতো বিন্যাস তাদের সহজেই চেনায়। এই ছোপগুলির বিন্যাস বাঘের গায়ের ডোরার কথা মনে করায়। দক্ষিণ ভারতের পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট জুড়ে এদের মৌসুমি পরিযান বহু দশক ধরে প্রকৃতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বর্ষার সময় পশ্চিমঘাটের অনেক অংশে অতিবৃষ্টি ও ঘন মেঘাচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হলে বিপুল সংখ্যক নীল-বাঘ প্রজাপতি পূর্বদিকে সরে যায়। তামিলনাড়ুর ইয়ারকড (Yercaud), কল্লি (Kolli) ও পাচামালাই (Pachamalai) পাহাড়ি অঞ্চল থেকে তারা সেলেম–ইরোড সমভূমি অতিক্রম করে সত্যমঙ্গলম বনাঞ্চল, নীলগিরি, আনামালাই ও পালনি পাহাড়ের দিকে চলে যায়। পরে মৌসুমি পরিস্থিতি বদলালে আবার পশ্চিমঘাটের অরণ্যে ফিরে আসে।
এই যাত্রা কেবল স্থান পরিবর্তন নয়; এ পরিযান খাদ্য-উদ্ভিদের প্রাপ্যতা, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। অনেক সময় লক্ষাধিক নীল-বাঘ প্রজাপতিকে একসঙ্গে উড়ে যেতে দেখা যায়, যা ভারতের অন্যতম বৃহত্তম পতঙ্গ-পরিযান। তারা ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পরিক্রমা করে।
ডার্ক ব্লু টাইগার বা কৃষ্ণনীল বাঘ প্রজাপতি (Tirumala septentrionis)

নীল-বাঘের নিকট আত্মীয় হলেও কৃষ্ণনীল বাঘ প্রজাপতি আরেকটু গাঢ় বর্ণের। ডানার কালচে বাদামি থেকে প্রায় কালো রঙের, তার ওপর নীলাভ-সাদা বা হালকা নীল ছোপগুলো আরও স্পষ্ট ও ঝকঝকে দেখায়। প্রাকৃতিক পরিবেশে এদের প্রায়ই নীল-বাঘ প্রজাপতিদের সঙ্গে একই পরিযায়ী দলে দেখা যায়।
দক্ষিণ ভারতের পরিযান গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষ্ণনীল বাঘ প্রজাপতিরাও মৌসুমি বায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাহাড় ও সমভূমির মধ্যে যাতায়াত করে। বর্ষাকালে পশ্চিমঘাটের অতিরিক্ত আর্দ্র অঞ্চল থেকে অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিবেশের দিকে সরে যায়, আবার বর্ষা শেষে ফিরে আসে। এই চলাচল সাধারণত নীল-বাঘ প্রজাপতির পথরেখার সঙ্গেই মিলে যায়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই পরিযানের অন্যতম কারণ হলো উপযুক্ত খাদ্য-উদ্ভিদ ও প্রজননস্থলের সন্ধান। এদের শূককীট প্রধানত অ্যাপোসাইনেসি (Apocynaceae) গোত্রের উদ্ভিদে নির্ভরশীল। মৌসুমি পরিবর্তনের ফলে যখন কোনো অঞ্চলে এই উদ্ভিদগুলির অবস্থা প্রতিকূল হয়ে ওঠে, তখন প্রজাপতিরা নতুন অঞ্চলে সরে যায়।
কৃষ্ণনীল বাঘের পরিযান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রজাপতিদের অনেক প্রজাতিই স্থানীয়ভাবে আবদ্ধ নয়; বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক জলবায়ু ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এক গতিশীল জীবনের অংশ। এরা ১৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পরিক্রমা করে।
কমন ক্রো বা কাক প্রজাপতি (Euploea core)

কাকপ্রজাপতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরিচিত প্রজাপতি। চকচকে গাঢ় বাদামি বা কালচে ডানার কিনারায় ছোট ছোট সাদা দাগের সারি তাকে স্বতন্ত্র চেহারা দেয়। শহরের বাগান, গ্রামাঞ্চল, বনভূমি; সর্বত্রই এদের দেখা যায়। কিন্তু এই সাধারণ উপস্থিতির আড়ালে লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর পরিযায়ী আচরণ।
কাকপ্রজাপতি দক্ষিণ ভারতের মৌসুমি পরিযানে নীল-বাঘ ও কৃষ্ণনীল বাঘের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে। কখনও কখনও হাজার হাজার কাক প্রজাপতিকে একই দিকে উড়ে যেতে দেখা যায়। পশ্চিমঘাটের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে তারা সমভূমি ও পূর্বাঞ্চলের দিকে চলে যায়, পরে আবার ফিরে আসে। এরাও ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।
