শ্বাস গ্রহণ আর বর্জন

বাতাস গ্রহণ করে আমরা বেঁচে থাকি। বাঁচবার প্রয়োজনে শরীরের ভিতরে টেনে নিই বায়ু। ‘বায়ু’ নামের দীর্ঘ কবিতায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন—
“কে বাঁচিত এ সংসারে, আমার বিহনে?
আমি না থাকিলে ভুবনে?
আমিই জীবের প্রাণ,
দেহে করি অধিষ্ঠান,
নিশ্বাস বহনে…”
সত্যিই তো, বায়ু বিনা—‘কে বাঁচিত এ সংসারে…?’ জীবজন্তু হোক বা মানুষ, সকলের বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত হলো শ্বাস-প্রশ্বাস। অর্থাৎ বাতাস শরীরের ভিতরে নেওয়া এবং অপকারী এক গ্যাস (কার্বন ডাই-অক্সাইড) বাইরে বের করে দেওয়া।
প্রকৃতির বাতাস অনেকগুলো গ্যাসের মিশ্রণ; তার মধ্যে কোন উপাদানটি জীবনধারণের জন্য একান্ত অপরিহার্য? সেই অপরিহার্য উপাদানটি হলো অম্লজান। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই একে বলা হয় অক্সিজেন। কিন্তু শরীরে অক্সিজেনের এত চাহিদা কেন? অক্সিজেন ছাড়া কেন মানুষ কয়েক মিনিটও বাঁচতে পারে না?
দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কারণে অজ্ঞান হয়ে গেলে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছায় না। অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্ক কাজ করতে পারে না। এর ফলেই ঘটে মস্তিষ্ক তথা দেহের মৃত্যু। শুধু মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুস নয়—দেহের সর্বত্রই দরকার অক্সিজেন। শ’দুয়েক হাড় আর নানারকম মেদ, মজ্জা ও মাংস দিয়ে তৈরি মানুষের শরীর। একে টিকিয়ে রাখতে চাই খাদ্য, জল এবং অক্সিজেন। অক্সিজেন পৌঁছে দিতে হয় শরীরের সর্বত্র—লক্ষ কোটি কোষে। নইলে দেখা দেয় অসুখ-বিসুখ, রোগব্যাধি, বিপর্যয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত।
কোন কোষে, কখন অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছে—জানা যাবে-ই বা কেমন করে? কে জানবে? কাকে জানাবে? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়ে বিশ্বকে জানিয়েছেন কয়েকজন বিজ্ঞানী, আর এজন্যই তাঁরা নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তবে বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনা এখানে নয়। এই নিবন্ধে আলোচ্য বিষয় হলো—আমাদের শরীর কীভাবে বাতাস থেকে আলাদা করে নেয় অক্সিজেন।
অক্সিজেন—বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। আমরা তা সংগ্রহ করি বায়ুমণ্ডলের বাতাস থেকে। সেখানে থাকে নাইট্রোজেন (৭৮.০৮%), অক্সিজেন (২০.৯৫%), আর্গন (০.৯৩%), কার্বন ডাই-অক্সাইড (০.০৪%), সামান্য পরিমাণে অন্যান্য গ্যাস (হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, জলীয় বাষ্প) এবং ধুলোবালি ও বিভিন্ন ভাসমান কণা।
শ্বাস নিলে বাতাস শরীরের ভিতরে ঢুকে যায়। বাতাসের সঙ্গে ক্ষতিকর ধুলো ও অন্য কিছু ক্ষুদ্র কণাও প্রবেশ করে। ঢোকার পথেই নাসিকা-লোম ধুলোবালির প্রবেশে বাধা দেয়। এরপর সেই বাতাস, অর্থাৎ গ্যাসের মিশ্রণ, ফুসফুসে গিয়ে পৌঁছায়।
নির্দিষ্ট করে বললে, পৌঁছায় ফুসফুসের অ্যালভিওলাসে। অ্যালভিওলাস বেলুনের মতো, একে বলা হয় বায়ুকোষ বা বায়ুথলি। অ্যালভিওলাসের বাইরে থাকে সূক্ষ্ম রক্তজালিকা (capillary)। অ্যালভিওলাসের আবরণ খুবই পাতলা (প্রায় ২৫ ন্যানোমিটার); তার মধ্যে থাকে অসংখ্য ছিদ্র (pores)। সেই ছিদ্রের মধ্য দিয়ে অ্যালভিওলাসে সহজেই বাতাস ঢুকতে ও বের হতে পারে। এখানেই বাতাস থেকে অক্সিজেন আলাদা হওয়ার কাজটি ঘটে—যেন ছাঁকনিতে ছেঁকে অক্সিজেনকে আলাদা করা হচ্ছে।
এরপর অক্সিজেন ব্যাপন প্রক্রিয়ার (diffusion) মাধ্যমে অ্যালভিওলাস থেকে ক্যাপিলারিতে প্রবেশ করে। এর কারণ হলো, অক্সিজেনের পার্শ্বচাপ অ্যালভিওলাসে বেশি এবং রক্তজালিকায় তুলনামূলকভাবে কম।
স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো—আমাদের শরীর কীভাবে গ্যাসমিশ্রণ থেকে অক্সিজেনকে আলাদা করে নেয়? আর বাতাসের অন্য গ্যাসগুলোই বা কোথায় যায়?
