Biography-জীবনীFree Articles

ভারতীয় ভূতত্ত্ব বিদ্যার জনক ‘দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া’

Darashaw Nosherwan Wadia

দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া ছিলেন ভারতীয় ভূতত্ত্ব বিদ্যার জনক ও স্বনামধন্য জীবাশ্মবিশেষজ্ঞ (Paleontologist)। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রথম নন ইউরোপিয় ডিগ্রিধারী ভারতীয় বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি । হিমালয়ের স্তর বিন্যাসের (Stratigraphy Of Himalaya) ওপর তিনিই প্রথম কাজ করেন। তাঁর ভূতাত্ত্বিক গবেষণা এবং তাঁর ধনাত্মক বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ভারতবর্ষের সার্বিক উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করেছিল।

দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া (Darashaw Nosherwan Wadia) গুজরাটের সুরাট শহরে ১৮৮৩ সালের ২৩সে অক্টোবর মাসে এক ঐতিহাসিক পার্শী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ওয়াদিয়া পরিবারের ছিল জাহাজ তৈরির ব্যবসা। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে ব্যবসা, বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষার জগতেও ওয়াদিয়ারা এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। পিতা নশেরওয়ান ওয়াদিয়া ও মাতা কুভারবাইয়ের ন’টি সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সন্তান ছিলেন দারাশাউ।

নশেরওয়ান ওয়াদিয়া গুজরাটের একটি ছোট্ট শহরে স্টেশন মাস্টার ছিলেন। পড়াশুনার সেরকম সুযোগ সেখানে ছিল না। তাই দারাশাউ সুরাটে ঠাকুমার কাছে থেকে প্রথমে একটি গুজরাটি স্কুল ও পরে স্যার, জে জে ইংলিশ স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। ১১ বছর বয়সে তাঁর পরিবার বরোদায় স্থানান্তরিত হলে তিনি বরোদা হাইস্কুলে ভর্তি হন। স্কুলের পাঠ সম্পূর্ণ করে বরোদা কলেজে ভর্তি হন। প্রানীবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, ও ভূতত্ববিদ্যা ক্রমান্বয়ে এই তিনটি বিষয়ে তিনি বি.এসসি (B.Sc) ডিগ্রি অর্জন করেন। বরোদা কলেজের ন্যাচারাল হিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক আদারজী এম মাসানির সাহচর্যে ভূতত্ববিদ্যার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। বরোদা কলেজে সেইসময় ভূতত্ববিদ্যা পঠন পাঠনের যথোপযুক্ত পরিকাঠামো না থাকায় ওয়াদিয়া প্রায় নিজের প্রচেষ্টায় এই বিষয়টি অধ্যয়ণ করেন। ১৯০৬ সালে জীববিদ্যা ও ভূতত্ববিদ্যায় তিনি এম.এসসি (M.Sc) ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯০৭ সালে কাশ্মীরের প্রিন্স অফ ওয়েলস কলেজে (অধুনা মহাত্মা গান্ধী কলেজ নাম পরিচিত) অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন।১৪ বছর এখানে অধ্যাপনা করেন।ছাত্র জীবনে ভুতত্ত্ব বিদ্যার সেরকম পরিকাঠামো পাননি বলে ছাত্রদরদী ওয়াদিয়া ছাত্রদের সবরকম ভাবে সাহায্যের চেষ্টা করতেন। এই সময় হিমালয়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তিনি ভূতাত্বিক সমীক্ষা চালান। সংগৃহীত খনিজ, প্রস্তরখণ্ড ,ফসিল তিনি ছাত্রদের স্যাম্পল স্পেসিমেন হিসাবে দেখাতেন। কখনো কখনো তিনি ছাত্রদের এডভেঞ্চার ট্রেকিং-এ নিয়ে যেতেন।শিবালিক হিমালয়ে এইরকমই এক ট্রেকিং-এর সময় তিনি বিশালাকৃতি আধুনিক হাতির পূর্বপুরুষ Stegodon ganesa-এর ৩ মিটার দীর্ঘ প্রস্তরীভূত একটি দাঁতের ফসিল আবিষ্কার করেন যা জম্মু বিশ্ববিদ্যয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে এখনো সংগৃহীত আছে কাশ্মীর হিমালয়ের গঠন, স্তরবিন্যাস, বিভিন্ন স্তরে জীবাশ্মের উপস্থিতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তিনি গবেষণা করেন। উত্তর পশ্চিম হিমালয়ের বিশদ গঠনের ওপরও তিনি পরীক্ষা চালান।

