Free ArticlesHealth-স্বাস্থ্যPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

আত্মহত্যা ও মস্তিষ্ক (২য় পর্ব)

suicide-2

প্রথম পর্ব থেকে আমরা জানতে পারিঃ–

প্রাণীর বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে জিনোমের জিনই এক প্রজন্ম থেকে অপর প্রজন্মে বয়ে নিয়ে চলে। আত্মহত্যা ও আত্মহত্যা-প্রবণতার জন্যও তাহলে কি মানব জিনোমের এক বা একাধিক জিন দায়ী হতে পারে?

মানব জিনোমে আছে প্রায় তিরিশ হাজার জিন। জিনোম অর্থাৎ জিনভাণ্ডার। এদের কার যে কি কাজ তা এখনো পুরোপুরি জানা যায় নি। তবে প্রত্যেকটি জিন যে আসলে একটি প্রোটিন তা অনেক আগেই জানা গেছে।

জিন বিজ্ঞানীরা জিনকে সরাসরি শনাক্ত করেন জিন প্রোব বা জিন শলাকা দিয়ে কিংবা জিনের উপজাতকে চিনে। যে সব জিন-প্রোটিন রক্তে ভেসে বেড়ায় তাদের চেনা যায় রক্ত পরীক্ষা করে। মস্তিষ্কের কাজকর্মকে যে সব জিন নিয়ন্ত্রিত করে থাকে তাদের চিহ্নিত করতে হলে মস্তিষ্কের জৈবতদন্ত বা বায়োপসি করতে হয়। মৃত মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা সংগ্রহ করা যায় ময়না তদন্তের সময় কিন্তু জীবন্ত মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা সংগ্রহ করা সব সময় সম্ভব হয় না। সেই সব ক্ষেত্রে জিনের বিপাকজাত উপজাত পদার্থগুলিকে শনাক্ত করে জিনকে পরোক্ষভাবে চিনতে হয় । মস্তিষ্কের জিনের উপজাতকে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে মস্তিষ্কসুষুম্না তরলে। শিরদাঁড়ায় সূচ ঢুকিয়ে এই তরল সহজেই বের করে আনা যায়।

যে প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় সুইডেনের সেই ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের এক দল বিজ্ঞানী প্রথম লক্ষ করলেন যে, আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীর মস্তিষ্কসুষুম্না তরলে ৫-হাইড্রোক্সিইনডোলঅ্যাসেটিক অম্লের (5-HIAA) পরিমাণ ভীষণ রকম কম থাকে। এটি সেরোটোনিন নামক মস্তিষ্কের এক রাসায়নিক পদার্থ বা স্নায়ুপ্রেরকের উপজাত পদার্থ। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করলেন যে, আত্মঘাতী বা আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের মস্তিষ্ক সেরোটোনিনের পরিমাণ কম থাকে। শুধু অনুমানে তো বিজ্ঞানীর চলে না। সেই অনুমানকে প্রমাণ করতে হয়। মৃত আত্মঘাতীর মস্তিষ্কের নমুনা পরীক্ষা করে সত্যিই দেখা গেল যে, ওদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন এবং তার উপজাত পদার্থ 5-HIAA – উভয়েরই পরিমাণ কম থাকে। এর থেকে বিজ্ঞানীরা স্থির সিদ্ধান্তে এলেন যে, মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ যাদের কম থাকে তারাই আত্মহত্যা করেন বেশি।

কালক্রমে এটিও জানা গেল যে, ট্রিপটোফ্যান হাইড্রোক্সিলেজ নামক জিনটিই সেরোটোনিনকে ভেঙ্গে 5-HIAA-তে পরিবর্তিত করে। TPH-জিনই মানব জিনোমের প্রথম জিন যা আত্মহত্যা ও আত্মহত্যাপ্রবণতার সঙ্গে এক বন্ধনীভুক্ত করে চিহ্নিত করা গেল।