এখানে আগের প্রসঙ্গ আরেকটু স্পষ্ট করে বলা দরকার। অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত ফুসফুস থেকে বেরিয়ে ধমনীর মধ্য দিয়ে হৃদযন্ত্রের বাম দিকের প্রকোষ্ঠে পৌঁছায়। তারপর হৃদযন্ত্র সেই রক্ত পাম্প করে শরীরের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও কোষে পাঠিয়ে দেয়।
অন্যদিকে কার্বন ডাই-অক্সাইডসমৃদ্ধ রক্ত দুটি প্রধান শিরার (superior vena cava এবং inferior vena cava) মাধ্যমে চলে আসে হৃদযন্ত্রের ডান দিকের প্রকোষ্ঠে। এরপর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়ায় সেই রক্ত আবার ফুসফুসে পৌঁছায়। সেখান থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায় (শ্বাসত্যাগ বা বর্জন প্রক্রিয়া)।
অক্সিজেন শরীরে ঢুকে বহু রকম কাজ করে। রক্তের উপাদান হলো—লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা ও অণুচক্রিকা। লোহিত রক্তকণিকায় থাকে হিমোগ্লোবিন; এটি ধাতব আয়রন ও ‘পরফিরিন’ নামের যৌগ দিয়ে তৈরি। হিমোগ্লোবিন অক্সিজেনকে কাজে লাগায় (আয়রনের যোজ্যতা দুই থেকে তিনে বদলে যায়) এবং রক্তের মাধ্যমে দেহের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
অক্সিজেন গ্রহণ করে শরীরের কোষ প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে। এই বিক্রিয়ায় তৈরি হয় শক্তি। কোষের ভেতরে থাকা মাইটোকনড্রিয়া নামের সূক্ষ্ম অঙ্গাণু তৈরি করে সেই শক্তি, যা শরীর নানা কাজে ব্যবহার করে। শক্তি তৈরির প্রক্রিয়ায় উপজাত হিসেবে তৈরি হয় কার্বন ডাই-অক্সাইড। সেটি আবার ব্যাপন প্রক্রিয়ায় রক্তে ফিরে আসে এবং রক্তের মধ্য দিয়ে গিয়ে জমা হয় অ্যালভিওলাসে। সেখান থেকে ফুসফুসের ক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়।
সামান্য কিছু নাইট্রোজেন রক্তে মিশলেও তা নিষ্ক্রিয় গ্যাস হওয়ায় শরীরের কোনো ক্ষতি করতে পারে না; শ্বাসত্যাগের সঙ্গে সেও বাইরে চলে যায়।
বলা হয়েছে, শ্বাসক্রিয়ায় বাতাস শরীরে প্রবেশ করে। বাতাসের ধুলোবালি নাসিকা-লোম আটকে দেয়। কিন্তু সূক্ষ্ম ধুলো বা ভেসে থাকা অন্য কণিকা বেশি হলে নাসিকা-লোম তা আটকাতে পারে না। সেই দূষিত বাতাস ফুসফুসে পৌঁছে নানা রোগ ডেকে আনে— এমনকি প্রাণঘাতী ক্যানসারও। তাই বেঁচে থাকার জন্য দরকার শুদ্ধ বায়ু।
একবার শ্বাসগ্রহণ আর শ্বাসত্যাগ— মাত্র দু’-তিন সেকেন্ডের কাজ। অথচ তার মধ্যেই ঘটে অসংখ্য ক্রিয়াকর্ম, বহু জটিল বিক্রিয়া। এখানে সামান্য কিছু মাত্র বলা হলো।
একটা কথা বারবার বলা দরকার— আমাদের বেঁচে থাকার জন্য, স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন ধুলো-ধোঁয়ামুক্ত শুদ্ধ বায়ু।

ড. সৌমিত্র কুমার চৌধুরী
পূর্বতন বিভাগীয় প্রধান ও এমেরিটাস মেডিক্যাল স্যায়েন্টিস্, চিত্তরঞ্জন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা সংস্থান, কলকাতা।