এই প্রজাতির বিশেষত্ব হলো এর অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা। নগরাঞ্চল থেকে শুরু করে ঘন অরণ্য, সবজায়গাতেই এরা মানিয়ে নিতে পারে। ফলে পরিযানের সময় তারা বিভিন্ন ধরনের আবাসস্থল ব্যবহার করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য-উদ্ভিদের প্রাপ্যতা, মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং প্রজনন-সফলতার সম্ভাবনা এদের চলাচলকে প্রভাবিত করে।
কাক-প্রজাপতি বিষাক্ত উদ্ভিদ থেকে রাসায়নিক উপাদান সংগ্রহ করে নিজের শরীরে সঞ্চয় করতে পারে, যা পাখি ও অন্যান্য শিকারিদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে দীর্ঘ যাত্রাপথে বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
এই তিনটি প্রজাতির প্রজাপতি আমাদের জানায় যে ভারতীয় মৌসুমি বর্ষা শুধু নদী, বন বা কৃষিজীবনকেই নিয়ন্ত্রণ করে না; তা আকাশপথে চলমান লক্ষ লক্ষ প্রজাপতির জীবনেও ছন্দ আনে। পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাটের মধ্যে তাদের বার্ষিক যাতায়াত প্রকৃতির এক সূক্ষ্ম, প্রাচীন ও এখনও পুরোপুরি না-জানা বিস্ময়ের গল্প।
এদের পরিযানের একটি সরলীকৃত মানচিত্র:

যাযাবর ডানার পথিক: সাধারণ যাযাবর ও চিত্রিত যাযাবর প্রজাপতি
বর্ষার আকাশে যখন প্রথম মেঘের পাল জমতে শুরু করে, তখন প্রকৃতির অদৃশ্য মহাসড়কে নেমে পড়ে আর একদল ক্ষুদ্র যাত্রী। তাদের নেই কোনো মানচিত্র, নেই কোনো দিকনির্দেশক যন্ত্র, তবু তারা জানে কোন পথে যেতে হবে। এরা হলো সাধারণ যাযাবর (Common Emigrant, Catopsilia pyranthe) ও চিত্রিত যাযাবর (Mottled Emigrant) প্রজাপতি, ভারতীয় উপমহাদেশের আরও দুই বিস্ময়কর পরিযায়ী পতঙ্গ।

সাধারণ যাযাবর প্রজাপতিদের ডানায় মাখানো থাকে কোমল হলুদ ও সবুজাভ-সাদা রঙের ছোঁয়া। রৌদ্রের আলোয় তারা যেন উড়ন্ত সর্ষেফুল। অন্যদিকে চিত্রিত যাযাবরদের ডানায় ছড়িয়ে থাকে বাদামি ও জলপাই রঙের অনিয়মিত ছোপ, যেন শুকনো পাতার মতো সে আকাশে ভেসে যাচ্ছে। দুজনের চেহারা ভিন্ন হলেও জীবনদর্শন এক, চলমানতা। তারা সবসময় একই পথে ওড়ে না, আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ১০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার আকাশ পরিক্রমা করে।
ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষার আগমন ও প্রস্থানকে অনুসরণ করে এদের বিশাল ঝাঁক এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে উড়ে যায়। কখনও শত শত, কখনও হাজার হাজার প্রজাপতি একই দিকে উড়তে থাকে। পথের ধারে দাঁড়ানো মানুষ বিস্ময়ে দেখে, যেন হলুদ-সাদা রঙের কোনো নদী আকাশের বুক চিরে বয়ে চলেছে। তাদের এই যাত্রার উদ্দেশ্য নতুন খাদ্যের উৎসের সন্ধান, উপযুক্ত আবহাওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ প্রজননক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া।
বর্ষার আকাশে উড়ে চলা সাধারণ (কমন এমিগ্রান্ট) যাযাবর ও চিত্রিত (মটল্ড এমিগ্রান্ট) যাযাবর প্রজাপতিদের দিকে তাকালে মনে হয়, পৃথিবী আসলে পথিকদেরই। ক্ষুদ্র ডানায় ভর করে তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন মানে গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; জীবন মানেই পথ চলা।
কিন্তু সবচেয়ে বড় রহস্য এখনও রয়ে গেছে, তারা পথ খুঁজে পায় কীভাবে?
