ওরাংওটান-এর বিচিত্র স্বভাব

গহিন বনের উঁচুতে, একদম মগডালে ঝুলে আছে লালচে-বাদামি রঙের একটা মস্ত বড় প্রাণী! কি, ভাবছো ওটা কোনো রাক্ষস? আরে না না, ও তো আমাদের বনের মিষ্টি বন্ধু ওরাংওটান! এদের লম্বা দুটো হাত দেখলে মনে হবে যেন লম্বা দুটো দড়ি ঝুলছে! মাটিতে হাঁটার চেয়ে গাছের ডালে সুপারম্যানের মতো ঝুলে থাকাটাই এদের বেশি পছন্দ। শুধু তা-ই নয়, এই বুদ্ধিমান প্রাণীরা গাছের পাতা দিয়ে নিজেদের জন্য সুন্দর ছাতাও বানিয়ে নেয়, আবার প্রতি রাতে ঘুমানোর জন্য নতুন নরম বিছানাও তৈরি করে! চল, আজ আমরা এই গাছে থাকা ঝাকড়া চুলের মজার বন্ধুর অদ্ভুত আর মজার সব কাণ্ডকারখানার কথা জেনে নিই!
দৈহিক গঠন ও স্বভাবঃ
ওরাংওটানের অদ্ভুত শরীরের দিকে তাকালে তোমাদের হাসি পেয়ে যাবে! মনে হবে যেন একটা লালচে-কমলা রঙের তুলতুলে পুতুল লম্বা দুটো হাত বাড়িয়ে তোমার সঙ্গে কোলাকুলি করতে আসছে। কিন্তু জানো কি, এই মজার চেহারার পেছনেই লুকিয়ে আছে বনের মগডালে রাজত্ব করার সুপারপাওয়ার? ওদের হাত দুটো এতই লম্বা যে, সোজা হয়ে দাঁড়ালেও হাত দুটো পায়ের পাতা ছুঁয়ে ফেলে। ভাবো তো, একবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের আঙুল ছোঁয়া আমাদের পক্ষে কত কঠিন, আর ওদের হাত অমনিতেই মেঝেতে ঠেকে যায়!
এই লম্বা হাত দুটো দিয়ে ওরা বার ক্লাইম্বারের মতো এক ডাল থেকে অন্য ডালে হুশ-হাস দোল খেয়ে চলে। আমরা পা দিয়ে কি কোনো কিছু শক্ত করে ধরতে পারি? একদম না! কিন্তু ওরাংওটানের পা দুটো দেখতে আর কাজ করতে একদম হাতের মতো। তাই এক হাত দিয়ে পাকা ফল খেতে খেতেই পা দিয়ে গাছের ডাল আঁকড়ে ঝুলে থাকা ওদের কাছে কোনো ব্যাপারই না! গায়ে থাকা ঘন লাল-কমলা রঙের সুন্দর পশমগুলো শুধু ফ্যাশনের জন্য নয়। বনে যখনই মুষলধারায় বৃষ্টি নামে তখন ওদের গা’য়ের পশমগুলো রেইনকোটের মতো কাজ করে ওদের একদম শুকনো রাখে।
গাছের ডালে ডালে সারাদিনের কাণ্ডকারখানাঃ
ভাবো তো একবার, যদি তোমাকে সারাদিন গাছের উঁচু মগডালে থাকতে বলা হতো তোমার কি ভালো লাগতো? নিশ্চয়ই না। কিন্তু এই কাজটাই প্রতিদিন আনন্দের সঙ্গে করে লালচে পশম গায়ে ওরাংওটানেরা। বিশ্বের বড় বড় প্রাণীদের মধ্যে এরাই একমাত্র প্রাণী, যারা দিনের প্রায় পুরোটাই মাটি না ছুঁয়ে গাছের ডালে ডালে কাটিয়ে দেয়। সকাল হতেই যখন মিষ্টি রোদ ওঠে, ওরা গাছের উঁচুতে দাঁড়িয়ে আলসেমি ভেঙে লম্বা দুই হাত মেলে ডাল ধরে দোল খেতে শুরু করে।

সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুরের হালকা ঘুম, সবকিছুই কিন্তু ঘটে এই মগডালের ওপর! ডাল থেকে ডালে হেঁটে হেঁটে ওরা মিষ্টি ফল আর কচি পাতা খুঁজে খুঁজে খায়। সারাদিন উঁচুতে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মাটিতে থাকা বাঘ বা অন্য কোনো শিকারি প্রাণীর ভয় একদম থাকে না। যেন আকাশের কাছাকাছি এক নিজস্ব নিরাপদ দুর্গ! এমনকী যখন ভীষণ খিদে পায় বা তৃষ্ণা পায়, ওরা কিন্তু নিচে নেমে জল খেতে যায় না; গাছের কোটরে জমে থাকা বৃষ্টির জল পা দিয়ে চামচের মতো তুলে চটপট খেয়ে নেয়।
দুপুরবেলা কড়া রোদ উঠলে লম্বা ডাল আর পাতা দিয়ে মাথার ওপর চট করে ছাতাও বানিয়ে ফেলে। রোদ, বৃষ্টি আর ঝড়ের মধ্যেও ওরা গাছের মগডাল ছেড়ে নামতেই চায় না। মা ওরাংওটানেরা তো তাদের পুঁচকে ছানাদের পেটের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে গাছের দুটো ডাল ধরে দোল খায়, যেন কোনো রোলার কোস্টার রাইড চলছে!
সারাদিনের খেলাধুলা আর খাওয়া-দাওয়া শেষে যখন রাত নেমে আসে, তখনো ওরা নিচে নামে না; ডালে বসেই ঘুম সেরে নেয়। সোজা কথায়, মাটির ছোঁয়া না নিয়ে আকাশের কাছাকাছি মগডালে ডানা ছাড়া পাখির মতো রাজত্ব করাই হলো ওরাংওটানদের আসল আনন্দ!
খাবার খোঁজার বৈচিত্রঃ
পেটে খিদে পেলেই আমরা সোজা ডাইনিং টেবিলে বা ফ্রিজের সামনে ছুটি, তাই না? কিন্তু আমাদের বুদ্ধিমান বন্ধু ওরাংওটানের খাবার খোঁজার স্টাইলটা একদম আলাদা আর ভীষণ মজার! বনের মগডালই হলো ওদের বিশাল এক বুফে রেস্তোরাঁ, আর সারাদিনের প্রধান কাজই হলো সেই রেস্তোরাঁ থেকে সবচেয়ে সুস্বাদু খাবারটা খুঁজে বের করা। ওদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হলো রসালো পাকা ফল! বিশেষ করে ডুমুর, আম, আর বিশ্রি গন্ধযুক্ত কিন্তু দারুণ মিষ্টি দুরিয়ান ফল পেলে তো ওদের খুশির আর সীমাই থাকে না।
ফল খোঁজার জন্য ওরা বনের কোথায় কোন গাছে কখন পাকা ফল পাওয়া যাবে, তার একটা ম্যাপ নিজেদের মাথায় লুকিয়ে রাখে! যেন ওদের মাথার ভেতর জিপিএস বসানো আছে। তবে শুধু ফল খেয়ে কি আর মন ভরে? তাই মাঝে মাঝে মুখরোচক খাবার হিসেবে গাছের কচি পাতা, ফুল, গাছের বাকল, এমনকী সুস্বাদু মধুও চটপট চেটেপুটে খেয়ে নেয়! কোনো ফলের খোসা যদি বেশি শক্ত হয়, ওরা হাত দিয়ে না পেরে শক্ত দাঁত দিয়ে কড়মড় করে ভেঙে ফেলে। আবার কখনো কখনো কাঠি দিয়ে ফলের ছাল ছাড়িয়ে ভেতরের খাবারটা বের করে আনে। আর মিষ্টি মধু খাওয়ার জন্য তো ওরা পাতা বা কাঠি দিয়েই বানিয়ে ফেলে খুদে চামচ! সারাদিন গাছে গাছে ঘুরে ঘুরে এমন মজার সব খাবার খেতেই ওদের যত আনন্দ।
বাসা তৈরির কৌশলঃ
আমরা যেমন সারাদিন খেলাধুলা শেষে রাতে নিজেদের নরম বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ি, ওরাংওটানদের কিন্তু রোজ রাতে ঘুমানোর জন্য এমন তৈরি কোনো ঘর বা বিছানা থাকে না! তাই বলে কি ওরা কষ্ট করে শক্ত ডালে ঘুমায়? একদম না, ওদের বিছানা বানানোর কৌশল দেখে যেকোনো মানুষের চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে!

