Free ArticlesLife Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

সামুদ্রিক পাখির পরিযান

migratory-birds

কিছু সামুদ্রিক পাখির প্রজাতি সারা বছর তাদের বাসা বাঁধার এলাকার আশেপাশে থাকে। অন্যরা অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। সামুদ্রিক পাখিদের পরিযান (migratory birds) বলতে এমন সামুদ্রিক পাখিদের বোঝায়, যারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, বিশেষত প্রজনন এবং খাদ্যের খোঁজে, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। শীতকালে ঠান্ডা এবং খাদ্য সংকট থেকে বাঁচতে এবং গ্রীষ্মকালে প্রজননের জন্য পাখিরা এই পরিযান করে। গবেষণায় জানা যায়, সামুদ্রিক পাখির মধ্যে ৩৬৫টি প্রজাতি পরিযায়ী। উষ্ণ রক্তের প্রাণী হিসেবে পাখিদের জন্য সমুদ্র বসবাসের জন্য সহজ জায়গা নয়। খোলা সমুদ্রে কোনো সুরক্ষা থাকে না।

সামুদ্রিক পাখিদের শরীরে চর্বি এবং পেশীতে খাদ্য মজুত থাকে। তাদের পেটও বড়। শরীর গরম এবং শুকনো রাখার জন্য এই পাখিদের পালকও অন্যরকম। এতে জল প্রতিরোধ করার দারুণ ক্ষমতা আছে। সামুদ্রিক পাখিরা জানে কীভাবে লবণাক্ত সমুদ্রের জলকে পানীয় জল হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। তারা তাদের মাথার ত্বকে অবস্থিত দুটি গ্রন্থির সাহায্যে সমুদ্রের জল থেকে লবণ বের করে দিতে পারে। একটি ছোট নালীর মাধ্যমে অতিরিক্ত লবণ নাকের ছিদ্রে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে তা বের করে দেয়।

সকল পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির মধ্যে একটি জিনিস মিল রয়েছে, তা হলো তাদের অবিশ্বাস্য এই পরিযান যাত্রায় তারা হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বিশ্বের সমুদ্রের বিভিন্ন অঞ্চলকে সংযুক্ত করে। সামুদ্রিক পাখিরা কখনো কখনো সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বিশ্রাম নিতে এবং শক্তি সঞ্চয় করার জন্য থামে। তারা চাঁদনী রাতে বেশি পাড়ি দিতে পছন্দ করে এবং কখনো কখনো তাদের রুটে পরিবেশগত বাধাগুলোর চারপাশে চলাচল করে।

কিছু প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি, যেমন সাবাইনস গাল, উপকূল ধরে ভ্রমণ করে, আর অন্যরা, যেমন অনেক গ্যাডফ্লাই পেট্রেল, সমুদ্রের অববাহিকার মাঝখান দিয়ে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। কিছু আবার অক্ষাংশীয় গ্রেডিয়েন্ট (উত্তর-দক্ষিণ বা তার বিপরীত) জুড়ে স্থানান্তরিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে শিয়ারওয়াটার, পেট্রেল, গাল এবং স্কুয়া। আবা কিছু সামুদ্রিক পাখি, যার মধ্যে রয়েছে অনেক অ্যালবাট্রস, দক্ষিণ মহাসাগরের চারপাশে অনুদৈর্ঘ্যভাবে পাড়ি দিতে পছন্দ করে। কিছু সামুদ্রিক পাখি আবার প্রতি বছর শীতকালে একই অঞ্চলে ফিরে যায়, অন্যরা তা করে না।

সামুদ্রিক পাখিদের পরিযায়ী আচরণ ভিন্ন। কিছু প্রজাতি তুলনামূলকভাবে বাসার কাছাকাছি থাকে, তাদের বাসা বাঁধার উপনিবেশ থেকে কয়েকশ মাইলের মধ্যে খাবারের জায়গায় অবস্থান করে। তবে পাখির জগতে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দীর্ঘ দূরত্বের পরিযায়ীদের মধ্যে রয়েছে সুটি শিয়ারওয়াটার। এরা সুদূর দক্ষিণ গোলার্ধে প্রজনন করে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকার চারপাশে একটি লুপযুক্ত ‘৮’ সংখ্যার প্যাটার্নে প্রায় ৪০,০০০ মাইল দূরত্বে পরিযান করে। অস্ট্রেলিয়ার ইয়ান পয়নার পাফিনদের ট্র্যাক করে জানা গেছে, তারা প্রতি বছর নিউজিল্যান্ড থেকে জাপান, রাশিয়া, আলাস্কা, চিলি এবং তারপর ফিরে এসে প্রায় ৬৪,০০০ কিলোমিটার পরিযান করে।

