অদ্ভুত যত গ্যালাক্সি – পর্ব ২

সেন্টরাস এ (Centaurus A)
সেন্টরাস নক্ষত্রমণ্ডলীতে (Constellation Centaurus) থাকা এই অদ্ভুত গ্যালাক্সিটির অপর নাম এনজিসি ৫১২৮ (NGC 5128)। অতিকায় এই গ্যালাক্সিটির ভর সৌরভরের ১০০০০০ কোটি গুণ। সেন্টরাস-এ-কে নিয়ে অনেক বিতর্ক। প্রথম বিতর্ক এর দূরত্ব নিয়ে। একদল বিজ্ঞানী বলছেন, পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ১ কোটি আলোকবর্ষ; অন্যদল বলছেন, না, এই দূরত্ব কোনমতেই ১ কোটি ৬০ লক্ষ আলোকবর্ষের কম নয়। দ্বিতীয় বিতর্ক এর জ্যামিতিক আকৃতি নিয়ে। কেউ বলছেন, এটি আতসকাঁচের মতো ফোলা বা লেন্টিকুলার (Lenticular)। আবার কেউ বলছেন, এটি ডিমের মতো উপবৃত্তাকার ( Elliptical)।
গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে ৫.৫ কোটি সৌরভর বিশিষ্ট একটি অতিকায় কৃষ্ণগহ্বর রয়েছে। ওই কৃষ্ণগহ্বরের ঠেলায় তীব্র এক্সরশ্মি ও রেডিও তরঙ্গ সমন্বিত প্লাজমা স্রোত বেরিয়ে আসছে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে। প্রায় ১০ লক্ষ আলোকবর্ষ দীর্ঘ এই মহাশক্তিশালী স্রোত অতিদ্রুতগামী। আলোর বেগের অর্ধেক বেগে নির্গত হচ্ছে এই স্রোত।
রেডিও তরঙ্গ বিকিরণের নিরিখে এই গ্যালাক্সি পৃথিবীর নিকটতম শক্তিশালী গ্যালাক্সি। আকাশের পঞ্চম উজ্জ্বল এই গ্যালাক্সিটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। মনে করা হয় যে, দুটি ছোট গ্যালাক্সির সংঘাতের ফলেই সেন্টরাস-এ এর জন্ম হয়েছিল। কিম্বা অতীতে কোনো ছোট গ্যালাক্সিকে উদরসাৎ করেছিল এনজিসি ৫১২৮। গ্যালাক্সিটির মধ্যভাগ বরাবর ছড়িয়ে থাকা ধুলো-গ্যাসের অন্ধকার চাকতিটিই নাকি ওই সংঘাতের সাক্ষ্য দিচ্ছে। চাকতিটির মধ্যে বিজ্ঞানীরা প্রায় ১০০টি সক্রিয় নক্ষত্রসৃষ্টিকারী অঞ্চল খুঁজে পেয়েছেন।
অতিসম্প্রতি এই গ্যালাক্সির দৈর্ঘ্য বরাবর প্রায় ৪৫০০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে (কার্যকর দৈর্ঘ্যের ২৫ গুণ প্রায়) এবং প্রস্থ বরাবর ২৯৫০০০ আলোকবর্ষ জুড়ে(কার্যকর প্রস্থের প্রায় ১৬ গুণ) বিশদ অনুসন্ধান চালাল হাবল স্পেস টেলিস্কোপ। এই অনুসন্ধানে অদ্ভুত এক তথ্য ধরা পড়ল। দেখা গেল, গ্যালাক্সিটির বহির্মণ্ডলে থাকা তারকাগুলির মধ্যে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেশি। এর একটাই কারণ হতে পারে। অতীতে নিশ্চয় কোনো সর্পিলাকার গ্যালাক্সিকে গিলেছে এনজিসি ৫১২৮; সেই গ্যালাক্সির ধাতুসমৃদ্ধ তারকারা ছিটকে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে এই গ্যালাক্সির বহির্জ্যোতির্মণ্ডলে।
এম ৮৭ বা মেসিয়ার ৮৭ (Messier 87)

