সৃজনমূলক ক্ষুদ্র-জৈবিক বুদ্ধিমত্তা

আপনার কখনও ইচ্ছা হয়েছে যে আপনার এমন কোন অভিজ্ঞতা হোক, যে অভিজ্ঞতা আজ পর্যন্ত অন্য কোন মানুষের হয়নি ?
কল্পনা করুন, শুধুই পথ চলার আনন্দ নিতে কুয়াশা ঘেরা এক শীতের ভোরে এক জনশূন্য পথে হাঁটছেন আপনি। অনেক্ষণ হাঁটার পর আপনি আপনারই মতো আরেক পথিকের দেখা পেলেন। তাকে দেখা মাত্র নিঃসঙ্গতায় হাঁপিয়ে ওঠা আপনার মন আপনার ঠোঁটে সাজিয়ে দিল এক চিলতে হাসি। সেই হাসি থেকেই জমে উঠল আলাপ। কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্য তো আপনার ছিল না, তাই সেই আলাপকেই মনে করে নিলেন পরম প্রাপ্তি। পথের ধারে চারদিক ঘেরা একটি কাঠামোর মধ্যিখানে বসে এগিয়ে চলল আপনাদের গল্প। একে অপরকে জানতে জানতে আলাপ যখন বন্ধুত্বে পর্যবসিত হয়েছে, হিমেল হাওয়ায় উড়ে আসা এক গোছা পরাগ রেণুকে আপনি কথার ফাঁকে তুলে দিলেন বন্ধুর হাতে।
আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, এই অভিজ্ঞতাগুলিকে মোটেই অনন্য বলা যায় না। অনেক মানুষের জীবনেই এই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কল্পনা করুন, যদি এমন হয় যে, আপনার সামনে বসে থাকা বন্ধুটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর হঠাৎ আপনার চোখের সামনেই অজস্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণীতে বিশ্লিষ্ট হয়ে গেল ! বন্ধু হাতে নিয়েছিল যে পরাগ রেণুর গোছা, সেটাও আর নেই ! সেই স্থানে রয়েছে অজস্র ক্ষুদ্র এককোষী উদ্ভিদ ! আপনি লক্ষ্য করলেন, চারপাশে বাতাসে ভেসে বেড়ানো কুয়াশাও অদৃশ্য হয়েছে ! এই আশ্চর্য ঘটনার আকস্মিকতাকে সামলে নিয়ে ঘটনাটিকে খতিয়ে দেখতে গিয়ে আপনি আরও জানতে পারলেন, যে কাঠামোর মধ্যিখানে বসে আপনারা গল্প করছিলেন, সেটি একটি খনিজ কাঠামো (Mineral structure) যা মানুষের নয় বরং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াদের তৈরি করা!
ডেসালফোভিব্রিও (Desulfovibrio)
ডেসালফোভিব্রিও (Desulfovibrio) হলো অক্সিজেন-স্বল্প পরিবেশে যেমন জলাভূমি বা পলিমাটিতে জন্মানো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি নিজেদের বিপাক ক্রিয়ার একটি ধাপ হিসাবে “ডিসিমিলেটরি সালফেট রিডাকশন” (Dissimilatory Sulfate Reduction) নামে একটি প্রক্রিয়া সম্পাদন করে, সেইজন্য এদেরকে “সালফেট-হ্রাসকারী ব্যাকটেরিয়া” (Sulfate-reducing bacteria) বলা হয়। এরা এই প্রক্রিয়ায় সালফেট মূলককে (Sulfate radical) ব্যবহার করে জৈব অণু (Biomolecule) বা হাইড্রোজেনকে (Hydrogen) ভেঙে ফেলে এবং হাইড্রোজেন সালফাইড (Hydrogen sulfide) উৎপাদন করে। এই হাইড্রোজেন সালফাইড পরিবেশে উপস্থিত লোহার (Iron) সঙ্গে বিক্রিয়া করে আয়রন সালফাইড (Iron sulfide) যেমন ফেরাস সালফাইড (Ferrous sulfide) তৈরি করে।
এরপর এই আয়রন সালফাইড জমাট বেঁধে পরিবেশে এক ধরনের খনিজ কাঠামো গঠিত হয় ! আমরাই শুধু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হই না। ভাইরাস আক্রমণ করে ব্যাকটেরিয়াদেরও। ডেসালফোভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরিওফাজ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হলে তাদের তৈরি করা ঐ খনিজ কাঠামোতে ব্যাকটেরিওফাজ যুক্ত হয় যা ঐ কাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা (Flexibility) বৃদ্ধি করে কাঠামোটির স্থায়ীত্ব (Stability) বৃদ্ধি করে !
সাইয়ানোব্যাকটেরিয়া (Cyanobacteria)
সাইয়ানোব্যাকটেরিয়া (Cyanobacteria) জাতে ব্যাকটেরিয়া হলেও সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সক্ষম বলে ও নীলচে সবুজ রঙের জন্য “নীল-সবুজ শৈবাল” (শৈবাল হলো এক ধরনের উদ্ভিদ) নামে বেশী পরিচিত। এরা এককভাবে জীবনধারণে সক্ষম হলেও নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনযাত্রা পেতে একসঙ্গে থেকে জলের পৃষ্ঠে বা জলের গভীরে কলোনি গঠন করে যা স্তর বা ফিল্মের মত দেখায়। এদের খাদকদের পক্ষে এই বড় কলোনিগুলিকে খাওয়া অপেক্ষাকৃত কঠিন। বাতাসে কুয়াশা যেমন ভেসে বেড়ায়, তেমনই এই কলোনি জলে ভেসে সাইয়ানোব্যাকটেরিয়ার জন্য পুষ্টিকর রাসায়নিক পদার্থগুলোর দিকে এগিয়ে যায় !