জন হপকিন্স ইউনিভারসিটি স্কুল অব মেডিসিনের এক দল গবেষক মানুষের দুই নম্বর ক্রোমোসোমে একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন যা নাকি আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টার জন্য দায়ী। এক হাজার মনোরোগীকে পরীক্ষা করে তাঁরা জানতে পেরেছেন যে, এদের মধ্যে যারা আত্মহত্যা করেছেন তাদের মস্তিষ্কে ACP1 জিনের পরিমাণ বেশি থাকে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে গবেষকদের আনুসিদ্ধান্ত এই যে, ACP1 জিনজাত প্রোটিনকে দেহে প্রয়োগ করে আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীর আত্মহত্যাকে প্রতিরোধ করা যাবে। বর্তমানে এই কাজটি করা হয় লিথিয়াম নামক ওষুধ প্রয়োগ করে। কিন্তু লিথিয়ামের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এত বেশি যে অনেক রোগীর কাছে তা গ্রহনযোগ্য বিবেচিত হয় না। ACP1 জিন-প্রোটিনটিকে ওষুধ হিসাবে প্রয়োগ করে হয় তো ভবিষ্যতে আত্মহত্যার সংখ্যা কমানো যাবে এবং লিথিয়ামের পার্শ্বক্রিয়াকেও ঠেকানো যাবে।

জন হপকিন্সেরই আর এক দল গবেষক হালে আর একটি জিনের সন্ধান পেয়েছেন যার পরিমাণ আত্মঘাতীদের মস্তিষ্কে ভীষণ রকম কমে যায়। কপালের ঠিক পিছনে মস্তিষ্কের যে অংশটুকু থাকে, যার নাম প্রিফ্রন্টাল করটেক্স বা প্রাগ্‌ললাট করটেক্স, সেখানেই এই জিনটি সক্রিয় থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় এই জিনটি মানুষের নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং আবেগমথিত চিন্তাচেতনাকে নিস্তেজিত রাখে। এই জিনটির নাম SKA2-জিন। আত্মঘাতীদের মস্তিষ্কে এই জিনটির মধ্যে একটি রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। এর ডিএনএ-অনুক্রমে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকে না কিন্তু ‘মিথাইল গ্রুপ’ নামক এক রাসায়নিক পদার্থ সুস্থ জিনটির গায়ে লেগে জিনটিকে পালটে দেয়। এই প্রক্রিয়াটিকে জিনবিজ্ঞানীরা বলেন মিথাইলেসন বা মিথাইলযোজন। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে SKA2-জিনের মিথাইলযোজনের পরিমাণ মাপা যায় এবং ৮০-৯০% নিশ্চয়তার সঙ্গে রোগীর আত্মহত্যাপ্রবণতাকে চিহ্নিত করা যায়।

আগের আলোচনা থেকে আমরা জেনেছি যে, আত্মঘাতী ও আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তিদের শতকরা পঁচানব্বই জনই বিভিন্ন মনোরোগে ভুগে থাকেন। মনের আধার যে মস্তিষ্ক তা তো একবিংশ শতাব্দীর সব মানুষই প্রায় জানেন। এবার দেখা যাক মন তথা মস্তিষ্কের কি কি গোলমালে মানুষ আত্মহত্যাপ্রবণ হয়ে পড়ে।

মস্তিষ্কের এই সব গোলমালগুলি হতে পারে তার গঠনশৈলীর গোলমালে, স্নায়ুকোষের গণ্ডগোলের ফলে, জৈবরাসায়নিক গোলমালের কারণে এবং মস্তিষ্কের রক্তসিঞ্চনের অস্বাভাবিকতায়।

