অঙ্ক শেখানোর গল্প

শিরোনামে ‘গল্প’ কথাটা থাকলেও আসলে এটা নির্ভেজাল সত্য কাহিনি। নোবেলজয়ী এক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর শিশু বয়সের এই অদ্ভুত ঘটনাটা জানা গিয়েছিল তাঁরই একটি ভাষণ থেকে।
বিজ্ঞানীর প্রকৃত নাম এখুনি জানাচ্ছি না , ধরা যাক তাঁর নাম ‘রিফা’। রিফার বাবা ছিলেন একটি পোশাক কোম্পানির সেলস ম্যানেজার। পোশাকের বিক্রিবাটা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও বিজ্ঞানের প্রতি ছিল গভীর টান। খেলার ছলে শিশু রিফাকে অঙ্ক শেখানোর জন্য এক অভিনব পদ্ধতির উপযোগ করেছিলেন তিনি। রিফার বয়স তখন খুবই কম। নিজের হাতে ফেলে-ছড়িয়ে খেতে পারে বটে , তবে প্লেটের নাগাল পাবার জন্য বসতে হয় বিশেষভাবে তৈরি উঁচু চেয়ারে। ডিনারের পর বাবার সাথে কিছুক্ষণ খেলার পরই ঘুমুতে যেত রিফা।
খেলার সরঞ্জাম হিসেবে একসময় আনা হল একবাক্স মেঝের পুরনো টালি — চৌকো আকারের, সাদা রঙের। খেলাটাও ছিল সাদামাটা। খাড়াভাবে টালিগুলোকে পরপর দাঁড় করানোর পর এক প্রান্তের টালিকে ঠেলা দিতে হত। টালিটা কাত হয়ে পড়ত পরেরটার ওপর। সেটা আবার কাত হয়ে ধাক্কা দিত তিন নম্বর টালিটাকে। এভাবে চলতে চলতে ক্রমান্বয়ে ধরাশায়ী হত সবগুলোই।দিনকয়েক পরে খেলায় এল বৈচিত্র্য। আনা হল অনেকগুলো নীল রঙের টালি। রিফাকে বলা হল একটা সাদা , দুটো নীল তারপর আবার একটা সাদা , দুটো নীল এভাবে টালিগুলোকে দাঁড় করাতে। রিফা বেশ মজা পেল। সাদা / নীল , নীল / সাদা / নীল , নীল — এই নিয়মে কিছুটা সাজানোর পর দুটো নীলের পর আরও একটা নীল বসানোর ইচ্ছে হল তার। শিশুসুলভ খেয়াল! কিন্তু বাদ সাধলেন বাবা । সাদা টালির নির্ধারিত স্থানে নীল টালি কিছুতেই বসাতে দেবেন না তিনি। হাত-পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল রিফা।
ব্যাপারটা নজরে এল রিফার মায়ের। তিনি স্বামীকে বললেন, “এই সামান্য কারণে জেদ করছ কেন! বেচারাকে ওর পছন্দমতো রঙেরই টালি বসাতে দাও না।“
রিফার বাবার জবাবটা ছিল ভারী অদ্ভুত। তিনি বললেন , “আপাতদৃষ্টিতে সামান্য বিষয় মনে হলেও আদপে এটা তা নয় । আসলে, আমি রিফাকে অঙ্কের প্রাথমিক পাঠ দিতে চাইছি। এক-দুই-তিন শিখবারও বয়েস হয়নি রিফার। তাই প্যাটার্ন কী , শুধু সেটাই ওকে চিনতে শেখাচ্ছি । ম্যাথমেটিক্সের মূল বিষয়ই হল প্যাটার্ন চিনতে পারা। খেলার ছলে এই ব্যাপারটাই ওর মাথায় ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করছি । তাই নিয়মমাফিক টালি সাজানোয় জোর দিতেই হচ্ছে।“
‘টালি সাজাও, ঠেলা লাগাও’ খেলার সুফল মিলল বছরখানেক বাদেই। এল স্কুলে ভর্তির সময়। সেই আমলে কিন্ডারগার্ডেন স্কুলে ভর্তির সময় এক বিচিত্র পরীক্ষা নেওয়া হত। একটা ফ্রেমে খাড়াভাবে পরপর রাখা কাপড়ের ফালির ভেতর দিয়ে বিভিন্ন রঙের সরু, লম্বা কাগজের টুকরো ‘বুনতে’ বলা হত বাচ্চাদের। কীভাবে করতে হবে সেটা অবশ্য বুঝিয়ে দেওয়া হত সকলকে। যাই হোক , বুনন-পরীক্ষা দিল রিফা । স্কুলের তরফে অভিভাবকদের জানানো হল, এক সপ্তাহের মধ্যেই বাড়িতে চিঠি দিয়ে ভর্তি-পরীক্ষার ফল জানানো হবে।
রিফার বুননের কাজ দেখে পরীক্ষক অভিভূত হলেন। রিফার নির্বাচনের খবর জানানোর চিঠিতে তিনি উল্লেখ করলেন , রিফার বুনন-কর্ম দেখে তিনি খুব অবাক হয়েছেন। কী করতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে রিফা যেন আগে থেকেই মনস্থির করে নিতে সক্ষম। এই বয়সে এরূপ ক্ষমতা আশ্চর্যজনক ।
গল্পের শেষ এখানেই। বাকি রয়েছে শুধু গল্পের নায়কের পরিচয় জানানো। অলোকসামান্য প্রতিভাধর এই পদার্থবিজ্ঞানীর নাম রিচার্ড ফেইম্যান (1918 – 1988)। গণিতে তাঁর পারদর্শিতা ছিল বিষ্ময়কর । পদার্থবিদ্যার কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা (কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডাইনামিক্স) অত্যন্ত জটিল গণিত- কন্টকিত একটি বিষয়। উচ্চতর গণিতে প্রগাঢ় জ্ঞান তাঁকে এই বিষয়ে অবাধ বিচরণের স্বাধীনতা দিয়েছিল। কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যায় মৌলিক অবদানের জন্য 1965 সালে ফাইনম্যান পেয়েছিলেন নোবেল পুরষ্কার।

সুজিতকুমার নাহা
বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক।
