যারা বাতাসে ভেসে বেড়ায়

আমরা সবাই জানি পাখি তার ডানার সাহায্যে আকাশে ওড়ে। এই ডানাই পাখিকে খুশিমতো বাতাস কেটে যে কোন উচ্চতায় উঠতে সহায়তা করে আর পাখি খাবার অন্বেষণে চারপাশে উড়ে বেড়াতে পারে। শকুন, চিল, ঈগল আর বাজপাখি আকাশে খুব উঁচুতে উড়তে পারে এবং যেকোনো সময়ে নিচে শিকার দেখলে দ্রুতগতিতে নেমে এসে ছোঁ মেরে তা তুলে নিয়ে যায়। কিছু পাখির ডানার শক্তি খুব বেশি, আর তাই তারা বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে, যেমন অ্যালবেট্রস পাখি একটানা পনেরো হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে। প্রতি বছর শীতের শুরুতে তিব্বতের মালভূমি থেকে হাসের ঝাঁক হিমালয় পর্বত পেড়িয়ে ভারতবর্ষের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চলে চলে আসে। কোলকাতার চিড়িয়াখানায় শীতের মরসুমে এই পাখিদের দেখা যায়। এই আসা যাওয়া শুধুমাত্র তাদের পাখনার অসীম শক্তির জন্য সম্ভব হয়। পাখনাহীন উটপাখি আর কিউই পাখি উড়তে পারে না যদিও তারা পাখির মত ডিম পারে। আজ আমরা কয়েকটি জীবজন্তুর সাথে পরিচিত হবো যারা পাখির মতই বাতাসে উড়তে পারে, অন্তত অল্পক্ষণের জন্য এইসব প্রাণী বাতাসে উড্ডীয়মান হয়।
উড়ন্ত বাঁদর
প্রথমে আমরা জানবো যারা গাছে গাছে ঘুরে বেড়ায় এমন দুটি জন্তু, বাঁদর আর কাঠবিড়ালি। বাঁদর স্বভাবতই পাখির চেয়ে ওজনে ভারী, আর সেই কারণে এই জন্তুর বাতাসে উড়ে বেড়াবার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। কয়েকটি কম ওজনের ছোট বাঁদর যেমন স্পাইডার (spider) মাঙ্কি আর কলোবাস (Colobus) মাঙ্কি এক গাছ থেকে আর এক গাছের ডালে যাবার সময় কয়েক মিনিট হাওয়ায় ভেসে থাকে পারে যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় গ্লাইড (glide) করা বলে। কলোবাস বাঁদর এভাবে প্রায় ২০০ ফুট উড়তে সক্ষম, এমন কি অনেক সময় অন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য তারা বাতাসে এদিক ওদিক “উড়ে” নিজেদের আত্মরক্ষা করে।

ছবিঃ www.discovery.com

ছবিঃ vocal.media
স্পাইডার মাঙ্কি (চিত্র ১) গুয়াতেমালা, কোস্টা রিকা, ব্রাজিল, এবং কলোম্বিয়ার জঙ্গলে বাস করে। এদের লেজ ও হাত পা অপেক্ষকৃত লম্বা। অনেক সময় এরা শুধু লেজের সাহায্যে গাছের ডাল থেকে ঝুলে থাকে। এরা ফলাহারী আর দল বেঁধে বাস করে। এই বাঁদরেরা তাদের শরীরের দুধারে হাত আর পেটের সন্ধিস্থানের পাতলা চামড়া প্রয়োজন মত সম্প্রসারিত করে বাতাসে গ্লাইড করতে সক্ষম হয়। এই সাময়িক প্রসারণ শরীরের এলাকা বাড়িয়ে দিয়ে এদের বাতাসে ভেসে থাকার ক্ষমতা বাড়ায়।

