Life Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানই-পত্রিকা জুলাই-অক্টোবর ২০২৬ সংখ্যা

ব্লু জে পাখির আজব আচরণ

সেইরকমই উত্তর আমেরিকার বন,পার্ক এবং জনবসতির আশেপাশে দেখা যায় এক অন্য রকম পাখি ,যার নাম হলো ‘ব্লু জে’ (Blue Jay)। এদের গায়ের উজ্জ্বল নীল রঙ আমাদের চোখে প্রথম দেখাতেই আকর্ষণীয় লাগে। তবে গবেষকদের কাছে এই পাখিটি কেবল তার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়, বরং তারা তাদের অসাধারণ বুদ্ধির পরিচয়ে পরিচিত। এই লেখাটিতে যে আমরা কেবল ব্লু জে পাখির সাধারণ পরিচিতির কথা বলবো তাই না, বরং তাদের এমন কিছু ‘আজব’ ও বিস্ময়কর আচরণ নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের এই পাখিটির সম্পর্কে অন্যভাবে ভাবতে সাহায্য করে। তার সাথে আমরা আরো জানবো কীভাবে একটি ছোট পাখি তার আচরণের মাধ্যমে সমগ্র বনের উদ্ভিদ এবং কীটপতঙ্গের জীবনধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

কোনো প্রাণীর আচরণ বুঝতে হলে প্রথমেই তার শারীরিক গঠন এবং তার বিবর্তনের ইতিহাস জানা খুবই দরকার। ব্লু জে (যার বৈজ্ঞানিক নাম: Cyanocitta cristata) হলো করভিড (Corvid) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি অত্যন্ত চঞ্চল এবং মাঝারি আকৃতির পাখি। প্রাণীজগতে এই করভিড পরিবারটি অত্যন্ত পরিচিত, কারণ এই পরিবারের অন্য সদস্যরা হলো কাক (Crow) এবং র‍্যাভেন (Raven) যাদের পৃথিবীর অন্যতম বুদ্ধিমান পাখি হিসেবে মনে করা হয়। স্বভাবতই এই জিনগত বুদ্ধি ব্লু জে-এর মধ্যেও পুরোপুরি দেখা যায়। এদের শরীরের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৯ থেকে ১২ ইঞ্চি (প্রায় ২২ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার) হয়ে থাকে এবং ওজনে এরা প্রায় ৭০ থেকে ১০০ গ্রামের মতো হয়। এদের ডানার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ থেকে১৭ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।

ব্লু জে (Cyanocitta cristata) | ছবিঃ www.natureswaybirds.com

ব্লু জে পাখির দিকে দেখলে মনে হবে এদের পালকগুলো উজ্জ্বল নীল পিগমেন্টে ভরা। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান এবং জীববিজ্ঞানের গবেষণা আমাদের জানায় যে আসলে ব্লু জে পাখির পালকে কোনো ‘নীল রঞ্জক’ বা পিগমেন্ট নেই! আমরা যদি অন্য কোন রঙিন পাখির লাল বা হলুদ রঙের পালক নিয়ে হাত দিয়ে ঘষে দেখি, তবে সেই রঙ দেখতে পাব, কারণ তাদের কোষে রাসায়নিক রঞ্জক থাকে। কিন্তু ব্লু জে-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। এটি আসলে আলোর খেলা।

এদের পালকের ভেতরের কোষের গঠন অত্যন্ত জটিল। এই কোষগুলোর ওপর যখন সূর্যের আলো পড়ে, তখন তারা শুধু নীল আলোকে প্রতিফলিত এবং বিচ্ছুরিত (Scattering) করে এবং আলোর অন্যান্য দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙগুলোকে (যেমন লাল বা হলুদ) সম্পূর্ণ শুষে নেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় আলোর এই বিশেষ বিচ্ছুরণকে বলা হয় ‘টিন্ডাল স্ক্যাটারিং’ (Tyndall Scattering)।যদি একটি ব্লু জে-এর পালক ছিঁড়ে নিয়ে সেটিকে আলোর বিপরীত দিকে রেখে পেছন থেকে দেখি তবে লক্ষ্য করা যায় যে পালকটি আসলে ধূসর বা কালচে বাদামী রঙের দেখাচ্ছে! প্রকৃতি তার নিজস্ব আলো দিয়ে এত সুন্দর একটি রঙের ভ্রান্তি তৈরি করেছে।

