ওডার্ডো বেক্কারি ও ফেয়ারি ল্যান্টার্ন

র্যাফ্লেসিয়া ফুলের নাম শুনেছেন তো? বিশ্বের সবথেকে বড় ফুল। সেই র্যাফ্লেসিয়ার গোত্রেরই আর একটি প্রজাতি ‘কর্পস ফ্লাওয়ার’ বা শবপুষ্প নামে পরিচিত, বৈজ্ঞানিক নাম Amorphophallus titanum। ইন্দোনেশিয়া ঘুরে ঘুরে সেই ফুল আবিষ্কার করেছিলেন এক ইতালীয় বিজ্ঞানী। শুধু তাই নয়, এমন এক আজব ‘পরজীবী উদ্ভিদ’ (Thismia Neptunis) আবিষ্কার করেছিলেন তিনি যা মাটির নীচেই সারা জীবন কাটিয়ে দেয়। তাতে আবার ক্লোরোফিলও নেই। অন্যের উপর নির্ভর করেই বাঁচে সেই উদ্ভিদ। বিজ্ঞানীর নাম ওডার্ডো বেক্কারি (Odoardo Beccari)।
তাঁর আবিষ্কৃত সেই অদ্ভুত উদ্ভিদটির নাম দেওয়া হয়েছে ফেয়ারি ল্যান্টার্ন। বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় পরীর লণ্ঠন। শুধু ইন্দোনেশিয়া নয়, নিউ গিনি দ্বীপপুঞ্জ এবং অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াতেও তিনি দীর্ঘ সময় গবেষণা করেছেন, আবিষ্কার করেছেন নানা উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজাতি।
জন্ম ও শিক্ষা
ইতালির ফ্লোরেন্সে জন্ম হয়েছে ওডার্ডো বেক্কারির। তাঁর বাবার নাম জোসেফ দি লুইজি বেক্কারি এবং মায়ের নাম আন্তোনিয়েত্তা মিনুচি। শৈশবেই তিনি বাবা-মাকে হারান, পরে তাঁর মামা মিনুচির কাছে তিনি বড় হন। ১৮৫৩ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত লুক্কার রিয়েল কলেজিও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এই বিদ্যালয়েই অ্যাবট ইগনাজিও মেজেত্তি নামে এক শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসেন বেক্কারি যিনি উদ্ভিদের নানা নমুনা সংগ্রহ করে থাকেন। তাঁর উৎসাহেই বেক্কারি হার্বেরিয়াম গড়ে তোলেন। পরে একটি গণের নামকরণও করেন মেজেত্তির নামে।
১৮৬১ সালে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এখানেই তিনি প্রকৃতিবিদ জোসেফ মিনিঘিনি, পিয়েত্রো সাভির নজরে আসেন। সেখানে সাভির সহায়ক হিসেবেও তিনি বেশ কিছুদিন কাজ করেন। কিন্তু পিসার শিক্ষকদের বিজ্ঞানচিন্তার রক্ষণশীলতা নিয়ে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন বেক্কারি। তাই ওই সহায়কের কাজ ছেড়ে তিনি বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন পড়তে, এখান থেকেই স্নাতক উত্তীর্ণ হন বেক্কারি।
প্রথম অভিযান
জীবনের প্রথম পর্বে তিনি বোর্নিওতে এক অভিযানে গিয়েছিলেন। জেনোয়াতে পরিচিত হওয়া তরুণ গিয়াকোমো ডোরিয়ার সঙ্গেই বোর্নিওর সারাওয়াকে পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা করেন বেক্কারি। ডোরিয়া বহুবার মেসোপটেমিয়া ভ্রমণ করেছিলেন। তার আগে ১৮৬৫ সালে এপ্রিল মাস পর্যন্ত লন্ডনে বেশ কিছুদিন থেকে কিউয়ের রয়্যাল বটানিক্যাল গার্ডেনের সংগ্রহগুলি দেখেন, চার্লস ডারউইন, জোসেফ হুকারদের সঙ্গে দেখা করেন। এমনকি সারাওয়াকের প্রথম রাজা জেমস ব্রুকের সঙ্গেও দেখা করেন।