প্রতিদিন সূর্য ডোবার ঠিক আগেই ওরা নিজেদের জন্য তুলতুলে এক নতুন খাট বানিয়ে ফেলে। ঘুম লাগলেই ওরা প্রথমে বনের সবচেয়ে শক্ত আর নিরাপদ একটা গাছের ডাল বেছে নেয়। তারপর সেই ডালের ওপর দাঁড়িয়েই শুরু হয় ওদের রাজমিস্ত্রির কাজ! চারপাশের মোটা মোটা ডালগুলোকে সুন্দর করে বাঁকিয়ে একটার সাথে একটা বুনে মজবুত একটা খাট বানিয়ে ফেলে। শক্ত খাটে শুয়ে কি আর ঘুম আসে? তাই ডাল দিয়ে তৈরি সেই খাটের ওপর ওরা বিছিয়ে দেয় হাজার হাজার নরম কচি পাতা আর ছাল, যাতে শোবামাত্রই তুলোর তোষকের মতো তুলতুলে লাগে! আর যদি রাতে ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামার ভয় থাকে, তবে তো কথাই নেই; মাথার ওপর বিশাল বড় বড় পাতা দিয়ে ঝটপট সুন্দর একটা ছাদ বা ছাতাও বানিয়ে নেয়!
এত খাটুনি করে বানানো এই দারুণ রাজকীয় বিছানায় ঘুমিয়ে ওরা ভোরবেলা জেগে ওঠে, আর ঘুম থেকে উঠেই সেই ঘর ছেড়ে নতুন খাবারের খোঁজে চলে যায়। পরের রাতে ঘুমানোর সময় আবার অন্য গাছে নতুন করে ঠিক এভাবেই রাজকীয় খাট ও বিছানা বানিয়ে নেয়! রোজ রাতে ইঞ্জিনিয়ারদের মতো চটপট তুলতুলে বিছানা বানানোর এই কায়দাটা দেখতে সত্যিই ভীষণ মজার!
বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রের উদ্ভাবনী ক্ষমতাঃ
ওরাংওটানদের বলা যায় বনের খুদে বিজ্ঞানী! ওদের বুদ্ধি দেখলে যে কারোরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। বনের ভেতর কোনো দরকার পড়লেই ওরা আশপাশের জিনিস দিয়ে ঝটপট দরকারি জিনিস বানিয়ে ফেলে। ধরো, গাছের কোটরে বা শক্ত পাথরের খাঁজে কোনো লোভনীয় খাবার বা পোকা লুকিয়ে আছে, যেখানে ওদের হাত পৌঁছাচ্ছে না; ওরা তখন কিন্তু মোটেই বসে থাকে না! চট করে একটা গাছের সোজা কাঠি খুঁজে নিয়ে পাতাগুলো ছাটাই করে সেটাকে একদম চামচ বা চপস্টিকের মতো বানিয়ে খাঁজের ভেতর ঢুকিয়ে খাবার বের করে আনে।

আবার যখন ভীষণ খিদে পায় আর গাছের কাঁটাওয়ালা ফল বা শক্ত ছালের ফল খেতে ইচ্ছে করে, তখন হাত কেটে যাওয়ার ভয়ে ওরা কাঠি দিয়ে ফলের কাঁটা ছাড়িয়ে নেয় বা বড় পাতা জড়িয়ে দস্তানা বা গ্লাভস বানিয়ে ফেলে! বৃষ্টি নামলে বিশাল বড় একখানা পাতা ভেঙে এনে মাথার ওপর ছাতার মতো ধরে বসে থাকে। নদী বা নালা পার হওয়ার সময় জল কতটা গভীর, তা মাপার জন্য হাতে লম্বা লাঠি নিয়ে জলের ভেতর ডুবিয়ে পরীক্ষা করে দেখে। মানুষের মতো কোনো ট্রেনিং ছাড়াই নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে প্রকৃতি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া লাঠি, পাতা আর পাথরকে এভাবে দরকারি হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা সত্যি অসাধারণ!
একাকী জীবন ও সামাজিক আচরণঃ

অন্যান্য বানর বা হনুমানদের দেখলে মনে হয় যেন বনে সারাদিন পিকনিক চলছে! ওরা সবসময় দল বেঁধে চেঁচামেচি করে, মারামারি করে আর একসাথে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু আমাদের শান্ত বন্ধু ওরাংওটানদের গল্পটা একদম উল্টো! ওরা একটু নির্জনপ্রিয়, অর্থাৎ একা থাকতেই ভালোবাসে। হইচই করার চেয়ে গাছের মগডালে একা একা দোল খাওয়া বা নিজের মতো খাবার খোঁজা ওদের সবচেয়ে বেশি পছন্দ।
তবে একা থাকে বলে ভেবো না যে ওদের কোনো বন্ধু নেই। বনের গাছ যত বিশালই হোক সবার জন্য এক জায়গায় অত ফল থাকে না, তাই বুদ্ধিমান ওরাংওটানেরা এলাকা ভাগ করে আলাদা আলাদা গাছে থাকে; যাতে খাবার নিয়ে কারো সাথে ঝগড়াঝাটি বা মারামারি না হয়! পথে অন্য কোনো ওরাংওটানের সাথে দেখা হয়ে গেলে ওরা কিন্তু ঝগড়াঝাঁটি না করে শান্তভাবে একে অপরকে এড়িয়ে নিজের পথে চলে যায়।