পৃথিবী থেকে প্রায় ৫.৩ কোটি আলোকবর্ষ দূরে কন্যারাশির (Constellation Virgo) গভীরে রয়েছে এই অতিকায় উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি। এর অপর নাম ‘ভার্গো এ’ বা এনজিসি ৪৪৮৬ (Virgo A or NGC 4486)। পিণ্ডাকার এই উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিতে কোনো নতুন তারা তৈরি হয় না। সর্পিলাকার নক্ষত্রপ্রসূ গ্যালাক্সিগুলির যেমন গঠনে বৈচিত্র্য আছে, এর তেমন নেই। কেন্দ্র থেকে বহির্ভাগের দিকে ধীরে ধীরে ঔজ্জ্বল্য কমে আসে। এম ৮৭-এর কেন্দ্রে থাকা অতিকায় কৃষ্ণগহ্বরটি সূর্যের চেয়ে ৩৫০ কোটি গুণ ভরযুক্ত। ওই অতিকায় কৃষ্ণগহ্বরের তীব্র টান শুধু ওই গ্যালাক্সির ১০০০০ কোটি তারাকে বেঁধে রাখেনি, আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্যালাক্সি নিয়ে সম্পূর্ণ একটি গ্যালাক্সিগুচ্ছকে বেঁধে রেখেছে।
এম ৮৭ গ্যালাক্সিটির সবচেয়ে বিস্ময়কর হল ওর মধ্যে থাকা বর্তুলাকার নক্ষত্রস্তবকের (Globular cluster) সংখ্যা। প্রায় ১৩০০০ ওই ধরনের নক্ষত্রস্তবক রয়েছে গ্যালাক্সিটিতে। যা এযাবৎ জানা কোনো গ্যালাক্সির পক্ষে সর্বাধিক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সিতে মাত্র ১৫০টি বর্তুলাকার নক্ষত্রস্তবক রয়েছে। প্রতিটি নক্ষত্রস্তবকের গড় ভর প্রায় ২ লক্ষ সৌরভর।
এম ৮২ (Messier 82)

সপ্তর্ষিমণ্ডলের (Constellation Ursa Major) গভীরে থাকা এই বিচিত্রদর্শন গ্যালাক্সিটির অপর নাম সিগার গ্যালাক্সি। জ্বলন্ত সিগারেটের মতো দেখতে বলেই বোধ হয় এমন নাম। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ১ কোটি ২০ লক্ষ আলোকবর্ষ। এম ৮২ অনিয়তাকার আকৃতিবিশিষ্ট হলেও নিকট-অবলোহিত (Near Infra red) রশ্মি পর্যবেক্ষণে এর দু’টি সুষম সর্পিলাকার বাহু পাওয়া গেছে। ২০০৫ সালে হাবল টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অংশে ১৯৭টি অতিকায় বর্তুলাকার নক্ষত্রস্তবক (Globular cluster) পাওয়া গেছে। প্রতিটি নক্ষত্রস্তবকের গড় ভর সৌরভরের প্রায় ২০০০০০ গুণ। গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রে নক্ষত্রসৃষ্টির হার আমাদের ছায়াপথের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি।

