ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
এক জোড়া ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’ আবিষ্কার করে প্রশান্ত মহাসাগরের পারাপারের দু’জন বিজ্ঞানী জিতে নিলেন ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কার। এ ‘ব্রেক’ গাড়ির নয়, দেহকোষের। দেহের সব রকমের কোষে এই ‘ব্রেক’ থাকে না, দেহের অনাক্রম্যতন্ত্রের এক বিশেষ ধরনের কোষে থাকে এই ‘ব্রেক’। ওই বিশেষ ধরনের কোষের নাম টি-লসিকাকোষ (টি-লিম্ফোসাইট)।
যে দু’জন বিজ্ঞানী এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন তাদের নাম জেমস পি. এলিসন ও তাসুকু হঞ্জো। প্রথম জন আমেরিকার বিজ্ঞানী , দ্বিতীয় জন জাপানের। আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে এই দু’জন বিজ্ঞানী দুটো আলাদা ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’ আবিষ্কার করেছেন যাদের কাজ প্রায় একই রকমের।
এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ক্যান্সারের চিকিৎসায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে নোবেল কমিটির ধারণা। এবার আমরা ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টা করব এই গবেষণার বিষয়টি ও তার গুরুত্ব।
দেহের অনাক্রম্যতন্ত্র কিভাবে কাজ করে?
স্কুল পাঠ্য বইয়ে আমরা পড়েছি যে, রক্তে আছে দুই রকমের কোষ — লাল রঙের লোহিত রক্তকোষ এবং সাদা রঙ-এর শ্বেত রক্তকোষ। লোহিত রক্তকোষ কোষকলায় অক্সিজেন জোগায়। শ্বেত রক্তকোষ হল দেহের জওয়ান যারা বহিরাগত শত্রুর আক্রমণ থেকে দেহকে সুরক্ষা দেয়। রক্তের স্রোতে বাহিত হয়ে এরা সারা দেহে ঘুরে বেড়ায় এবং যখনই কোনো বহিরাগত জীবাণু-ভাইরাস-পরজীবী-ছত্রাক এদের নজরে আসে তখনই এরা তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে ওদের ধ্বংস করে। ক্যান্সার কোষকেও এভাবে ওরা মেরে ফেলতে পারে। শ্বেত রক্তকোষের এই ক্ষমতারই পোশাকি নাম হল অনাক্রম্যতা বা ইমিউনিটি। শ্বেত রক্তকোষ আবার অনেক রকমের। ওদের কাজকর্মও আলাদা রকমের। কেউ জীবাণুকে গিলে খায়, কেউ বানায় জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিবস্তু (আন্টিবডি) যা জীবাণুর গায়ে লেগে গিয়ে জীবাণুকে নিস্ক্রিয় করে দেয়। কেউ আবার বহিরাগত শত্রুদের সারা জীবনের জন্যে চিনে রাখে যাতে অনুপ্রবেশের সাথে সাথে ওদের উপর ঝাপিয়ে পড়তে পারে। শেষোক্ত ওই কোষের নাম লসিকাকোষ বা লিম্ফোসাইট। লসিকাকোষ আবার দুই রকমের —
বি-লসিকাকোষ এবং টি-লসিকাকোষ। এই টি-লসিকাকোষই বর্তমানের আলোচ্য বিষয়।
টি-লসিকাকোষ কিভাবে কাজ করে?
অস্থিমজ্জায় জন্ম নিয়ে লসিকাকোষ দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। এক দল অস্থিমজ্জায় পরিপূর্ণতা লাভ করে বি-লসিকাকোষে পরিণত হয়। অপর দল অস্থিমজ্জা থেকে চলে যায় থাইমাস গ্রন্থিতে। ওখানে ওরা প্রশিক্ষণ পায় কিভাবে স্বকীয় প্রোটিন থেকে পরকীয় প্রোটিনকে আলাদাভাবে চিনতে হয়। স্বকীয় অর্থাৎ দেহের নিজস্ব প্রোটিন। পরকীয় প্রোটিন অর্থাৎ দেহের বাইরের প্রোটিন। থাইমাস গ্রন্থিতে প্রশিক্ষিত এই ধরনের লসিকাকোষকে বলা হয় টি-লসিকাকোষ। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লসিকাকোষ বেশ দীর্ঘায়ু। এরা মনে রাখে কোন প্রোটিনকে রক্ষা করতে হবে আর কোন প্রোটিনকে আক্রমণ করতে হবে। এই হিসাবের যখন গোলমাল হয় তখন টি-লসিকাকোষ ভুল করে দেহের নিজস্ব কোষকে আক্রমণ করে বসে। এর ফলে যে রোগ দেখা দেয় তার নাম স্ব-অনাক্রম্য রোগ (অটো-ইমিউন ডিজিজ)।
ক্যান্সার কোষের গায়ের প্রোটিনকে ওরা চেনেনা বলে ক্যান্সারের কোষকে ওরা পরকীয় প্রোটিন বলে আক্রমণ করতে পারে এবং ধ্বংস করতে পারে। টি-লসিকাকোষের এই ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বিগত একশো বছর ধরে ক্যান্সারের চিকিৎসার ওষুধ বের করার বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রচেষ্টাই তেমন কার্যকরী ও ফলপ্রসূ হয়নি।
এলিসনের গবেষণা:
ঊনবিংশ শতকের শেষের দশকে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাগারে বসে জেমস পি এলিসন টি-লসিকাকোষের গায়ে এমন একটি প্রোটিনের উপস্থিতি লক্ষ করলেন যা টি-লসিকাকোষের ক্যান্সারনাশী অনাক্রম্য ক্ষমতাকে ‘ব্রেক’ মেরে দমিয়ে রাখে। এই প্রোটিনটির নাম ‘CTLA-4’। সেকালের অনেক বিজ্ঞানীই এই প্রোটিনটির কথা জানতেন এবং তাদের অনেকেই এই প্রোটিনটিকে কাজে লাগিয়ে স্ব-অনাক্রম্য রোগের চিকিৎসা করা যায় কিনা তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু আলিসনের চিন্তাভাবনা ছিল একটু অন্য রকমের। তিনি ভাবলেন, এই ব্রেককে যদি কোনোভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া যায় তাহলে হয়তো টি-লসিকাকোষের ক্যান্সারনাশী ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেওয়া যাবে।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সেই উদ্দেশ্যে তিনি CTLA-4 প্রোটিনকে আলাদা করে ফেললেন এবং তা প্রাণীদেহে ইনজেকশন দিয়ে বানাতে সমর্থ হলেন এমন এক প্রতিবস্তু (এন্টিবডি) যা ওই প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম। অর্থাৎ নির্মিত হল এমন এক জিনিস যা ‘CTLA-4 ব্রেক’-কে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে টি-লসিকাকোষের ক্যান্সারকোষনাশী ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেবে। ফলে সেরে যাবে ক্যান্সার নামক মারণ ব্যাধি।
এবার এই ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’ প্রতিবস্তুকে ইনজেকশন দেওয়া হল একটা ক্যান্সারগ্রস্ত ইঁদুরের দেহে। সেটা ১৯৯৪ সালের কথা। তিনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলেন যে, সেই ইঁদুরের ক্যান্সার রোগ সেরে গেল। বারংবার পরীক্ষা করে একই ফল পাওয়া গেল। প্রমাণিত হল এই ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’-এর ক্যান্সারনাশী ক্ষমতা।
২০১০ সালে এই ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’-কে মানব দেহে প্রয়োগ করার সুযোগ এলো। ‘ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমা’ নামক এক মারাত্মক চর্মক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর দেহে প্রয়োগ করে বেশ ভালো ফল পাওয়া গেল। সেরে না গেলেও রোগকে উপশমিত রাখা সম্ভব হল। ক্যান্সার চিকিৎসার অস্ত্রভাণ্ডারে যোগ হলো আর একটি নতুন অস্ত্র।
তাসুকু হোঞ্জোর গবেষণা:
প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পাড়ে কায়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক গবেষণাগারে বসে জাপানি বিজ্ঞানী তাসুকু হোঞ্জো টি-লসিকাকোষের গায়ে খুজে পেলেন আর একটা ‘ব্রেক-প্রোটিন’ যার নাম ‘PD-1’। এটি ‘CTLA-4’-এর থেকে আলাদা এবং কর্মপদ্ধতিও আলাদা কিন্তু কাজ প্রায় একই। এই ‘ব্রেক-প্রোটিন’-কে নিষ্ক্রিয় করে দেখা গেল যে, টি-লসিকাকোষের ক্যান্সারনাশী ক্ষমতা বেড়ে যাচ্ছে। এই ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’-কে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনি ক্যান্সার, লিম্ফোমা এবং মেলানোমার মত ক্যান্সার রোগীর দেহে প্রয়োগ করে ক্যান্সারকোষ নিধন করা গেল। এই ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’ খুব কার্যকরী এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘CTLA-4’নিষ্ক্রিয়ক’-এর চেয়েও বেশি কার্যকরী। হালের গবেষণায় জানা গেছে যে, এই দুটো ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’ একসাথে প্রয়োগ করলে আরো ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে।
উপসংহার:
কেন যে ক্যান্সার হয় তার কারণ এখনো অবধি জানা যায়নি। পূর্ণবিভেদিত সুস্থ দেহকোষের অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনই এর কারণ। কেন যে পূর্ণাঙ্গ কোষ আবার আদিম দশায় ফিরে যায় এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে তার কারণ মানব জাতি এখনো অবধি জানতে পারেনি। ফলে ক্যান্সারের কোনো মূলগত চিকিৎসা আজ অবধি বের হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতে হবে। যতদিন তা না হচ্ছে উপশমক চিকিৎসাতেই আমাদের খুশি থাকতে হবে।
ক্যান্সার চিকিৎসার তূণে যেসব অস্ত্র বর্তমানে মজুত আছে তারা হল শল্য চিকিৎসা, রাসায়নিক চিকিৎসা (কেমোথেরাপি) , তেজস্ক্রিয় বিকিরণ চিকিৎসা (রেডিয়োথেরাপি), হরমোন চিকিৎসা এবং অনাক্রম্য চিকিৎসা (ইমিউনোথেরাপি)। এবার এদের সংগে যোগ হল ‘ব্রেক-নিষ্ক্রিয়ক’ চিকিৎসা। নতুনতম এই চিকিৎসা ক্যান্সার রোগীকে কতটা আরাম দেবে এবং কতখানি আয়ু বাড়াবে তা মহাকালই বিচার করবে।

ড. নৃপেন ভৌমিক
অধ্যাপক ও বিভাগিয় প্রধান, শ্নায়ুশল্য বিভাগ, কেপিসি মেডিকাল কলেজ, কলকাতা
