আমাজন নদীর আতঙ্ক

ছবি: Listverse.com
গা ছম ছম করা জঙ্গল। বড় বড় পাতার গাছগুলি ঘেঁষাঘেঁষি করে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। এই আলো-আঁধারি জঙ্গলে কোথায় যে বিপদ লুকিয়ে আছে তা কে জানে? একটু অসতর্ক হলেই প্রাণটা খোয়াতে হতে পারে কোনো বন্য জন্তুর আক্রমণে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেইন ফরেস্ট (Rain forest) এই আমাজন জঙ্গল। ব্রাজিল, পেরু, কলোম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়াডোর, বলিভিয়া, গুয়ানা, সুরিনেম এবং ফ্রেঞ্চ গায়েনা— দক্ষিণ আমেরিকার এই ন’টি দেশে ছড়িয়ে আছে এই জঙ্গল। জঙ্গলের ষাট শতাংশই আছে ব্রাজিলে। এই জঙ্গলের বুক চিড়ে বয়ে চলেছে পৃথিবীর দ্বিতীয় লম্বা নদী ‘আমাজন’। সবচেয়ে লম্বা নীল নদ। তবে ব্রাজিলের একদল বিজ্ঞানীর দাবী যে আমাজন নদী নীল নদের চেয়ে লম্বা। এক নতুন পদ্ধতিতে মাপজোখ করে তাঁরা দাবী করছেন যে আমাজন 6992 কিলোমিটার এবং নীল নদ 6853 কিলোমিটার লম্বা। এ নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে বিতর্ক থাকলেও 2001 সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি (National Geographic Society) এই হিসেব মেনে নিয়েছে।

আমাজন নদীর উৎপত্তি আন্ডিজ পর্বতমালা্র 5,597 মিটার (18,363 ফুট) উঁচু নেভাডো মিস্মিন পর্বত শৃঙ্গের হিমবাহ। তাই এই নদীতে সারা বছরই জল থাকে। মূল নদীর বেশিরভাগটাই প্রবাহিত হয়েছে ব্রাজিল এবং পেরুর ভিতর দিয়ে। তবে এর বিভিন্ন শাখানদী দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ভিতর দিয়ে বয়ে চলেছে। বিশাল চওড়া নদী। আটলান্টিক মহাসাগরে যেখানে নদী এসে মিশেছে সেখানটা 240 কিলোমিটারের মতো চওড়া। এই বিশাল চওড়া নদীর প্রকৃত মোহনা কোথা থেকে শুরু তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এই বিশালতার জন্য এই নদী ও মহাসাগরের মিলন জায়গাকে অনেক সময় ‘নদী সমুদ্র’ বলা হয়ে থাকে।
ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে গন্ডোয়ানা যুগে এই নদী পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হত। প্রায় পনেরো মিলিয়ন বছর আগে নাজকা প্লেটের সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকা প্লেটের সংঘর্ষে আন্ডিজ পর্বতমালার সৃষ্টি হয়। এই সময় ধুলো, বালি, পাথরের টুকরো ইত্যাদি নদীমুখে জমে নদীমুখ আটকে যায়। ফলে সাগরের মতো বিশাল আকারের এক হ্রদের সৃষ্টি হয়। দশ থেকে এগারো মিলিয়ন বছর আগে সমুদ্রতল এই অঞ্চল থেকে নীচে নেমে যায়। তখন আমাজন হ্রদের জল পূর্বদিকে বইতে শুরু করে এবং নদীর রূপ নেয়। এই নদীর আতঙ্ক পিড়ানহা মাছ। এরা যখন ঝাঁকবেঁধে ঘুরে বেড়ায় তখন এদের ভয় পায় না এমন কোনো প্রাণী নেই। জলে ভেসে আসা মরা গরু, ঘোড়া, মোষ, ছাগল, মানুষ যাই হোক না কেন এরা নিমেষে তাদের মাংস খেয়ে ফেলে। পড়ে থাকে শুধু কঙ্কালটা। স্থানীয় মানুষেরা অনেক সময় এদের ‘পিড়ানা’ মাছ বলে থাকে। ভেনেজুয়েলায় এদের বলা হয় ‘ক্যারিবেস’। দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সব নদীতেই এদের পাওয়া যায়। মিষ্টি জলের এই মাংসাশি মাছগুলির ত্রিভুজাকৃতির দাঁতগুলি ব্লেডের মতো ধারালো হয়। চোয়াল হয় অত্যন্ত শক্ত। এছাড়া এদের আছে রাক্ষুসে খিদে।

