আশ্চর্য প্রাণী অক্টোপাস

অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণী অক্টোপাস এক আশ্চর্য প্রাণী। বুদ্ধিমান, পরিবেশ সম্পর্কে কৌতুহলী, সতর্ক, সমস্যা সমাধানে পটু, নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে (ক্যামোফ্লাজ) ওস্তাদ, পুরোনো পরিচয় স্মৃতিতে ধরে রাখতে ও ভালোমন্দের ভেদাভেদ করতে সক্ষম।
অক্টোপাসের পরিচয় ও বৈচিত্র্য
‘স্কুইড’-এর মতো অক্টোপাসও অমেরুদণ্ডী ‘সেফালোপোডা’ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এদের দেহে হাড়গোড় মেরুদণ্ড কোনো কিছুই নেই।

পৃথিবীর প্রতিটি সমুদ্রে নানা আকারের নানা বর্ণের অক্টোপাস দেখতে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হলো লালচে গোলাপী রঙের জায়ান্ট প্যাসিফিক অক্টোপাস (Enteroctopus dofleini), সংক্ষেপে জিপিও। এদের বাহু ১৪ফুট (৪মিটার), এমনকি ১৮ফুট (৫.৪ মিটার) দীর্ঘ হয়ে থাকে। সমগ্র উত্তর আমেরিকা দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে জাপান পর্যন্ত, প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে এদের দেখতে পাওয়া যায়।


সচরাচর আমরা যে অক্টোপাস দেখি সেগুলো হল অক্টোপাস ভালগারিস (octopus vulgaris) প্রজাতির ছোটো আকারের; এরা তাও মোটামুটিভাবে ৩ফুট (০.৯মিটার) লম্বা হয়। রেড অক্টোপাস (octopus rubens) সবচেয়ে ছোটো ; মাত্র ২০ইঞ্চি (৫১ সেন্টিমিটার) লম্বা হয়।
অক্টোপাসের দেহ ও গঠন
অক্টোপাসের দেহের প্রায় ৯০ শতাংশ নরম নমনীয় মাংসপেশী। শামুক ঝিনুকের মতো এদের দেহের নরম অংশের বাইরে কোনো শক্ত আবরণ নেই। দেহে কোনো হাড় না থাকায় সহজেই এসবের ভিতর নিজের শরীরকে প্রবেশ করিয়ে নিতে পারে। ছোটো কোনো ছিদ্রের ভিতর দিয়ে সহজেই গলে যেতে পারে।
একমাত্র শক্ত অঙ্গ অক্টোপাসের ঠোঁট (‘বিক’), যা দেখতে অনেকটা কাকাতুয়ার ঠোঁটের মতো, ‘কেরাটিন’ দিয়ে তৈরি। মানুষের চুল ও নখের উপাদানও কেরাটিন। এই ঠোঁটের সাহায্যে এরা শামুক ঝিনুকের মতো খাদ্যের শক্ত আবরণ ভেঙে ফেলে ভিতরের নরম মাংস খায়।
অক্টোপাসের মাথার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার আটটি শুঁড় (বা পা) যার সাহায্যে সমুদ্রতলে তারা চলাফেরা করে। শুঁড়গুলোর সংযোগস্থলের নীচে রয়েছে ঠোঁটযুক্ত একটি মুখ; উপরে একজোড়া চোখ। প্রতিটি শুঁড়ের তলদেশে একগুচ্ছ শোষক (সাকার) চাকতি সারি সারি বসানো। প্রত্যেকটা চিটচিটে আঠালো ; যার সাহায্যে এরা সমুদ্রতলে বা শিকারের শরীরে বা অন্য কিছুর উপর নিজেদেরকে শক্ত করে স্থাপন করতে পারে।
অক্টোপাসের নয়টি মস্তিষ্কের রহস্য
অক্টোপাসের প্রত্যেকটি শুঁড় স্বাদগ্রহণ করতে পারে, স্পর্শ করতে পারে, দেখতে পারে, অনুভব করতে পারে বা আলাদাভাবে চলাফেরায় সক্ষম। প্রত্যেক শুঁড়ে আছে একটি করে ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক (মিনি ব্রেন)! প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র মস্তিস্ক স্বাধীনভাবে কাজ করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর ফলে অক্টোপাস খুব দ্রুত কার্যকরভাবে তার কাজ সম্পাদন করতে পারে।

আটটি শুঁড়ে আটটি মস্তিষ্ক ছাড়াও অক্টোপাসের মাথায় রয়েছে একটি কেন্দ্রীয় মস্তিষ্ক (সেন্ট্রালাইজড ব্রেন)। সেন্ট্রালাইজড ব্রেন নিজের কাজ ছাড়াও অন্য আটটি মস্তিষ্কের কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধন করে।! অক্টোপাসের মস্তিষ্কের সংখ্যা তাহলে মানুষের মত একটি নয়, মোট ৮+১=৯টি।
অক্টোপাসের তিন হৃদপিণ্ড ও নীল রক্ত