১৮৬৫ সালের ১৯ জুন ডোরিয়ার সঙ্গে সারাওয়াকের রাজধানী কুচিং-এ পৌঁছান বেক্কারি। প্রথম দিকে এই অভিযানে তাঁর সঙ্গে ভাই জিওভানি বাতিস্তাও ছিলেন, পরে তিনি জাপানে চলে যান। আবার মাঝে ডোরিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তাঁকে ইতালিতে ফিরে যেতে হয়।
১৮৬৬ সালেই এই অভিযানে তিনি আবিষ্কার করেন সেই আজব উদ্ভিদ। থিসমিয়াসি গোত্রের উদ্ভিদ থিসমিয়াসি নেপচুনিস। নিজের নোটবুকে এই উদ্ভিদের ছবি এঁকে রেখেছিলেন তিনি। এই সময় তিনি কুচিং থেকে প্রায় ৮০ কিমি দূরে আজকের কুবাহ জাতীয় উদ্যানের মধ্যে একটি জঙ্গলে ছোট্ট কুঁড়েঘরে কাজ করতেন। সারাওয়াকের প্রত্যন্ত এলাকায় বেশ ঝুঁকি নিয়েই তিনি অভিযান চালিয়েছিলেন। পরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে দেশ ছাড়তে হয় এবং ১৮৬৮ সালের ২ মার্চ তিনি ইতালিতে পৌঁছান।
আজব উদ্ভিদ- Fairy Lantern
চলতি কথায় পরীর লণ্ঠন। বৈজ্ঞানিক নাম Thismia Neptunis। এটি একটি পরজীবী উদ্ভিদ যা আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানী ওডার্ডো বেক্কারি। এটি আদপে মাইক্রোহেটারোট্রফ নামে এক প্রকার পরজীবী যা মাটির ভিতরে মাইকোরাইজা ছত্রাকের উপরে পরজীবী হিসেবে বেঁচে থাকে। এতে কোনও পাতা, ক্লোরোফিল কিছুই থাকে না, ফলে একে আলাদা করে উদ্ভিদ বলে চেনাই যাবে না। তাহলে একে উদ্ভিদ বলা হচ্ছেই বা কেন? প্রশ্ন উঠবেই।


এই থিসমিয়া নেপচুনিসে এক ধরনের সামুদ্রিক অ্যানিমোনের মতো দেখতে ফুল হয়। ফুল ফোটার সময় ছাড়া বাকি সময়টা এটি মাটির নীচেই থাকে। এই কারণেই এদের খুঁজে পাওয়া এত কঠিন। আর ওডার্ডো জানিয়েছেন যে এই থিসমিয়া নেপচুনিস কেবলমাত্র সারাওয়াকের কাছে বোর্নিওর একটি ছোট্ট অঞ্চলেই জন্মায়। আশ্চর্যের কথা এই যে, ১৮৬৬ সালে এই পরজীবী উদ্ভিদের খোঁজ পেয়েছিলেন ওডার্ডো বেক্কারি, তার পরে ১৫১ বছর আর এই উদ্ভিদটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০১৮ সালে আবার কয়েকজন বিজ্ঞানী এই উদ্ভিদটি খুঁজে পান এর ফুল দেখে। জানা যাচ্ছে, এই ফুলের উপর কিছু মাছি উড়ে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। তা থেকে অনুমান করা হয়েছে, মাছির দ্বারাই ফুলের পরাগায়ন ঘটতে পারে।
অন্য বিজ্ঞানীদের মতে, এই থিসমিয়া নেপচুনিস (Thismia Neptunis) নিজে সালোকসংশ্লেষ করে না, মাটিতে থাকা অন্য ছত্রাক যারা কোনও উদ্ভিদের উপর বসে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে, এরা সেই ছত্রাকের উপর নির্ভরশীল থাকে। সারা বছর এটি মাটির নীচেই থাকে। তবে ফুল ফোটার সময় মাটির নীচ থেকে এরা একটি মাখন রঙের ডাঁটা বের করে দেয় যার আগায় কালচে কমলা রঙের একটি কন্দ থাকে। অনেকে একে ভিনগ্রহীদের ডিমের মতো দেখতে বলেও বর্ণনা দিয়েছেন। বেক্কারি এই উদ্ভিদের যে স্কেচ করেছিলেন তাতে এর উচ্চতা ছিল সাড়ে তিন ইঞ্চি।
