কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা ও কিবেল ব্যালেন্স (Kibble balance)

আজকের আলোচনাটি বৈজ্ঞানিক যুক্তি তত্ত্বের নিরিখে বেশ জটিল। কিন্তু সমীকরণের আলোচনাতে না গিয়ে আমরা বিষয়টিকে সহজভাবে হাজির করার চেষ্টা করছি।
1990 সালে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। দু-রকমের মতামত উঠে আসে। একদল বিজ্ঞানী বললেন, সিলিকন পরমাণুর ভর দিয়ে কিলোগ্রামের সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব। কিভাবে? এক কেজি ভরের অতি বিশুদ্ধ সিলিকন-28 (সিলিকনের এই আইসোটোপ টি প্রকৃতিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, যার মধ্যে 14 টি প্রোটন ও 14 টি নিউট্রন আছে) এর সাহায্যে ভরকে পরিমাপ করা সম্ভব। কিন্তু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেকনোলজির (NIST) দুই বিজ্ঞানী Peter Mohr এবং Barry Taylor এর মতামত চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল। তারা কিবেল ব্যালেন্স (kibble balance) ব্যবহার করে ভর মাপতে সক্ষম হলেন 1999 সালে।
এই কিবেল ব্যালেন্স ঠিক কি এবং কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক। কিবেল তুলা যন্ত্র অত্যন্ত জটিল একটি হাতিয়ার, যা তড়িৎ-চুম্বকীয় মাপন পদ্ধতিতে ভরকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপতে পারে! কেন এই নামকরণ? ব্রিটেনের পদার্থবিদ Bryan Kibble (National Physics Laboratory বা NPL এর বিজ্ঞানী) 1985 সালে এই অতি সংবেদনশীল যন্ত্রটি তৈরি করেন। তার নামানুসারেই কিবেল ব্যালেন্স। এরপর 1980 সালে NPL ও NIST-এর বিজ্ঞানীরা কিবেল তুলা যন্ত্র ব্যবহার করে প্লাঙ্কের ধ্রুবকের মান নিখুঁতভাবে মাপতে উঠে পড়ে লাগলেন এবং তারা সক্ষমও হলেন এই জটিল কাজের সমাধান করতে।
প্লাঙ্কের ধ্রুবক কি? আমরা জানি, এই মহাবিশ্বে স্থানকাল আসলে ত্রিমাত্রিক চাদরের মতো। এই ত্রিমাত্রিক চাদরের সবথেকে ছোট একককে বলে ব্লাঙ্কের ধ্রুবক (h)। বিজ্ঞানী মোর এবং টেলার দাবি করলেন কিবেল তুলা যন্ত্রের সাহায্যে h এর নির্ণীত সঠিক মান ব্যবহার করে অজানা ভরের সুলুক সন্ধান পাওয়া অবশ্যই সম্ভব। আর এসবের হাত ধরে 2017 সালের মাঝামাঝি ইন্টারন্যাশনাল সাইন্টিফিক কমিউনিটি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন এবং তুলা যন্ত্রের সাহায্যে নিখুঁতভাবে ভর মাপতে সমর্থ হলেন।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা চান নিখুঁত থেকে নিখুঁততম মাপজোথ। আর তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পরীক্ষাগারে কম করে 6টি কিবেল ব্যালেন্স ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ভর মাপতে সক্ষম হলেন। CODATA Task Group on Fundamental Constants-এর বিজ্ঞানীরা সব কটি যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য হিসেব নিকেশ করে জানালেন, h (প্লাঙ্কের ধ্রুবক) এর মান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হয়েছে। h-এর মান পাওয়া গেল, 6.626070150 x 10^-34 Js, যেখানে ভুলের সম্ভাবনা 10 কোটি ভাগের মাত্র একভাগ। আর এই প্লাঙ্কের ধ্রুবকের নিখুঁত মানের সাহায্যে নতুন ভাবে কিলোগ্রাম কে মাপা সম্ভব হলো, m= h/c/ সমীকরণে h এর নিখুঁত মান, আলোর গতিবেগের (c) 9 সংখ্যার নিখুঁত মান, আর সিজিয়াম-133 থেকে প্রাপ্ত তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের মান বসিয়ে। এভাবেই বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতি হয় বহু অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে ও বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের মিলিত প্রচেষ্টার ফলে।
বিজ্ঞান প্রযুক্তি আজ আক্ষরিক অর্থেই আন্তর্জাতিক, আমরা যতই স্বদেশ স্বদেশ বা জাতীয়তাবাদ নিয়ে চিৎকার করি না কেন। বলে রাখা ভালো, জটিল সৌন্দর্যে ভরপুর কিবেল তুলাযন্ত্র চিরায়ত বলবিদ্যার সাথে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার যোগাযোগ ঘটিয়েছে পদার্থবিদ্যার প্রায় সব শাখাতে (ইলেকট্রনিক্স, তড়িৎচুম্বক, তাপগতিবিদ্যা, বলবিদ্যা, ইত্যাদি প্রভৃতি)। আর, এই ব্যালেন্সের সাহায্যেই অ্যাম্পিয়ার অর্থাৎ তড়িৎপ্রবাহের এককের নতুন সংজ্ঞা দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

সন্তোষ সেন
বিজ্ঞানের শিক্ষক ও বিজ্ঞান কর্মী। সংযোজনায় NISC-র সদস্য।
