Environment-পরিবেশFree ArticlesPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

সমুদ্রজলের সংকট

Sea-1

আমেরিকার স্মিথসোনিয়ান এনভারনমেন্টাল রিসার্চ সেন্টারের প্রখ্যাত মেরিন ইকোলজিস্ট এবং লেখিকা ডেনিস ব্রেইটবার্গের একটি বিবৃতি …

Oxygen is fundamental to life in the oceans. The decline in ocean oxygen ranks among the most serious effects of human activities on the earth’s environment.

হাঁ। বিগত 50 বছরে পৃথিবীর সমস্ত সাগর মহাসাগরে অক্সিজেনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে (40%) হ্রাস পেয়েছে এবং এই অক্সিজেন হ্রাসের পরিমাণ একই হারে অব্যাহত। আবহাওয়ার পরিবর্তন/উষ্ণায়ণ, সাগরজলের মাত্রাতিরিক্ত দূষণই যে এর জন্য দায়ি একথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। আসুন একটু গভীরে গিয়ে এর প্রকৃত স্বরূপ কিছুটা অনুধাবন করার চেষ্টা করি।

হেনরীর সূত্র অনুসারে আমরা জানি জলে বা যেকোন তরলে গ্যাসের দ্রাব্যতা তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পায়। কাজেই উষ্ণায়ণের ফলে আবহাওয়ার তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সমুদ্রের জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে, একথা সহজেই অনুমেয়।

এ তো গেল উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ফল। তবে এই উষ্ণতা বৃদ্ধির পরোক্ষ ফল কিন্তু আরও সুদূর প্রসারি। আসুন একটু বিশদে যাই।

যে বাতাসের অক্সিজেনে আমরা নিঃশ্বাস নিই তার 70% কিন্তু আসে সমুদ্রজল থেকে। সমুদ্রের জলে যে বিপুল পরিমাণ ফাইটোপ্লাঙ্কটন, কেলপ, এ্যালগী(algae) ইত্যাদি আছে এগুলিই হল অক্সিজেনের বিপুল উৎস। স্থলজ উদ্ভিদের মতই এইসব জলজ উদ্ভিদরাও ফটোসিনথেসিস’এর মাধ্যমে তাদের খাদ্য প্রস্তুত করে আর যার ফলে উৎপন্ন হয় প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন। বিভিন্ন প্রজাতির ফাইটোপ্লাঙ্কটনের মধ্যে একটি বিশেষ প্রজাতি হল প্রোক্লোরোকক্কাস (prochlorococcas)।

এই প্রজাতি প্রচুর পরিমাণ অক্সিজেন উৎপন্ন করে। এরা আকারে এতই ক্ষুদ্র যে এক ফোঁটা জলে কয়েক মিলিয়ন প্রোক্লোরোকক্কাস থাকতে পারে।পৃথিবীর সমস্ত সাগর মহাসাগরের জলে সবচাইতে বেশি যে ফটোসিনথেটিক অরগানিজম আছে তা হল এই প্রোক্লোরোকক্কাস প্রজাতি।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে আবহাওয়ার উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সব শ্রেণীর ফাইটোপ্লাঙ্কটনের গ্রোথরেট ভীষণ ভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ফলত এদের ফটোসিনথেসিস দ্বারা উৎপন্ন অক্সিজেনের পরিমাণ ও যেমন একদিকে কমে যাচ্ছে অন্যদিকে আবার কারবনডাইঅকসাইড’এর শোষণ (ফটোসিনথেসিস’এর প্রয়োজনে) ও কমে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের জলে প্রচুর কারবনডাইঅকসাইড গ্যাস জমতে থাকছে যা সমুদ্রের জলের এ্যাসিডিটির মাত্রা বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে। তাছাড়া বর্ধিত পরিমাণ কারবনডাইঅকসাইড উষ্ণতা বৃদ্ধির ও একটি কারণ।