চেক প্রজাতন্ত্রের পালাকি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক দল এই উদ্ভিদ পুনরায় আবিষ্কারের পরে ‘ফাইটোট্যাক্সা’ নামে একটি জার্নালে তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। ১৮৬৬ সালে বেক্কারি এটি আবিষ্কারের পরে বোর্নিও থেকে ফিরে নিজের খরচে ‘নুওভো জিয়োর্নালে বোতানিকা ইতালিয়ানো’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন, সেখানে অন্য খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাঁর নিজের গবেষণার ফলাফলও প্রকাশ করেছিলেন।
গবেষকদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, সারা বিশ্বে নেপচুনিস প্রজাতির ৫০টিরও কম উদ্ভিদ রয়েছে যা এটিকে চরম বিপন্ন উদ্ভিদের তালিকাভুক্ত করেছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা প্রায় এক শতাব্দী ধরে থিসমিয়া নেপচুনিসের সমগোত্রীয় থিসমিয়া আমেরিকানার সন্ধান করছেন শিকাগো অঞ্চলে। কিন্তু খোঁজ মেলেনি।
বেক্কারির অন্যান্য অভিযান
এরপরে ১৮৭১ সালে পক্ষীবিদ লুইজি ডি আলবার্টিসের সঙ্গে প্রায় অনাবিষ্কৃত নিউ গিনির উদ্দেশে রওনা দেন সমুদ্রযাত্রায়। পশ্চিম নিউ গিনি তখন ডাচদের দখলে ছিল, তাই তাদের থেকে আগে অনুমতি নিয়ে মানচিত্র সংগ্রহ করতে থামতে হয়েছিল জাকার্তায়। বেক্কারি সেই সময় পাংরাঙ্গো পর্বতেও চড়েছিলেন।
প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় এই নিউ গিনি অভিযানের প্রথম পর্ব চলেছিল। বেক্কারি এই সময় মোট ৭০০ প্রজাতির উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। ফেরার পথে কাই দ্বীপপুঞ্জের কাছে তিনি জাহাজডুবির শিকার হন, তবে তাঁর সংগৃহীত নমুনাগুলি অক্ষত ছিল। পরে ১৮৭৪ সাল নাগাদ তাঁর টাকা ফুরিয়ে এলে জেনোয়ার নগর পরিষদের থেকে অর্থসাহায্য পান বন্ধু ডোরিয়ার তৎপরতায়। ১৮৭৬ সালের মার্চ মাসে জাকার্তার দিকে রওনা দেন বেক্কারি, পরে জুন মাসে তিনি ফ্লোরেন্সে ফিরে আসেন।

ছবিঃ www.monaconatureencyclopedia.com

ছবিঃ www.instagram.com
এই অভিযানই শেষ নয়। পরে তৃতীয়বারের জন্য তিনি মালয়েশিয়া অভিযান করেন। এই সময় তিনি ভারত হয়ে কুচিং ও সিঙ্গাপুর পেরিয়ে প্রথমে অস্ট্রেলিয়া যান। পরে সেখান থেকে পশ্চিম সুমাত্রার সিঙ্গালাং পর্বতের আশপাশে গবেষণা করেন এবং ১০০০ উদ্ভিদ প্রজাতির সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন। এই সময়কালেই বেক্কারি র্যাফ্লেসিয়া ফুলের এক বিশেষ প্রজাতি অ্যামোরফোফ্যালাস টাইটানাম (Amorphophallus Titanum) আবিষ্কার করেন। এটিই ছিল বিশ্বের বৃহত্তম ফুল। বেক্কারি প্রথমে এর নাম দিয়েছিলেন কনোফ্যালাস। ওই বছরই সাপ্তাহিক গার্ডন ক্রনিকলে এই আশ্চর্য ফুলের ছবি (বেক্কারির আঁকা) প্রকাশিত হয়। এই ফুলটি মাত্র তিন দিনের জন্য ফুটতো। আর এতে পচা মাংসের মতো গন্ধ হতো। ফুলের পাঁপড়ির মাঝখান থেকে পুরুষের লিঙ্গের মতো একটা লম্বা অংশ উত্থিত হয়ে থাকতো।
