আরব সাগরে বিশ্ব উষ্মায়নের প্রভাবের গল্প বলতে পারে প্রবালরা
১০০০ বছর ধরে ঋতুপরিবর্তনের যে প্রভাব আরব সাগরের ওপর পড়েছে তার জন্য মূলত দায়ী বিশ্ব উষ্ণায়ণ প্রক্রিয়া। ভুক্তভুগী প্রবালরা আমাদের সামনে তুলে ধরে ১০০০ বছরের পুরনো সেই ইতিহাস ।

আসুন ব্যাপারটা এবার বিশদে বুঝে নেওয়া যাক। প্রত্যেক বছর দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গ্রীষ্মে আরব উপদ্বীপ প্লাবিত হয়। আরব সাগরের উপরিতলের জলরাশি উপকূলভাগ থেকে দূরে সরে যায়। সমুদ্র অভ্যন্তরস্থ গভীর জলরাশি সেই স্থান দখল করে ও সমুদ্রের জলস্ফীতি হয়।
সমুদ্র পৃষ্ঠের উত্থিত জলরাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের জল রাশির তুলনায় অধিক শীতল কিন্ত কম লবণাক্ত। এই জলরাশি পুষ্টি পদার্থ সমৃদ্ধ হওয়ায় ভারত মহাসাগর ও আরব সাগরে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণীদের শক্তি সরবরাহ করে । প্রবালপ্রাচীর বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ তুয়শি ওয়াতানেব সহ জাপান ,তাইওয়ান্ এবং জার্মানির বিজ্ঞানীরা ওমানের সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রবালের অবস্থা দেখে বলেছেন বিশ্ব উষ্ণায়ন আরবসাগরের যে পরিবর্তন সাধন করেছে তার প্রভাব ভারত মহাসাগরের সন্নিহিত ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চলের জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র , আর্থ সামাজিক পরিবেশের ওপরো ভীষণ ভাবে পড়েছে। এই তথ্যটি ‘ জিও ফিসিকাল লেটার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
শক্তিশালী গ্রীষ্ম কালীন মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আরব সাগর ফুলে ফেঁপে ওঠে। ভারত উপমহাদেশের স্থলবায়ু ভারত মহাসাগরের সমুদ্র বায়ুর তুলনায় দ্রুত হারে গরম হওয়ার ফলেই এই শক্তি শালী বায়ুর সৃষ্টি হয়। বর্তমানে যদিও এর ঠিক বিপরীত ঘটনাই ঘটছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাবে কিভাবে আরব সাগরের জলস্ফীতি হচ্ছে বিজ্ঞানীরা তা বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সমস্যা হল যেহেতু এই ঘটনার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ সম্ভবপর হচ্ছে না তাই প্রাপ্ত স্বল্প ফলাফলের ভিত্তিতে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাচ্ছে না।
ওয়াতানেব এবং তাঁর সহকারীরা আরব সাগরের ওমানী উপদ্বীপের ফসিলীভূত ও জীবিত প্রবালের আনুমানিক বয়স নির্ধারণ করেছেন । এই তথ্যের ভিত্তিতে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তার একটা যোগসূত্র বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন। জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে কিভাবে সমুদ্রের জলের লবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে তার কারণও তাঁরা আন্দাজ করতে পেরেছেন। যে চারটি প্রস্তরীভূত প্রবালের উপর তাঁরা পরীক্ষা চালিয়েছিলেন সেগুলির আনুমানিক বয়স ছিল যথাক্রমে 1176 CE, 1624 CE, 1703 CE এবং , 1968 CE। সমুদ্রের বিভিন্ন তল থেকে প্রবালগুলির স্যাম্পল সংগ্রহ করে তাঁরা নানা পরীক্ষা করেন। সংগৃহীত প্রবালগুলির স্ট্রনসিয়াম ও ক্যালসিয়ামের অনুপাত এবং অক্সিজেন ও কার্বন আইসোটপের অনুপাত তাঁরা বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায় প্রবালের বৃদ্ধির হার কয়েক শতাব্দী ধরে ধ্রুবক থাকলেও প্রবালের কঙ্কাল মধ্যস্থ জৈব বস্তুগুলি সংযুক্তির অর্থাৎ স্ট্রনসিয়াম ও ক্যালসিয়ামের অনুপাত এবং অক্সিজেন -18 আইসটোপের পরিমাণ বেশ কমে গেছে। সাধারণত জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেই এই ঘটনা ঘটে।
দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি অব্দি উষ্ণ জলবায়ুর প্রভাবে আরব সাগরের জলস্ফীতির পরিমাণ ধ্রুবকই ছিল। কিন্তু চতুর্দশ থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়কাল ধরে চলে প্রায় হিমযুগের মত দশা। ঠিক এর পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন আরব সাগরের জলস্ফীতির পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। কারণ হিসাবে তাঁরা বলেন পরিবেশে গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাবে উত্তর ভারত মহাসাগর দ্রুত হারে উত্তপ্ত হয় । দক্ষিণ এশিয়ার বায়ুমন্ডলে ভাসমান এরোসল দ্বারা সূর্যরশ্মির আংশিক শোষণের ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাপমাত্রা হ্রাস পায় । এর ফলে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ুর শক্তি কমতে থাকে , যার প্রভাবে আরব সাগরের জলস্ফীতির মাত্রাও কমে যায়।
ওয়াতানেব বলেন সমুদ্রের জলস্ফীতি বাণিজ্যিক ভাবে মাছ ধরার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তাছাড়া আঞ্চলিক জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র এবং আর্থ সামাজিক পরিবেশের ওপরেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে সমুদ্রের জলস্ফীতির হার হ্রাস পেতে থাকলে মৌসুমি বৃষ্টিপাত, সমুদ্রতলের উচ্চতা, মৎস চাষ, এবং কৃষি উৎপাদন সামগ্রীক ভাবে ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অরুন্ধতী চৌধুরী
স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।