ব্লু জে পাখিদের আজব আচরণের কথা বলতে গেলে যে বিষয়টি সবার আগে আসে, তা হলো তাদের অন্য প্রাণীর শব্দ হুবহু অনুকরণ করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। এরা কেবল অন্য সাধারণ পাখিদের ডাকই নকল করে না, বরং শিকারি পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং এমনকি মানুষের তৈরি কৃত্রিম শব্দও হুবহু নিজেদের গলা তে ফুটিয়ে তুলতে পারে। পাখিবিজ্ঞানীদের মতে, এদের এই নকল করার ক্ষমতার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশগত কারণ রয়েছে।

ব্লু জে-এর সবচেয়ে প্রিয় এবং পরিচিত কাজ হলো ‘রেড-শোল্ডারড হক’ (Red-shouldered Hawk) বা বাজপাখির জোরালো ডাক নকল করা। বনের মধ্যে যখন কোনো ব্লু জে যখন কোন বাদাম,সূর্যমুখী ,বা বীজ জাতীয় কোনো ফলের গাছ দেখে,তখন তারা সরাসরি সেই ফল খেতে শুরু করে না, তার আগে তারা বাজপাখির মত ডেকে ওঠে। এই ডাক শোনা মাত্রই আশেপাশে থাকা অন্যান্য ছোট পাখি, কাঠবিড়ালি কিংবা ইঁদুর ভয়ে নিজেদের খাবার ফেলে যে যার মতো লুকিয়ে পড়ে। আর এই সুযোগে ব্লু জে একা সেই ফল খেতে শুরু করে।

blue-jay-attacking-red-tailed-hawk
‘রেড-শোল্ডারড হক’ বা বাজপাখির ঘাড়ে চেপেছে ব্লু জে পাখি তার শিকার করা ইঁদুর খাবে বলে | ছবিঃ reddit.com

এদের এই মিমিক্রি বা অনুকরণ করার ক্ষমতা কেবল খাবারের জন্যই ব্যবহার করে না, বরং আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি তাদের এক বড় অস্ত্র। যদি কোনো শিকারি প্রাণী ব্লু জে-এর বাসার কাছে চলে আসে, যেখানে তাদের ডিম বা বাচ্চা থাকে, তখন ব্লু জে দলবদ্ধভাবে বা একা বাজপাখির মত ডাকতে থাকে। এর ফলে সেই প্রাণীটি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং ভাবে যে আশেপাশে হয়তো বড় কোনো শিকারি পাখি আছে যা তাকে আক্রমণ করতে পারে। এই ভয়ের কারণে অনেক সময়ই সেই প্রাণীরা তাদের শিকার ছেড়ে পালিয়ে যায়। বিভিন্ন অবস্থায় ব্লু জে-কে মানুষের শিস, বিড়ালের ‘মিউ’ শব্দ কিংবা বাগানের জলের কলের শব্দও নকল করতে দেখা গেছে, যা তাদের অন্যরকম শোনার ক্ষমতা এবং গলার পরিচয় দেয়।

ব্লু জে-এর আচরণের মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত হলো ‘অ্যান্টিং’। গ্রীষ্ম বা শরৎকালে ব্লু জে পাখিটিকে মাঝে মাঝে অদ্ভুত কিছু কাজ করতে দেখা যায়। তারা হঠাৎ করে একটি পিঁপড়ের ঢিবির ওপর নিজের পুরো শরীর ও ডানা ছড়িয়ে বসে পড়ে। এরপর সে তার শক্ত ঠোঁট দিয়ে একেকটি জ্যান্ত পিঁপড়ে তুলে নেয় এবং খুব সাবধানে সেই পিঁপড়েগুলোকে নিজের পালকের গোড়ায়, ডানার নিচে এবং পেটের পালকে ঘষতে থাকে।

অ্যান্টিং (Anting) হলো অনেক প্রজাতির পাখির মধ্যে দেখা যাওয়া একটি আকর্ষণীয় এবং কিছুটা রহস্যময় আচরণ। ভিডিওতে দেখা ব্লু জে (Blue Jay)-এর মতো পাখিরাও এ ধরনের আচরণ করে। এতে পাখিরা একটি বিশেষ উপায়ে পিঁপড়া ব্যবহার করে।
অ্যান্টিং প্রধানত দুই ধরনের—
সক্রিয় অ্যান্টিং (Active anting): পাখি তার ঠোঁট দিয়ে পিঁপড়া তুলে নিয়ে পালকের গায়ে ঘষে।
নিষ্ক্রিয় অ্যান্টিং (Passive anting): পাখি এমন জায়গায় বসে বা শুয়ে থাকে যেখানে পিঁপড়া রয়েছে এবং পিঁপড়াগুলোকে তার পালকের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে দেয়।
ছবিঃ গুগুল