একটি বা দুটিমস্তিষ্ক গোলার্ধ যদি শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে যায় তাহলে নাকি মানুষের মনোরোগ তথা আত্মহত্যাপ্রবণতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বিষাদগ্রস্ত রোগীদের ডান মস্তিষ্ক গোলার্ধ নাকি ২৮% শীর্ণ হয়ে যায়। উদ্বেগগ্রস্ত ও বিষাদগ্রস্ত রোগীর নাকি বাম মস্তিষ্কগোলার্ধ শীর্ণ হয়ে যায়। আন্তর্জালে অর্থাৎ ইনটারনেটে প্রাপ্ত এই তথ্যটির সমর্থনে আর কোনো গবেষণালব্ধ ফলাফল জানা গেল না। বার্ধক্যে তে অধিকাংশ মস্তিষ্কই শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে যায়। তাহলে তো সব বৃদ্ধেরই মনোরোগ হওয়ার কথা বা তাবৎ বৃদ্ধেরই ফাঁসিতে ঝুলে পড়ার কথা! বাস্তবে তা কিন্তু হয় না।

সম্প্রতি জার্মানির এক দল বিজ্ঞানী এক ধরনের স্নায়ুকোষকে আত্মহত্যার সঙ্গে এক বন্ধনীভুক্ত করেছেন। মূলোর মতো দেখতে এই স্নায়ুকোষের নাম ভন ইকোনোমো স্নায়ুকোষ। আত্মঘাতীদের মস্তিষ্কে এই স্নায়ুকোষের সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এই ধরনের স্নায়ুকোষে থাকে এমন ধরনের গ্রাহী বা রিসেপটর যারা বিভিন্ন ধরনের স্নায়ুপ্রেরককে গ্রহন করতে পারে এবং মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এমন তিনটি স্নায়ুপ্রেরকের নাম ডোপামিন, ভ্যাসোপ্রেসিন এবং সেরোটোনিন। স্নায়ুপ্রেরকের কথা পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

নয় জন আত্মঘাতীর মস্তিষ্ককে আন্য কারণে মৃত তিরিশ জনের মস্তিষ্কের সঙ্গে তুলনা করে তাঁরা পূর্বোক্ত সিদ্ধান্তে এসেছেন। মানুষের জটিল সব আবেগমথিত ব্যাপারগুলিকে এই সব স্নায়ুকোষ বিশ্লেষণ করে। রজ্জা, আত্মগ্লানি ও সমানুভূতি বা এমপ্যাথিকে এরা এত গভীরভাবে প্রভাবিত করে যে মানুষ তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং হঠাৎ আত্মহত্যা করে ফেলে।

পৃথিবীর অন্য কোনো গবেষণাগারে এই পরিক্ষাটিকে এখনো অবধি পুনঃপ্রমাণিত করা যায় নি।

আমাদের জটিল সব মানসিক প্রক্রিয়াগুলিকে মস্তিষ্ক কি ভাবে সম্পন্ন করে? আগে ধারণা ছিল যে, স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক সক্রিয়তাই এসব কাজের জন্য মূলত দায়ী। কিন্তু গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে এই ধারণাটি ধীরে ধীরে পালটেছে। মানব মস্তিষ্কে থাকে ৮৬ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ যা কিনা আকাশের ছায়াপথে যত তারা আছে তার প্রায় অর্ধেক। প্রতিটি স্নায়ুকোষ তাদের শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে অপর স্নায়ুকোষের সাথে যোগাযোগ রেখে পরস্পরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে। দুটি স্নায়ুকোষের মধ্যেকার এই সব সংযুক্তিস্থলকে বলা হয় স্নায়ু-সন্নিকর্ষ বা সাইনাপ্‌স। ইংরেজ বিজ্ঞানী চার্লস শেরিংটন ১৮৯৭ সালে তার গবেষণার মাধ্যমে এই স্নায়বিক সংযুক্তিস্থলগুলিকে চিহ্নিত করেন এবং তাদের নাম দেন সাইনাপ্‌স, বাংলায় যার নাম সন্নিকর্ষ। দুটি স্নায়ুর সন্নিকর্ষস্থলে স্নায়ুপ্রান্ত দুটি কিন্তু গায়ে গায়ে লেগে থাকে না। দুটি স্নায়ুপ্রান্তের মাঝে সামান্য একটু ফাঁক থাকে। এই ফাঁকটির নাম সন্নিকর্ষ ফাটল। এ যেন ছেঁড়া তার যার মধ্য দিয়ে এক স্নায়ুর বৈদ্যুতিক বার্তা অপর স্নায়ুতে সরাসরি যেতে পারে না।