আর্কটিক টার্নের রেকর্ড-ব্রেকিং কীর্তির কথা উল্লেখ না করলে কোনো পাখির পরিযানের তালিকা সম্পূর্ণ হয় না। প্রাণীজগতে এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে দীর্ঘতম পরিযানের রেকর্ড রয়েছে এই মাঝারি আকারের পাখিটির। এটি প্রতি বছর ৯০,০০০ কিলোমিটার (৫৫,৯২৩ মাইল) দূরত্ব পাড়ি দিয়ে এক মেরু থেকে অন্য মেরুতে ভ্রমণ করে, উত্তরে গ্রিনল্যান্ড থেকে দক্ষিণে ওয়েডেল সাগর পর্যন্ত। উল্লেখযোগ্যভাবে, আর্কটিক টার্নগুলি ৩০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এর মানে, যদি কেউ তাদের জীবদ্দশায় ভ্রমণের দূরত্ব যোগ করে, তবে তাদের মোট দূরত্ব চাঁদে যাত্রা এবং ফিরে আসার তিনবারেরও বেশি সমতুল্য হবে।

বার-টেইলড গডউইট, একটি পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখি, ২০০৮ সালে আলাস্কা থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত ১১,৪০০ কিলোমিটার একটানা খাবার ছাড়াই উড়ে যাওয়ার রেকর্ড গড়েছিল। রেড নট, একটি স্যান্ডপাইপারের মতো পাখি, টিয়েরা দেল ফুয়েগো থেকে আর্কটিক পর্যন্ত ১৫,০০০ কিলোমিটার পথ উড়ে যায়। এরা পরিযানের পথে ডেলাওয়্যার উপসাগরে সন্ন্যাসী কাঁকড়ার ডিম খাওয়ার জন্য একটি বিরতি নেয়। এই পাখিরা জানে কখন এবং কোথায় ডিম পাওয়া যাবে। কিছু ক্ষেত্রে, ডিম খাওয়ার পর তাদের ওজন দ্বিগুণ হয়ে যায়।

এটা শুধু উড়ার ব্যাপার নয়! পেঙ্গুইনের মতো উড়ানহীন পাখিরাও পরিযান করে। অ্যাডেলি পেঙ্গুইন প্রতি বছর গড়ে ১৩,০০০ কিলোমিটার (৮,০৭৭ মাইল) পথ পাড়ি দেয়। তারা সূর্যের আলো অনুসরণ করে তাদের প্রজনন উপনিবেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার রস সাগর অঞ্চলে যায় এবং ফিরে আসে।

পরিযায়ী পাখিরা কীভাবে দলবেঁধে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নির্ভুলভাবে পৌঁছে যায়, তা নিয়ে বহুদিন ধরে গবেষণা চলছে। পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো থেকে জানা গেছে, পরিযায়ী পাখিদের চোখের রেটিনায় ‘ক্রিপ্টোক্রোম’ নামে এক ধরনের প্রোটিন থাকে, যা চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রতি সংবেদনশীল। এই প্রোটিন পাখিদের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে সাহায্য করে, যার ফলে তারা দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় জানা গেছে, পরিযায়ী পাখিরা এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম’ (জিপিএস) ব্যবহার করে। কিন্তু কীভাবে?

ইউরোপিয়ান জার্নাল অব নিউরোসায়েন্সে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পাখিদের মস্তিষ্কে ‘ক্লাস্টার এন’ নামে একটি অংশ থাকে, যা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সাড়া দেয়। এই অংশের মাধ্যমে পাখিরা উড়ন্ত অবস্থায় তাদের পথ ঠিক করে নিতে পারে। গবেষণায় আরও জানা গেছে, রাতে পরিযানের সময়, যখন পাখিরা দীর্ঘ দূরত্বের উড়ানে ব্যস্ত থাকে, তখনই এই ‘ক্লাস্টার এন’ সক্রিয় হয় এবং ভূ-চৌম্বকত্বের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে। দিনের বেলা, যখন তারা বিশ্রাম নেয়, তখন এই অংশ নিষ্ক্রিয় থাকে। এভাবেই পরিযায়ী পাখিরা এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে নির্ভুলভাবে পৌঁছে যায়।