প্রথম দিকে সাধারণ মানুষ বা গবেষকরা ভাবতেন, এটি হয়তো পাখিদের এক ধরণের রোগ বা কোনো খেলা। কিন্তু আধুনিক প্রাণী বিজ্ঞানীরা তাদের এই আচরণের পেছনে এক গভীর বিবর্তনের খোঁজ পেয়েছেন।

এটি তারা প্রাকৃতিক প্রসাধন ও ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করে।পিঁপড়েরা যখন নিজেদের রক্ষার জন্য উত্তেজিত হয়, তখন তাদের শরীর থেকে এক ধরণের অ্যাসিড নিঃসৃত হয়, যাকে বলা হয় ‘ফর্মিক অ্যাসিড’ (Formic Acid)। পিঁপড়েগুলোকে পালকের ভাঁজে ঘষার ফলে নিঃসৃত এই ফর্মিক অ্যাসিড পাখির শরীরের ভেতর লুকিয়ে থাকা ক্ষতিকর পরজীবী, উকুন, মাইট এবং বিভিন্ন ধরণের ছত্রাক (Fungus) খুব অল্প সময়ের মধ্যে নষ্ট করে দেয়। এটি পাখিদের জন্য এক প্রাকৃতিক কীটনাশক বা অ্যান্টিসেপটিক ট্রিটমেন্ট হিসাবে কাজ করে, যা তাদের পালকের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং নতুন পালক গজাতে সাহায্য করে।

শুধু তাই নয়, যখন পিঁপড়েটি তার শরীরের সমস্ত অ্যাসিড পাখির পালকে ঢেলে দেয়, তখন ব্লু জে সেই পিঁপড়েটিকে অনায়াসে গিলে খেয়ে ফেলে।কারণ তখন আর পিঁপড়েটি খেতে টক বা তেতো লাগে না। একই সাথে নিজের শরীরের যত্ন এবং খাওয়া শেষ করার এই কৌশল সত্যিই অবাক করার মতো ঘটনা।

প্রাণীজগতে মানুষের বাইরে খুব কম প্রাণীই আছে যারা নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে হাতিয়ার (Tools) ব্যবহার করতে পারে। শিম্পাঞ্জি, ওরাংওটাং বা কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির ডলফিনের মধ্যে এই ক্ষমতা দেখা গেলেও পাখিদের মধ্যে এটি অত্যন্ত বিরল। তবে করভিড পরিবারের সদস্য হিসেবে ব্লু জে এই ক্ষেত্রে এক অনন্য ব্যতিক্রম দেখা যায়।

আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী খাঁচায় বন্দি ব্লু জে পাখিদের ওপর একটি বুদ্ধির পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তারা একটি ব্লু জে-এর খাঁচার বাইরে, ঠিক ঠোঁটের নাগালের সামান্য দূরে কিছু খাবার রেখে দেন। কিছুক্ষণ পর, ব্লু জে-টি এক অদ্ভুত কাণ্ড করল। খাঁচার নিচে বিছিয়ে রাখা খবরের কাগজের একটি টুকরো সে তার ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে নিল। এরপর সেই কাগজের টুকরোটিকে নিজের পায়ের নিচে চেপে ধরে ঠোঁট দিয়ে মুচড়ে একটি শক্ত লাঠির মতো তৈরি করে নিল। সেই কাগজের তৈরি লাঠিটি খাঁচার বাইরে বাড়িয়ে দিয়ে সে অত্যন্ত সহজে খাবারটি টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল এবং খেয়ে ফেলল।

এই আচরণটি প্রমাণ করে যে ব্লু জে কেবল পরিস্থিতি বুঝে কাজ করে না, বরং তারা কোনো সমস্যা সমাধান করার জন্য আগে থেকে পরিকল্পনা করতে পারে এবং চারপাশের সাধারণ জিনিসকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে পারে। তাদের এই উচ্চ আইকিউ (IQ) তাদের পাখি জগতের অন্যতম বুদ্ধিমান জীবে পরিণত করেছে।

ব্লু জে পাখিরা ভবিষ্যতের জন্য এক দারুন সঞ্চয়কারী হিসাবে পরিচিত। বিশেষ করে শরৎকাল যখন আসে, তখন বনের সমস্ত ওক গাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে ওক ফল মাটিতে পড়তে শুরু করে। এই সময় ব্লু জে পাখিদের মধ্যে এক ধরণের কর্মব্যস্ততা দেখা যায়। তারা শীতকালের কথা ভেবে এই ফলগুলো সঞ্চয় করতে শুরু করে।

