পাখি ধরা গাছ পিসোনিয়া

‘একটি গাছ, একটি প্রাণ’- ছোটবেলায় এই রচনাটা পড়েনি, এমন কেউ বোধহয় নেই। গাছ আমাদের কি কি উপকার করে, তার গুণাগুণ, বিশেষ করে অক্সিজেন উৎপাদন করে কীভাবে আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে সেই সবই আমরা পড়েছি এই রচনায়। কিন্তু যদি ‘একটি গাছ, একটি প্রাণ’ মানে একটি গাছ কীভাবে একটি প্রাণ শেষ করে দেয় সেটা বোঝায়, তাহলে? খুব অবাক লাগছে তো? হ্যাঁ অপার রহস্যময় এই পৃথিবীর কোণায় কোণায় এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যা শুনলে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যেতে পারে। তেমনই এক আশ্চর্য রাক্ষস গাছের কথা বলব তোমাদের।
ইংলিশ হরর ফিল্মে মানুষখেকো গাছের অনেক কাহিনী দেখানো হয় যারা নিমেষে গোটা গোটা মানুষ গিলে ফেলে, কিন্তু আদতে মানুষখেকো গাছ কিন্তু এখনও কোথাও পাওয়া যায়নি। বহু মাংসাশী গাছ আছে যেমন- সূর্যশিশির, কলসপত্রী, জলজ ঝাঁঝি প্রভৃতি। তবে এরা নিতান্তই ছোটখাটো পোকামাকড়, ইঁদুর, ব্যাঙ এইসব খায়। জলজ ঝাঁঝি জলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুজীবকে খাদ্যরূপে গ্রহণ করে। বড়সড় প্রাণী এরা কেউ খায়না। তবে এখন যে গাছের কথা বলব সে মানুষ না খেলেও, খায় এমন এক প্রাণী যাদেরকে গাছ ছাড়া আমরা ভাবতেই পারিনা। আর সেই প্রাণীটি হল- পাখি।
হ্যাঁ, যে পাখি গাছেই বাসা বাঁধে, গাছই তাদের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র, সেই পাখির মৃত্যুর কারণই কিন্তু এই গাছ যার পোশাকি নাম, ‘পিসোনিয়া’ (Pisonia)। ডাকনাম “পাখি খেকো গাছ”। বছরে দুবার এই পিসোনিয়া (Pisonia) সাধারণ গাছ থেকে পাখি খেকো গাছে পরিণত হয়। কিন্তু কেন? চলো জেনে নিই।
Nyctaginaceae গোত্রের এই গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম “Pisonia umbellifera”। অনেক জায়গায় Ceodes umbellifera নামেও পরিচিত। ১৭৭৬ খ্রীঃ এটি প্রথম আবিষ্কার করেন Johann Reinhold Forster এবং George Forster নামক প্রকৃতিবাদী এক পিতা-পুত্রের জুটি। পরবর্তীকালে ডাচ বিজ্ঞানী তথা প্রকৃতিবাদী Willem Piso এই উদ্ভিদের উপর বিশদে অধ্যয়ন করেন এবং ওনার নামানুসারেই এই উদ্ভিদের নামকরণ Pisonia করা হয়।
আদতে এটি নরম কাঠের একপ্রকার গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর সংলগ্ন ক্রান্তীয় অরণ্যে মূলত এই Pisonia-এর বাস। ভারতের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ এবং ভারতের বাইরে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন্স, থাইল্যাণ্ড, ভিয়েতনাম, চীন, তাইওয়ান, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ, আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, নিউ সাউথ ওয়েলস ও অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যাণ্ডে দেখা মেলে এই পাখি খেকো গাছের।
এই উদ্ভিদটি সমুদ্রস্তর থেকে প্রায় ১৫০-২০০০ ফুট উচ্চতায় পাওয়া যায়। সাধারণত বৃষ্টি অরণ্যেই এর দেখা মেলে। তবে বহু দেশে সমুদ্র উপকূলেও গড়ে ওঠে Pisonia-এর জঙ্গল। ১৬-২০° সেলসিয়াস তাপমাত্রা, এই উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার জন্য আদর্শ। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। Pisonia-এর কিছু বিরল প্রজাতি আছে যারা (-৩°) সেলসিয়াস উষ্ণতাতেও বেঁচে থাকতে পারে। ছোট গাছের জন্য উচ্চ আর্দ্রতা ও মাঝারি জলীয় বাষ্প সমন্বিত আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়। উচ্চ পটাশিয়াম সমৃদ্ধ মাটিতে এরা দ্রুত বেড়ে ওঠে। কিন্তু পরিণত Pisonia গাছ খুবই সহনশীল হয়। এরা কিন্তু রুক্ষ, শুষ্ক মাটিতেও দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। বেড়ে ওঠার জন্য এদের মাঝারি সূর্যালোকের প্রয়োজন অর্থাৎ দিনে একটানা ৪ ঘণ্টা সূর্যালোকে থাকলে আর বাকি সময়টা উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শে থাকলেই এদের চলে যায়। তাই এই গাছ ক্রান্তীয় অরণ্য সমন্বিত দেশগুলিতেই বেশি দেখা যায়।