ইতালির বিজ্ঞানী ভিত্তোরিয়ো এর্সপামার (Vittorio Erspamer) (১৯০৯-১৯৯৯) ও ইংরেজ বিজ্ঞানী চার্লস শেরিংটন (Charles Sherrington)(১৮৫৭-১৯৫২) |ছবিঃ গুগুল

সন্নিকর্ষ ফাটলের এই বাধাকে অতিক্রম করার জন্য বুদ্ধিমতী প্রকৃতি প্রাণীর মস্তিষ্কে একটি কৌশল পুরে দিয়েছেন। এই কৌশলের সাহায্যেই প্রাণিমস্তিষ্ক তার বার্তা বিনিময়ের কাজটি করে আসছে সেই আদি কাল থেকে। হালে আমরা তার হদিশ পেয়েছি – গত শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে। এটি জানা গেছে যে, সন্নিকর্ষের পূর্ববর্তী স্নায়ুপ্রান্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ক্ষরিত হয় সন্নিকর্ষ ফাটলে। এই সব রাসায়নিক পদার্থ সন্নিকর্ষের সন্নিকর্ষের পরবর্তী স্নায়ুপ্রান্তকে উত্তেজিত করে বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি করে যা বয়ে চলে পরবর্তী স্নায়ুর গা বেয়ে।

এই রাসায়নিক পদার্থগুলির নাম স্নায়ুপ্রেরক বা নিউরোট্র্যান্সমিটার। সম্প্রতি জানা গেছে যে, মস্তিষ্কে এই সব স্নায়ুপ্রেরকের পরিমাণ বাড়লে বা কমলে বিভিন্ন স্নায়ুরোগ ও মনোরোগের সৃষ্টি হয়।

এমন একটি স্নায়ুপ্রেরকের নাম সেরোটোনিন। মস্তিষ্কে এর পরিমান কমে গেলে মানুষ হয়ে পড়ে বিষাদগ্রস্ত এবং আত্মহত্যাপ্রবণ।

ট্রিপটোফ্যান নামক অ্যামাইনো অম্ল থেকে সেরোটোনিন তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় যে উৎসেচকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় তার নাম ট্রিপটোফ্যান হাইড্রোক্সিলেজ। এটি একটি জিন যার নাম TPH-জিন। এই‌ জিনটির কথা আমরা পূর্বের আলোচনায় জেনেছি। দেহে বা খাদ্যে ট্রিপটোফ্যানের ঘাটতি ঘটলে মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ কমে আসে। এই জন্যই খিদে পেলে আমাদের মেজাজ বিগড়ে যায় – আমরা খিটখিটে হয়ে পড়ি। খাদ্যে ট্রিপটোফ্যানের জোগান বাড়ালে আবার আমাদের মন ভালো হয়, মেজাজে আমেজ আসে। আমাদের উদ্‌বেগ কমে আসে এবং ঘুম পায়।

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন ছাড়াও মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ বাড়ানো কমানো যায় ওষুধের সাহায্যে। দীর্ঘদিন ধরে বানরকে কোলেস্টেরল-মুক্ত খাদ্য খাইয়ে দেখা গেছে যে, ওদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর ফলে ওরা হযে পড়ছে বদমেজাজি, লড়াকু এবং হিংসাপ্রবণ।