একটি ওক ফল আকারে বেশ বড় হয়, যা সাধারণ পাখির পক্ষে একসাথে একাধিক বয়ে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ব্লু জে-এর গলার নিচে একটি বিশেষ থলি থাকে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘গুলার পাউচ’ (Gular Pouch)। এই থলিটি প্রয়োজন মত ছোট বড় হয়। একটি ব্লু জে তার এই থলির ভেতর একসাথে ৩ থেকে ৫টি ওক ফল ঢুকিয়ে নিতে পারে এবং ঠোঁটের ডগায় আরও একটি ফল চেপে ধরে উড়ে যেতে পারে।

তারা এই ফলগুলো নিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো করে রাখে না, বরং বনের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট গর্ত খুঁড়ে একেকটি ফল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লুকিয়ে রাখে। মাটি দিয়ে গর্তটি ভরাট করার পর তারা ওপর থেকে একটি শুকনো পাতা বা ছোট পাথর দিয়ে ঢেকে দেয় যাতে অন্য কোন প্রাণী তা দেখতে না পায়। এক এক মরসুমে একটি ব্লু জে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ ওক ফল মাটির নিচে পুঁতে রাখতে পারে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, তাদের এই হাজার হাজার লুকিয়ে রাখা ফলের অবস্থান তারা মাসের পর মাস মনে রাখতে পারে। শীতকালে যখন চারপাশ বরফে ঢেকে যায়, তখন তারা বরফ খুঁড়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গা থেকে তাদের জমানো খাবার বের করে আনে। তবে প্রকৃতির নিয়মে,ব্লু জে তার পুঁতে রাখা সমস্ত ফলের জায়গা শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে পারে না বা সব খাবার তাদের খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ফল মাটির নিচেই থেকে যায়।

বসন্তকাল এলে মাটির নিচে রয়ে যাওয়া সেই ওক ফলগুলো থেকে অঙ্কুরোদগম হয় এবং ধীরে ধীরে তা বিশাল বিশাল ওক গাছে পরিণত হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, উত্তর আমেরিকার ওক বনাঞ্চল শতাব্দী ধরে টিকে থাকার এবং নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পেছনে প্রধান অবদান এই ব্লু জে পাখিদের ‘ভুলে যাওয়া’ স্বভাবের। তারা নিজের অজান্তেই প্রকৃতির বুকে হাজার হাজার গাছ রোপণ করে চলেছে, যা বনভূমির ভারসাম্য রক্ষা করছে।

ব্লু জে পাখিরা সমাজবদ্ধ জীব। তারা সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে না এবং তাদের নিজস্ব দলের প্রতি গভীর আনুগত্য থাকে। এদের পারস্পরিক যোগাযোগের ভাষা রয়েছে। এদের মাথার ওপর যে পালকের ঝুঁটি বা ‘ক্রেস্ট’ (Crest) থাকে, তা কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তা হলো তাদের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। যখন একটি ব্লু জে তার পরিবারের সাথে খুব শান্ত মেজাজে থাকে বা খাবার খায়, তখন ঝুঁটিটি মাথার সাথে একদম লেগে থাকে। কিন্তু যখনই সে কোনো বিপদ, ভয় বা রাগের মুখোমুখি হয়, তখন ঝুঁটিটি ঝাড়ুর মতো একদম খাড়া হয়ে যায়। দূর থেকে অন্য পাখিরা এই ঝুঁটি দেখেই বুঝে নেয় যে অন্য পাখিটি বিপদে আছে।

বিপদ, ভয় বা রাগের মুখোমুখি হয়ে ঝুঁটিটি ঝাড়ুর মতো খাড়া হয়ে গেছে | ছবিঃ reddit.com

ব্লু জে পাখিদের সাহসিকতা এবং একতার এক আজব রূপ দেখা যায় যখন তাদের এলাকায় কোনো বড় শিকারি জাতীয় প্রাণী পেঁচা, বাজপাখি বা সাপ ইত্যাদি ঢুকে পড়ে,ব্লু জে আকারে ছোট হলেও তাদের এলাকার প্রতি তাদেরঅধিকার অত্যন্ত বেশি হয়। কোনো শিকারিকে দেখা মাত্রই প্রথম যে ব্লু জে-টি তাকে লক্ষ্য করে, সে এক বিশেষ ধরণের উচ্চ কম্পাঙ্কের চিৎকার করতে থাকে। এই নির্দিষ্ট চিৎকার শোনা মাত্রই বনের সমস্ত প্রান্ত থেকে শত শত ব্লু জে উড়ে এসে সেই শিকারি পাখিটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে।