বড় ও মাঝারি আকারের ঘন সবুজ পাতা এই গুল্মের। কিছু কিছু প্রজাতিতে আবার পাতায় সাদা বা হালকা সবুজের দাগও দেখা যায়। প্রায় উপবৃত্তাকার পাতাগুলি সাধারণত ৬-২০ সেমি লম্বা ও ৪-১০ সেমি চওড়া হয়। পাতাগুলি চকচকে এবং রোমহীন হয়। প্রতিটি পাতায় প্রায় ৮-১০টি খুব স্পষ্ট সমান্তরাল শিরা থাকে। এদের পত্রবৃন্তটি বেশ মোটা হয় এবং ০.৫-৫ সেমি লম্বা হয়। কখনো কখনো এটি উপপত্রহীন হয়। সমগ্র গাছটি সাধারণত ৮-১২ মিটার লম্বা হয়। তবে এর উচ্চতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। কিছু কিছু গবেষকদের মতে দীর্ঘতম Pisoniaটির উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার। আবার অনেকের মতে ২৮ মিটার অবধি লম্বা গাছেরও খোঁজ পাওয়া গেছে। পরিণত Pisonia গাছ বেশ বিস্তৃত এবং পাতাগুলি উপরের দিকে মাথার মুকুটের মত বিন্যস্ত থাকে।

বসন্তের শুরুতেই এই গাছে কুঁড়ি আসে। ছোট ছোট ফানেল আকৃতির গোলাপি ও হলুদ ফুলে ভরে যায় গোটা গাছ। ফুলের ভিতর ৬-১৪টি পুংকেশর থাকে যার শীর্ষে কমলা রঙের প্রায় গোলকাকৃতির ছোট্ট ছোট্ট পরাগধানী থাকে। আর ফুল থেকে উৎপন্ন হয় বাদামি বা গোলাপি রঙের ফল। বছরে দুবার করে সেগুলি পাকে, মার্চ-এপ্রিল মাস ও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস করে। আর এই ফল পাকার পরই এই Pisonia গাছ রাক্ষস গাছে রূপান্তরিত হয়। প্রতিবছর হাজার হাজার পাখির মৃতদেহ পাওয়া যায় এই গাছে। অনেক সময় কিছু কিছু পাখির প্রজাতি বিপন্ন প্রজাতিতেও পরিণত হয় এই অদ্ভুত গাছের জন্য। Pisonia-এর অনেক প্রজাতিতে দুবার নয়, বছরে অনেকবারই ফল পাকে।
পাখি খেকো নাম হলেও আসলে কিন্তু এরা পাখি খায়না। যে কোনো মাংসাশী উদ্ভিদ কীটপতঙ্গ খায়, কারণ তারা যে মাটিতে জন্মায়, তাতে পুষ্টি উপাদান অনেক কম থাকে। সেই উপাদানগুলির চাহিদা মেটাতেই উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ কীটপতঙ্গকে প্রথমে ফাঁদে ফেলে, তারপর গাছ থেকে নিঃসৃত বিশেষ পাচকরসের মাধ্যমে তাদের পরিপাক করে। কিন্তু Pisonia-এর ক্ষেত্রে এসব কিছুই হয়না। এরা মোটামুটি ভালই উর্বর ও পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটিতেই জন্মায়।
তাহলে কেন এই হত্যালীলা?
এই গাছের বীজ জন্মায় ফলের বাইরে এবং এই বীজের গায়ে থাকে অসংখ্য ছোট ছোট হুক এবং একপ্রকার চটচটে আঠালো পদার্থ, যা সহজেই যেকোনো প্রাণীর গায়ে আটকে যায়; বিশেষ করে পাখির পালকে। একবার আটকে গেলে এই বীজ ঝেড়ে ফেলা খুবই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।


