Astronomy-জ্যোতির্বিজ্ঞানFree Articles

ছায়াপথ সৃষ্টির নেপথ্যে

আমরা ছায়াপথ নক্ষত্রজগৎ বা Milky Way galaxy এর কোটি কোটি নক্ষত্রের মধ্যে এক প্রান্তে থাকা একটি মাঝারি মাপের নক্ষত্র সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকা তিন নম্বর গ্রহের বাসিন্দা। বিশালাকৃতির এই ছায়াপথ যার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে আলোর সময় লাগে ১০০-১৮০ বছর (আলো ১ সেকেন্ডে যেতে পারে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার মানে, ১ সেকেন্ডে আলো পৃথিবীটাকে প্রায় ৭ বার পাক দিয়ে আসবে)।

পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি

ছায়াপথ মহাবিশ্বের কোটি কোটি নক্ষত্রজগৎ এর একটি সাধারণ নক্ষত্রজগৎ মাত্র। কিন্তু কী করে এল এত গ্রহ, নক্ষত্র নিয়ে তৈরি এই বিশাল নক্ষত্রজগৎ?

প্রাচীন কালে মানুষেরা ভাবত কেউ বা কারা নিজের হাতে তৈরি করেছে এই মহাবিশ্ব – কখনও ইচ্ছাশক্তির দ্বারা, কখনও জল থেকে, কখনও কোনো দানবের দেহ থেকে এবং এরকম আরও অনেক কিছু। জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই পুরানো ধারণার ত্রুটি দেখতে পেল মানুষ, শুরু হল সংশোধন। প্রায় ৬০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে থালেস (Thales of Miletus) প্রথম এই সমস্ত পৌরাণিক ধারণা বড় বেশি মানবকেন্দ্রিক ও অবৈজ্ঞানিক বলে বিরোধিতা শুরু করেন। পরবর্তীকালে যখন নতুনভাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বের খোঁজ আরম্ভ হয় তখন প্লেটো অ্যারিস্টটলের ন্যায় দার্শনিকদের মতামত হয়ে ওঠে সর্বগ্রাহ্য। তাঁদের ধারণা অনুযায়ী – ‘ আগুন, জল, মাটি ও বাতাস তাদের বিভিন্ন অনুপাতের মিশ্রণে তৈরি হয়েছে গ্রহ-নক্ষত্র, চন্দ্র-সূর্য সব কিছু। ভগবান বা অন্য কারও ভূমিকা নেই এখানে। এমন এক মহাবিশ্বের ধারণা করা হল যার কেন্দ্রে আছে পৃথিবী আর তার চারিদিকে আবর্তনরত সূর্য সহ অন্যান্য গ্রহ এবং তারাগুলি একত্রে পৃথিবীর বাইরে বলয় (Geocentric model) সৃষ্টি করেছে।

ভূকেন্দ্রিক মডেল

পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের এই ধারণা পরবর্তী সময়ে লাভ করে চার্চের বদান্যতা, হয়ে ওঠে ধ্রুবসত্য । নিকোলাস (Nicholas of Cusa , 1440 . A . D .), পিকট্রো (Pictro Pompanozzi, 1462 – 1525 ), ব্রুনো (Giardio Bruno, 1548 – 1600) এর ন্যায় বিজ্ঞানমনস্ক প্রতিবাদীদের পেতে হয় নির্মম শাস্তি। চার্চের আধিপত্যকে অগ্রাহ্য করতে ভয় হয়। বিজ্ঞানের, কিন্তু থামে না তার অগ্রগতি, থামে না প্রশ্ন করার কিংবা উত্তর খোঁজার পালা। নিকোলাস কোপারনিকাস (1473 – 1543) প্রথম পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের বিরোধী ধারণা ছাপার অক্ষরে প্রকাশ করেন তাত্ত্বিকভাবে (যদিও তিনি নিজে বইটি প্রকাশ করেন তার মৃত্যুশয্যায়), এই তত্ত্বটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন গ্যালেলিও গ্যালিলেই (1564 – 1642 ) তার নির্মিত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে। প্রমাণিত হয় পৃথিবী অন্যান্য গ্রহের ন্যায় সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকা একটা সাধারণ গ্রহ। বিজ্ঞান আবার ভাবতে শুরু করে নতুন ভাবে।