সামুদ্রিক পাখিরা বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পাখি ‘ফ্লাইওয়ে’ নামে পরিচিত ধারাবাহিক রুট ধরে কখনো কখনো কয়েক হাজার কিলোমিটার পরিযান করে। গত কয়েক দশকে ট্র্যাকিং ডিভাইসের উন্নতির ফলে সামুদ্রিক পাখির পরিযান সম্পর্কে আমাদের ধারণায় বিপ্লব এনে দিয়েছে। বেশ কয়েকটি পাখির প্রধান সামুদ্রিক উড়ালপথ আবিষ্কার হয়েছে। নতুন গবেষণায় ছয়টি প্রধান সামুদ্রিক পাখির পরিযান রুট চিহ্নিত করা হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘সুপার হাইওয়ে’।

ড. ট্যামি ডেভিস, বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের মেরিন সায়েন্স কো-অর্ডিনেটরের নেতৃত্বে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে সামুদ্রিক পাখির গতিবিধি ট্র্যাক করা হচ্ছে। এই তথ্যগুলো নিয়ে অনেকগুলি সামুদ্রিক পাখির ট্র্যাকিং ডেটাবেস তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ২৭৫ জনেরও বেশি সামুদ্রিক পাখি গবেষক মিলে ১৬০টি সামুদ্রিক পাখির প্রজাতির কমপক্ষে ৩ কোটি অবস্থান রেকর্ড করেছেন। এই ট্র্যাক করা সামুদ্রিক পাখির অবস্থানগুলি সমুদ্র জুড়ে বিস্তৃত এবং বেশ কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণ করার পর ছয়টি ওশান ফ্লাইওয়ে সনাক্ত করা হয়েছে।

অনেক পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখির প্রজাতি এখন বিলুপ্তির পথে। দক্ষিণ মহাসাগর জুড়ে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে পারা অ্যালবাট্রস, সমস্ত পাখি গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সঙ্কটের মুখে পড়েছে। গ্যাডফ্লাই পেট্রেল এবং কিছু ক্রেস্টেড পেঙ্গুইন প্রজাতিও বিলুপ্তির মুখোমুখি।

এর পেছনের কারণগুলি বিভিন্ন, তবে সামুদ্রিক পাখিদের অনেক গোষ্ঠীই কিছু সাধারণ সমস্যার সম্মুখীন। সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরা প্রায়শই একটি বড় কারণ, যদিও গবেষকরা এটাও লক্ষ্য করেছেন যে কিছু কিছু প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি আবার মাছের ঝাঁকের পূর্বাভাষ দিতে সক্ষম। যেহেতু এই প্রজাতিগুলি সমুদ্রের বিশাল অঞ্চল অতিক্রম করে, তাই গবেষক এবং সংরক্ষণবাদীদের পক্ষে সবচেয়ে সমস্যাযুক্ত অঞ্চলগুলি সনাক্ত করা কঠিন। উপনিবেশগুলিতে আক্রমণাত্মক প্রজাতির অনুপ্রবেশ আরেকটি বড় কারণ, যা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সামুদ্রিক পাখির প্রজাতিকে প্রভাবিত করে। সরাসরি শিকারও অনেক প্রজাতিকে হুমকির মুখে ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তন সামুদ্রিক পাখির সংখ্যা হ্রাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত সমুদ্রের অবস্থার পরিবর্তন এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার ঘটনাগুলি সামুদ্রিক পাখিদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠছে।

যেহেতু পরিযায়ী সামুদ্রিক পাখিরা একাধিক জাতীয় এখতিয়ারের বাইরের অঞ্চল অতিক্রম করে, তাই তাদের সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলি কোনো একটি দেশের সরকারের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সামুদ্রিক পাখিদের অবিশ্বাস্য ও বিশাল পরিযান তাদের সংরক্ষণকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। সামুদ্রিক উড়ালপথগুলির সনাক্তকরণ সামুদ্রিক পাখি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

যদি জাতীয় এখতিয়ারের বাইরের অঞ্চলগুলিতে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা না করা হয়, তবে পরিযায়ী প্রজাতির জনসংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাবে। আশা করা যায়, শীঘ্রই নতুন আইনি দলিল গৃহীত হবে, যা বিশ্বের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে থাকা শাসনের শূন্যতা পূরণ করবে।

তথ্যসূত্রঃ-

বিশ্ব রঞ্জন গোস্বামী

বিজ্ঞান লেখক।অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক, পশ্চিম বঙ্গ সরকার   সদ্যস, জীব বৈচিত্র সংরক্ষন একাডেমি ,কলকাতা।