প্রায় ১০০ বছর পর নিউজিল্যান্ডে তাকাহে পাখি আবার ফিরে এসেছে!

৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ টিপেনে ওরেগান লাঠিতে ভর দিয়ে ঝুঁকে পৌঁছালেন একটি বড় কাঠের বাক্সের কাছে। কয়েক সেকেন্ড থেমে তিনি ধীরে ধীরে ঢাকনা খুললেন। চোখে তার অপার বিস্ময়! কী দেখলেন তিনি? বাক্সের ভিতরে রয়েছে উজ্জ্বল নীল-সবুজ বা ফিরোজা রঙের পালকে ঢাকা মোটা গোলগাল শরীরের একটি পাখি। পাখিটার পা আর ঠোঁট টকটকে লাল।
“আমি এখন প্রায় অন্ধ হয়ে গেছি, কিন্তু এখনো চোখের সামনে দেখতে পাই,” বললেন ওরেগান। স্মৃতির আলোয় যেন আবার দৌড়ে বেড়াচ্ছে সেই তাকাহে – যে পাখিটিকে ১৮৯৮ সালে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের অগাস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের একটি অংশে ১৮টি তাকাহে পাখি মুক্তি পেয়েছে—অথচ গত প্রায় ১০০ বছর ধরে তাদের ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়নি। ভাবা হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক এই পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু কিছুদিন ধরে তা আবার নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ দ্বীপের আলপাইন ঢালে, লেক ওয়াকাটিপু উপত্যকায় পুনরায় ফিরে এসেছে। এই পাখির প্রত্যাবর্তন নিউজিল্যান্ডে সংরক্ষণের এক বিরাট সাফল্যের সূচনা করেছে। বছর দুয়েক আগে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় এই খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল। গার্ডিয়ান আরও জানিয়েছে, এই সাফল্যের জন্য সারা দুনিয়াজুড়ে পাখিপ্রেমী মানুষেরা দারুণ উৎসাহিত হয়েছেন!
তাকাহে বড় মুরগির আকারের একটি পাখি, যার উচ্চতা প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৩ কেজি পর্যন্ত হয়, কিন্তু উড়তে পারে না। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাখিগুলি বছরে একবার প্রজনন করে এবং এক থেকে দুটি ছানা বড় করে। দেখা গেছে, তাকাহে দম্পতি প্রচণ্ডভাবে এলাকা-সচেতন; একেকটি পরিবার খাবারের প্রাপ্যতা ও মানের ওপর নির্ভর করে ৪০-১০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে থাকে। তারা সাধারণত স্টার্চি পাতা ও বীজ খায়। কিন্তু শীতকালে যখন তাদের বসতি বরফে ঢেকে যায়, তখন তারা বনে চলে যায় এবং প্রধানত একপ্রকার সবুজ ফার্নের মাটির নিচে থাকা রাইজোম খেয়ে বেঁচে থাকে। এরা বন্য অবস্থায় ১৮ বছর এবং অভয়ারণ্যে ২২ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
জীবাশ্ম থেকে প্রমাণিত হয়েছে, প্রাগৈতিহাসিক প্লাইস্টোসিন যুগে নিউজিল্যান্ডের আওতেয়ারোয়ায় এরা বিরাজ করত। তারা দূরসম্পর্কের আত্মীয় পুকেকো বা পার্পল সোয়াম্প হেনের মতো দেখতে, যদিও তাকাহে তাদের মতো উড়তে পারে না।
ইউরোপীয়রা যখন নিউজিল্যান্ডে বসতি স্থাপন করতে আসে, তখন তাদের সঙ্গে কিছু বন্য প্রাণী (যেমন বন্য বিড়াল, স্টোট, ফেরেট ইত্যাদি) এসেছিল। এরা তাকাহেদের শিকার করত বলে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। ১৮৯৮ সালে বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়ার পর আবার প্রায় ৫০ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে তাকাহেকে পুনরাবিষ্কৃত করা হয়। ইনভারকার্গিলের চিকিৎসক জিওফ্রে অরবেল ও তার দল লা মার্চিসন পর্বতমালার উপরের দুর্গম টাসক তৃণভূমিতে এই পাখির শেষ কিছু বেঁচে থাকা সদস্য খুঁজে পান। পুনরাবিষ্কারের সময় তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০০। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চলতে থাকে, কিন্তু প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি এবং সংখ্যা আবার কমতে থাকে। একসময় তাকাহে দক্ষিণ দ্বীপ জুড়ে ঘুরে বেড়াত; শিকারের চাপ, শিকারিদের দৌরাত্ম্য, আবাসস্থল ধ্বংস ও খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা তাদের বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়।