আমাজন নদীর পিড়ানহা মাছের মতো এত হিংস্র মাছ পৃথিবীর আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। নিষ্ঠুরতার দিক থেকে এরা হাঙর, কুমিরদেরও লজ্জা পাইয়ে দেয়। অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীদের মধ্যে দেখা গেছে খিদে না থাকলে তারা শিকার ধরে না। পিড়ানহারা ঠিক উল্টো। এদের যেন খিদে মিটতেই চায় না। সবসময় খাই-খাই ভাব। যেকোনো প্রাণী নিজের শরীরের চেয়ে বড় কোনো প্রাণীকে সহজে আক্রমণ করে না। ব্যাতিক্রম পিড়ানহা। যত বড় প্রাণীই হোক না কেন এরা আক্রমণ করতে পিছ-পা হয় না। আর দলবেধে এরা যখন আক্রমণ করে তখন এদের ভয় পায় না এমন কোনো প্রাণী পৃথিবীতে নেই। অন্যান্য নদীতে যেসব পিড়ানহা আছে তারা চট করে মানুষকে আক্রমণ করে না। কিন্তু আমাজন নদীর পিড়ানহাদের স্বভাব বিপরীত। এদের কাছে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে তফাৎ নেই। যেকোনো প্রাণীর রক্ত এদের পাগল করে দেয়।
পিড়ানহা মাছ সাধারণত চোদ্দ থেকে ছাব্বিশ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে কিছু কিছু প্রজাতিকে আরও বেশি লম্বা হতে দেখা যায়। এদের উভয় চোয়ালেই একসারি করে ঘন তীক্ষ্ণ ত্রিভুজাকৃতির দাঁত থাকে। করাতের মতো এই দাঁত দিয়ে শিকারের মাংস কেটে নিতে এদের বেশি সময় লাগে না। মাথাটা অনেকটা তেলাপিয়া মাছের মতো ভোঁতা দেখতে। নানা রঙের পিড়ানহা দেখতে পাওয়া যায়। যেমন হলদে, ধূসর-রূপালি, নীলচে, আংশিক লাল, এমনকী কালচেও। যে পিড়ানহাদের পেটের দিকটা লাল রঙের হয় তারাই সবচেয়ে হিংস্র হয়।
প্রজননের সময় এলে আমাজনের পিড়ানহারা নদীর গভীরে চলে যায়। সুবিধা মতো জায়গা বেছে নিয়ে একটা ছোট গর্ত খোঁড়ে। সেখানে একটি স্ত্রী-পিড়ানহা একবারে হাজারটার মতো ডিম পাড়ে। ডিমগুলি পোস্ত দানার চেয়েও ছোট। ডিম ফুটে বাচ্চা বের না হওয়া পর্যন্ত ডিম পাহারা দেবার জন্য মা-বাবা উভয়েই সেখানে ঘুরপাক খেতে থাকে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে দু-চারদিন সময় লাগে। ছানা-পোনারা খোলস ছেড়ে বেরিয়েই খেতে চায়। মা-বাবারা তখন ছোটে খাবারের খোঁজে। এই সময় এদের জুপ্ল্যাঙ্কটন জাতীয় খাবার খেতে দেওয়া হয়। প্রথম দিকে ছানাপোনারা নিরামিষ খাবারই খায়। সেসময় এরা জলজ উদ্ভিদ, ফল, বীজ ইত্যাদি জাতীয় খাবার খেয়ে বড় হতে থাকে। এই সময় দুষ্টুমি করতে করতে ছানা-পোনারা যাতে এদিক ওদিক চলে না যায় সেজন্য মা-বাবাকে এদের বেশ কিছুদিন আগলে রাখতে হয়। জলের নীচে শত্রুর তো অভাব নেই? একটু অসতর্ক হলেই কয়েকটিকে টপাটপ মুখে পুরে কেটে পড়বে ওরা।
আমাজন ও তার শাখা নদী গুলিতে গ্রীষ্মকালে যখন জল কমে যায় তখন খাদ্যের অভাব দেখা দেয় আর তখনই নদীগুলিতে পিড়ানহার মানুষের প্রতি আক্রমণ বেড়ে যায়। শুকনো দিনে নদীর জলে কেউ নামলে বা পড়ে গেলে দু-চারটি পিড়ানহা এসে প্রথমে তার পায়ের আঙুল বা হাতের আঙুল ঠুকরে খেতে শুরু করে। জলে রক্ত মিশতে শুরু করলেই তার গন্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে পিড়ানহা ছুটে এসে আহত মানুষটাকে আক্রমণ করে এবং সারা শরীর থেকে মাংস খুবলে খেতে শুরু করে। ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এদের হাত থেকে তখন আর রেহাই নেই। 2015 সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রাজিলে একটি ঘটনা ঘটেছিল। এক ছুটির দিনে দাদুর সঙ্গে একটি বাচ্চা ছেলে আমাজন নদীতে নৌকা বিহারে বেরিয়েছিল। হঠাৎ-ই নৌকাটা উল্টে যায়। দাদু ও নাতি দু’জনেই জলে পড়ে যায়। দাদু প্রাণে বেঁচে গেলেও ছোট ছেলেটি পিড়ানহার আক্রমণে কয়েক মিনিটের মধ্যেই কঙ্কালে পরিণত হয়। সে এক বিভৎস দৃশ্য।