ছবিঃ en.wikipedia.org

ছবিঃ www.britannica.com
ভলভক্স (Volvox)
এমন এককোষী উদ্ভিদ আবিষ্কৃত হয়েছে যারা একসঙ্গে মিলে অনেকটা পরাগ রেণুর মতো দেখতে বহুকোষী উদ্ভিদের রূপ নেয়, যেমন “ভলভক্স” (Volvox)। এই এককোষী শৈবাল স্বাধীনভাবে বা একা একা থাকতে পারে ঠিকই, কিন্তু তারা একসঙ্গে কলোনি গঠন করে থাকলে অনেক বেশী নিরাপদ বোধ করে। কলোনি গঠন করে থাকলে শৈবালগুলি মিলেমিশে কাজ করতে পারে অর্থাৎ একজনের কাজে আরেকজন সাহায্য করতে পারে।
কলোনিতে থাকলে, পরিবেশে তাদের জন্য যদি কোন ঝুঁকি তৈরি হয়, এককোষী শৈবালগুলি একে অপরকে সহায়তা করতে পারে। একসঙ্গে কলোনি গঠন করে থাকলে সেই কলোনি জেলিবলের মত দেখতে একটি স্বতন্ত্র বহুকোষী উদ্ভিদের মতো পুষ্টিকর পদার্থ ও আলোর দিকে সহজে এগিয়ে যেতে পারে; কারণ কলোনিতে থাকা শৈবালগুলি যেভাবে তাদের লম্বা চাবুকের মতো অঙ্গাণু ফ্ল্যাজেলা (Flagella)-কে নাড়ায় তাতে এক সমন্বয় থাকে, ও কলোনির কিছু শৈবালে “আইস্পট” (Eyespot) নামক আলোক সংবেদী অঙ্গাণু থাকে।
যাই হোক, মাইক্রোস্কোপে এই কলোনিকে একটি জেলিবল ও খালি চোখে এই কলোনিকে একটি সবুজ বিন্দুর মত দেখায়।
সৃজনমূলক বুদ্ধিমত্তা (Generative Intelligence)
একটি পরমাণুর ব্যাস যতখানি, তার চেয়েও কম দৈর্ঘ্যে (ফেমটোমিটার এককে মাপা হয় এই দৈর্ঘ্য) এমন এক জগৎ আছে যেখানকার বাসিন্দা “বোসন” (Boson) নামক কণিকারা -২৭৩.১৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস এর কাছাকাছি ঠান্ডা পড়লে স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে একসঙ্গে জুড়ে গিয়ে একটি অখণ্ড বড় কণার মতো আচরণ করে ! ঐ একই ধরনের আচরণ আমরা লক্ষ্য করছি ক্ষুদ্র জীবেদের (Pan-Microbiota) মধ্যে যাদের আকার ন্যানোমিটার, মাইক্রোমিটার, মিলিমিটার ইত্যাদি এককে মাপা হয়। তবে জীবন ধারণের তাগিদে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা এই আচরণকে “সৃজনমূলক বুদ্ধিমত্তা” (Generative Intelligence) – এই বিশেষ নামে অভিহিত করছি!
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে মানুষের মতো দেখতে, মানুষের মতো আচরণ করে এমন একটি জটিল হাড় ও মাংসের বহুকোষী তন্ত্র (System) কি সৃজনমূলক ক্ষুদ্র-জৈবিক বুদ্ধিমত্তার পক্ষে গঠন করা সম্ভব ?
বলাই বাহুল্য যে আজ পর্যন্ত এমন কোনো ক্ষুদ্র জীব আবিষ্কৃত হয়নি যাদের কলোনি মানুষের মতো আচরণ করে। তবে পরের বাস্তব উদাহরণগুলো পড়লে আপনি ভাবতে বাধ্য হবেন যে এমন ক্ষুদ্র জীব প্রকৃতির বুকে থাকলেও থাকতে পারে!
আগেই বলেছি যে সাইয়ানোব্যাকটেরিয়া জলের পৃষ্ঠে বা জলের গভীরে স্তর বা ফিল্মের মতো দেখতে কলোনি গঠন করে। আসলে অনেক ধরনের ব্যাকটেরিয়াই এরকম দেখতে কলোনি গঠন করে থাকে। এই কলোনিকে “বায়োফিল্ম” (Biofilm) বলা হয়।