১-২টো বীজ আটকালে সেটা সমস্যার নয়, কিন্তু যদি কোনো পাখির গায়ে প্রায় শ’খানেক বীজ আটকে যায়, তাহলে? পাখিটি আর উড়তে পারেনা। ফলে দীর্ঘদিন এক জায়গায় আটকে পড়ে না খেয়ে ধীরে-ধীরে সেটি মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হয়। বিশেষত সামুদ্রিক পাখিই এর শিকার হয় এবং প্রতিবছর এইভাবে যেসব পাখির মৃত্যু হয় তার সংখ্যাটা রীতিমত চমকে দেওয়ার মতো, যা পাখিদের ক্ষেত্রে বেশ চিন্তার কারণও বটে।

তবে আসল টুইস্ট এখনও বাকি। এই যে এত পাখি বীজে জড়িয়ে মারা যায়, Pisonia কি এদের খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে? না একেবারেই তা নয়। এই পাখিগুলি ঐভাবেই পড়ে থেকে থেকে হয় অন্যপ্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয় নতুবা মাটিতে পড়ে মিশে গিয়ে মাটিকে আরও উর্বর করে তোলে।
এখন প্রশ্ন তাহলে এত পাখি মারে কেন এই গাছ?
উত্তর হল- বংশবৃদ্ধির কারণে। যেকোনো গাছের ক্ষেত্রেই বংশবৃদ্ধির বিভিন্ন মাধ্যম থাকে। কারণ গাছকে তার বীজ এমন জায়গায় ছড়াতে হয়, যেখানে সেটি থেকে গাছ জন্মাবার অনুকূল পরিবেশ থাকে, পাশাপাশি সেটি যথেষ্ট দূরবর্তীও হয়। কারণ তা নাহলে মূল গাছ আর তার থেকে উৎপন্ন চারাগাছ খাদ্য বা অন্যান্য উপাদানের জন্য পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে। Pisonia গাছ সাধারণত সামুদ্রিক অঞ্চলে বেড়ে ওঠে। এদের বীজ দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ার একমাত্র মাধ্যম হল সমুদ্রের জল ও বায়ু। কিন্তু নোনা জলে এই বীজ ৪-৫ দিনের বেশি বাঁচেনা। আর বাতাসে উড়ে গিয়েও বহু দূরে অবস্থিত কোনো দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই, সমুদ্রের জলে পড়ে নষ্টই হয়ে যায়।
তাহলে উপায়?
এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হল সামুদ্রিক পাখি। এরা সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলেই থাকে, কিন্তু বাসা বাঁধে বহু দূরে। ফলে এরা বহু দূরদূরান্তে Pisonia-এর বীজ ছড়িয়ে পড়ার এক অভিনব মাধ্যম। প্রাকৃতিক বিবর্তনের এক অভূতপূর্ব উদাহরণ এই Pisonia বীজের বিচ্ছুরণ। তবে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে বলি হতে হয় এই নিরীহ পাখিগুলিকে। এই গাছের কারণে অস্ট্রেলিয়ার Cabbage Tree Island-এ Gould’s Petrel নামক সামুদ্রিক পাখিটি এক বিপন্ন প্রজাতিতে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৯২-৯৩ সালে কৃত্রিমভাবে রাসায়নিক বিষ প্রয়োগের দ্বারা এই Pisonia গাছের সংখ্যা হ্রাস করাতে পুনরায় পাখিটির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাই সরাসরি পাখি না খেয়েও ‘পাখি খেকো’র তকমা জুটেছে Pisonia-এর কপালে। এই পৃথিবীর নানান অদ্ভুত ঘটনার মধ্যে এই Pisonia-এর পাখি হত্যার ঘটনাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

