প্রবালের প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন

কিছু কিছু প্রবাল (Coral) আছে যারা অন্য প্রবালের তুলনায় আবহাওয়ার পরিবর্তনকে মানিয়ে নিতে পারে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই সমস্ত প্রবালদের শরীরে একটি বিশেষ প্রোটিন উপস্থিত থাকে যা প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন (Natural Sunscreen) নিঃসরণ করে। সানস্ক্রিন সদৃশ এই প্রোটিনটি তাদের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে অভিযোজিত হতে সাহায্য করে।
স্মিথসোনিয়ান কনসারভেশন বায়োলজি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কিছু কিছু প্রবালের সন্ধান পেয়েছেন যাদের দেহে উপস্হিত একটি বিশেষ প্রোটিন প্রাকৃতিক সানস্ক্রিন নিঃস্বরণ করে। উদাহরণ স্বরূপ হাওয়াইআন ব্লু রাইস প্রবালের(Hawaiin Blue Rice Coral) নাম করা যায়। এদের দেহে উপস্থিত ক্রোমোপ্রোটিনটি (Chromoprotein) গাঢ় নীল রঙের একটি রঞ্জক পদার্থ নিঃস্বরণ করে যা সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধ করে দেহকে রক্ষা করে।অতিবেগুনি রশ্মি ব্রাউন রাইস প্রবল সহ অনেক প্রবালের দেহে নানারকম সুদূর প্রসারী ক্ষতিকারক প্রভাব বিস্তার করে। প্রজনন ক্ষমতা অব্দি হারাতে পারে এই সমস্ত প্রবালরা । ব্লু রাইস প্রবালরা কিন্তু নীল রঞ্জক নিঃস্বরণ করে এই পরিস্থিতেও দিব্য বংশবিস্তার করে চলে। ৯ই জুন ” Reproductive Plasticity Of Hawaiian Montipora Coral Following Thermal Stress ” শীর্ষক একটি রিপোর্টে এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়।
প্রবালের বর্ণ কী হবে তা নির্ধারণ করে জুযান্থিল (Zooxanthellae) নামক একটি মাইক্রোস্কোপিক প্রোটোজোয়া।প্রাচীর সৃষ্টি করতে পারে যে প্রবালগুলি তাদের কলার(Tissue) মধ্যে এই শৈবালটি বসোবাস করে। জুযান্থিল ও প্রবালের মধ্যে একটি সিমবায়োটিক(Smbiotic) সম্পর্ক রয়েছে।প্রবাল খাদ্য তৈরী করতে পারে না । জুযান্থিল সালোকসংশ্লেষের মাধ্যম খাদ্য প্রস্তুত করে । সালোকসংশ্লেষের ফলে যে সুগার উৎপন্ন হয় তা হয়ে যায় এই প্রবালগুলির খাদ্য।প্রবালকে খাদ্য সরবরাহ করে জুযান্থিল শৈবাল আর তার বিনিময় প্রবাল দেয় তাকে আশ্রয়।এদের মধ্যে খাদ্য ও আশ্রয়ের একটি বিনিময় প্রথা চলতে থাকে। শুধু খাদ্যই নয় শৈবাল প্রবালদের জন্য সানস্ক্রিন ও উৎপন্ন করে।
যখন সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়তে থাকে , প্রবালগুলির ওপর পরিবেশগত চাপ বাড়তে থাকে। শৈবাল ও প্রবালের মধ্যে সিমবায়োটিক সম্পর্কটি ভেঙ্গে যায়।তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে জুযান্থিলের বিপাকক্রিয়ার হারও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। তারা বিষাক্ত পদার্থ উৎপন্ন করতে শুরু করে। প্রবালগুলি বিষক্রিয়া থেকে বাঁচবার জন্য জুযান্থিলগুলিকে শরীর থেকে নির্গত করে দেয় । ফলস্বরূপ সানস্ক্রিনের সরবরাহ তাদের দেহে বন্ধ হয়ে যায়।UV রশ্মির ক্ষতিকারক প্রভাব এদের ওপর পড়তে থাকে।জুযান্থিল প্রাচীর সৃষ্টিকারী প্রবাল(Reef Coral) প্রজাতির বর্ণ সৃষ্টির জন্যও অনেকাংশে দায়ী তাই এগুলি যখন প্রবালদের শরীর থেকে নির্গত হয়ে যায় তখন প্রবালদের গাত্র বর্ণও গাঢ় থেকে অনেকটা ফিকে হয়ে যায়। গাত্র বর্ণ ফিকে হয়ে যাবার এই ঘটনাকে ব্লিচিং(Bleaching) বলে।জুযানথিলের অভাবে UV রশ্মির নানারকম ক্ষতিকারক প্রভাব এদের ওপর পড়তে শুরু করে। DNA গুলির ক্ষতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।শুক্রানুর কোষঅভ্যন্তরস্থ মাইটোকন্ড্রিয়ার পরিবর্তনে ফলে শুক্রানুগুলি সন্তরণের ক্ষমতা হারায়। ফলস্বরূপ প্রবালগুলি প্রজনন ক্ষমতা হারায়। বর্ধিত তাপমাত্রা সহ অন্য আবহাওয়া জনিত সমস্যাতেও অভিযোজিত হওয়ার মতো জেনেটিকালি মডিফাইড কোনো আদর্শ বংশধর তৈরি হতে পারে না।
২০১৪ – ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা হাওয়াই দ্বীপে, প্রবালের ব্লিচিংয়ের ওপর একটি পর্যবেক্ষন চালান। দেখা যায় ব্লু রাইস প্রবালদের প্রজনন ক্ষমতা সর্বোচ্চ থাকে যখন তাদের শুক্রাণুগুলির সন্তরণশীলতার হার ৯০% থাকে।অন্যদিকে ব্রাউন রাইস(Brown Rice) প্রবালদের প্রজনন ক্ষমতা ব্লু রাইস প্রবালদের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায় । ব্লিচিংয়ের পরেও ব্রাউন প্রবালদের আপাত দৃষ্টিতে সুস্থ্য সবল মনে হলেও এদের প্রজনন ক্ষমতার ওপর ব্লিচিং এক দীর্ঘমেয়াদী কুপ্রভাব ফেলে।ব্লিচিংয়ের পরেও ব্লু রাইস প্রবালদের প্রয়োজন ক্ষমতা কিণ্তু অক্ষুন্ন থাকে। এর মূল কারণ হিসাবে মনে করা হয় সম্ভবত ব্লিচিংয়ের পরেও এরা সানস্ক্রিন পিগমেন্ট টিকে শরীরে রেখে দেয়|
বিজ্ঞনীরা বুঝতে পারেন UV প্রতিরোধক কণাটিই আবহাওয়া পরিবর্তন থেকে শুরু করে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি সহ – সমস্তরকম প্রতিকূল পরিস্হিতি থেকে প্রবালদের রক্ষা করে।
তাই পরিশেষে বলা যায় যেসমস্ত প্রজাতির প্রবালদের দেহে এই UV প্রতিরোধক রক্ষা কবচটি থাকে শুধুমাত্র তারাই পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক পরিবেশে বেঁচে থাকে এবং বংশবিস্তার করে।
তথ্যসুত্রঃ-

অরুন্ধতী চৌধুরী
স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।