ব্যাসিলাস সাবটিলিস (Bacillus subtilis)
ব্যাসিলাস সাবটিলিস (Bacillus subtilis) নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া আছে যাদের তৈরি করা বায়োফিল্মে উপস্থিত কিছু ব্যাকটেরিয়া নিজেদের কোষে ক্যালসিয়াম আয়ন (Calcium ions) সঞ্চয় করে। এরপর কার্বনেট আয়ন (Carbonate ions) সেই ক্যালসিয়াম আয়নগুলোর সংস্পর্শে এসে অনেক ক্যালসিয়াম কার্বনেট কেলাস (Calcium carbonate crystals) গঠন করে। ফলে সেই গোটা বায়োফিল্মের একটি অংশ কোন বহুকোষী প্রাণীর কঙ্কালের (Skeleton) রূপ নেয় !

ছবিঃ www.molkem.com

ছবিঃ www.britannica.com
পর্তুগিজ ম্যান-ও-ওয়ার (Portuguese man o’ war)
পুরনো দিনের পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজের মত আকৃতির প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ এক ধরনের বহুকোষী প্রাণীকে সমুদ্রের জলে ভেসে থাকতে দেখা যায়। এটি জেলিফিশ নয় কিন্তু জেলিফিশের মতোই এটি হুল ফোটায়। এই প্রাণীকে নাম দেওয়া হয়েছে “পর্তুগিজ ম্যান-ও-ওয়ার” (Portuguese man o’ war) বা “পর্তুগিজ যুদ্ধজাহাজ জেলিফিশ”।
”নিউম্যাটোফোর” (Pneumatophore) নামক বেলুনের মতো গ্যাস ভর্তি থলি থাকে এর শরীরে। নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি গ্যাসে পূর্ণ থাকে এই থলি। এই প্রাণী সাঁতার কেটে এগোতে না পারলেও নিউম্যাটোফোর এর সাহায্যে জলের প্লবতা বলকে (Buoyant force) কাজে লাগিয়ে সমুদ্রে ভেসে থাকতে পারে।
হাওয়া ও ঢেউয়ের নিরন্তর ধাক্কায় সমুদ্রের খুব বড় অঞ্চল জুড়ে অনায়াসেই বিচরণ করতে পারে এই প্রাণী। এই বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বিচরণের সময়ে এই প্রাণী বিষাক্ত নাইডোসাইট (Cnidocyte) কোষ সমন্বিত লম্বা কর্ষিকাগুলিকে (৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এই কর্ষিকা) সমুদ্রের জলের গভীরে প্রসারিত রাখে। এই কর্ষিকার (Tentacle) সাহায্যেই এটি ছোট মাছ, মাছের লার্ভা, চিংড়ি, প্ল্যাঙ্কটন ইত্যাদিকে ধরে প্যারালাইজ করে খায়।
জুওয়েড (Zooid)
জানলে বিস্মিত হতে হয়, পর্তুগিজ ম্যান-ও-ওয়ার, যাকে একটি স্বতন্ত্র বহুকোষী প্রাণী বলে মনে হয়, সেটি আসলে কোন প্রাণীই নয়, বরং সেটি হলো “জুওয়েড” (Zooid) নামক এক ধরনের বহুকোষী ক্ষুদ্র প্রাণীর কলোনি ! এক একটি জুওয়েড কয়েক মিলিমিটার থেকে কয়েক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের হতে পারে। অর্থাৎ ক্ষুদে জুওয়েড প্রাণীদের নিয়ে তৈরি হওয়া এক একটি কলোনি এক একটি বড় আকারের স্বতন্ত্র প্রাণী অর্থাৎ পর্তুগিজ ম্যান-ও-ওয়ার এর মতো আচরণ করে!

