পাখিরা এক পায়ে দাঁড়ায় কেন?

এমন এক পাখির কথা ভাবুন, যারা এক পায়ে দাঁড়ানোর জন্য পরিচিত। এই নিয়ে প্রথমেই অনেকেরই মনে আসবে ফ্ল্যামিঙ্গো বা বকের কথা। কিন্তু আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি, কেন তারা প্রায়শই এই ভঙ্গিতে দাঁড়ায়?
সব পাখিই কি এই ভঙ্গিতে ভারসাম্য বজায় রাখে? সারস, ফ্ল্যামিঙ্গো, ইগ্রেট বা হেরনের মতো লম্বা পা-ওয়ালা পাখিদের অনেকক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়ানো বেশ ক্লান্তিকর। একবার একটি পা ব্যবহার করলে অন্য পায়ের পেশীর ক্লান্তি কম হয় ও সেই পা বিশ্রাম নিতে পারে। তাই পাখিদের মধ্যে এই অস্বাভাবিক আচরণটির জন্য অন্য কোনও কারণ আছে কিনা এবং অন্য সব পাখির মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য আছে কিনা, তা জানা দরকার।
কখন পাখিরা এক পায়ে দাঁড়ায়?
পাখির পা হল তাদের শরীরের একমাত্র অংশ, যা পালক দিয়ে ঢাকা থাকে না। তাদের পা দিয়ে শরীর থেকে তাপ বেরিয়ে যেতে পারে। এমন পাখিদের অন্যতম অভিযোজন হলো তাপক্ষয় নিয়ন্ত্রণ। এদের শরীর মানুষের তুলনায় ছোট। তাই তারা সহজেই শরীরের তাপ হারায়। শীতকালে এক পায়ে দাঁড়ালে শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ বেরিয়ে যেতে পারে না। তাই গবেষণায় জানা গেছে, শীতকালে পাখিদের এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশি দেখা যায়, কিন্তু গরমকালে দুই পায়ে দাঁড়ানো পছন্দ করে। তাই পাখিরা এক পায়ে দাঁড়ানোর মানে হল শরীর থেকে কম তাপ বেরিয়ে যাবে ও শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল থাকবে।
শরীরের তাপ সংরক্ষণের সুবিধার পাশাপাশি মনে করা হয়, এক পায়ে দাঁড়ানো পাখিরা ছদ্মবেশ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। লম্বা পায়ের জলচর পাখিরা শিকার ধরার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় জলে ডুব দেওয়ার আগে এক পায়ে দাঁড়ায়। এক পায়ে ভারসাম্য রেখে পাখি তার পরিবেশের সঙ্গে খুব সহজেই চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এইভাবে পাখিরা যেমন একদিকে শিকারীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, আবার নিজেরাও তাদের শিকার ধরার সময় লুকিয়ে থাকতে পারে। পাখিদের কখনও যদি কোনও একটি পায়ে আঘাত লাগে, তখন তারা এক পায়ে দাঁড়ায়। আহত পায়ের বিশ্রাম দেওয়া ও সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত এক পায়ে দাঁড়ানোর ভঙ্গি অনেকটা সুবিধাজনক বা আরামদায়ক।
কোন পাখিরা এক পায়ে দাঁড়াতে পারে?
সম্ভবত এক পায়ে দাঁড়ানোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত পাখি হল ফ্ল্যামিঙ্গো। কিন্তু ফ্ল্যামিঙ্গোরাই একমাত্র পাখি নয়, যারা ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই কৌশল নিয়মিত ব্যবহার করে। অনেক শিকারী পাখি যেমন পেঁচা থেকে শুরু করে সারস, ইগ্রেট, হেরন, অনেক প্রজাতির হাঁস, রাজহাঁস ও টিয়া জাতীয় পাখিদের নিয়মিত এক পায়ে দাঁড়াতে দেখা যায়। এমনকি তারা এই ভঙ্গিমায় ঘুমাতেও পারে। আবার মুরগি, টার্কি জাতীয় ভারী ওজনের পাখিরা কেবল কয়েক মিনিটের জন্য এই ধরনের ভঙ্গি ধরে রাখতে পারে।
এখন কথা হল পাখিরা এক পায়ে কীভাবে দাঁড়ায়?
লম্বা পা-ওয়ালা জলচর ও অনেকক্ষণ উড়ে বেড়ায় এমন উড়ন্ত পাখিরা এক পায়ে দাঁড়ানোর পক্ষে উপযুক্ত। এই ভঙ্গি দুই পায়ে দাঁড়ানোর তুলনায় বেশি আরামদায়ক। এক পায়ের ভঙ্গিতে দাঁড়ালে তাদের শরীরের ওজন বহন করতে বরং বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়। এক পা উপরে তুলে ধরার ফলে অন্য পাটি গুটিয়ে রাখার আগে কার্যকরভাবে অন্য পাটিকে সঠিক অবস্থানে আটকে রেখে স্থিতিশীল হয়ে যায়। পাখির শরীরের ওজন পেশী ও লিগামেন্টের মাধ্যমে তার পায়ের জয়েন্টগুলিকে লক করতে সাহায্য করে। সেই কারণে এইসব পাখিরা ভঙ্গিটি ধরে রাখতে পারে ও পা ভেঙে পড়ার কোনও সম্ভাবনা থাকে না। পাখিরা নিয়মিতভাবে এক পায়ে দাঁড়ানোর সময় পা বদল করে নেয়, যাতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বেশি ক্লান্ত না হয়ে পড়ে।
পাখিরা কি এক পায়ে দাঁড়িয়ে ঘুমায়?
রাতে পাখিরা যেখানে কাটায়, সেখানে তাদের প্রায়শই এক পায়ে দাঁড়াতে দেখা যায়, বিশেষত পোষা পাখিদের মধ্যে। তখন তারা একটি পা পেটের নিচের পালকের মধ্যে রাখে ও ডানার পালকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। সারারাত এই ভঙ্গিতে কাটায়। তাহলে ঘুমানোর পর তারা কীভাবে টলমল করে না বা পড়ে যায় না? কোনও একটি পার্চিং পাখি তার শরীরের ওজন ব্যবহার করে তার গোড়ালির উপর চাপ দেয়। তাতে পায়ের টেন্ডন শক্ত হয় ও পায়ের আঙুলগুলি ডালের চারপাশে শক্ত করে ধরে রাখে। এই পার্চিং গ্রিপটি ততক্ষণ পর্যন্ত অবস্থানে আটকে থাকে, যতক্ষণ পাখির ওজন তার গোড়ালির উপর চাপ দিতে থাকে। তাই দুর্ঘটনাক্রমে তাদের পড়ে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকে না। তার ফলে পাখিটি পড়ে না গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। অনেক সময় হাঁসেদের তাদের ডানার নিচে মাথা রেখে এক পায়ে মাটিতে বিশ্রাম নিতেও দেখা যায়।

বিশ্ব রঞ্জন গোস্বামী
বিজ্ঞান লেখক। অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক, পশ্চিম বঙ্গ সরকার সদ্যস, জীব বৈচিত্র সংরক্ষন একাডেমি, কলকাতা ও বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটি।