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সূর্যের অবস্থান, আকাশের মেরুকৃত আলো, বাতাসের প্রবাহ এবং পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তাদের দিকনির্ণয়ে সাহায্য করে। কিছু প্রজাতির মধ্যে একটি জৈবিক ঘড়িও কাজ করে, যা দিনের সময় ও ঋতুর পরিবর্তন বুঝতে পারে। তবে, এ সবই গোল গোল তত্ত্ব; এই রহস্য পুরোপুরি এখনও বোঝা যায়নি। এখনও এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে, যার উত্তর বিজ্ঞানের কাছে অসম্পূর্ণ।
সম্ভবত এটাই এই বিষয়টির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তবু, পতঙ্গ-পরিযানের সবচেয়ে আশ্চর্য গল্পটি সম্ভবত কোনো প্রজাপতির নয়। সেটা এক প্রজাতির ফড়িংয়ের।
আ-বিশ্ব ভেসে-চলা ফড়িং বা Globe Skimmer (Pantala flavescens)

এই নামের মধ্যেই আছে এদের আসল পরিচয়। পৃথিবীর উষ্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ফড়িংদের অনেক বিজ্ঞানী পৃথিবীর প্রকৃত বিশ্বভ্রমণকারী বলে মনে করেন। আফ্রিকার জলাভূমিতে জন্ম নেওয়া একটি প্রজন্ম মৌসুমি বায়ুতে ভেসে, ভারত-মহাসাগর পেরিয়ে আমাদের দেশে আসে। এখানে তাদের সন্তান জন্মায়। সেই নতুন প্রজন্ম আবার ভারতের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাদের উত্তরসূরিরা আবার আফ্রিকার দিকে ফিরে যায়।
পৃথিবীর সব ‘আবিশ্ব ভেসে-চলা ফড়িং’ কোন একটিমাত্র পরিযান পথে অংশ নেয় না। বরং বলা যায়; পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এদের অনেকগুলি পরস্পর-সংযুক্ত পরিযান পথ (migration systems) রয়েছে।
ভারত মহাসাগরের আফ্রিকা–ভারত পথ, পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি পথ, উত্তর আমেরিকার উত্তর–দক্ষিণ পথ এবং অস্ট্রেলিয়ার বৃষ্টিনির্ভর চলাচল; সব মিলিয়ে এই প্রজাতি পৃথিবী জুড়ে নানান বড় বড় চলমান দল গঠন করে।
এই কারণেই আবিশ্ব ভেসে-চলা ফড়িং নামটি সার্থক। এরা শুধু দূরপাল্লার পরিযায়ী নয়; বরং সমগ্র পৃথিবীকে কার্যত নিজের আবাসভূমি হিসেবে ব্যবহার করে। বিভিন্ন অঞ্চলে নিজস্ব পরিযানচক্র মেনে চলে।
আইআইটি খড়্গপুরের (IIT Kharagpur) ২০২৩ সালে আবিশ্ব-ভাসমান ফড়িংয়ের ভারত মহাসাগরীয় পরিযান নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাটির ফলাফলগুলি দেখলে চমকে উঠতে হয়।
গবেষকরা বায়ুপ্রবাহ, শক্তি-ব্যয় (energetics) এবং জীবনচক্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে পূর্ব আফ্রিকা থেকে ভারত পর্যন্ত ভারত মহাসাগর অতিক্রম করা এই ফড়িংদের পক্ষে সম্ভব। এই যাত্রায় ‘সোমালি জেট’ নামে পরিচিত শক্তিশালী মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ তাদের সাহায্য করে।