ছবিঃ www.instagram.com

ছবিঃ www.nature.com
গোনোডেনড্রা (Gonodendra)
জুওয়েড প্রাণীরা একা বা স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। তাই কলোনি তৈরি করা তাদের কাছে একমাত্র বিকল্প। প্রত্যেকটি কলোনিতে কিছু সংখ্যক জুওয়েড নিয়ে তৈরি হয় নিউম্যাটোফোর, অন্য কিছু সংখ্যক জুওয়েড মিলে তৈরি করে কর্ষিকা, বংশবিস্তারের দায়িত্বে থাকা জুওয়েডগুলি একসঙ্গে তৈরি করে প্রজনন অঙ্গ “গোনোডেনড্রন” (Gonodendron), বহুবচনে “গোনোডেনড্রা” (Gonodendra)।
তথ্যসূত্রঃ
- Cyanobacteria diversity and ecological roles: insights into cyanobacterial adaptations and environmental implications — Springer, 2025. DOI: 10.1007/s43994-025-00261-2.
- Analysis of molecular diversity within single cyanobacterial colonies — NCBI, 2024.
- Desulfovibrio magneticus RS-1 contains an iron- and phosphorus-rich organelle distinct from its bullet-shaped magnetosomes — Proceedings of the National Academy of Sciences USA, 2010. DOI: 10.1073/pnas.1001290107.
- The Crystal Structure of Desulfovibrio vulgaris Dissimilatory Sulfite Reductase — Journal of Biological Chemistry, 2000.
- Morphology and development of the Portuguese man of war, Physalia physalis — Nature, 2020.
- The influence of atmospheric and oceanographic conditions on Physalia physalis colonies — Frontiers in Marine Science, 2021.
- Novel method to achieve crystallinity of calcite by Bacillus subtilis in coupled and non-coupled calcium-carbon sources — AMB Express, 2020. DOI: 10.1186/s13568-020-01111-6.
- Bioprecipitation of calcium carbonate by Bacillus subtilis and its applications — Journal of Applied Research and Technology, 2019.
- Origins of multicellular complexity: Volvox and the volvocine algae — Molecular Ecology, 2016. DOI: 10.1111/mec.13551.
- Volvox as a Model for Studying Cell Death and Senescence — Springer, 2018.

দিগন্ত পাল
বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ থেকে অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি রৌপ্য পদকপ্রাপ্ত। আকাশবাণী কলকাতার একজন বিজ্ঞান-কথিকা লেখক ও শিল্পী। বিজ্ঞান প্রবন্ধ, বিজ্ঞান নিবন্ধ, কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প, কল্পবিজ্ঞান কবিতা, গাণিতিক কল্পকাহিনী, বিজ্ঞান নাটক, ও বিজ্ঞান কবিতা লেখেন।
