Astronomy-জ্যোতির্বিজ্ঞানFree ArticlesPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

২০২৫ সালে জ্যোতির্বিদ্যার সেরা পাঁচ আবিষ্কার

discoveries-in-astronomy-in-2025

২০২৫ সালের শেষ। বছরজুড়ে নিত্যনতুন আবিষ্কার অবাক করে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে। মহাকাশপ্রেমীদের কাছে এই বছরটি ছিলো বর্ণময়।পৃথিবীতে বসে বিজ্ঞানীরা বছরভর খুঁজে গেলেন এক্সেপ্লানেট বা ভিনগ্রহীদের, পাওয়া গেল ক‍্যুইপার মতো বিশালাকৃতির মহাজাগতিক কাঠামো, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নায় ধরা পড়ল অলকানন্দা (আমাদের ছায়াপথের মতো দেখতে ), দেখা মিললো লেমন, 3I/ATLAS সহ হরেক রকমের ধুমকেতুর, আরও কত কী। এরই মাঝে একটিই ভয় বছরভর তাড়া করে বেড়ালো আমাদের-এই বুঝি বিশালকার কোনো গ্রহাণু ধাক্কা মারলো! সারা বছর ধরে ঘটে যাওয়া রোমাঞ্চকর পাঁচটি আবিষ্কারের কথা রইলো আজ।

এইবছর, ‘অ্যাস্ট্রোনমি ও অস্ট্রোফিজিক্স’ নামক জার্নালে প্রকাশিত ‘আনভিলিং দ‍্য লার্জেস্ট স্ট্র্যাকচার .…’ নামের গবেষণাপত্রটি কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্বের জগতে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্স ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্সের গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঠামো, ‘কুইপুকে’। রোস্যাট এক্স-রে স্যাটেলাইটের সাহায্যে নিকটবর্তী মহাবিশ্বের ম্যাপিংয়ের সময় ধরা পড়ে প্রায় ২০০ কোয়াড্রিলিয়ন সৌর ভরের (১ সৌর ভর= ১.৯৮৮৪১৬×১০৩০ কিলোগ্রাম) বিশালাকৃতির এই মহাজাগতিক কাঠামো। শুধু ভরের দিক থেকেই নয়, আকারের নিরিখেও এটি অকল্পনীয়; বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী এটি ৪২৮ মেগাপারসেক (১ ‘মেগাপারসেক’=৩২.৬ লক্ষ‍্ আলোকবর্ষ) জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই দানবাকার কাঠামোটি আকারে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের তেরো হাজার গুণ! জ্যোতির্বিদ্যায় মহাজাগতিক বস্তু সমুহের আকার বোঝাতে দৈর্ঘের বদলে ক্ষেত্রবিশেষ ‘সময়’ এর সাহায্য নেওয়া হয়। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে এটি অতিক্রম করতে আলোর সময় লাগবে ১৩ কোটি বছর!

Quipu
কুইপুর’ ত্রি মাত্রিক গঠনঃ সুত্র-ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্স

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের বিজ্ঞানী, হ্যান্স বোহরিঙ্গার ও তাঁর সহকর্মীরা এই বিশালকায় কাঠামোর নাম দিয়েছেন ‘কুইপু’ (Quipu)। এরকম অদ্ভুত নাম কেন? মধ্য আমেরিকার ইনকা সভ্যতার গণনা পদ্ধতিতে গিঁট বাঁধা দড়ির প্রচলন ছিল। ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরিতে কাজ করার সময় চিলির সান্তিয়াগোর কাছে একটি জাদুঘরে দড়িগুলো দেখেছিলেন বোহরিঙ্গার। সেই থেকে এই নামকরণ। আর একটি কারণ হলো অধিকাংশ গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলির দূরত্ব মাপা হয়েছিল চিলির সাউদার্ন অবজারভেটরিতে। মূলত একটি মোটা দড়ির চারপাশে বেশ কয়েকটি সরু দড়ি দিয়ে প‍্যাঁচ দেওয়া আছে ‘কুইপুর’ অবয়বে, ঠিক প্রাচীন ইনকা লিপির মতো।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণা প্রচলিত মহাজাগতিক মডেলগুলোকে আরো উন্নত করতে সাহায্য করবে। বিজ্ঞানী, গেইউং চোনের গলায় ফুটে ওঠে সেই সম্ভাবনার কথা-“ এইসমস্ত মহাজাগতিক পরিমাপগুলি যদি কেবলমাত্র কয়েক শতাংশের সংশোধন করা সম্ভব হয়, তবে মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণের নির্ভুলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এগুলি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে”।

