Life Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানই-পত্রিকা জুলাই-অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা

ইঁদুরখেকো কলসি গাছ:  নেপেন্থেস অ্যাটনবোরই

২০০৭ সালে সেই দ্বীপের মাউন্ট ভিক্টোরিয়ার উপরিভাগের উপত্যকায় এই গাছের অস্তিত্ব খুঁজে পান একদল বিজ্ঞানী, যাদের মধ্যে ছিলেন স্টুয়ার্ট ম্যাকফারসন, অ্যালেস্টার রবিনসন এবং আন্দ্রে ফ্লিসম্যান। পরবর্তী কালে এই গাছের নামকরণ করা হয় নেপেন্থেস অ্যাটনবোরই (Nepenthes attenboroughii)। প্রখ্যাত ব্রডকাস্টার এবং প্রকৃতিবিদ স্যার ডেভিড অ্যাটনবোরইয়ের বন্যপ্রাণী বিষয়ক ডকুমেন্টারি (wildlife documentaries) তৈরিতে বিশেষ অবদান এবং মাংসাশী উদ্ভিদের (carnivorous plants) প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানিয়ে এই নামকরণ করা হয়। ২০১২ সালে এই গাছটিকে প্রথম ১০০টি বিপন্ন প্রজাতির গাছের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গাছগুলির মধ্যে পোকামাকড় বা ইঁদুর হজম করার মতো বিষাক্ত তরল থাকলেও দেখতে কিন্তু এরা মোটেই ভয়ংকর নয়। এই গাছগুলি দেখতে ঠিক যেন কলসির মতো বা অনেকটা বেল শেপড অর্থাৎ ঘণ্টার মতো। এরা কিন্তু আকারেও বেশ বড় হয়। এদের পাতাগুলো প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা আর ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। এখন যে গাছে পাতাগুলি এত বড়, বুঝতেই পারছ তার আকার কেমন প্রকাণ্ড।

এই গাছ দেড় মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ডগুলো প্রায় সাড়ে তিন সেন্টিমিটার পর্যন্ত পুরু হতে পারে। এই গাছের স্ত্রী ও পুরুষ ফুলের গঠন ভিন্ন এবং সেই মতন স্ত্রী ও পুরুষ গাছ পৃথকভাবেই অবস্থান করে। এদের পুষ্পবিন্যাসটি হলো রেসিমোস ধরনের। পুরুষ পুষ্পমঞ্জরি প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং পুষ্পমঞ্জরিতে প্রায় ১০০টি বৃন্তযুক্ত ফুল থাকে। অন্যদিকে স্ত্রী পুষ্পবিন্যাস আকারে ছোট, ৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং মোটামুটি ৭০টি ফুল হতে দেখা যায়। পুষ্পপত্র বা টেপালগুলি পুরুষ পুষ্পের ক্ষেত্রে লাল রঙের, প্রশস্ত ডিম্বাকার আর ভোঁতা অগ্রভাগযুক্ত হয়। অন্যদিকে স্ত্রী ফুলের পুষ্পপত্রগুলি বাদামি বা বেগুনি রঙের হয় এবং এদের অগ্রভাগ সূচালো ধরনের হয়।

কলসপত্রী গোত্রের গাছের মধ্যে এই গাছটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বলা যেতে পারে। প্রধানত যে সমস্ত স্থানের মাটি একান্তই গুণগতভাবে খুব খারাপ, নুড়ি-বালির সমন্বয়ে গঠিত, সেই সমস্ত প্রতিকূল এলাকায় এই গাছ জন্মায়। ফলত মাটি থেকে কোনও প্রকার পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করার উপায় এর থাকে না। তাই জীবনধারণের জন্য এটি পোকামাকড় ও ছোটখাটো জীবকেই খাদ্য হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।

আসলে এরা কিন্তু শুধুমাত্র পোকামাকড় ধরার জন্যই বিবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিবেশে বিভিন্ন বদল আসায় যখন পোকামাকড়ের সংখ্যা বা উপলব্ধতা হ্রাস পেয়েছে, সেই সব বিরল ক্ষেত্রে ছুঁচো এবং ইঁদুরজাতীয় প্রাণী থেকে এরা পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করার পথ খুঁজে নিয়েছে বিবর্তনের নিয়মে।

ইঁদুরখেকো কলসপত্রী গাছ | ছবিঃ www.reddit.com

এই প্রজাতির কলসপত্রী গাছের ধারণক্ষমতা প্রায় দুই লিটারের মতো এবং পোকামাকড় ধরার ফাঁদটিও বড় চমৎকার। অ্যাটনবোরই গাছের কলসগুলি বেশিরভাগ সময় খোলা অবস্থায় থাকে এবং সেই কারণে বৃষ্টির জলও অনেক সময় এর মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। এছাড়া এর ভিতরকার তরল নিচের অংশে চটচটে এবং আঠালো। উপরের অংশে জলীয় ধরনের। দুই ধরনের তরল কখনও এর মধ্যে মিশে যেতে দেখা যায় না। উপরের অংশটিতে অনেক সময় মশা-মাছির লার্ভা ও তাদের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে দেখা যায়।

প্রথম দিকে অবশ্য পোকামাকড় ছাড়া অন্য কোনও প্রাণী এ প্রজাতির গাছের কলসের মধ্যে দেখা যায়নি। তবে ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে রবিনসন এবং তাঁর দলের বিজ্ঞানীরা যখন মাউন্ট ভিক্টোরিয়ায় অভিযানে যান, তখন একটি অ্যাটনবোরইয়ের কলসের মধ্যে একটি ছোট ছুঁচো বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর সন্ধান তাঁরা পান। আবার ডিসেম্বর মাসে আরও একটি পরিদর্শনে দেখা যায় যে সেই ছুঁচো বা ইঁদুরজাতীয় প্রাণীটির আর কিছুই বাকি নেই। ততদিনে সেটি একেবারে কঙ্কালসার নাড়িভুঁড়িতে পরিণত হয়েছিল।

তাই বলাই বাহুল্য যে কলসপত্রী গাছের প্রজাতির মধ্যে এই নেপেন্থেস অ্যাটনবোরই কিন্তু বেশ চমকপ্রদ এবং বিরল। তবে কিন্তু ভেবো না, এই গাছটি তুমি তোমার বাড়ির ছাদে ইঁদুর ধরার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। কারণ এই গাছ তো সব স্থানে, সকল পরিবেশে দেখা যায় না, তাই একে বিপন্ন প্রজাতির গাছের তালিকাতেই রাখা হয়েছে। এরকমই আরও অনেক পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ কিন্তু আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে, যাদের আচরণ এবং আকার আজব এবং মজাদার। তাদের তথা এই রঙিন বৈচিত্র্যময় পরিবেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। তাই এবার থেকে রাস্তাঘাটে বা বাড়ির উঠোনে নতুন কোনও কীটপতঙ্গ বা উদ্ভিদ দেখলে তাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে ভুলো না কিন্তু।

তথ্যসূত্রঃ-

অনন্যা মণ্ডল

বিজ্ঞান লেখিকা