ছবিঃ facebook.com

কলোবাস (Colobus) বাঁদর (চিত্র ২) আফ্রিকার জঙ্গলে বাস করে। লম্বা লেজ ও হাতপার সাহায্যে এরা গাছের ওপরেরই চলাফেরা করে এবং কদাচিৎ মাটিতে নামে। গাছের পাতা আর ফলমূল এই বাঁদরের খাদ্য। হাত ও পেটের সন্ধিস্থানের পাতলা চামড়া সম্প্রসারণ করে এরাও খানিকক্ষণ বাতাসে ভেসে থাকে পারে।


এছাড়া Flying Lemur বা কলুগোস (Colugos) (চিত্র ৩) নামে এক ধরনের ছোটো লেমুর বাতাসে কয়েক মিনিট গ্লাইড করে থাকতে পারে। এরা ঠিক বাঁদর গোষ্ঠীর অন্তর্গত নয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জঙ্গলে এই লেমুর দেখতে পাওয়া যায়। সাইজে ছোট লোমশ কলুগোসের চোখ গাড় লাল, আর এদের চেহারার সাথে কাঠবিড়ালির খুব মিল আছে। এই নিশাচর লেমুর বাতাসে প্রায় ২০০ ফুট ভেসে যেতে পারে।
উড়ন্ত কাঠবিড়ালি


এবার কাঠবিড়ালির কথায় আসা যাক। উড়ন্ত কাঠবিড়ালি দেখতে অনেকটা বাদুরের মতন। হাতের কব্জি থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত টানা এক পাতলা চামড়ার পর্দা বা পাটাজিয়াম (Patagium) (চিত্র ৪) এই জীবকে ভালভাবে উড়তে সাহায্য করে। এরা নিশাচর আর বেশির ভাগ সময় গাছেই বাস করে। পোকামাকড় থেকে শুরু করে ইঁদুর, ফলপাকুড় থেকে গাছের বীজ সবই এই কাঠবিড়ালির খাদ্য। উত্তর আমেরিকা, কানাডা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশ আর উত্তর ইউরোপের দেশে উড়ন্ত কাঠবিড়ালি দেখতে পাওয়া যায়। উড়ন্ত কাঠবিড়ালি ৩০০ ফুট দূরত্ব সহজেই গ্লাইড করে যেতে পারে আর জোরাল চোখের দৃষ্টির কারণে অন্ধকারে উড়ে বেড়াতে এদের কোন অসুবিধা হয় না। প্যাঁচা আর সাপ এদের বড় শত্রু।
উড়ন্ত মাছ

সামুদ্রিক মাছেদের মধ্যে এক ধরনের মাছ তাদের বক্ষ অঞ্চলের পাতলা ডানার সাহায্যে জলের ওপরে উঠে গ্লাইড করতে পারে। জলের মধ্যে এই মাছের গতি দ্রুত আর এরা জল থেকে লাফিয়ে উঠে জলের ওপর দিয়ে অনায়াসে ছয় সাতশ ফুট গ্লাইড করে। বেশির ভাগ সময় আক্রমণকারীকে এড়াবার জন্য এই মাছ ৪৫ সেকেন্ড পর্যন্ত জল ছেড়ে ওপরে চলে আসে।
উড়ন্ত সাপ


মাছের পর আমরা যাব সাপের দেশে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার (থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কাম্বোডিয়া ও মিয়ানমার) বৃষ্টিবহুল জঙ্গলে প্যারাডাইজ উড়ন্ত সাপ (Paradise flying snake বা Chrysopelea paradisi) দেখতে পাওয়া যায়। এই বিশেষ সাপ উড়তে পারে। এই সাপটি তার পাঁজরা দুপাশে প্রশস্ত করে নিজের শরীর এক পাতলা পাতের (strip) মত করে নিয়ে (চিত্র ৬) বাতাসে ১০০ থেকে ৩০০ ফুট পর্যন্ত ভেসে চলে যায়। সরীসৃপ প্রাণীরা যদিও জমির ওপর দিয়ে বুকে হেঁটে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যায়, এই সাপ গাছের এক উঁচু ডাল থেকে আর এক ডালে অনায়াসেই “উড়ে” যায়।
উড়ন্ত মাকড়সা
এখন পর্যন্ত আমরা যেসব প্রাণীর ওড়ার ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করলাম তারা শরীরের গঠন সাময়িক ভাবে রদবদল করে নিয়ে কিছুক্ষণ হাওয়ায় ভেসে থাকতে পারে। পাখিদের তুলনায় এদের ওড়ার ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু সব শেষে আমরা আসব উড়ন্ত মাকড়সার কথায়।