অক্টোপাসের আছে একটি নয়, তিন তিনটি সক্রিয় হৃদপিণ্ড (হার্ট)। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রধান (সিস্টেমিক বা মেন) হৃদপিণ্ডটি সমগ্র দেহে রক্ত সংবহন করে, অপর দুটি হৃদপিন্ড ফুলকোর সঙ্গে যুক্ত। ফুলকো হৃদপিন্ড, ফুলকোর ভিভর দিয়ে প্রবাহিত জল থেকে ফুলকো যে অক্সিজেন সংগ্রহ করে, তাকে প্রধান হৃদপিন্ডের রক্তপ্রবাহে সরবরাহ করে। অক্টোপাসের ত্বকও জল থেকে অক্সিজেন শোষণ করে রক্তপ্রবাহে সরবরাহ করে।

অক্টোপাসের রক্ত মানুষের রক্তের মতো লাল নয়, নীল। মানুষের রক্তে লৌহঘটিত হিমোগ্লোবিনের পরিবর্তে, অক্টোপাসের রক্তে থাকে তামাঘটিত হিমোসায়ানিন। হিমোসায়ানিন সারা দেহে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। শীতল ও কম অক্সিজেন পরিবেশে হিমোগ্লোবিনের চাইতে হিমোসায়ানিন অক্সিজেন ছেঁকে নিতে ও পরিবহন করতে অধিকতর দক্ষ। তাই সমুদ্রের নীচে নীল রক্ত তথা হিমোসায়ানিন, অক্টোপাসের সারা দেহে অক্সিজেন সরবরাহ করতে অধিকতর উপযোগী।
অক্টোপাসের বাসস্থান ও আশ্রয় তৈরির কৌশল

এরা বসবাস করে সমুদ্রজলের তলায় কোনো গর্ত বা ফাটল বা প্রবালপুঞ্জ (‘কোরাল’) বা জলের তলায় উপলব্ধ মানুষের ফেলে দেওয়া কোনো পাত্র বা নারকেলের খোল ইত্যাদির ভিতরে। কৌটো, পাত্র, নারকেল খোল, নুড়ি পাথর, ভাঙা পাথরের টুকরো, এমনকি ভাঙা বোতল, কৌটোর ঢাকনা, বোতলের ছিপি দেখতে পেলে এগুলি এরা বাসস্থান তৈরির জন্য কুড়িয়ে নিয়ে যায়। ছোটো অক্টোপাস অর্ধেক নারকেলের খোল ও সামুদ্রিক ঝিনুকের খালি খোলের মাঝখানে একাকী লুকিয়ে থাকতে ভালবাসে। এরা দলবেঁধে থাকে না।

অক্টোপাসের খাদ্যাভ্যাস, আত্মরক্ষা ও শিকারের কৌশল
সব অক্টোপাসের কামড়েই বিভিন্ন শক্তির বিষ আছে। এই বিষ অক্টোপাস তার ঠোঁটের সাহায্যে শিকারের শরীরে প্রবেশ করিয়ে তাকে অবশ করে দিতে পারে। এদের খাদ্য কাঁকড়া, মাছ, ছোট চিংড়ি (শ্রিম্প), লবস্টার (বড়ো চিংড়ি) ইত্যাদি অন্যান্য ছোটো সামুদ্রিক প্রাণী।
অক্টোপাসের প্রতিটি শুঁড় প্রচন্ড শক্তিশালী। নিজের শুঁড় দিয়ে কোনো কিছু ধরতে পারলে, প্রবল শক্তি দিয়ে তাকে টেনে একেবারে মুখের মধ্যে এনে ফেলতে চেষ্টা করে। এর থেকে শিকারের রেহাই নেই।
কিন্তু অক্টোপাস শুঁড় দিয়ে টেনে আনতে যতটা পটু যতটা শক্তিশালী, ঠেলে দূরে বা পাশে, সরিয়ে দিতে ততটা নয়। শিকারের উদ্দেশ্যে অক্টোপাস গুঁড়ি মেরে সন্তর্পণে কোনো ছোটো চিংড়িকে (শ্রিম্প) শুঁড় দিয়ে ধরতে চেষ্টা করলে, চমকে গিয়ে সেটা হয়তো লাফিয়ে উঠে পালাতে চেষ্টা করে; কিন্তু তার রক্ষা নেই; অক্টোপাস আরো সাতটি শুঁড়ের যে কোনো একটি দিয়ে তাকে ঠিক পাকড়াও করে চালান করে দেয় একেবারে মুখের ভিতর।
ভয় পেলে বা শিকারীর আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিলে, অক্টোপাস তাদের শরীরের সাইফনের ভিতর দিয়ে জল তীরবেগে ছুড়ে দ্রুত অন্যত্র সরে যেতে পারে। সেই সঙ্গে ছিটিয়ে দেয় পিচকারির ধারায় কালো রঙ। ফলে অক্টোপাসটিকে আর দেখতে পায় না শিকারী।
অক্টোপাস নিজে যেমন দক্ষ শিকারি, তেমনই আবার অন্য অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য। সীল, একধরনের তিমি (স্পার্ম হোয়েল), হাঙর, মাছ, সমুদ্র ভোঁদড় (সী ওটার), সামুদ্রিক পাখি ইত্যাদি অক্টোপাস শিকার করে খায়।
অক্টোপাস কিন্তু ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ
অক্টোপাস অতিদ্রুত পরিবেশের রঙ, আকার, চেহারা ইত্যাদির সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তিত করে মিলিয়ে নিতে পারে। একদম চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায় (ক্যামোফ্লাজ)। এভাবে শিকারী প্রাণী বা অক্টোপাসেরম নিজের শিকার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে লুকিয়ে রাখতে পারে।

