অদ্ভুত যত গ্যালাক্সি – পর্ব ১

মানুষের দীর্ঘ গবেষণায় এবং পর্যবেক্ষণে আমাদের মহাজাগতিক ঘর অর্থাৎ ছায়াপথ গ্যালাক্সির পূর্ণ রূপ আমাদের চোখে ধরা পড়েছে। জানা গিয়েছে যে, প্রায় ৪০০০০ কোটি নক্ষত্র রয়েছে আমাদের সেই সুবৃহৎ ঘরে। আর সঙ্গে অসংখ্য নীহারিকা, গ্রহ, গ্রহাণু ইত্যাদি ইত্যাদি। এত সুবিশাল এই ছায়াপথের কথা জানার পর আমাদের জানতে ইচ্ছে করে যে, ছায়াপথের আশেপাশে প্রতিবেশী কারা আছে? কিম্বা সুবিস্তৃত এই ব্রহ্মাণ্ডেই বা আর কত গ্যালাক্সি আছে? যখন শুনি, আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান অংশে প্রায় ২০০০০-৫০০০০ কোটি গ্যালাক্সি আছে, তখন অবাক হওয়ার পালা শুরু হয়। দৃষ্টির বাইরে থাকা জ্বলন্ত গ্যাস-ধুলো-প্লাজমায় তৈরি বিচিত্র যত নক্ষত্র-নীহারিকা নিয়ে তৈরি গ্যালাক্সিগুলির রহস্য আমাদের মনে শিহরণ জাগাতে শুরু করে। ঘরের কাছের নক্ষত্রদের সম্পর্কে তো অনেক কথা শোনাই যায়, এবার ব্রহ্মাণ্ডের কোণে কোণে ছড়িয়ে থাকা অদ্ভুত গ্যালাক্সিদের সম্পর্কে একটু জানা যাক।
১৯৬৬ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিদ হ্যালটন আর্প সারা আকাশ খুঁজে ৩৮৮ টি অদ্ভুত গ্যালাক্সির তালিকা তৈরি করেন। মূলত অতিকায় সর্পিলাকার (Spiral) এবং উপবৃত্তাকার (Elliptical) গ্যালাক্সিগুলির বিকৃতি ও পারস্পরিক সংঘর্ষ ভালো করে বোঝার জন্য আর্প এই তালিকা তৈরি করেন। তালিকার ১-১০১ পর্যন্ত রয়েছে অদ্ভুত আকৃতির সর্পিলাকার গ্যালাক্সিগুলো; ১০২-১৪৫ পর্যন্ত রয়েছে উপবৃত্তাকার বা প্রায়-উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিরা; ১৪৬-২৬৮ পর্যন্ত রয়েছে উপবৃত্ত বা সর্পিলের মাঝামাঝি আকৃতির গ্যালাক্সিরা; ২৬৯-৩২৭ পর্যন্ত রয়েছে গ্যালাক্সি যুগলগুলি। আর বাকি গ্যালাক্সিগুলি একেবারেই জ্যামিতি-বহির্ভূত।
এখন আমরা এক এক করে এই বিচিত্র গ্যালাক্সিগুলির কথা শুনব।
আর্প ১৪৭ (Arp 147)

তিমিমণ্ডলের (Constellation Cetus) গভীরে পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৪ কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা অদ্ভুত সুন্দর গ্যালাক্সি আর্প ১৪৭। ১৮৯৩ সালে স্টেফান জাভেলে এই অদ্ভুত গ্যালাক্সিটি আবিষ্কার করে এটিকে ‘অদ্ভুত গ্যালাক্সির মানচিত্রে’ অন্তর্ভুক্ত করেন। কী করে জন্ম হয়েছিল এই সুদৃশ্য গ্যালাক্সির? একটি সর্পিলাকার গ্যালাক্সি এবং একটি উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সির সংঘাতের ফলেই এর সৃষ্টি। সংঘাতের ফলে আজ থেকে ৪ কোটি বছর আগে নক্ষত্র সৃষ্টিকারী এক তরঙ্গ তৈরি হয় যা প্রায় ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে ওই গ্যালাক্টিক সিস্টেম থেকে বাইরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ঐ নক্ষত্রবলয়ের মধ্যে মোট নয়টি কৃষ্ণগহ্বর পাওয়া গিয়েছে যাদের প্রতিটির ভর ১০-২০ সৌরভরের কাছাকাছি। ডানদিকের গ্যালাক্সিটি প্রায় ৩০০০০ আলোকবর্ষ স্থান জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। সঙ্গী গ্যালাক্সির থেকে তার দূরত্ব ২১০০০ আলোকবর্ষ। আর সমগ্র সিস্টেমটি প্রায় ১১৫০০০ আলোকবর্ষ পরিমিত স্থান জুড়ে রয়েছে। ডানদিকের ওই সক্রিয় গ্যালাক্সিটিতে প্রতি বছর প্রায় ৪.৭ সৌরভর হারে নক্ষত্র তৈরি হয়। নক্ষত্রবলয়টি ২২৫ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড বেগে পাশের দিকে প্রসারিত হচ্ছে।
মূষিক গ্যালাক্সি (Mice galaxies)