এরপর তারা সবাই মিলে একসাথে ডানা ঝাপটাতে থাকে এবং কর্কশ শব্দে চিৎকার করতে থাকে। কখনও কখনও তারা উপর থেকে ডাইভ মেরে শিকারির গায়ে আঘাতও করে। এই সম্মিলিত মনস্তাত্ত্বিক ও আক্রমণকে প্রাণীবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘মবিং’ (Mobbing)। এই আক্রমণের তীব্রতা এত বেশি থাকে যে, ঈগল বা পেঁচার মতো বড় শিকারিরাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ছোট হয়েও যে একতার শক্তিতে বিশাল শত্রুকে হারিয়ে দেওয়া যায় , ব্লু জে তার এক চমৎকার উদাহরণ।

শহরায়ন এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে যেখানে পৃথিবীর বহু প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির পথে, সেখানে ব্লু জে মানুষের তৈরি পরিবেশের সাথে অত্যন্ত চমৎকারভাবে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এরা অত্যন্ত কৌতূহলী প্রকৃতির পাখি। মানুষের বাড়ির উঠোনে বা বাগানে যদি কেউ বার্ড ফিডার (Bird Feeder) বা পাখিদের জন্য খাবার পাত্র রাখে, তবে ব্লু জে সেখানে খুব দ্রুত চলে আসে।

ব্লু জে-এর আরেকটি আজব স্বভাব হলো উজ্জ্বল ও চকচকে বস্তুর প্রতি তাদের তীব্র আকর্ষণ। মানুষের ফেলে দেওয়া কাঁচের টুকরো, ধাতব চাবির রিং, অ্যালুমিনিয়ামের ফয়েল বা ছোটখাটো গয়না দেখলে এরা ঠোঁটে করে তুলে নিয়ে নিজেদের বাসায় লুকিয়ে রাখে। মজা করে এদের ‘পাখি সমাজের চোর’ বলা হলেও, আসলে এটি তাদের কৌতূহল এবং নিজেদের বাসাকে আকর্ষণীয় করার একটি সহজাত প্রবৃত্তি মাত্র।

প্রজনন ঋতুতে এদের পারিবারিক বন্ধন আরও শক্ত হয়। পুরুষ এবং স্ত্রী ব্লু জে সাধারণত সারাজীবনের জন্য একে অপরের সঙ্গী হিসেবে জুটি বাঁধে। বাসা তৈরির সময় পুরুষ পাখিটি পরিশ্রম করে শক্ত ডালপালা, কাদা এবং শ্যাওলা সংগ্রহ করে এনে দেয়, আর স্ত্রী পাখিটি তা দিয়ে মজবুত বাসা তৈরি করে। ডিম ফুটে ছানা বের হওয়ার পর বাবা এবং মা দুজনেই সমানভাবে সন্তানদের খাবার খাওয়ানো এবং শিকারিদের হাত থেকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে।

একটি ব্লু জে পাখির সমগ্র জীবন, খাদ্যভ্যাস এবং আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, প্রকৃতিতে কোনো প্রাণী র আচরণ অর্থহীন নয়। ব্লু জে যখন ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ এবং শুঁয়োপোকা খেয়ে বেঁচে থাকে, তখন সে পরোক্ষভাবে কৃষিকাজে ও বনাঞ্চল রক্ষায় সাহায্য করে। আবার যখন সে মাটির নিচে বীজ লুকিয়ে রাখছে, তখন সে ভবিষ্যতের সবুজ বন তৈরি করছে। এমনকি পিঁপড়ের সাথে তার ‘অ্যান্টিং’ আচরণও অনেক বছরের বিবর্তনের ফলাফল।

এর থেকে এটাই বলা যায় প্রকৃতিকে কেবল দূর থেকে দেখলেই চলে না, তাকে গভীরভাবে দেখতে হয়। একটি ব্লু জে-এর নীল ডানার ঝাপটানি কিংবা তার কর্কশ ডাকের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের টিকে থাকার লড়াই, বুদ্ধির বিবর্তন এবং পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখার এক কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন এবং নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে আজ এই সুন্দর পাখিদের চারণভূমি কমে আসছে। নিজেদের স্বার্থেই, এই পৃথিবীর বুকে ব্লু জে-এর মতো প্রতিটি অদ্ভুত প্রাণীটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

তথ্যসূত্রঃ-

রীয়া অধিকারী চট্টোপাধ্যায়

বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে বায়োলজিক্যাল সাইন্সে বিএসসি, রবীন্দ্র ভারতী ইউনিভার্সিটি থেকেএনভারমেন্টাল স্টাডিজ মাস্টার ডিগ্রী।