বহুরূপী লতা

বিখ্যাত অভিনেতা উডি অ্যালেন একবার জেলিগ (Zelig) নামে একটি সিনেমা বানিয়েছিলেন। ছবির মূল চরিত্র এমন একজন মানুষ, যে যার পাশে দাঁড়ায়, তারই বৈশিষ্ট্য নিজের মধ্যে ধারণ করে ফেলে। উদ্ভিদজগতেও এরকম এক জেলিগ-এর সন্ধান মেলে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. এরনেস্তো জিয়ানোলি-র হাত ধরে, সম্পুর্ণ আকষ্মিকভাবে।
২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের ঘটনা। ড. এরনেস্তো জিয়ানোলি (Dr. Ernesto Gianoli) একবার তাঁর এক ছাত্র ফার্নান্দো কারাসকো-উরা (Carrasco-Urra)-কে নিয়ে দক্ষিণ চিলির একটি শীতল রেইনফরেস্টে ফিল্ড রিসার্চের জন্য গিয়েছিলেন। ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ একটি লতানে গাছের উপর চোখ পরে তাঁর। গাছটির ডাল বা কাণ্ডের দিকে তাকিয়ে জিয়ানোলির একটু খটকা লাগে। তিনি লক্ষ্য করেন, লতাটির যে অংশ মাটিতে বাইছে তার পাতাগুলোর সঙ্গে উপরের দিকের অন্য অংশের পাতাগুলোর কোন মিল নেই। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত।


জিয়ানোলি এরপর জঙ্গলের পথে হাঁটতে হাঁটতে এই প্রজাতির লতার দিকে নজর রাখতে থাকেন। একের পর এক গাছ ও ঝোপ আঁকড়ে ধরে লতাগুলো উপরে উঠে গেছে। কৌতূহলবশত প্রতিবারই কাছে গিয়ে তিনি একই ঘটনা ঘটতে দেখতে পান। তিনি যা দেখলেন, তা তাঁর কাছে ছিল “অবিশ্বাস্য রকমের বিস্ময়কর”। তিনি বুঝতে পারেন, আশ্রয়দাতা গাছের ডালকে পেঁচিয়ে ধরে ঠিক তার পাতার আকার, রঙ, এবং শিরার প্যাটার্ন হুবহু নকল করে ঝুলে রয়েছে এই লতাটি! আশ্রয়দানকারী গাছ যতই আলাদা আলাদা হোক না কেন, এই লতাটি ঠিক তার পাতার আকৃতি নকল করে আসল গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসে আছে।