মাকড়সার ওজন খুব কম আর সে সিল্ক সুতো তৈরি করতে পারে। এই দুই মিলিয়ে কিছু মাকড়সা এক বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষমতা পেয়েছে। যেমন গালাপাগোস দ্বীপের জোরো (Joro) মাকড়সা পাখনার বদলে এক অভিনব উপায়ে উড়তে সক্ষম হয়। সিল্ক তৈরির গ্রন্থি থেকে যেই সুতো বার হয় তা নেগেটিভ তড়িৎগ্রস্থ। পৃথিবীর নিজস্ব নেগেটিভ বৈদ্যুতিক রেখাকে এই সুতো প্রতিহত করে। এই প্রতিহত করার ধর্মটি কাজে লাগিয়ে জোরো মাকড়সা পৃথিবীর বৈদ্যুতিক লাইন ধরে “উড়ে” বেড়ায়।
এই অভিনব উপায়ে জোরো মাকড়সা সমুদ্র পেরিয়ে ভিন্ন দেশেও পৌঁছে যায়। বলা যেতে পারে যে মাকড়সা নিজেকে সিল্ক সুতোয় বাঁধা ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়ে বেড়ায়। অনেক সময় এই সিল্ক সুতো হাওয়াতেও উড়ে অন্যান্য মাকড়সাকে অনেক দূর নিয়ে যায়। এই কারণে মাকড়সারা নতুন অঞ্চলে প্রায়শই বাসা বদল করতে পারে। তবে গালাপাগোস দ্বীপের জোরো মাকড়সার পৃথিবীর নিজস্ব বৈদ্যুতিক ধর্মকে কাজে লাগিয়ে উড়ে বেড়াবার পদ্ধতি প্রাণিজগতের এক বিস্ময়কর উদাহরণ।
উপসংহার
কোনো প্রাণীর ওড়ার ক্ষমতা তখনি সম্ভব যখন শরীরের ওজনের তুলনায় তার পাখার বিস্তার অনেক বেশি। পাখির পাখনা শুধু আকারেই প্রশস্ত নয়, সেই পাখনার হাড় ফাঁপা যাতে পাখনা হাল্কা থাকে। ঈগল বা শকুনির ওজন একটু বেশি আর তাই তাদের পাখার বিস্তার বিশাল। স্বভাবতই জন্তু জানোয়ারদের মধ্যে এমন সংমিশ্রণ খুবই কম। ছোট কাঠবিড়ালি তার পাটাজিয়ামের সাহায্যে বাতাসে ক্ষণিকের জন্য ভেসে থাকতে পারে, আর প্যারাডাইজ সাপ তার পাঁজরা সাময়িক ভাবে দুপাশে প্রসার করে শরীর পাতলা পাতের মত করে স্বল্প সময়ের জন্য বাতাসে উড়তে সক্ষম হয়। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই তাদের ওড়ার ক্ষমতা পাখিদের মত উঁচু মানের নয়। তবে আজকের এই গল্পে আমরা জানলাম যে কয়েকটি বিশেষ প্রাণী স্বল্প সময়ের জন্য হলেও বাতাসে ওড়ার ক্ষমতা রাখে।

প্রদীপ মাশ্চরক
ওয়েস্টমুর ড্রাইভ, সান্তা ক্রুজ, ক্যালিফোর্নিয়া ৯৫০৬০, যুক্তরাষ্ট্র