প্রাচীন কাল থেকে দুরবীণে চোখ রেখে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে গেছেন বিজ্ঞানীরা। কালের আবর্তনে, তাঁদের হাতে এসছে হাবল জেমস ওয়েবের মতো শক্তিশালী সব টেলিস্কোপ। নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী, পৃথিবী থেকে ১২৮ আলোকবর্ষ দূরে ‘K12-18b’ নামক একটি গ্রহে খুঁজে পেয়েছেন প্রাণের অস্তিত্ত্ব।

Habitable-Zone-Exoplnet-K2-18b
JWST- MRI স্পেকট্রোগ্রাফ থেকে পাওয়া লেখচিত্রে DMS ও DMDS ইঙ্গিত মিলেছে (সূত্র- স্মিথ, মাধুসুদন) | ছবির সূত্রঃ eurekalert.org
K2-18-b-spectra
ছবির সূত্রঃ www.planetary.org

আমাদের পৃথিবীর চেয়ে ৮.৬ গুণ বড় এই গ্রহে ডাইমিথাইল সালফাইড (DMS) এবং ডাইমিথাইল ডাইসালফাইড (DMDS) নামে দুটি রাসায়নিক গ্যাসের অস্তিত্ত্ব খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা। মূলত সামুদ্রিক ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন-অ্যালগি উৎপন্ন করে এগুলি। অর্থাৎ, কোনও জৈবিক প্রক্রিয়ার ছাপ সেখানে থাকতে পারে বলে অনুমান করছেন গবেষকরা। প্রযুক্তির আরো উন্নতি হলে, সে বিষয়ে জোর দিয়ে কিছু বলা যাবে।

মঙ্গল গ্রহে জলের সন্ধান বিজ্ঞানীরা করে আসছেন অনেকদিন ধরে। জল মিললেই প্রাণ স্পন্দনের হদিশ পাওয়া যাবে তেমন নয়, কিন্তু জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জল। এবছরের ১০ সেপ্টেম্বর, নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণায় একদল বিজ্ঞানী দাবি করেছেন যে নাসার পার্সিভিয়ারেন্স রোভারে সংগৃহীত ‘চেয়াভা ফলস’ নামক পাথরের নমুনায় জীবনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তীরের মতো আকৃতি বিশিষ্ট ৬ বর্গফুটের দাগযুক্ত এই পাথরটি এমন এক জায়গায় (জেজেরো গর্তে) পাওয়া গেছে, যেখানে আগে নদী বইতো।

পার্সিভিয়ারেন্স রোভারে সংগৃহীত ‘চেয়াভা ফলস’ নামক পাথরের নমুনায় জীবনের চিহ্ন পাওয়া গেছে | ছবিঃ গুগুল

বিজ্ঞানীরা রোভারের পাওয়া পাথরটি থেকে ছোটো ছোটো নমুনা সংগ্রহ করে গত এক বছর ধরে পর্যালোচনা করেছেন। তাঁরা সেই নমুনার নাম দিয়েছেন ‘স্যাফায়ার ক্যানিয়ন’। প্রাথমিক বিশ্লেষণে তাঁরা দাবি করেছেন যে পাথরটি জৈব যৌগে সমৃদ্ধ। এতে মিলেছে ভিভিয়ানাইট নামের এক ধরনের লোহার ফসফেট, যা পৃথিবীতে পচনশীল জৈব পদার্থের কাছে খুঁজে পাওয়া যায়; এছাড়াও পাওয়া গেছে গ্রেইজাইট নামক লোহার সালফাইড। সাধারণত পৃথিবীতে এদের মিশ্রণকে সম্ভাব্য জীবনের ছাপ হিসেবে দেখা হয়।

‘চেয়াভা ফলসের ‘ গায়ে লম্বা লম্বা দাগ দেখতে পাওয়া গেছে, এটি প্রমাণ করে যে পাথরের ভেতর দিয়ে একসময় জলপ্রবাহ হতো। বিজ্ঞানীদের অনুমান এই দাগগুলোর পিছনে রয়েছে প্রাচীন অণুজীব সম্পর্কিত কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়া। তবে এ ব্যাপারে তাঁরা এখনই নিশ্চিত নন; কোনো অজ্ঞাত রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্যেও এমনটা হতে পারে। ২০২১ সাল থেকে মঙ্গল গ্রহের বিভিন্ন প্রান্তের নমুনা সংগ্রহ করে ১০টি টাইটানিয়ামের বাক্সে সংরক্ষণ করা আছে, সেগুলোকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আরও নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে। অতএব কোটি কোটি বছর আগে সত‍্যি মঙ্গলে প্রাণের স্পন্দন ছিল কিনা, থাকলে কত বছর ধরে ছিল, সেখানকার জলবায়ুর এই দশা কী করে হলো, এসব জানতে গেলে আমাদের হয়তো আরো কিছু বছর অপেক্ষা করতে হবে।

