Featured Post-বিশেষ নিবন্ধFree ArticlesLife Science-জীববিজ্ঞানPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞানScience News-বিজ্ঞানের টুকরো খবর

উদ্ভিদের নাচ

Telegraph-Plants
ডেসমোডিয়াম জাইরেন্স

জমাটিয়া গান চালিয়ে সেই গানে নিজের মত নাচতে কি আপনার ভালো লাগে ? আপনি কি জানেন যে সেই নাচে আপনার সঙ্গী হতে পারে এক বিশেষ কড়াই জাতীয় উদ্ভিদ ! এই উদ্ভিদকে আগে ‘ডেসমোডিয়াম জাইরেন্স’ (Desmodium gyrans) বৈজ্ঞানিক নামে ডাকা হত, এখন এর বিজ্ঞানসম্মত নাম – ‘কোডারিওকেলিক্স মোটরাইস’ (Codariocalyx motorius)।

এই উদ্ভিদকে ‘প্ল্যান্ট ট্যাক্সনমি’ বা উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস অনুযায়ী আগে ‘ডেসমোডিয়াম’ জিনাসের অর্ন্তগত বলে মনে করা হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ আবিষ্কৃত হয় যে এই উদ্ভিদের পত্রিকা অর্থাৎ ছোট পাতাগুলি উচ্চ কম্পাঙ্কের (Frequency) শব্দের প্রভাবে এলিপ্টিকাল বা উপবৃত্তাকার পথে দ্রুত নড়তে থাকে ! এই বিশেষত্বের জন্য একটি নতুন জিনাস ‘কোডারিওকেলিক্স’-এ এই উদ্ভিদকে স্থান দেওয়া হয়। আবার এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এই উদ্ভিদ ‘ডান্সিং প্ল্যান্ট’ নামে খ্যাতি পায়।

১৭৯২ সালে ফ্রান্সে দূর-দূরান্তে নানান খবর বা সংকেত পাঠানোর জন্য আবিষ্কৃত হয়েছিল ‘সেমাফোর টেলিগ্রাফ’ (semaphore telegraph) যা অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল ও ঊনিশ শতকের শুরুর দিকেও সেই জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিল। সেমাফোর টেলিগ্রাফির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পথ বরাবর কিছু দূরত্ব অন্তর অন্তর তৈরি করা টাওয়ারগুলির প্রত্যেকটিতে থাকত ধাতুর তৈরি একটি কাঠামো। সেই কাঠামোর অংশগুলিকে বলা হত ‘শাটার’ ও ‘আর্ম’। একটি টাওয়ারে বসে থাকা টেলিগ্রাফ চালক আর্মগুলিকে নাড়িয়ে শাটারের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট অবস্থানে নিয়ে এসে কোন নির্দিষ্ট অক্ষর বা সংখ্যা বা চিহ্ণ পরবর্তী টাওয়ারে বসে থাকা টেলিগ্রাফ চালককে বুঝিয়ে দিত। (নিচের ছবি দেখুন) ডান্সিং প্ল্যান্টের কাছাকাছি বেশী কম্পাঙ্কের শব্দ উৎপন্ন হলেই তার পত্রিকাগুলি টেলিগ্রাফের আর্মগুলির মতই নড়তে থাকে, তাই ডান্সিং প্ল্যান্টের আরেক নাম দেওয়া হয়েছে – ‘টেলিগ্রাফ প্ল্যান্ট’।

সেমাফোর টেলিগ্রাফ | ছবির উৎসঃ বিবিসি ন্যুজ

ডান্সিং প্ল্যান্ট শুধু শব্দ নয়, আলোর প্রতিও খুব সংবেদনশীল, কারণ দেখা গেছে যে এই উদ্ভিদ তার পত্র বা বড় পাতাগুলিকে রাতের বেলা অবনমিত রাখে, কিন্তু সূর্য উঠলেই সূর্যের আলো শোষণ করার জন্য পত্রগুলিকে টান টান করে মেলে ধরে। শুধু তাই নয়, সারাদিন ধরে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্ভিদ তার পত্রগুলিকে খুব ধীর গতিতে নাড়িয়ে নানান অবস্থানে রাখতে থাকে যাতে পত্রগুলি সূর্যের আলো পর্যাপ্ত পরিমাণে শোষণ করে নিজেদের নির্দিষ্ট উষ্ণতা বজায় রাখতে পারে ! শব্দ ও আলোর পাশাপাশি উষ্ণতার প্রতি এমন সংবেদনশীলতার কারণে এই উদ্ভিদ ‘বুদ্ধিমান উদ্ভিদ’ তকমা পেয়েছে ! পরিণত দশায় দুই থেকে চার ফুট লম্বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাসিন্দা এই উদ্ভিদে বেগুনি রঙের ফুল ধরে। ভারত, বাংলাদেশ, লাওস, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এই উদ্ভিদ ভালো জন্মায়।

