Free ArticlesPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

রেল টয়লেট, পরিবেশ দূষণ ও প্রতিকার

rail-toilet-and-environmental-pollution

বীরভূমের একটি ছোট্ট, শান্তশিষ্ট, গ্রাম্য স্টেশন হল আহমদ্পুর। অনেকে চলতি কথায় একে আমোদপুর বলেও ডাকে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান এটি। সাইথিয়া, সিউড়ী ও কাটোয়ার সংযোগকারী স্থানও এটি। কিন্তু পূর্বে এই স্টেশনে চলত গুটিকয়েক ট্রেন। ট্রেনের অফিস ও কন্ট্রোল রুম ছাড়া চারিদিকে ধু ধু করা প্রান্তর। এমনই এক সময়ে রেলের এক উচ্চপদস্থ কর্মী অখিল চন্দ্র সেন যাচ্ছিলেন ট্রেনে করে। ট্রেন প্রতিটি স্টেশনেই বেশ কিছুক্ষণ করে দাঁড়ায়। তারপর শম্বুক গতিতে চলতে থাকে। রেলে চড়ার আগের দিন প্রচুর পরিমাণে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য ভদ্রলোকের হঠাৎ প্রকৃতির ডাক আসে, ফলে নামতে হয় ওই আমোদপুরে। প্রাকৃতিক কর্ম সমাপনে যখন তিনি প্লাটফর্মে ফিরলেন, ট্রেন তখন স্টেশন ছেড়ে দুলকি চালে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। বেচারা ভদ্রলোক এক হাতে ধুতি অন্য হাতে ঘটি নিয়ে ছুটতে থাকলেও ট্রেন পেলেন না। রাত্রিযাপন করতে হলো ওই বিদেশ-বিভুঁইয়ে। সহজ ভাষায় কড়া করে চিঠি লিখলেন রেল কোম্পানিকে।

Dear Sir,

I am arrive by passenger train at Ahmedpur station and my belly is too much swelling with jackfruit. I am therefore went to privy. Just I doing the nuisance the guard making whistle blow for train to go off and I am running with lota (water pot) in one hand and dhoti (clothes) in the next. When I am fall over and expose all my shockings to man and woman on platform. I am got leaved at Ahmedpur station.

This too much bad, if passengers go to make dung, the damn guard not wait train five minutes for him? I am therefore pray your honour to make big fine on that guard for public sake otherwise I am making big report to papers.

Yours faithfully servant
Okhil Chandra Sen

টনক নড়ল কোম্পানির। তড়িঘড়ি মিটিং থেকে নিয়ম পাস করালেন যে প্রতিটি ট্রেনে টয়লেট থাকবে যাত্রী সুবিধার্থে। রেল ইতিহাসে এ এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। গুরুত্ব বিচার করে চিঠিটি আজও নয়াদিল্লীর রেল জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ক্রমে বিপুল জনপ্রিয়তা পেল এই রেল টয়লেট। 1909 সাল থেকে পথ চলা শুরু করে এই নয়া টয়লেট। তাই রেলের ইতিহাসে আমোদপুর স্টেশন এক উজ্জ্বল নাম।

2017 সালের গণনা অনুযায়ী ভারতীয় রেলে নিত্যযাত্রীর সংখ্যা প্রায় 23 লক্ষ।কিছু লোকাল বা প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছাড়া প্রায় প্রতিটি ট্রেনেই আছে টয়লেট। এর ফলে নিত্যযাত্রীদের সুবিধা হল খুবই কিন্তু সেই সাথে দূষিত হল পরিবেশ। কারণ দু’মুখ খোলা টয়লেটে বর্জ্য সঞ্চয়ের কোন ব্যবস্থা নেই। তাই বিপুল পরিমাণে রেচন ও বর্জ্য পদার্থ প্রতিনিয়ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। সমগ্র ভারতবর্ষই যেন হয়ে উঠল উন্মুক্ত টয়লেট।

Environmental Pollution and sanitation Issues created by Rail Toilets in India | ছবি: pnrstatuslive.com

বিজ্ঞানী, ডাক্তার ও অণুজীব বিশারদরা গবেষণা করে দেখেছেন রেললাইন, স্টেশন ও প্লাটফর্ম সংলগ্ন অঞ্চলে প্রচুর ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া ও আদ্যপ্রাণী পাওয়া যায়। রেল স্টেশনে প্রাপ্ত অনেক ক্ষতিকারক ছত্রাকের মধ্যে একটি হল ক্যানডিডা, যা কোনো স্থানে ক্ষত ও মুখে ঘা সৃষ্টি করে।

স্টেশন সংলগ্ন অঞ্চলে পাওয়া যায় শিজেলা, সালমনেল্লা, এরোমোনাস, ইয়ারসিনিয়া, ই. কোলাই ইত্যাদি।শিজেলা-ডায়রিয়া রোগ, এরোমোনাস-গ্যাস্ট্রোএন্ট্রাইটিস, ডায়রিয়া ও রক্তে ভাঙ্গন ঘটায়, সালমোনেল্লা- প্যারাটাইফয়েড ও টাইফয়েড এর মতো রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম, ইয়ারসিনিয়া-বাত, অটোইমিউন রোগ এবং প্লেগের মতো মারাত্মক ব্যাধি সৃষ্টি করে। ই. কোলাই-মূত্রনালীতে সংক্রমণের সৃষ্টি করে। প্রাপ্ত আদ্যপ্রাণীগুলি হল ক্রিপ্টোস্পোরডিয়াম, এন্টামিবা হিস্টোলাইটিকা ইত্যাদি। ক্রিপ্টোস্পোরডিয়াম থেকে ডায়রিয়া রোগ সৃষ্টি হয়।

বায়ো টয়লেট | ছবিঃ গুগুল

রেল সহ পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন করতে প্রথমেই প্রয়োজন ‘মুক্ত টয়লেট’ বর্জিত ট্রেন। সেই লক্ষ্য পূরণে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থা-ডিআরডিও সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি করেছে বায়ো-টয়লেট। বর্তমান সময়ে এই বায়ো টয়লেটই হলো সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়। মানবদেহের বর্জ্য পদার্থ সম্পূর্ণ অবায়বীয় পদ্ধতিতে জারিত করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রায় 55 শতাংশ মিথেন ও 45 শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি হয়। এই বায়োটয়লেটে দুটি নল থাকে, একটিতে মলমূত্র প্রবেশ করে ও অন্যটিতে কার্বন ডাই অক্সাইড ও মিথেন। হয় এই মিথেন জ্বালানী হিসাবে ও দ্বিতীয় গ্যাসটি আগুন নেভানোর কাজে লাগে। 2022 সালের মধ্যে ভারতীয় রেলের প্রায় 53 হাজার বগীতে এই বায়োটয়লেট ব্যবহার করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। যাত্রা পরিষেবা উন্নত না হলে রেলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে না। তাই প্রয়োজন প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোর উন্নতি ও সেই সাথে দূষণমুক্ত পরিবেশ।


উৎপল অধিকারি

এসিস্টেন্ট টিচার, অঝাপুর হাই স্কুল, অঝাপুর, জামালপুর, পূর্ব বর্ধমান