মা ওরাংওটান অবশ্য কখনো একা থাকে না; ছানা বড় না হওয়া পর্যন্ত বছরের পর বছর তাকে নিজের কোল আর পেটে আঁকড়ে রেখেই ঘুরে বেড়ায়। মা ও সন্তান ছাড়া বাকি সবাই বনের নিস্তব্ধতায় একা থাকতেই বেশি ভালোবাসে। ঝুট-ঝামেলা এড়িয়ে নিজের মতো শান্তিতে থাকার স্বভাবই ওদের অন্য সব বানরজাতীয় প্রাণীদের চেয়ে একদম আলাদা করে তুলেছে!
মা ও সন্তানের অনন্য সম্পর্কঃ
আমাদের মতো ওরাংওটানের ছানারাও কিন্তু মায়ের খুব ন্যাওটা হয়! প্রাণীজগতের মধ্যে মানুষের পর ওরাংওটান মা আর তার ছানার সম্পর্কটাই সবচেয়ে আদুরে এবং দীর্ঘমেয়াদী। এক-দুই বছর নয়, একটা ছোট ওরাংওটান প্রায় সাত-আট বছর ধরে একদম সুপারগ্লুর মতো তার মায়ের সাথে সেঁটে থাকে!
ছোটবেলায় যখন ছানাটির হাঁটাচলা শেখা হয়নি, তখন মা ওরাংওটান তাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে এক গাছ থেকে অন্য গাছে দোল খেয়ে বেড়ায়। ছানাটি যেন মায়ের গায়ের সাথে ফ্রি রাইড উপভোগ করে! শুধু কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোই নয়, ওরাংওটান মা কিন্তু বনের সেরা শিক্ষিকা। বনে বেঁচে থাকার সব কৌশল সে ছানাকে প্রতিদিন হাতে-কলমে শেখায়। ছানাটি না শেখা পর্যন্ত মা তাকে ছেড়ে একচুলও নড়ে না। মা ও সন্তানের এই মিষ্টি ভালোবাসা সত্যি মন ছুঁয়ে যায়!
যোগাযোগের মাধ্যম ও কণ্ঠস্বরঃ
ওরাংওটানেরা কিন্তু বনের ভেতর খুব সুন্দর করে কথা বলে! ঘন বনে গাছের আড়ালে সবাইকে দেখা যায় না। তাই ওরা গলার আওয়াজ দিয়েই কাজ চালিয়ে নেয়। ওদের গলায় একটা থলি থাকে। সেই থলি ফুলিয়ে ওরা ভীষণ জোরে ডেকে ওঠে। একে বলে ‘লং কল’ বা লম্বা ডাক। এই ডাক এত জোরদার যে অনেক দূর থেকেও শোনা যায়! নিজের ঘর বা এলাকা বোঝাতে ওরা এমন ডাক দেয়। আবার খুশি হলে বা ভয় পেলেও নানা মজার আওয়াজ করে। কখনো ঠোঁট দিয়ে পটপট শব্দ করে, কখনো বা ফুঁ দিয়ে আওয়াজ করে। দূর থেকে বন্ধুদের খবর দেওয়ার এই বুদ্ধিটা ওদের সত্যিই দারুণ!
উপসংহারঃ
সত্যি, লালচে পশমের এই বুদ্ধিমান ও শান্ত প্রাণী ওরাংওটান বনের এক বিস্ময়! গাছের মগডালে ঘুমানো, পাতা দিয়ে ছাতা বানানো, আর হাত দিয়ে খাবার খুঁজে খাওয়ার কৌশলগুলো ওদের সত্যিই অনন্য করে তুলেছে। তাই প্রকৃতির এই অসাধারণ বন্ধুদের ভালোবাসতে হবে। আর ওদের বাসস্থানকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের যত্নশীল হতে হবে।
তথ্যসুত্রঃ-

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লেখালেখি।