পিড়ানহা নানা প্রজাতির হয়। তবে মোট প্রজাতির সংখ্যা এখনও অজানা। নতুন নতুন প্রজাতি এখনও আবিষ্কার হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ‘প্রিস্টোব্রাইকন’, ‘পাইগোসেন্ট্রাস’, ‘পাইগোপ্রিস্টিস’ এবং ‘সেরাসালমাস’ প্রজাতিগুলিই প্রকৃত পিড়ানহা। আমাজন নদীর উপত্যকা এদের প্রধান আবাসস্থল হলেও দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য অঞ্চলের নদীগুলিতেও এদের দেখা মেলে। সব চেয়ে বিস্ময়ের কথা বাংলাদেশের কাপটাই হ্রদে এবং চিনের লিজিয়াং নদীতে এই মাছের দেখা পাওয়া গেছে। প্রধান আবাসস্থল ছেড়ে এত দূরে মাছগুলি এল কীভাবে? এর উত্তর এখনও পাওয়া যায় নি। অনেকের ধারণা কোনো এক সময়ে মাছ চুরি আটকাতে মাছ ব্যবসায়ীরা কাপটাই হ্রদে এই মাছগুলি ছেড়েছিল। যাতে ভয়ে কেউ এই হ্রদে না নামে। তবে এই ধারণার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায় নি।
দক্ষিণ আমেরিকার মানুষদের কাছে পিড়ানহা খাদ্য হিসেবে অতি লোভনীয় মাছ। টেবিল-ফিস হিসেবে পরিচিত এই মাছ খেতে বেশ সুস্বাদু। প্রথম প্রথম স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে এই মাছ খাবার প্রচলন ছিল। পরে তা দক্ষিণ আমেরিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এখন তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পিড়ানহা মাছ খাবারের টেবিলে শোভা পাচ্ছে। বর্তমানে এই মাছ আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও যথেষ্ট পাওয়া যায়। বিভিন্ন জেলায় মাছের বাজারগুলিতে রুই, কাতলা, ভোলা, ভেটকির পাশাপাশি পিড়ানহা মাছ বিক্রি হচ্ছে। এমনকী কলকাতার মাছের বাজারগুলিতেও এই মাছ ক্রেতাদের থলিতে জায়গা করে নিয়েছে। বাজারে ‘রূপচাঁদা’ নামে যে মাছ বিক্রি হয় তা প্রকৃতপক্ষে পিড়ানহারই একটি প্রজাতি। এই মাছ খেতে বড় তেলাপিয়া মাছের মতো সুস্বাদু।
দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীরা পিড়ানহার দাঁত দিয়ে নানা ধরনের ছোটখাট অস্ত্র তৈরি করে। মাছ ধরার বড়শিও তৈরি হয় এই দাঁত দিয়ে। মজার কথা হল, বড়শিতে যদি কোনো একটি পিড়ানহা মাছ গেঁথে যায় তাহলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অন্য পিড়ানহারা ঝাঁক বেধে তাকে আক্রমণ করে। ফলে জল থেকে বড়শি তোলার পর বেশিরভাগ সময় দেখা যায় সেখানে গেঁথে আছে হয় একটি ক্ষতবিক্ষত পিড়ানহা মাছ নতুবা তার কঙ্কাল।
মাংস খেকো পিড়ানহা কি অ্যাকোরিয়ামে রাখা যাবে? মাছ প্রেমিদের কাছে এমন প্রশ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাদের উদ্দেশ্যে বলি বিভিন্ন দেশের মাছ প্রেমিকরা অনেকদিন আগে থেকেই সাবধানতার সঙ্গে এই মাছ অ্যাকোরিয়ামে রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন। তবে ইউনাইটেড স্টেট্স-এ এই মাছ পোষা আইনত নিষিদ্ধ। ফিলিপিন্স-এ এই মাছ ঢুকতেই দেওয়া হয় না। সৌন্দর্যের জন্য মূলত লাল পেটের পিড়ানহাই অ্যাকোরিয়ামে রাখা হয়। কলকাতা চিড়িয়াখানার কাছে মাছের যে অ্যাকোরিয়াম আছে সেখানে পিড়ানহা মাছ আছে। এরা খুব মারকুটে স্বভাবের হয়। তাই কোনো অ্যাকোরিয়ামে কখনই দু”টো মাছ রাখা উচিত নয়। তাহলে দুর্বল মাছটি মারা পড়বে। এদের একা অথবা একসঙ্গে চারটে বা তার বেশি রাখা উচিত। দেখা গেছে একজায়গায় একসঙ্গে অনেকগুলি মাছ থাকলে নিজেদের মধ্যে মারামারি করার প্রবণতা অনেক কম থাকে।

Red Bellied Piranha | ছবি: aquarium-larochelle.com