এম ৮২-এর কেন্দ্রের অতিকায় কৃষ্ণগহ্বরটির ভর সৌরভরের প্রায় ৩ কোটি গুণ। কেন্দ্রের চারপাশে প্রায় ১৬৩০ আলোকবর্ষ পরিমিত স্থান জুড়ে অবিরাম নক্ষত্রসৃষ্টির প্রক্রিয়া চলছে। কিছুদিন আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চন্দ্র এক্সরশ্মি টেলিস্কোপের (Chandra X-ray Telescope) সহায়তায় এম-৮২ এর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে ৫০০০ সৌরভর বিশিষ্ট একটি মাঝারি মাপের কৃষ্ণগহ্বর খুঁজে পান। সারা ব্রহ্মাণ্ডে অমন মাঝারি মাপের কৃষ্ণগহ্বর আগে পাওয়া যায়নি। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার ঘটল ২০১০ সালে। ম্যাঞ্চেস্টারের জড্রেল ব্যাংক পর্যবেক্ষণাগারের (Jodrell Bank Observatory) বিজ্ঞানীরা এই গ্যালাক্সিতে এক অদ্ভুত জ্যোতিষ্ক খুঁজে পেলেন। অত্যধিক রেডিও তরঙ্গ বিকিরণকারী এই বস্তুটি আলোর চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেগে গতিশীল। পদার্থবিদ্যার কোনো তত্ত্ব দিয়েই এটিকে এযাবৎ ব্যাখ্যা করা যায়নি। সম্প্রতি স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট (Smithsonian Institute) এবং চন্দ্র এক্স-রশ্মি টেলিস্কোপের (Chandra X-ray Telescope) যৌথ অনুসন্ধানে এম-৮২ এর নক্ষত্রসৃষ্টিকারী অংশে ২৯টি এমন বস্তু পাওয়া গেছে যাদের বহির্মুখী বাতাসের বেগ প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। বহির্মুখী বাতাস না বলে এগুলিকে বহির্মুখী বিস্ফোরণ বলাই ভাল। সাধারণ গ্যালাক্টিক বাতাসের চেয়ে এগুলি প্রায় ১০ গুণ দ্রুতগামী।
এনজিসি ২৬২৩ (NGC 2623)

কর্কট রাশিতে (Constellation Cancer) থাকা এই অদ্ভুতদর্শন গ্যালাক্সিযুগলের অপর নাম আর্প ২৪৩। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব অন্ততপক্ষে ৩০ কোটি আলোকবর্ষ। প্রায় ১০ কোটি বছর আগে শুরু হয়েছিল গ্যালাক্সিযুগলের এই সংঘর্ষ। সংঘাতের প্রায় শেষ পর্যায়ে প্রায় ২০৩০০০ আলোকবর্ষ পরিমিত স্থান জুড়ে রয়েছে এই গ্যালাক্সিযুগল। এদের দীর্ঘ লেজটি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্ভবত তিনটি গ্যালাক্সির সংঘাতের ফলেই অমন বিচিত্র গ্যালাক্সির সৃষ্টি হয়েছে। ওই দীর্ঘ লেজের মধ্যে প্রায় ১০০টি বর্তুলাকার নক্ষত্রগুচ্ছ রয়েছে। কেন্দ্রে অবশ্য মাত্র একটিই নিউক্লিয়াস রয়েছে। কেন্দ্রটিকে যদি জুম করে দেখা হয়, তাহলে সামগ্রিক তুমুল সংঘাতের ছবিটা পাওয়া যাবে। নীলচে অংশটিতে জোরকদমে তারা তৈরি হচ্ছে। আর লালচে অংশটিতে ধুলো আর জটিল আণবিক মেঘ রয়েছে। এই দুটি গ্যালাক্সিও আগামী ১০০ কোটি বছরের মধ্যে পরস্পর মিশে গিয়ে একটি বৃহদাকার উপবৃত্তীয় গ্যালাক্সি তৈরি করবে।

তন্ময় ধর
জন্ম হুগলী জেলার কোন্নগর নবগ্রামে। বর্তমানে হিমালয়ের গোবিন্দ বল্লভ পন্থ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী। গত দু’দশক ধরে নিয়মিত জনপ্রিয় বিজ্ঞানপ্রবন্ধ লিখেছেন জ্ঞান ও বিজ্ঞান, কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান, কিশোর বিজ্ঞানী, আনন্দমেলা, Everyman’s Science ইত্যাদি পত্রিকায়।