ছবির উৎসঃ OddScience

এই বিষয়টা অনেক আগে থেকেই জানা ছিল যে, উদ্ভিদ সঙ্গীত ও বাদ্য অনুভব করে। উদ্ভিদের উপর বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতের প্রভাব নিয়ে পরীক্ষাও করা হয়েছে অনেক। দেখা গেছে, শাস্ত্রীয় সংগীতের নিয়মিত প্রয়োগে উদ্ভিদ আরও সতেজ হয়ে ওঠে ! আবার রক্ সংগীতের নিয়মিত প্রভাবে উদ্ভিদ ক্রমে দুর্বল হয়ে মারা যায় ! ফরাসি সংগীত শিল্পী রজার রজার শুধুমাত্র উদ্ভিদদের জন্য সুর তৈরি করতেন যা উদ্ভিদদের ভালো বৃদ্ধি ও ফলনে সাহায্য করত, কিন্তু সুর ও বাদ্যের সঙ্গে উদ্ভিদের নাচ – এই বিষয়টা একেবারে অভিনব !

কোডারিওকেলিক্স মোটরাইস উদ্ভিদের প্রতিটি শাখার প্রান্তে একটি করে পত্র থাকে ও তার উপরের দিকে থাকে এক বা একাধিক পত্রিকা। প্রত্যেক পত্রিকার ভিতে কতগুলি কোষের একটি বলয় থাকে যাকে ‘পলভিনাস’ (Pulvinus) বলা হয়। পলভিনাসে উপস্থিত কোষগুলিকে ‘মোটর কোষ’ (Motor cell) বলা হয় কারণ এই কোষগুলিই উদ্ভিদটির পত্রিকার চলনে সাহায্য করে। মোটর কোষগুলির মধ্যে ‘অক্সিন’ (Auxin) নামক এক বিশেষ হরমোন থাকে যার প্রভাবে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ মাোটর কোষগুলিকে উদ্দীপিত করে। একটি মোটর কোষ উদ্দীপিত হলেই কোষটি তার কোষপর্দার (Cell membrane) মধ্য দিয়ে অভিস্রবণ (Osmosis) পক্রিয়ায় জল শোষণ করে, কোষটির মধ্যে উপস্থিত অক্সিন ব্যাপন (Diffusion) প্রক্রিয়ায় সেই জলে গুলে যায় ও কোষটি দ্রুত অক্সিনের জলীয় দ্রবণ ভর্তি একটি বেলুনের মত ফুলে ওঠে। আবার ফুলে থাকা মোটর কোষ উদ্দীপিত হলেই সে তার মধ্যে উপস্থিত জলকে নির্গত করে দিয়ে বেলুনের মতই দ্রুত চুপসে যায়। এইভাবে পত্রিকাগুলির ভিতে থাকা মোটর কোষগুলি ক্রমাগত ফুলে উঠে বা চুপসে গিয়ে পত্রিকাগুলিকে নাড়ায় !

প্রাণীরা যেমন নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াতে পারে, তেমনই কোডারিওকেলিক্স মোটরাইস উদ্ভিদ তার পত্রিকাগুলিকে নাড়াতে পারে – এই ব্যাপারটা বোঝা গেল, কিভাবে পত্রিকাগুলিকে নাড়ায় তাও বোঝা গেল। এখন প্রশ্ন হলো, এই উদ্ভিদ উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দে সাড়া দিয়ে তার পত্রিকাগুলিকে নাড়ায় কেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই বলেছিলেন – “ঘটনা বহু, সত্য এক”। বাস্তবে পেঁয়াজের মতই বহুস্তরীয়। ঠিক যেমন পেঁয়াজের একটি কলাস্তরের নীচে থাকে আরেকটি কলাস্তর, তেমনই এক ঘটনার গভীরে নিহিত থাকে আরেক ঘটনা। গভীর থেকে গভীরতর ঘটনাগুলিকে একে একে আবিষ্কারের মাধ্যমে সবচেয়ে গভীরে লুকিয়ে থাকা সত্যের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন। পত্রিকাগুলিকে নাড়ানোর কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে – এই উদ্ভিদ শুধু শব্দ নয় বরং যে কোন কম্পনের (Vibration) প্রতি সংবেদনশীল !