উত্তর আকাশে কোমা বেরেনিকস নক্ষত্রমন্ডলীর (Constellation Coma Berenics) গভীরে প্রায় ২৯ কোটি আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে দুটি মূষিক গ্যালাক্সি। এই দু’টি গ্যালাক্সির মধ্যে সংঘাতও শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ২৯ কোটি বছর আগে। গ্যালাক্সিযুগলের বর্ণ এবং জ্যামিতিক আকৃতি কিন্তু অদ্ভুত। গ্যালাক্সিদুটূর একটির নাম দেওয়া হয়েছে এনজিসি ৪৬৭৬এ (NGC 4676A)। (‘NGC’ –এর পুরো কথাটি হল ‘New General Catalogue of nebulae and clusters of stars’। ১৮৮৮ সালে দিনেমার জ্যোতির্বিদ জন লুইস এমিল ড্রেয়ারের নেতৃত্বে একদল জ্যোতির্বিদ এটি তৈরি করেন। এতে মোট ৭৮৪০টি জ্যোতিষ্ক তালিকাভুক্ত হয়। জন ড্রেয়ারের উদ্যোগেই পরে দুই পর্বে, ১৮৯৫ এবং ১৯০৮ সালে আরো ৫৩৮৬টি জ্যোতিষ্ক এতে তালিকাভুক্ত হয়। পরে সংযোজিত ওই তালিকার নাম ‘IC’(Index Catalogue) রাখা হয়। ওই তালিকায় থাকা জ্যোতিষ্কগুলির নামের আদ্যক্ষরে ‘IC’ বসে।) এই গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রীয় অংশে বেশ কিছু কালো ছোপ দেখা যায়। আর ওই কালো ছোপগুলিকে ঘিরে কিছু নীলাভ শাদা সর্পিলাকার বাহু দেখা যায়। এর লম্বা লেজটির গঠনও নিয়ম বহির্ভূত। এ ধরনের গ্যাসস্রোতের মাথার দিকটা সাধারণত হলদেটে এবং শেষপ্রান্তটা নীলচে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উলটো। অপেক্ষাকৃত ছোট গ্যালাক্সিটির (এনজিসি ৪৬৭৬বি) গঠন অনেকটাই স্বাভাবিক – কেন্দ্রীয় অংশটি হলদেটে, আর লেজের মতো দেখতে গ্যাসস্রোতটির মাথা হলদে, শেষপ্রান্ত নীল।
এনজিসি ২২০৭ ও আইসি ২১৬৩ (NGC 2207 and IC 2163)

পৃথিবী থেকে প্রায় ৮ কোটি আলোকবর্ষ দূরে বৃহৎ কুকুরমণ্ডলে (Constellation Canis Major) রয়েছে এই দুই বিবাদমান গ্যালাক্সি। বিবাদ হলেও মূষিক বা আর্প ১৪৭ গ্যালাক্সিযুগলের মতো অত খারাপ অবস্থা এদের নয়। দু’টি গ্যালাক্সিরই সর্পিলাকৃতি এখনো অটুট আছে। সংঘাত প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে আজ থেকে ৪ কোটি বছর আগে। এখন সংঘর্ষের যে পর্যায়ে এরা রয়েছে তাতে অপেক্ষাকৃত বড় এনজিসি ২২০৭ এর বিস্তৃতি প্রায় ১৪৩০০০ আলোকবর্ষ এবং একটু ছোট আইসি ২১৬৩-এর বিস্তৃতি প্রায় ১০১০০০ আলোকবর্ষ। আগামী কয়েকশো কোটি বছরের মধ্যে এ দু’টি গ্যালাক্সির আর অস্তিত্ব থাকবে না। মিলেমিশে একটি উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি তৈরি হবে।
আর্প ২৪৪ বা অ্যান্টেনা গ্যালাক্সিযুগল (Arp 244)

পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.৫ আলোকবর্ষ দূরে কাকমণ্ডলীর (Constellation Corvus) গভীরে রয়েছে এই অদ্ভুত সুন্দর গ্যালাক্সিযুগল। প্রায় ১২০ কোটি বছর আগে দুটি গ্যালাক্সি আলাদা ছিল। অপেক্ষাকৃত বড় গ্যালাক্সি এনজিসি ৪০৩৮ (NGC 4038) ছিল দণ্ডাকৃতি সর্পিলাকার গ্যালাক্সি (Barred Spiral galaxy) এবং অপেক্ষাকৃত ছোট গ্যালাক্সি এনজিসি ৪০৩৯ (NGC 4039) ছিল সর্পিলাকার গ্যালাক্সি। প্রায় ৯০ কোটি বছর আগে সংঘাত শুরু হলে তাদের চেহারা দাঁড়ায় এনজিসি ২২০৭ এবং আইসি ২১৬৩ গ্যালাক্সিযুগলের মতো। এরপর সংঘাত আরও এগোলে, প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে একটি গ্যালাক্সি অন্যটির ভেতর দিয়ে গলে যাওয়ায় সিস্টেমটির চেহারা দাঁড়ায় মূষিক গ্যালাক্সিযুগলের মতো। ৩০ কোটি বছর আগে গ্যালাক্সির তারাগুলি গ্যালাক্সির অভিকর্ষজ টান ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে শুরু করে। গ্যালাক্সিযুগলের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে ওর বিবর্তনের মডেল বানিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, আজ থেকে প্রায় ৪০ কোটি বছর পরে এই দু’টি গ্যালাক্সির কেন্দ্রদু’টি পরস্পর মিশে যাবে। তৈরি হবে অতিকায় এক উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি (Elliptical galaxy)। নতুন ওই উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিপিণ্ডে আর কোনো নতুন তারা তৈরি হবে না। সম্প্রতি এই গ্যালাক্সিতে দু’টি সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটেছে-এসএন ২০০৪জিটি (SN 2004 GT) এবং এসএন ২০০৭এসআর (SN 2007 SR)। চন্দ্র এক্স-রশ্মি টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণে এই যুগ্ম-গ্যালাক্সিতে প্রচুর পরিমাণে নিয়ন, ম্যাগনেশিয়াম এবং সিলিকন পাওয়া গিয়েছে।
আর্প ১৪২ (এনজিসি ২৯৩৬-২৯৩৭ যুগল) (Arp 142)

দক্ষিণ আকাশে হ্রদসর্পমন্ডলীতে (Constellation Hydra ) থাকা আর্প ১৪২ গ্যালাক্সিযুগল অদ্ভুত সুন্দর। যেন শূন্যে ভাসমান একটি ডলফিন বল নিয়ে খেলছে। পৃথিবী থেকে এদের দূরত্ব ৩২ কোটি আলোকবর্ষ। ডলফিন-আকৃতি গ্যালাক্সিটির নাম এনজিসি ২৯৩৬ (NGC 2936)। নীলচে শাদা এই গ্যালাক্সিটি আসলে কিন্তু নক্ষত্রসৃষ্টিকারী সর্পিলাকার গ্যালাক্সি; আমরা অন্য জ্যামিতিক তল থেকে দেখছি বলে ওর অমন চেহারা দেখছি। ওর একটু নীচে থাকা উপবৃত্তাকার হলদেটে ছোট গ্যালাক্সিটির নাম এনজিসি ২৯৩৭ (NGC 2937)। উপবৃত্তীয় এনজিসি ২৯৩৭-এর তীব্র অভিকর্ষীয় টানেই ডলফিনমুখো গ্যালাক্সিটির উজ্জ্বল নীল অংশে তারা তৈরি হচ্ছে। তীব্র অভিকর্ষীয় টানে গ্যাস স্রোতে উজ্জ্বল হয়ে ভেসে উঠছে নবীন নীল নক্ষত্রেরা। আর ওই নীল নক্ষত্রদের তীব্র আলোয় শ্যিলুটের মতো ভেসে থাকছে মৃত নক্ষত্রের দল যা ওই নীল ডলফিনের শরীরে লাল শিরার মতো দেখতে দেখায়। মনে হয় যেন লাল-নীল আলোর এক আতসবাজি!
এর পর দ্বিতীয় পর্বে

তন্ময় ধর
জন্ম হুগলী জেলার কোন্নগর নবগ্রামে। বর্তমানে হিমালয়ের গোবিন্দ বল্লভ পন্থ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী। গত দু’দশক ধরে নিয়মিত জনপ্রিয় বিজ্ঞানপ্রবন্ধ লিখেছেন জ্ঞান ও বিজ্ঞান, কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান, কিশোর বিজ্ঞানী, আনন্দমেলা, Everyman’s Science ইত্যাদি পত্রিকায়।