মানুষের ক্ষেত্রেও একই জিনিস লক্ষ করা গেছে। যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকে কিংবা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ খেয়ে যাদের রক্তের কোলেস্টেরলের পরিমাণ খুব কমে গেছে তাদের মধ্যে খুনখারপি, আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। মানুষতো আজকাল কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ মুড়িমুড়কির মতো খেয়ে চলেছে। এসব ওষুধ সেবনের লাভক্ষতি নিয়ে বহূ সমীক্ষা হয়েছে। সবারই ফলাফল প্রায় এক রকম। হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুহার সামান্য কমলেও এসব ওষুধসেবীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়েছে।

বর্তমানে এটি জানা গেছে যে, ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানও মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ বাড়ায়-কমায়। উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ বেশি থাকে। হঠাৎ পদচ্যুত হলে, ক্ষমতাচ্যুত হলে বা অবসর গ্রহন করলে তার পরিমাণ কমে যায়। এই ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতার হারও তাই বেশি।

মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়লেও বিপদ। মানুষের মধ্যে দেখা দেয় উন্মাদনা। মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ বাড়া-কমায় একই মানুষের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেখা দিতে পারে হর্ষ ও বিষাদ। মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের পরিমাণ বাড়লে রোগী ভোগে শুচিবায়ু রোগে। রোগী সব ব্যাপারেই খুব খুঁতখুঁতে হয়, একই চিন্তা মনের মধ্যে ঘুরপাক খায় এবং ইচ্ছা না থাকলেও একই কাজ বাধ্যতামূলকভাবে বারবার করতে থাকে। এ যেন শাঁখের করাত, বাড়লেও বিপদ কমলেও বিপদ।

সেরোটোনিনের আবিষ্কারের ইতিহাসও রূপকথার মতো। ইতালির এক যুবক উকিল হতে গিয়ে হয়ে গেলেন গবেষক। প্রাণিদেহের নির্যাস থেকে ওষুধ বানানো – এই ছিল তার গবেষণার বিষয়। খরগোশের পাকস্থলী থেকে তিনি খুঁজে পেলেন একটি জৈব-অ্যামাইন যা ইঁদুরের জরায়ুর মসৃণপেশিকে সংকুচিত করতে সমর্থ হল। ভিত্তোরিয়ো এর্সপামার ১৯৩৭ সালে এই অজানা অ্যামাইনের নামকরণ করলেন এন্‌টার‍্যামাইন। ওইটিই যে সেরোটোনিনের ছেলেবেলার নাম তা জানা গেল অনেক পরে।

আমেরিকার গবেষক মরিস র‍্যাপোর্ট ১৯৪৯ সালে আমাদের জানালেন যে, ওই পদার্থটির রাসায়নিক গঠনের নাম ৫-হাইড্রোক্সিট্রিপটামাইন। তার দুই বছর বাদে, ১৯৫১ সালে, আমেরিকার এক ওষুধের কোম্পানি কৃত্রিম উপায়ে তাকে বানাতে সক্ষম হলেন এবং তার নাম দিলেন সেরোটোনিন। অর্থাৎ সেরোটোনিন আর এনটার‍্যামাইন যে একই পদার্থ তা এত দিনে জানা গেল। তারও দুই বছর পরে, ১৯৫৩ সালে, বেটি ত্বারোগ নামক এক মার্কিন গবেষিকা সেরোটোনিনকে মস্তিষ্কে খুঁজে পেলেন।

সেরোটোনিন যে মনোরোগের কারণ হতে পারে তা ১৯৫৪ সালে প্রথম অনুমান করলেন ড. উলি। আমেরিকার এই গবেষক ডায়াবিটিস রোগের জটিলতার কারণে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দিবাস্বপ্নে দেখলেন যে, সেরোটোনিনের গঠন আর মাদকদ্রব্য এলএসডির গঠন একই রকম। তিনি প্রস্তাব করলেন যে, এলএসডির নেশায় যে যে মানসিক উপসর্গ হয় সেরোটোনিনের প্রাচুর্য বা অভাবও একই ধরনের মানসিক রোগ সৃষ্টি করবে। তাঁর অনুমান যে সঠিক ছিল তা জানা গেল আরো পরে – ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষণার মাধ্যমে। এলএসডি নেশাখোররা যে বিষাদ ও আত্মহত্যাপ্রবণতায় ভোগে তা তো আজ সব চিকিৎসকই জানেন।