অক্সিন হরমোনের উপস্থিতির জন্যই উচ্চ কম্পাঙ্কের যে কোন কম্পন এই উদ্ভিদের মোটর কোষগুলিকে উদ্দীপিত করতে পারে ! শব্দতরঙ্গ (Sound wave) বায়ুর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময়ে তরঙ্গের গতির অভিমুখেই বায়ুস্তরগুলিকে পর্যায়ক্রমে সংকুচিত ও প্রসারিত করতে থাকে। বায়ুস্তরগুলির এই পর্যায়ক্রমিক সংকোচন (Compression) ও প্রসারণের (Rarefaction) সময়ে স্বাভাবিকভাবেই বায়ুকণাগুলি কম্পিত হতে থাকে। বায়ুকণার এই কম্পন উদ্ভিদটির মোটর কোষকে উদ্দীপিত করে।

পতঙ্গরা এই উদ্ভিদের পত্রিকা খাওয়ার জন্য যখন কিছু দূর থেকে উড়ে আসতে থাকে, তাদের পাখা বায়ুতে উচ্চ কম্পাঙ্কের ঢেউ তোলে। সেই ঢেউ এই উদ্ভিদের মোটর কোষগুলিতে আছড়ে পড়লে এই উদ্ভিদ তার পত্রিকাগুলিকে পতঙ্গের পাখার মত দ্রুত নাড়িয়ে পতঙ্গেরই অনুকরণ করার চেষ্টা করে – উদ্ভিদটি দূর থেকে উড়ে আসা পতঙ্গদেরকে এই বোঝানোর চেষ্টা করে যে আগে থেকেই বেশ কিছু পতঙ্গ তার পত্রিকাগুলিকে খাওয়ার জন্য সেগুলির উপর জড়ো হয়েছে, তাই নতুন কোন পতঙ্গ এসে বসার জায়গা নেই। বেশ কিছু তত্ত্ব এও বলে যে, কোডারিওকেলিক্স মোটরাইস উদ্ভিদের পত্রিকাগুলির এই নড়ন বহু পতঙ্গভুক পাখিদের জন্য এক সংকেত ! এই সংকেত ঐ পাখিদেরকে বুঝিয়ে দেয় যে কিছু দূরেই তাদের খাদ্যের সংস্থান হিসাবে কিছু পতঙ্গ আছে !

বেশ কিছু পরীক্ষার ফলাফল বলছে; কোন পতঙ্গ এই উদ্ভিদের চালাকিতে বোকা না বনে যদি শেষ পর্যন্ত এই উদ্ভিদের কাছাকাছি চলে আসে, উদ্ভিদটির আশেপাশের বায়ুতে সেই পতঙ্গের পাখার দ্বারা উৎপন্ন ঢেউ বা কম্পনের বিস্তার (Amplitude) অনেক বেশী হয় যা উদ্ভিদটির মোটর কোষগুলির উদ্দীপনার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে উদ্ভিদটি আরও দ্রুত গতিতে তার পত্রিকাগুলিকে নাড়াতে থাকে যাতে সেই পতঙ্গ কোন পত্রিকায় না বসে চলে যায়। ঠিকভাবে বসতে বা দাঁড়াতে না পারলে কি আর খাওয়া জমে ? তবু কিছু নাছোড়বান্দা পতঙ্গ আছে যারা যেমন করে হোক কোন পত্রিকায় বসে তাতে কামড় দিয়েই দেয়। তখন সেই কামড়ও এক কম্পনের জন্ম দেয় যা পত্রিকাটির গা বেয়ে ভিত পর্যন্ত পৌঁছয়, ফলে পত্রিকাটির ভিতে উপস্থিত মোটর কোষগুলি উদ্দীপনা পেতে থাকে যার ফলে পত্রিকাটিকে একইভাবে নাড়িয়ে পতঙ্গটিকে পত্রিকা থেকে ছিটকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে এই উদ্ভিদ !

অর্থাৎ সুর বা বাদ্যের সঙ্গে এই উদ্ভিদের নাচ উদ্ভিদটির সুর বা বাদ্যের প্রতি কোন প্রতিক্রিয়া নয় বরং উদ্ভিদটির এক ভ্রান্ত ধারণার বহিঃপ্রকাশ ! উচ্চ কম্পাঙ্কের কোন শব্দ বা সুর উৎপন্ন হলে অথবা উচ্চ কম্পাঙ্কে বাদ্য বাজলে এই উদ্ভিদেরা কোন পতঙ্গের আগমনের আশঙ্কা করে আত্মরক্ষার জন্য নিজের পত্রিকাগুলিকে দ্রুত নাড়াতে থাকে।

তথ্যসূত্রঃ

দিগন্ত পাল

বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ থেকে অমলেশচন্দ্র তালুকদার স্মৃতি রৌপ্য পদকপ্রাপ্ত। আকাশবাণী কলকাতার একজন বিজ্ঞান-কথিকা লেখক ও শিল্পী। বিজ্ঞান প্রবন্ধ, বিজ্ঞান নিবন্ধ, কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প, কল্পবিজ্ঞান কবিতা, গাণিতিক কল্পকাহিনী, বিজ্ঞান নাটক, ও বিজ্ঞান কবিতা লেখেন।