সূর্য তার গ্রহদের নিয়ে চলা শুরু করল কী ভাবে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে 1796 সালে ল্যাপলাস (Marquis de Laplace) একটি প্রকল্পের ধারণা দেন। তিনি বললেন ধর একটি মহাজাগতিক মেঘ (Nebula ) ঘূর্ণনশীল অবস্থায় জমাট বাঁধতে শুরু করল। তখন বিভিন্ন ব্যাসার্ধে অতি বেগে ঘুরতে থাকার জন্য কিছু অংশ ছিটকে গিয়ে জমাট বেঁধে তৈরি হয়েছে গ্রহগুলো (যেমন সুতোয় ঢিল বেঁধে ঘোরালে তা ছিটকে যেতে চায় সেরকম), আর মেঘটা একটু একটু করে ছোট হয়েছে। এরকমই যখন মেঘটা এত বড় ছিল যে একপাক খেতে ১৬৫ বছর সময় লাগত তখন একটা অংশ ছিটকে তৈরি হয়েছে নেপচুন। আবার, যখন একপাক খেতে ১২ বছর লাগত তখন তৈরি হল বৃহস্পতি, আর এইভাবে ক্রমান্বয়ে ছোট হতে হতে বর্তমান অবস্থায় এসেছে সৌরজগৎ। যদিও পরে এই প্রকল্পের ক্রটি ধরা পড়ে এবং প্রমাণিত হয় সৌরজগৎ এইভাবে তৈরি হয়নি, কিন্তু ল্যাপলাসের এই প্রকল্প ভাবতে শেখাল বিশাল নক্ষত্রজগৎ সৃষ্টির রহস্যকে।

লাপ্লাসের নীহারিকা তত্ত্ব

সূর্যসহ সমস্ত নক্ষত্র একেকটা আগুনের গোলা, গ্যাসীয় পদার্থে পূর্ণ – যেখানে হাইড্রোজেন জ্বালানী নিরন্তর জ্বলে যাচ্ছে। নক্ষত্র তৈরির আগে যখন এই গ্যাসীয় পদার্থ অকেন্দ্রীভূত ভাবে ছড়িয়ে থাকে বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে মেঘের মতন, তখন ওই মহাজাগতিক মেঘকে বলে নেবুলা। এই নেবুলার অন্তঃস্থিত পদার্থ মহাকর্ষের টানে একত্রিত হতে শুরু করে এবং ঘুরতে থাকে। একত্রিত হওয়ার প্রবণতায় নেবুলার মাঝের অংশ ফুলে ওঠে ও প্রান্ত পাতলা হয়ে যেতে থাকে। নেবুলার মাঝের অংশ ফোলার সঙ্গে সঙ্গে তার ঘোরার বেগও বাড়তে থাকে এবং একসময় যখন ওর মাঝে টেনে রাখার ক্ষমতার চেয়ে বেশি পদার্থ চলে আসে তখন ওই গরম গ্যাসীয় পদার্থ ছিটকে যেতে শুরু করে। মাঝখান থেকে ছিটকে বেরোনো পদার্থের তাপমাত্রা নেবুলার চেয়ে কম হওয়ায় সেগুলি উজ্জ্বলতা নেবুলার চেয়ে কম হয়। ফলে সেগুলি কালো বলে মনে হয় এবং ছিটকে বেরোনোর মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পদার্থগুলি একটা আংটির মতো নেবুলার চারিদিকে অবস্থান করে। পাশ থেকে দেখলে নেবুলাটি দু-ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে হয়। নির্গত পদার্থগুলো কেন্দ্রীভূত ও ঘন হয়ে জন্ম নেয় নক্ষত্র, আর এই ভাবেই নেবুলা থেকে নক্ষত্র তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকায় তৈরি হয় নক্ষত্রজগৎ|

সাধারণত নিখুঁত বলয়াকৃতি (ring shaped ) পরিবর্তে ঘূর্ণণশীল নেবুলার দুটি বিপরীত প্রান্ত থেকে নির্গত পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে ঘূর্ণায়মান নেবুলার পাশে তৈরি হয় spiral বাহুর, যেখানে বাহুগুলিতে অবস্থিত পদার্থ জন্ম দেয় নক্ষত্রের। আর এভাবেই তৈরি হয়েছে নক্ষত্রজগৎ, তৈরি হয়েছে আমাদের সূর্যও। কিন্তু সময় লেগেছে বহু কোটি বছর।


শৌভিক দে

বর্তমানে সাংবাদিকতা ও গণ জ্ঞাপন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র। বিজ্ঞান জ্ঞাপন অবং ভ্রমণ বিষয়ে আগ্রহী।