আমাদের সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহের চাঁদের সংখ্যা বিভিন্ন; সবচেয়ে বড়, বৃহস্পতির আছে ৯৫টি, শনির আছে ২৭৪টি, পৃথিবীর আছে একটি মাত্র উপগ্রহ। আবার বুধ বা শুক্রের কোনো উপগ্রহ নেই। সম্প্রতি, বিজ্ঞানীরা S/2025U1 নামক ইউরেনাসের নতুন এক চাঁদের সন্ধান পেয়েছেন, যার ব্যাস মাত্র ১০ কিলোমিটার। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এতদিন নজরে পড়ছিল না জ্যোতির্বিদদের। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ইনফ্রারেড ক্যামেরায় গত ২ ফেব্রুয়ারি এই চাঁদটির সন্ধান মেলে। বর্তমানে, ইউরেনাসের মোট উপগ্রহ ২৯ টি। ইউরেনাসের চারপাশে ১৩টি রিং আছে, বিজ্ঞানীদের ধারণা এগুলোর আড়ালেই আরো চাঁদ লুকিয়ে আছে। সুতরাং বরফ শীতল এই গ্রহের মোট কটি চাঁদ আছে, তার জন্য আমাদেরকে আরো অপেক্ষা করতে হবে।

S/2025U1 নামক ইউরেনাসের নতুন এক চাঁদ | ছবিঃ en.wikipedia.org/

এ বছর অক্টোবরে দেখা মিলেছিল সোয়ান (C/2025 R2) ও লেমন (C/2025 A6) নামক জোড়া ধুমকেতুর। আবার, গত জুলাই থেকে মহাকাশ প্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল 3I/ ATLAS নামের আন্তনাক্ষত্রিক ধূমকেতু। সম্প্রতি, ১৯শে ডিসেম্বর পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে (আনুমানিক ১.৮ আস্ট্রনমিক্যাল ইউনিট দূরে) আসে এই মহাজাগতিক বস্তুটি। কি এই 3I/ATLAS?

এটি সাধারণত কঠিন বরফ (জল, কার্বন ডাই অক্সাইড ইত্যাদি) এবং ধুলো ও পাথরের সমন্বয়ে গঠিত এর কেন্দ্রটি ০.৬ থেকে ৫.৬ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, যাকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে গ্যাস ও ধুলোর মেঘ। দেখতে অনেকটা উল্টানো ঝাঁটার মতো, যাকে বলা হয় ‘অ‍্যান্টি-টেইল। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ল্যারি ডেননিউ ২০২৫ সালের ১লা জুলাই রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এই মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পান।

3I/ATLAS | ছবিঃ science.nasa.gov

অ্যাস্টরেয়ড টেরেস্ট্রিয়াল ইমপ্যাক্ট লাস্ট অ্যালার্ট সিস্টেম (ATLAS) এর সাথে যুক্ত ছিলেন ডেননিউ, যার কাজই হলো পৃথিবীর ওপর আঘাত হানতে পারে এমন গ্রহাণু বা মহাজাগতিক বস্তুর ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা। এটি হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাস্ট্রোনমির অধিনে রয়েছে। হাওয়াইতে দুটো ও দক্ষিণ গোলার্ধে আরো দুটো, মোট চারটি টেলিস্কোপের সাহায্যে মহাকাশে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালায় ATLAS, যাতে কোনো মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর সীমার কাছে পৌঁছানোর অনেক আগেই টের পাওয়া যায়।

২০২৫ সালের ২১ শে জুলাই, হাবলের তোলা ছবিতে অ্যান্টি-টেইল এর উপস্থিতি টের পান বিজ্ঞানীরা । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তখন সূর্যাভিমুখী 3I/ATLAS এর পৃথিবী থেকে দূরত্ব ছিল ২.৯৮ AU; পরবর্তীতে ৩০শে নভেম্বর, হাবলের তোলা ছবিতেও এই উল্টানো ঝাঁটার মতো অ্যান্টি-টেইল লক্ষ্য করা যায় । বিজ্ঞানীদের ধারণা, 3I/ATLAS এর ভেতরে থাকা পদার্থগুলি হয়তো সেই সময়ের সাক্ষী, যখন আমাদের এই সৌরজগৎ সৃষ্টিই হয়নি।


Dr Shamim Haque Mondal

ড.শামীম হক মন্ডল

নিবন্ধকার পশ্চিমবঙ্গ বিচার সহায়ক পরীক্ষাগারের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে কর্মরত এবং আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব গবেষক।