মাছ সাধারণত মুখ দিয়ে শব্দ করতে পারে না। লাল পেটের পিড়ানহারা শব্দ করতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের দাবী তারা যখন এই মাছ ধরে তখন জালের ভিতর থেকে হালকা আওয়্যাজ শুনতে পায়। বিশেষজ্ঞদের অনুমা্ন লাল রঙের পেটের পিড়ানহা্রা ডাকতে পারে।
পিড়ানহা নিয়ে নানা রকম গল্প আছে। যেমন,
(১) এরা নাকি মানূষ দেখলেই আক্রমণ করে। ধারণাটা সঠিক নয়। নদীতে জল ও খাদ্যের পরিমাণ কমে গেলে তবেই এরা মানুষকে আক্রমণ করে। এছাড়া সব পিড়ানহা মানুষ খেকো নয়।
(২) পূর্ণ বয়াস্ক মানুষ বা কোনো বড় প্রাণীর দেহের মাংস এরা মুহূর্তে সাবাড় করে দিতে পারে। এ তথ্যও সঠিক নয়। সময় নির্ভর করে ঝাঁকে কতগুলি মাছ আছে তার উপর।
(৩) রক্তের স্বাদ বা গন্ধ এদের পাগল করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই তথ্য কতটা সঠিক তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
(৪) ব্রাজিলের লোকেদের বিশ্বাস নদী পারাপারের জন্য যখন গরু, ঘোড়া, জেব্রা ইত্যাদির মতো পশুর দল নদীতে নামে তখন দূর থেকে পিরানহার দল লক্ষ রাখে কে সবার আগে জলে নামছে। এরা ছুটে এসে শুধু তাকেই আক্রমণ করে। অন্যদের করে না। এই বিশ্বাসেরও কোনো ভিত্তি নেই। পিরানহাদের নিয়ে এমন কাল্পনিক গল্প আরও আছে।
নানা অতিরঞ্জিত গল্প থেকেই এদের সম্পর্কে মানুষের মনে নানা ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্রে এদের যতটা ভয়ঙ্কর বলে দেখানো হয় এরা ততটা ভয়ঙ্কর নয়। এদের সম্পর্কে শহরের মানুষদের মধ্যে যত ভয় দক্ষিণ আমেরিকার উপজাতিদের মধ্যে তত ভয় নেই। পিড়ানহা আছে জেনেও তারা আমাজন নদীতে দিব্যি স্নান করে বা সাঁতার কাটে। পিড়ানহাও যখন তখন তাদের আক্রমণ করে না।
পিড়ানহা মাছেরও শত্রু আছে। আর সবচেয়ে বিস্ময়ের কথা হল এরা নিজেরাই নিজেদের শত্রু। ঝাঁক ছেড়ে দু’টি পিড়ানহা একজায়গায় হলেই মারামারি অবধারিত। আর তাতে একজনের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামে না। সুযোগ পেলে একজন আরেকজনের ছানাপোনাদের টপাটপ মুখে পুড়তে দেরি করে না। এছাড়া আমাজন ও তার শাখানদীগুলিতে ঘুরে বেড়ানো কুমির, হাঙর, কচ্ছপ, ডলফিনরা তো আছেই। প্রতিদিন কত পিড়ানহা যে এদের পেটে যায় তার কোনো হিসেব নেই। এক সময় দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীরা ছাড়া এই মাছ খাওয়ার ঝোঁক আর কারও মধ্যে তেমন ছিল না। কিন্তু বর্তমানে এই মাছের প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে আসক্তি দিনে দিনে বাড়ছে। তাই আশঙ্কা হয় হয়তো এমন একদিন আসবে যেদিন মানুষই এদের প্রধান শত্রু হয়ে দাঁড়াবে।
‘পিড়ানহা’ নাম শুনলেই ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ পিড়ানহা নিয়ে অনেক গালগল্প আছে। আমাজন নদীতে প্রায় কুড়ি ধরনের পিড়ানহা আছে। এদের মধ্যে চার-পাঁচ প্রজাতির পিড়ানহা বিপজ্জনক। তাদের মধ্যে আবার লাল রঙের পেটের পিড়ানহা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। আজকাল অনেক দেশেই হ্যাচারিতে এই মাছের চাষ শুরু হয়েছে। আমাদের দেশেও হচ্ছে। খাদ্য হিসেবে এই মাছ বেশ সুস্বাদু। এখন প্রশ্ন হল, এই মাছের চাষ দিনে দিনে যেভাবে বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে স্থানীয় মাছগুলি ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে না তো?

কমলবিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়
জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে লেখালেখি।