তবে Pisonia যে শুধুই একটা খুনী গাছ তা কিন্তু নয়। বেশ কিছু ঔষধি গুণও রয়েছে এর মধ্যে। ১৯৯৬ সালের এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় এর থেকে ৬টি বিভিন্ন Saponin পাওয়া যায়, যার মধ্যে তিনটি Oleanolic acid saponin। এছাড়াও Secopisonic acid, Pisodienone, Pisoninol I এবং II অ্যাসিডগুলিও এই উদ্ভিদ থেকে নিঃসৃত করা হয়। ২০১৮ সালের সমীক্ষায় এই উদ্ভিদের প্রদাহবিরোধী বা কোশ-ধ্বংসকারী বৈশিষ্ট্য থেকে প্রায় ১২ রকমের নতুন যৌগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষরা এই গাছের আঠা, মাটির জিনিস মেরামতিতে কাজে লাগায়। এই গাছের পাতা ও ছাল শূকরের খাদ্য হিসাবে কাজে লাগে।
এছাড়াও এই গাছে বাসা বাঁধা বা মারা যাওয়া পাখি ও তাদের পালকও এই আদিবাসীদের খাদ্য ও পোষাক তৈরির কাজে লাগে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ ও চীনের আদিবাসী সমাজে এটি একটি ভেষজ উদ্ভিদ হিসাবে বহুল প্রচলিত। হাওয়াইতে পূর্বতন আদিবাসীরা এই Pisonia-এর পাতা হজমের ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করত। শিশুদের অনেক রোগেও ব্যবহৃত হত এই গাছ। চৈনিক সভ্যতাতেও ভেষজ উদ্ভিদ হিসাবে এর ব্যবহারের কথা শোনা যায়। এই গাছ জমিতে লাগানো হত ফসলে Phytophage nematodes-এর প্রতিরোধক হিসাবে। তবে এখনও এই Pisonia-এর ঔষধি গুণের উপর গবেষণা প্রচুর বাকি। আশা করা যায় ভবিষ্যতে এর আরও বেশ কিছু গুণাগুণ সম্পর্কে আমরা জানতে পারব।
প্রকৃতি অপার সুন্দর। সমুদ্রের কলতান, ঝর্ণার মিষ্টি সুর, হিমেল হাওয়ার পরশ, বসন্তের মূচ্ছর্না যেমন একদিকে আমাদের মন ভাল করে দেয়, তেমনই সেই প্রকৃতি আবার রহস্যময়ী ও নিষ্ঠুরও বটে। জীবনচক্রের ভারসাম্য রক্ষায় সে যেমন সৃষ্টি করে নতুন প্রাণের, তেমনই ধ্বংসও করে কিছু জীবন। আর এই খেলা চিরকালের। এমনই অসংখ্য Pisonia ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের চারিপাশে। যার কিছুটা আমাদের জানা, কিন্তু বেশিরভাগটাই রহস্যে ঢাকা। বিজ্ঞানের হাত ধরে একে একে সে রহস্য উন্মোচিত হবে অচিরেই। আরও নানান জীবের অদ্ভুত সব আচরণের সাথে পরিচিত হব, যার সাক্ষী থাকবে তোমরাও।
তথ্যসুত্রঃ-

ঐন্দ্রিলা সাউ
পেশাদার বিজ্ঞান বিষয়ক কন্টেন্ট রাইটার। Amul কোম্পানি থেকে “বিদ্যাশ্রী” পদকপ্রাপ্ত।