১৯২১ সালে প্রিন্স অফ ওয়েলস কলেজে ইস্তফা দিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট পদে তিনি যোগ দেন ”জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে”।ওয়াদিয়া ছিলেন GSI এর ইতিহাসের প্রথম ভারতীয় যাঁর কোনো ইউরোপিয় ডিগ্রি ছিল না। ওয়াদিয়া পেয়ে গেলেন গবেষণা করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ। উত্তর পশ্চিম হিমালয়ের গঠন, স্তরবিন্যাসের ওপরই শুধু গবেষণা করলেন না ,শুরু করলেন সেই অঞ্চলের মানচিত্র তৈরির মতো একটি দুরূহ ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ। তিনি মধ্য ও নিম্ন হিমালয়ের (Middle And Lesser Himalaya) অন্তর্গত কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার প্রায় ২০০০ বর্গ মাইল সহ সংলগ্ন পাঞ্জাবের প্রায় ২১০০ বর্গ মাইলের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র (Geological Map) প্রস্তুত করেছেন।

হিমালয়ের যে স্থানেই তিনি গেছেন সেখানকার স্তরবিন্যাস ও টেক্টোনিকের ওপর আলোকপাত করেছেন। ওয়াদিয়া প্রায় ১০০র ওপর রিসার্চ পেপার,নানা বিষয়ের ওপর মনোগ্রাফ (Monograph) এবং জিওলজিকাল সার্ভের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখেছেন।তিনি মধ্য ও নিম্ন হিমালয়ের (Middle And Lesser Himalaya) অন্তর্গত কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার প্রায় ২০০০ বর্গ মাইল এবং সংলগ্ন পাঞ্জাবের প্রায় ২১০০ বর্গ মাইলের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র (Geological Map) প্রস্তুত করেছেন। হিমালয়ের যে স্থানেই তিনি গেছেন সেখানকার স্তরবিন্যাস ও টেক্টোনিকের ওপর আলোকপাত করেছেন। ওয়াদিয়া প্রায় ১০০-র ওপর রিসার্চ পেপার,নানা বিষয়ের ওপর মনোগ্রাফ(Monograph) এবং জিওলজিকাল সার্ভের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখেছেন। সুদূর উত্তর পশ্চিম কাশ্মীরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বুঝতে ওয়াদিয়ার কাজ সাহায্য করে। অনেক দুর্যোগ অতিক্রম করে নাঙ্গা পর্বত ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, শিলা ও খনিজের সংযুক্তির বিশ্লেষণ এবং সেখানকার ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র প্রস্তুত করেন। নাঙ্গা পর্বতশ্রেণীতে হাঁটুর মতো বাঁক(Knee Bend) বা সিনট্যাক্সিসের উপস্থিতির কারণ তিনি বিশ্লেষণ করেন।

১৯২৮ সালে লোয়ার গন্ডোয়ানা ল্যান্ডের গঙ্গামপ্টেরিস (Gangamopteris) উপত্যকা থেকে এক্টিনোডনের (Actinodon) একটি খুলি (Skull), গ্যানোইড মাছ (Ganoid fish) ও, টেরিডোস্পেরমাসের (Pteridospermous) যে জীবাস্ম (Fossil) ওয়াদিয়া আবিষ্কার করেন তার থেকে অনুমান করা যায় ৩৫৫-২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে কাশ্মীর হিমালয় সৃষ্টি হয়েছিল ।

১৯৩৫ সালে এম এস কৃষ্ণান এবং পি এন মুখার্জির সাথে যৌথ ভাবে জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে ভারতের প্রথম মৃত্তিকা মানচিত্র (Soil Map) প্রকাশ করেন। ভারতবর্ষের কৃষির উন্নতির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড়ো পদক্ষেপ।

১৯৩৫ সালে অক্সফোর্ডে অর্নুষ্ঠিত তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ সয়েল সায়েন্স-এ (International Congress Of Soil Science) তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন ও ইংল্যান্ড,ওয়েলস,স্কটল্যান্ডের সয়েল প্রোফাইল অধ্যয়ণ করার সুযোগ পান। তিনি হল্যান্ডের হিরলিনে (Heerlen) অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ কার্বোনিফেরাস স্ট্রেটিগ্রাফির দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগ দেন।

১৯১৯ সালে জিওলজি অফ ইন্ডিয়া (Geology Of India) নামে ভারতে ভূতত্ত্বের প্রথম পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ভূতাত্ত্বিক রূপ বৈচিত্র্য এই পুস্তকে তিনি বর্ণনা করেন। জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন ডিরেক্টর আর. ডি. ওয়েস্ট এই পুস্তকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। এই পুস্তকটি রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দেয়। ছাত্র শিক্ষক নির্বিশেষে সমগ্র পৃথিবীর ভূতত্ত্ববিদ্যার সর্ব স্তরের মানুষদের কাছে এটি অত্যন্ত সমাদৃত হয়। লন্ডনের ম্যাকমিলান কম্পানী থেকে পরপর ৬ টি সংস্করণ বার হয় পুস্তকটির।
সিন্ট্যাক্সিস অফ নর্থ ওয়েস্টার্ন হিমালয়াস, মিনারেলস এন্ড মেটাল রিসোর্সেস অফ ইন্ডিয়া,জিওলজি অফ নাঙ্গা পর্বত এন্ড গিলগিট ডিস্ট্রিক্ট সহ বিভিন্ন পুস্তক তিনি রচনা করেন।

তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে জীবাশ্মবিদবিদ হিসাবে দু বছর (১৯২৬-১৯২৭) থাকাকালীন পটওয়ার ও কাশ্মীর থেকে প্রাপ্ত মেরুদন্ডী প্রাণীর ফসিল নিয়ে কাজ করেন। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, চেকস্লোভাকিয়ার বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সংস্থায় পরিভ্রমণ করেন। জেনেভায় আলপাইন জিওলজির ওপর পড়াশুনা করেন।

১৯৩৫ সালে চিন, জাপান, ইউ এস এ, পরিভ্রমণ করেন। ১৯৩৭ সালে মস্কোতে ইন্টারন্যাশনাল জিওলজি ক্যাল কংগ্রেসে তাঁর বিখ্যাত গবেষণা পত্র “টেক্টোনিক রিলেশনস অফ দা হিমালয়াস উইথ নর্থ ইন্ডিয়ান ফোরল্যান্ড” (Tectonic Relations Of The Himalayas With The North Indian Foreland) প্রকাশ করেন।
১৯৩৮ সালে জিওলজিকাল সার্ভে থেকে অবসর গ্রহণের পর শ্রীলংকার গভর্নমেন্ট মিনেরালজিসট পদে নিযুক্ত হন। দ্বীপভূমিতে পানীয় জলের সম্ভাব্য উৎসস্থল , বাঁধ নির্মাণের উপযুক্ত স্থান বিষয়ক ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তিনি অঙ্কন করেন। কলম্বোর মানচিত্র তাঁর হাতেই তৈরি।

১৯৪৫ সালে জহরলাল নেহেরুর জাতীয় সরকারে তিনি ভূতাত্ত্বিক উপদেষ্টা (Geological advisor) নিযুক্ত হন ও ভারতের জন্য একটি খনিজ নীতি (Mineral Policy) প্রণয়ন করেন।

১৯৫৮ সালে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কার পান। ভারত সরকার কর্তৃক ভূতত্ববিদ্যার প্রথম জাতীয় শিক্ষক (National Professor) মনোনীত হন।

বিভিন্ন সন্মান জনক পদে তিনি আসীন ছিলেন। যেমনঃ-

  • জিওলজিকাল সোসাইটি অফ লন্ডনের কমনওয়েলথ সদস্য
  • ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স, ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট (১৯৪৬-৪৭)
  • ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রেসিডেন্ট (১৯২১,১৯৩৮)
  • ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের জেনারেল প্রেসিডেন্ট (১৯৪২,৪৩)
  • ক্যালকাটা জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট
  • ন্যাশনাল কমিটি অফ ওসেনিক রিসার্চের চেয়ারম্যান
  • শুধু তাই নয় ,তিনি আমেরিকার জিওলজিকাল সোসাইটির একজন করেসপন্ডেন্ট এবং জার্মান ও বেলজিয়ান জিওলজিকাল সোসাইটির সম্মানীয় সদস্য ছিলেন।

তিনি বহু পুরস্কার ও সন্মানে ভূষিত হয়েছেন। যেমনঃ-

  • ফেলো অফ রয়াল সোসাইটি , লন্ডন(১৯৫৭)
  • ব্যাক অ্যাওয়ার্ড, রয়াল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি(১৯৩৪)
  • জয় কিষেন গোল্ড মেডেল , ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সাইন্স (১৯৪৪)
  • জগদীশচন্দ্র বোস মেমোরিয়াল মেডেল , রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি (১৯৪৭)
  • লিওপোল্ড ভন বুক অ্যাওয়ার্ড, জার্মান জিওলজিকাল সোসাইটি (১৯৬০)
  • খৈতান গোল্ড মেডেল, এশিয়াটিক সোসাইটি (১৯৬৪)।

১৯৬৯ সালের ১৫ই জুন , ৮৬ বছর বয়সে ভারতের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়ার মৃত্যু হয়। ১৯৮৪ সালে ওয়াদিয়ার স্মরণে ভারতীয় ডাক বিভাগ থেকে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়।কর্মযোগী এই বিজ্ঞানীর স্মরণে দেরাদুনের ইন্ডিয়ান ইন্সিটিউট অফ হিমালায়ান জিওলজির নাম ওয়াদিয়া ইন্সিটিউট অফ হিমালায়ান জিওলজি রাখা হয়।


অরুন্ধতী চৌধুরী

স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।