এই নকলনবিশ লতানে গাছটি ছিল বোক্যুইলা ট্রাইফলিয়াটা (Boquila trifoliolata) প্রজাতির একটি উদ্ভিদ। বোক্যুইলা (Boquila) হল লার্ডিজাবালাসি (Lardizabalaceae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত সপুষ্পক উদ্ভিদের একটি গণ (genus)। মধ্য ও দক্ষিণ চিলি এবং আর্জেন্টিনার নাতিশীতোষ্ণ অরণ্যই এর স্বাভাবিক বিস্তৃতি। এই গণটি monotypic, অর্থাৎ এর অন্তর্ভুক্ত মাত্র একটি প্রজাতিই আছে আর সেটি হলো বোক্যুইলা ট্রাইফলিয়াটা (B. trifoliolata)।
১৭৮২ সালে জুয়ান ইগনাসিও মোলিনা (Juan Ignacio Molina) প্রথম এই প্রজাতিটির বর্ণনা দেন। পরে ১৮৩৯ সালে জোসেফ দেকেইন (Joseph Decaisne) Boquila গণটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৪ সালে এর পাতার অনুকরণ ক্ষমতা নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশের পর এটি “chameleon vine” বা ‘গিরগিটি লতা’ নামেও পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে এটিই একমাত্র পরিচিত উদ্ভিদ প্রজাতি, যা mimetic polymorphism বা বহুরূপী অনুকরণ প্রদর্শন করে বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি একই সময়ে বা বিভিন্ন সময়ে একাধিক আশ্রয়দাতা উদ্ভিদ প্রজাতির বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে পারে।
বোক্যুইলা ট্রাইফলিয়াটা কিন্তু মোটেও পরজীবী লতা নয়। এটি আশ্রয়দাতা গাছপালাকে জড়িয়ে পাক খেতে খেতে বেড়ে ওঠে ঠিকই তবে সেটি মূলত তাদের কাঠামোগত সহায়তা ও সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটিকে Batesian mimicry-এর একটি উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই ধরনের অনুকরণে একটি নিরীহ প্রজাতি নিজেকে শিকারির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ক্ষতিকর বা শিকারির কাছে অপছন্দের কোনো উদ্ভিদ প্রজাতির মতো করে তোলে। গবেষণায় এমনও দাবি করা হয়েছিল যে, বোক্যুইলা লতা এবং যে গাছের পাতা সে অনুকরণ করছে, তাদের মধ্যে সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শের প্রয়োজন হয় না, শুধু কাছাকাছি থাকলেই অনুকরণ শুরু হতে পারে।
২০১৪ সালে এই অনুকরণ ক্ষমতা নিয়ে প্রথম গবেষণাটি প্রকাশিত হওয়ার পরের এক দশকে অন্য কোনো স্বাধীন গবেষকদল মাঠপর্যায়ের এই পর্যবেক্ষণগুলো নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে বোক্যুইলা-র এই আশ্চর্য অনুকরণ ক্ষমতা নিয়ে এখনও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর এটি কীভাবে ঘটে, তারও কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।
সম্ভাব্য কয়েকটি তত্ত্বের মধ্যে রয়েছে —
- অণুজীবের মাধ্যমে অনুভূমিক জিন স্থানান্তর (horizontal gene transfer)
- আশপাশের উদ্ভিদ থেকে নির্গত উদ্বায়ী জৈব যৌগ (volatile organic compounds) শনাক্ত করা
- পাতায় থাকা চোখের মতো বিশেষ গঠন ব্যবহার করে আশপাশের উদ্ভিদকে শনাক্ত করা
অর্থাৎ, বোক্যুইলা সত্যিই আশপাশের উদ্ভিদের অনুকরণ করে কি না এবং করলেও ঠিক কীভাবে তা করে — দুটিই এখনও পুরোপুরি সমাধান না হওয়া বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন।
Boquila-র পাতার অনুকরণ ঠিক কীভাবে ঘটে, তার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনও ভালোভাবে জানা যায়নি। তবে আশ্রয়দাতা উদ্ভিদকে শনাক্ত করা এবং তার বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করার ক্ষেত্রে রাসায়নিক সংকেত, গন্ধ, জিনগত তথ্য, মেটাজেনোমিক, ট্রান্সক্রিপ্টোমিক, প্রোটিওমিক, মেটাবোলোমিক, এপিজেনেটিক এবং/অথবা অণুজীবজাত সংকেত ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compounds)
উদ্ভিদ-পরিবেশবিদ আর্নেস্তো জিয়ানোলির একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল, আশ্রয়দাতা গাছ হয়তো পরিবেশে কিছু উদ্বায়ী জৈব যৌগ (Volatile Organic Compounds বা VOCs) ছড়িয়ে দেয়, যা B. trifoliolata শনাক্ত করতে পারে।
উদ্ভিদের মধ্যে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে VOC-নির্ভর সংকেত ব্যবহার বেশ পরিচিত একটি ঘটনা। যেমন, এই ধরনের রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে কোনো উদ্ভিদ তার প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত জিনের কার্যকলাপ বাড়িয়ে তুলতে পারে। ফলে, সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ ছাড়াই কীভাবে Boquila আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের উপস্থিতি বুঝতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে এটি।
তবে এই ধারণার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, VOCs-এর মাধ্যমে কোনো উদ্ভিদের পাতার আকৃতি বা সামগ্রিক গঠন বদলে দেওয়ার ঘটনা উদ্ভিদবিজ্ঞানে আগে দেখা যায়নি। দ্বিতীয়ত, B. trifoliolata-র অনুকরণের যে মাত্রার নির্দিষ্টতা দেখা যায়, তা সাধারণত VOC-নির্ভর উদ্ভিদীয় প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় না।
অর্থাৎ, VOC তত্ত্বটি আকর্ষণীয় হলেও এখনও এটি একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা মাত্র, প্রমাণিত প্রক্রিয়া নয়।
অনুভূমিক জিন স্থানান্তর (Horizontal Gene Transfer)
জিয়ানোলি আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ধারণা, B. trifoliolata-র এই অনুকরণ ক্ষমতার পেছনে এন্ডোফাইটিক অণুজীব ভূমিকা রাখতে পারে। এই অণুজীবগুলো B. trifoliolata এবং আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের মধ্যে অনুভূমিক জিন স্থানান্তর (Horizontal Gene Transfer বা HGT) ঘটাতে পারে।
এভাবে স্থানান্তরিত জিনগত তথ্য লতার পাতায় থাকা জিন, ট্রান্সপোজন (transposon) এবং/অথবা এপিজেনেটিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে Boquila আশ্রয়দাতা উদ্ভিদকে শনাক্ত করতে এবং নিজের পাতার গঠন পরিবর্তন করে তার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে সক্ষম হতে পারে — এমনকি দুই উদ্ভিদের মধ্যে সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ ছাড়াও।