সেরোটোনিন ছাড়াও আরো কিছু রাসায়নিক পদার্থও যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে তা হালের গবেষণায় ক্রমে ক্রমে জানা যাচ্ছে। এমন একটি রাসায়নিকের নাম ‘মস্তিষ্ক জাত স্নায়ুপুষ্টি নিয়ামক’ (BDNF)। মস্তিষ্ক, স্নায়ুকোষ ও স্নায়ুসন্নিকর্ষকে পুষ্টি জোগানো এর মূল কাজ। আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের রক্তে এবং আত্মঘাতীর মস্তিষ্কে এর পরিমাণ কমে যেতে দেখা গেছে।

এরা ছাড়াও আরো যেসব রাসায়নিক পদার্থের প্রতি বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানী দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত হয়েছে তাদের কয়েকটির নাম অ্যাডিনাইলিল সাইক্লেজ, ফসফোআইনোসিটাইড, ফসফোলাইপেজ-সি, জি-প্রোটিন, প্রোটিন কাইনেজ-এ, প্রোটিন কাইনেজ-সি এবং ক্রেব প্রোটিন। এদের নিয়ে গবেষণা চলছে কিন্তু ফলাফল এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায় নি।

এতক্ষণ আমরা আলোচনা করলাম আত্মহত্যাপ্রবণতায় মস্তিষ্কের জৈবরাসায়নিক গোলমাল নিয়ে। এবার আমরা আলোচনা করব মস্তিষ্কের রক্তসিঞ্চনের গোলমালের কথা। রক্তসিঞ্চন অর্থাৎ সেরিব্রাল পারফিউসন। রক্তের পুষ্টিকর পদার্থ মস্তিষ্ককলায় পৌঁছানো এবং মস্তিষ্ককলার বিপাকজাত পদার্থ রক্তে বর্জন করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় রক্তসিঞ্চন। রক্ত সরবরাহ আর রক্তসিঞ্চন এক জিনিস নয়।

মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের রক্তসিঞ্চনের বাড়া-কমা দেখে বিজ্ঞানীরা আজকাল মানুষের মানসিক যন্ত্রণাকেও মাপতে শিখেছেন। যে কৌশলের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এই কাজটি করে থাকেন তার নাম এক ফোটন নিঃসারী স্তরচিত্রণ (SPECT scan)। জানা গেছে যে, মানসিক যন্ত্রণায় কাতর, বিষাদগ্রস্ত এবং আত্মহত্যাকামী মানুষের মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে রক্তসিঞ্চন বেড়ে যায় এবং কোনো কোনো অঞ্চলে রক্তসিঞ্চন কমে যায়। এই পর্যবেক্ষণটির গুরুত্বের মূল্যায়ন এখনো অবধি হয় নি। তবে মানসিক যন্ত্রণাও যে আত্মহননের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তা আন্দাজ করা যায়।

শেষের কথা

এত তথ্য সরবরাহ করে পাঠককে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্য এই লেখকের কখনোই ছিল না। শার্লক হোমস একবার বলেছিলেন, আমার তথ্য চাই, অনেক তথ্য চাই। ইট ছাড়া কি প্রাসাদ বানানো যায়? যেসব তথ্য এই প্রবন্ধে সন্নিবেশিত হয়েছে তার থেকে যে সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে তা হল – আত্মহত্যা ও আত্মহত্যা প্রবণতার একটি বংশগত ও জিনগত ধাত থাকে। পরিবেশের প্রতিকুলতা তাকে উসকে দেয় মাত্র।


ড. নৃপেন ভৌমিক

অধ্যাপক ও বিভাগিয় প্রধান, শ্নায়ুশল্য বিভাগ, কেপিসি মেডিকাল কলেজ, কলকাতা