ইতালিতে জীবনযাপন
১৮৭৮ সালে ফ্লোরেন্সে ফিরে এসে কয়েক দিনের জন্য বেক্কারি ফ্লোরেন্স বোটানিক গার্ডনের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাকি জীবন বেক্কারি ইতালিতেই কাটান। শেষ জীবনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্ভিদ, বিশেষত পাম গাছের উপরে বেশ কিছু বই ও প্রবন্ধ লেখেন। ফ্লোরেন্সের রয়্যাল মিউজিয়াম অফ ফিজিক্স অ্যান্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রির উদ্ভিদ সংগ্রহ এবং উদ্যানের পরিচালক ছিলেন। যদিও ১৮৭৯ সালেই তিনি এই পদ থেকে অব্যাহতি নেন।
পারিবারিক জীবন


ছবিঃ en.wikipedia.org
১৮৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে ওডার্ডো বেক্কারি নেল্লা গোরেত্তি দে ফ্লামিনিকে বিয়ে করেন। তাঁদের চার পুত্র ছিল- নেলো, দিনো, বাচ্চিও এবং রেনজো। নেলো বেক্কারি পরে একজন শারীরতত্ত্ববিদ হন। ফ্লোরেন্সের কাছে কাস্তেলো দি বিসার্নো নামে একটি ভিলায় থাকতেন।
বোর্নিওর সারাওয়াকের রানি মার্গারেট ব্রুক তাঁর সঙ্গে দেখা করে বোর্নিও অভিযান সম্পর্কে বই লিখতে অনুপ্রাণিত করেন। বইটি ১৯০২ সালে ‘নেলে ফোরেস্তে দি বোর্নিও’ নামে প্রকাশিত হয়। বেক্কারিই প্রথম কুমায়ুন উইন্ডমিল পাম (Trachycarpus takil) আবিষ্কার করেন। এটি বিশ্বের সবথেকে সহনশীল কাণ্ডযুক্ত তালগাছ বলে গণ্য হয়।
বেক্কারির উদ্ভিদবিদ্যার বেশ কিছু সংগ্রহ বর্তমানে ফ্লোরেন্সের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। তবে বেশিরভাগ সংগ্রহ রয়েছে ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেক্কারির কিছু ভ্রমণ-নোট পাওয়া যায় গালিলিও জাদুঘরে। ১৯২০ সালের ২৫ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে ফ্লোরেন্সে ওডার্ডো বেক্কারির মৃত্যু হয়।
তথ্যসূত্রঃ-

সীমন রায়
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্বর্ণপদক সহ প্রথম বিভাগে প্রথম স্থানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। অনুবাদমূলক নানা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া বিভিন্ন ওয়েবসাইটে কনটেন্ট লেখেন। বাংলা থিয়েটার ও নাট্যসাহিত্য চর্চায় নিযুক্ত। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার কাজে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে নিবন্ধ-সংবাদ এবং কিছু মেডিকেল- প্যারামেডিকেল কোর্সের বই ইত্যাদি অনুবাদ করে থাকেন।