২০২১ সালের একটি গবেষণায় জিয়ানোলি দেখতে পান, অনুকরণ শুরু হওয়ার পর B. trifoliolata এবং তার আশ্রয়দাতা উদ্ভিদের মাইক্রোবায়োমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল বা ওভারল্যাপ দেখা যায়। তাঁর মতে, এটি বোক্যুইলা-র অনুকরণ প্রক্রিয়ার পেছনে অণুজীবের ভূমিকার একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে জিয়ানোলি নিজেও এই ব্যাখ্যার কিছু সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেছেন।
প্রথমত, বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে অনুভূমিক জিন স্থানান্তর অবশ্যই ঘটে, কিন্তু সাধারণত এটি সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগে এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মাধ্যমে ঘটে। অন্যদিকে Boquila-র পাতার আকৃতি তুলনামূলকভাবে দ্রুত বদলে যেতে দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, উদ্ভিদের মধ্যে HGT সাধারণত পরজীবিতা (parasitism)-র মতো ঘনিষ্ঠ জৈবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। কিন্তু B. trifoliolata কোনো পরজীবী উদ্ভিদ নয়; এটি আশ্রয়দাতা গাছকে কেবল বেড়ে ওঠার কাঠামো ও সুরক্ষার জন্য ব্যবহার করে।
তাই অণুজীব-নির্ভর অনুভূমিক জিন স্থানান্তর একটি আকর্ষণীয় সম্ভাবনা হলেও, বোক্যুইলা-র পাতার অনুকরণের নিশ্চিত ব্যাখ্যা হিসেবে এটি এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়।
ওসেলি (Ocelli)
২০২১ সালে Plant Signaling & Behavior জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ফেলিপে ইয়ামাশিতা এবং জেকব হোয়াইট দাবি করেন, B. trifoliolata হয়তো এক ধরনের আদিম দৃষ্টিশক্তি ব্যবহার করে তার আশ্রয়দাতা উদ্ভিদকে শনাক্ত করে এবং তাদের পাতার অনুকরণ করে।
এই ধারণার ভিত্তি রয়েছে ১৯০৫ ও ১৯০৭ সালে যথাক্রমে গটলিয়েব হ্যাবারলান্ডট এবং ফ্রান্সিস ডারউইন-এর করা কিছু প্রস্তাবের ওপর। তাঁদের মতে, কিছু উদ্ভিদে ‘ocelli’ বা লেন্সের মতো বিশেষ কোষ থাকতে পারে, যা আলোকে পাতার অন্যান্য আলোকসংবেদনশীল কোষের ওপর কেন্দ্রীভূত করতে সক্ষম।
২০২১ সালের গবেষণায় B. trifoliolata-কে প্লাস্টিকের তৈরি গাছের পাতার আকৃতিও অনুকরণ করতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়। এর ভিত্তিতে গবেষকরা হ্যাবারলান্ডট ও ডারউইনের ওসেলি-সংক্রান্ত ধারণাটিকে আরও বিস্তৃত করেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল, B. trifoliolata-র পাতার এপিডার্মিস বা বহিঃত্বকে থাকা উত্তল লেন্সের মতো গঠন আলো শনাক্ত করতে এবং কাছাকাছি থাকা পাতার আকৃতি “দেখতে” সক্ষম হতে পারে।
এরপর বোক্যুইলা কোনো অজানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুকরণ শুরু করে — এমনটিও তাঁরা প্রস্তাব করেন। এই প্রক্রিয়ায় নিউরনের মতো কোনো গঠন ভূমিকা রাখতে পারে বলে তাঁরা অনুমান করেছিলেন।
গবেষণাটিতে আরও দেখা যায়, অনুকরণ না-করা পাতায় মুক্ত প্রান্তবিশিষ্ট ক্ষুদ্র শিরিকা (free-end veinlets) তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। গবেষকরা অক্সিন (auxin) নামের উদ্ভিদ-হরমোনকেও পাতার গঠন পরিবর্তনের সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বিতর্কিত গবেষণা
গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর যথেষ্ট সংবাদমাধ্যমের আগ্রহ তৈরি হয়। F1000-এর Faculty Opinions থেকেও এটি প্রশংসা পায় এবং পরে TikTok-এ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
Plant Signaling & Behavior-এর সম্পাদকমণ্ডলীর প্রধান এবং উদ্ভিদজীববিজ্ঞানী ফ্রান্তিশেক বালুশকা এই ধারণাটির পক্ষে জোরালো সমর্থন জানান। তাঁর মতে, উদ্ভিদের শিকড়ের স্কোটোট্রপিজম (skototropism) এবং শৈবালের আলোকসংবেদনশীল কোষও উদ্ভিদের এক ধরনের “দৃষ্টিশক্তি”-র সঙ্গে তুলনীয় প্রক্রিয়ার উদাহরণ হতে পারে (নিচের ছবি)।

তবে গবেষণাটির সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক মহলে ব্যাপক সংশয়ের মুখে পড়েছে। সমালোচকদের প্রধান আপত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে গবেষণার পদ্ধতিগত দুর্বলতা, হোয়াইটের প্রাতিষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক পটভূমির অভাব এবং বালুশকা ও ইয়ামাশিতার মধ্যে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত (conflict of interest)।
ফলে Boquila সত্যিই “দেখতে” পারে — এই চমকপ্রদ ধারণাটি এখনও প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। গবেষণাটি ২০২৪ সালে বোটানিতে Ig Nobel Prize পেলেও, পুরস্কার পাওয়া নিজে থেকে এই বৈজ্ঞানিক দাবির সত্যতা প্রমাণ করে না।
তথ্যসুত্রঃ-

সায়ন্তনী ব্যানার্জী
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি। বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল মার্কেটিং পেশায় যুক্ত। কন্টেন্ট রাইটার ও গ্রাফিক ডিজাইনার। পরিবেশ নিয়ে লিখতে ভালবাসেন।