প্রতিটি ফড়িঙের শক্তি-সামর্থ অনুযায়ী, একটি ‘আবিশ্ব ভেসে-চলা ফড়িং’, অনুকূল অবস্থায় প্রায় ৯০ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা উড়তে পারে। এ কারণেই ভারত-মহাসাগরের বিশাল অংশ পেরিয়ে আসা সম্ভব হয়।
আফ্রিকা থেকে ভারতে আসা তুলনামূলকভাবে সরাসরি হলেও, ভারত থেকে আফ্রিকায় ফেরার সময় মালদ্বীপ ও সেশেলস দ্বীপপুঞ্জে মধ্যবর্তী বিরতির প্রয়োজন খুব সম্ভবত হয়। গবেষণার মডেল অনুযায়ী সরাসরি বিপরীতমুখী যাত্রা সবসময় সম্ভব হয় না।
গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ ফলগুলির একটি হলো, খুব সম্ভবত মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি ও উত্তর-পূর্ব ভারত এই পরিযান চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপত্তিস্থল। গবেষকরা একটি branched network বা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত পরিযান চক্রের ধারণা দিয়েছেন; উত্তর-পূর্ব ভারতে জন্মানো ফড়িং দক্ষিণ ভারতে পৌঁছে, পরে মহাসাগরীয় পরিযানে অংশ নেয়।
আগে ধারণা ছিল ভারত থেকে মালদ্বীপ, এবং সেখান থেকে আফ্রিকা একটি অপেক্ষাকৃত সরল পথ। আইআইটি খড়্গপুরের গবেষণা দেখিয়েছে, বাস্তবে এটি একটি জটিল পথ পরিক্রমা, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ফড়িং বিভিন্ন শাখাপথে ছড়িয়ে যায়, আবার ফেরার সময় মিলিত হয়।
ফড়িংরা শুধু বাতাস অনুসরণ করে না; তারা এমন অঞ্চলে পৌঁছায় যেখানে সাম্প্রতিক বৃষ্টির ফলে অস্থায়ী জলাশয় তৈরি হয়েছে। কারণ ডিম পাড়া ও শূককীটের বিকাশের জন্য জল অপরিহার্য। অর্থাৎ বৃষ্টি + বায়ুপ্রবাহ + জীবনচক্র; এই তিনটির সমন্বয়েই পুরো পরিযান সম্ভব হয়।
সমগ্র যাত্রাটি সম্পূর্ণ করতে কয়েকটি প্রজন্ম লাগে। কিন্তু পুরো বংশ যেন এক অদৃশ্য স্মৃতি বহন করে চলে; কখন উড়তে হবে, কোন বাতাস ধরতে হবে, কোথায় ডিম পাড়তে হবে। মানুষের ইতিহাসে যেমন প্রাচীন নাবিকেরা নক্ষত্র দেখে সমুদ্রপথ খুঁজে নিত, তেমনি এই ক্ষুদ্র ফড়িংরাও যেন প্রকৃতির নিজস্ব নির্দেশনা অনুসরণ করে হাজার হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করে।
পতঙ্গদের পরিযান শুধু জীববিজ্ঞানের তথ্য নয়; একটি প্রতিস্পর্ধার গল্প। এ গল্পে, কয়েক মিলিগ্রাম ওজনের একটি প্রাণী মহাসাগর পার করে। একটি প্রজন্ম যাত্রা শুরু করে, আর তিন-চার প্রজন্ম জুড়ে সেই যাত্রা শেষ করে। পথ দেখানোর কেউ থাকে না। যেখানে অদৃশ্য বায়ুপ্রবাহ আকাশে নির্মাণ করে হাজার কিলোমিটারের মহাসড়ক।

তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়
বিজ্ঞান লেখক। অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সদ্যস, জীব বৈচিত্র সংরক্ষন একাডেমি ,কলকাতা।