এদের ত্বকের নীচে থাকে হাজার হাজার স্পেশালাইজড কোষ ‘ক্রোমাটোফোর’, যার সাহায্যে এরা মুহূর্তের মধ্যে নিজের রঙ পালটিয়ে ফেলতে পারে, ঠিক ডাঙার প্রাণী গিরগিটির মত।
এছাড়াও আছে ত্বকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকায় থাকা ‘প্যাপিল্লি’, যেগুলো সঙ্কুচিত প্রসারিত করে (এক্সপ্যান্ড অর রিট্রাক্ট) এরা পরিবেশের বিভিন্ন আকার ও আকৃতির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে।
মিমিক অক্টোপাস: বহুরূপী ছদ্মবেশের শিল্পী
১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়াতে আবিষ্কার হয়েছে ‘মিমিক অক্টোপাস’ (Thaumoctopus mimicus)। এরা মিমিক অক্টোপাসের শিকারী প্রাণীরা যাদের এড়িয়ে চলে, সেইসব প্রাণীদের মতো আকার ও বর্ণ ধারণ করে তাদেরকে ধোঁকা দেয়।

মিমিক অক্টোপাস আবার সামুদ্রিক বিষাক্ত সাপের মতো, অন্যান্য বিশেষ কিছু প্রাণীদের মতো চেহারা ধারণ করতে পারে। অন্য আর কোনো প্রাণীকে এহেন বহুরূপী রূপধারণ করতে দেখা যায় না।

অক্টোপাসের বুদ্ধি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা
ইংল্যান্ডের ন্যাচারাল হিস্টোরি মিউজিয়ামের কিউরেটর জন অ্যাবলট, অক্টোপাসের বেশ কিছু আচার আচরণের সন্ধান দিয়েছেন। ২০০৯ সালে ‘ভেইনড অক্টোপাস’কে (অ্যাম্ফিঅক্টোপাস মার্জিন্যাটাস) সমুদ্রতলে পড়ে থাকা নারকেলের খোল কুড়াতে দেখা গিয়েছে।
২০১১ সালে গবেষকরা একটি পরীক্ষা করেছিলেন। একটি কাচের স্বচ্ছ চৌবাচ্চায় জলের মধ্যে কিছু অক্টোপাস রেখে, পাশের আর একটি স্বচ্ছ চৌবাচ্চায় তাদের খাদ্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। অক্টোপাসরা খাবারটা দেখতে পাচ্ছিল, কিন্তু খাবারের কাছে পৌঁছাতে পারছিল না। পৌঁছাতে হলে তাদের শুঁড় জলের বাইরে এনে পাশের চৌবাচ্চায় প্রবেশ করাতে হতো। ভিডিও ক্যমেরা চালিয়ে অক্টোপাসরা কি করে তা রেকর্ড করা হচ্ছিল। দেখা গিয়েছিল অধিকাংশ অক্টোপাস চৌবাচ্চার কিনারার উপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে, তাদের শুঁড় পাশের চৌবাচ্চায় খাবারের উপর পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে।
এর থেকে বোঝা গিয়েছিল, শুধু শুঁড়ের মিনি মস্তিষ্ক নয়, কেন্দ্রীয় মস্তিষ্কও শুঁড়ের কার্যকলাপের উপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আরো একটি অনুরূপ পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, চৌবাচ্চা থেকে বার হয়ে, অক্টোপাস পাশের চৌবাচ্চার ঢাকনা খুলে প্রবেশ করে মাছগুলো খেয়েছে; তারপর চৌবাচ্চা থেকে বার হয়ে, ঢাকনা বন্ধ করে দিয়ে নিজের চৌবাচ্চায় ফিরে এসে, সুবোধ বালকের মত থাকতে শুরু করেছে। বোঝা গিয়েছিল, অক্টোপাস মোটেই বোকা-সোকা নয়; অক্টোপাস বেশ চালাক-চতুর।

তপন কুমার বিশ্বাস
ফ্রি-ল্যান্স বিজ্ঞান লেখক