এই প্রসঙ্গে আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল মানুষের দ্বারা সৃষ্ট মাত্রাতিরিক্ত দূষণের প্রভাব, বিশেষ করে সমুদ্রের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলির জলে অক্সিজেনের পরিমাণ এত দ্রুত হারে কমে যাচ্ছে যে কোন কোন সমুদ্রের উপকূলবর্তী কিছু কিছু অংশ ‘dead zone’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। (সারা পৃথিবীতে এরকম চিহ্নিত ‘dead zone’ এর সংখ্যা বর্তমানে চারশোরও অধিক) যেখানে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ এতটাই কম যে ঐ অঞ্চলগুলি সামুদ্রিক প্রাণীদের বাসের অনুপযুক্ত হয়ে গেছে। এর ফলে ঐ সব অঞ্চলের সামুদ্রিক প্রাণীরা অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে স্থান পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে। তবে এই স্থান পরিবর্তন কিন্তু মোটেই কোন সহজ সমাধান নয়। কারণ স্থান পরিবর্তনের পরে নতুন যে অঞ্চলে যায় (সাধারণত সমুদ্রের অপেক্ষাকৃত গভীরতর অঞ্চলে)। প্রথমত সেখানে উপযুক্ত খাদ্যের অপ্রতুলতা আর দ্বিতীয়ত শিকারি প্রাণী র (predators) উপদ্রব। এর ফল হল বহু সামুদ্রিক প্রাণীর জীবন সংশয়/অবধারিত মৃত্যু।

স্থান পরিবর্তনের আরও একটি ফল হল। বিশেষ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে কোন কোন পুরুষ প্রজাতির মাছ/সামুদ্রিক প্রাণী এই হ্রাসপ্রাপ্ত অক্সিজেনের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য রকমের কম এবং less motile স্পার্ম উৎপন্ন করে। আর এই শারীরিক পরিবর্তন একটি স্থায়ি পরিবর্তন। ভবিষ্যতে যথার্থ পরিমাণ অক্সিজেনের পরিবেশ পেলেও শারীরিক পূর্বাবস্থা কিন্তু আর ফিরে আসেনা। এছাড়াও কম অক্সিজেনের পরিবেশে শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিশক্তিও ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।

সবশেষে আসি আরও একটি বিপদজনক দিকের প্রসঙ্গে। জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকলে তার ফলে একাধিক গ্রীণহাউস গ্যাস যেমন নাইট্রাস অক্সাইড(এর গ্রীণহাউস এফেক্ট কারবনডাইঅকসাইডের গ্রীণহাউস এফেক্টের থেকে 300 গুণ বেশি), কারবনডাইঅকসাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড ইত্যাদির উৎপাদন সহজতর হয় এবং স্বভাবতই বৃদ্ধি পায়। আর এই পরিবর্তিত পরিবেশে অনেক সামুদ্রিক প্রাণী তাদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে হেরে যায় এবং ধীরে ধীরে তাদের বিলুপ্তি ঘটে। আর এসবের সামগ্রিক ফল হলঃ. বায়োডাইভারসিটির ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়ে চলেছে মারাত্মক ভাবে।

জার্মানির “হেলমহোলটজ সেনটার ফর ওসেন রিসার্চ কিয়েল” এর প্রখ্যাত ওসেনোগ্রাফার ওরসচলিস্ এর নেতৃত্বে গঠিত একটি টিম’এর সাম্প্রতিক একটি প্রজেক্ট ছিল। এঁরা সারা বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রের জলে অক্সিজেনের পরিমাপন করেছেন। আর তাঁদের এই সুদীর্ঘ পর্যবেক্ষণের শেষে ওরসচলিস’এর বিবৃতিটি এখানে তুলে দিলাম…

We are surprised by the intensity of the changes we saw, how rapidly oxygen is going down in the oceans and how large the effects on marine ecosystem are.

তথ্যসূত্রঃ-
  • Denise Breitburg et al: Declining oxygen in the global ocean & coastal waters. Science, 2018 DOI.10.1126/science acm 7240
  • Nature communications in 2016

ড.  অঞ্জনা ঘোষ

বিজ্ঞান লেখিকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অজৈব রসায়নে পিএইচডি | বর্তমানে অশোক হল বালিকা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সিনিয়র বিভাগ)-এর শিক্ষিকা।

Anjana Ghosh

বিজ্ঞান লেখিকা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অজৈব রসায়নে পিএইচডি | বর্তমানে অশোক হল বালিকা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (সিনিয়র বিভাগ)-এর শিক্ষিকা।