প্রথমিকভাবে সংরক্ষণবাদীরা তাকাহেদের শত্রু বা শিকারীদের রোধ করার জন্য ডিমগুলিকে বন্য পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করে কৃত্রিমভাবে পালন করতেন। তখন তারা ডিমগুলিকে তা দেয়া, ছানাগুলিকে খাওয়ান এবং বড় করেছিল। বন্দী অবস্থায় এদের প্রজনন সাফল্য পাওয়ার পর সংরক্ষণ বিভাগ(ডিওসি) মুক্তি পাওয়া তাকাহেদের ধীরে ধীরে কয়েকটি দ্বীপের অভয়ারণ্যে এবং জাতীয় উদ্যানে ছেড়ে দেয়। পাশাপাশি এদের শত্রুদের রোধ করার সর্বাত্বক প্রচেষ্টাও জারী থাকে।
সংরক্ষণ বিভাগ(ডিওসি) তাকাহে পূনরুদ্ধার অপারেশনের প্রধান ম্যানে বলেছেন “স্টেটাস, ফেরেটস ও ফেরাল বন্য বিড়ালদের ফাঁদে ফেলার ফলে শিকারীর সংখ্যা কমে গেছে”। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার জন্য অল্প বয়সী তাকাহেকে সাতটিকে ২০২৩ সালের শেষের দিকে ও ২০২৪ সালের প্রথম দিকে ১০টিকে মুক্ত পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সংরক্ষণবাদী ভার্কে সতর্ক কিন্তু আশাবাদী ছিলেন যে কয়েক দশক ধরে কঠোর পরিশ্রমে তাকাহের সংখ্যা বাড়ানোর পর অন্য আরও বিরল প্রজাতির পাখির সংখ্যা বাড়ানোর দিকে চেষ্টা করা যেতে পারে। তাকাহে পাখিকে টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের কাজটি নিউজিল্যান্ডের অন্যান সংকটাপন্ন পাখিদের রক্ষা করার জন্য একটি বিসতৃত প্রচেষ্টার অংশ। এই দেশে ২০৫০ সালের মধ্যে তাকাহেকের শত্রু প্রাণীদের যেমন বন্য ইঁদুর, পোসাম ও স্টোটকে রোধ করার একটি জাতীয় কর্মসূচী নেয়া হয়েছে।একই সাথে বিরল প্রজাতির পাখিগুলিকে পূনরায় মুক্ত পরিবেশে ছেড়ে দেওয়ার কাজটিও ইতিমধ্যে শরু করা হয়েছে, যেমন ২০২২ সালে জাতীয় পাখি কিউই প্রথমবারের মতো শহরের উপকন্ঠে হ্রদ ওয়াকাটিপু ওয়াইমাওরি নামক বন্য স্থানগুলিতে পূনরায় প্রবর্তন করা হয়েছে।
ন’গাই তাহু (Ngāi Tahu) নামক একটি উপজাতি ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় নিউজিল্যান্ডের দক্ষিন দ্বীপ অঞ্চলে মুক্ত পরিবেশে তাকাহের সংখ্যা বৃদ্ধির কাজ জোর কদমে এগগিয়ে চলেছে। এই আদিবাসী উপজাতিদের মধ্যে স্বচেতনতা বাড়ানর ফলে আজ সংরক্ষণের এই কাজটি বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে। সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অন্যতম নেতৃস্থানীয় ক্যাসিডি বলেছেন “এই উদ্যোগ অবিশ্বাস্যভাবে তাৎপর্যপূর্ন ছিল, কারণ, তাকাহে এক সময় এই উপজাতি অধ্যুসিত এলাকায় থাকতো, তাই নিজেদের এলাকায় তা সক্ষম হওয়া শুধু সাত প্রজন্মের কথা মনে রাখা এবং চিন্তা করা আমাদের অধিকার পাওয়ার জন্য লড়াই করেছিল”। নিউজিল্যান্ডের বেশিরভাগ দক্ষিন দ্বীপের মাওরি এবং এগনাই তাহুর কাছে তাকাহের বিশেষ সাংস্কৃতিক,আধ্যাত্মিক ও ঐতহ্যগত তাৎপর্য রয়েছে, এরা তাকাহেকে লক্ষীর দেবতা হিসাবে মনে করে। তাই তারা এই মূল্যবান প্রজাতিকে রক্ষা করার জন্য সংরক্ষণ আন্দেলনের সাথে নিজেদের যুক্ত করেছে।
এই প্রসঙ্গে বলা যায় তাকাহে বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে উপজাতিদের বেশিরভাগ জমি বাজেয়াপ্ত, বা কেড়ে নেয়া হয়েছিল।সেই সময়কালে স্থানীয় মাওরিয়া আদিবাসীরা এই পাহাড়ের চূড়ার নাম দিয়েছিল ‘কা ভেনুয়া রৌইমাতা‘ অর্থাৎ কান্নার দেশ। তাই ওরেগান বলেছেন “এখন আমি আশা করি দর্শনার্থীরা উপত্যকার কাছাকাছি থেকে তাকাহের ডাক বা গান উপভোগ করবেন।“
প্রথমে আমরা ওরেগানের গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন এটি সেই গল্পের উপসংহারে পৌঁছে গেছি।প্রায় ৫০ বছরেরও বেশী সময় আগে যখন ওরেগানের দশ বছর বয়সী ছিলেন তখন তিনি জীবন্ত তাকাহে দেখেছিলেন, উনি ছিলেন প্রথম তাকাহে দেখা ব্যাক্তিদের মধ্যে একজন।ওরেগানের বাবা ছিলেন একজন সংরক্ষণবাদী,দক্ষিন দ্বীপের একজন মূর্চিসন পাহাড়ে এই পাখি দেখার পর তিনি ১৯৪৮ সালে তাকাহে খুঁজে বের করার জন্য ২য় অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন, সাথে ছিল তার ছোট ছেলে। ওরেগান এখনও সেই স্মৃতি মনে রেখেছে ও বলেছেন “এই গত ২০২৩ এর আগষ্টের ২য় সপ্তাহে একটি দীর্ঘ বৃত্ত পূর্ন হল, এটি এক পরম আনন্দের মূহুর্ত”।

বিশ্ব রঞ্জন গোস্বামী
বিজ্ঞান লেখক।অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক, পশ্চিম বঙ্গ সরকার সদ্যস, জীব বৈচিত্র সংরক্ষন একাডেমি ,কলকাতা।
