Free ArticlesGeography-ভূগোলPopular Science-জনপ্রিয় বিজ্ঞান

প্রাগৈতিহাসিক খান্তি সাগর

prehistoric-khanty-ocean
ছবির সূত্রঃ www.worldanvil.com

পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে সমুদ্র ও মহাসাগরগুলি জীবনের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং মহাদেশের গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই সমুদ্রগুলি কেবল জলাশয়ই ছিল না, বরং টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের সাক্ষী। খান্তি মহাসাগর (Khanty Ocean), যা খান্তি-মানসি মহাসাগর নামেও পরিচিত, এমনই একটি প্রাচীন সমুদ্র, যা প্রিক্যামব্রিয়ান যুগের শেষভাগ থেকে সিলুরিয়ান যুগ পর্যন্ত (প্রায় ৬০০ মিলিয়ন থেকে ৪৪০ মিলিয়ন বছর আগে) বিদ্যমান ছিল। পশ্চিম সাইবেরিয়ার ওব নদী অববাহিকায় বসবাসকারী খান্তি এবং মানসি আদিবাসীদের নামে নামকরণ করা এই সমুদ্রটি ইউরেশিয়ার গঠন এবং প্রাথমিক জীবনের বিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

খান্তি মহাসাগর প্রথমে ছিল একটি ছোটো সমুদ্র ছিল, যা বালটিকা (বর্তমান উত্তর-পূর্ব ইউরোপ, যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং রাশিয়ার ইউরেশিয়ান অংশ) এবং সাইবেরিয়ার কাছে অবস্থিত কিপচাক আর্ক (Kipchak Arc) নামক একটি দ্বীপপুঞ্জ-এর বাঁকের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। এটি প্রোটো-লরেশিয়া এবং সাইবেরিয়ান ক্রেটনের মধ্যে অবস্থিত ছিল। খান্তি মহাসাগর প্যানটিয়া (Pannotia) সুপারকন্টিনেন্টের বিভাজনের পর গঠিত হয়, যখন প্রোটো-লরেশিয়া তিনটি প্রধান ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়: লরেনটিয়া (উত্তর আমেরিকা), বালটিকা এবং সাইবেরিয়া।

বর্তমানের উরাল পর্বতমালার স্থানেই ছিল খান্তি সাগর | ছবির সূত্রঃ গুগুল

এর উত্তরে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগর প্যানথালাসা মহাসাগর, উত্তর-পূর্বে ছিল প্রোটো-টেথিস সমুদ্র আর দক্ষিণ ও পূর্বে প্যালিও-টেথিস সমুদ্র। এই অবস্থান খান্তি মহাসাগরকে লরেনটিয়া এবং বালটিকার মধ্যে অবস্থিত ইয়াপেটাস সমুদ্রের (Iapetus Ocean) একটি সহোদর সমুদ্র হিসেবে চিহ্নিত করে।

খান্তি মহাসাগরের গভীরতা এবং বিস্তার বেশী ছিল না। তবে এটি টেকটোনিক কার্যকলাপ এবং হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের জন্য বিজ্ঞানিদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। মনে করা হয় ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় এই ভেন্টগুলো পৃথিবীর বুকে আদীম জীবকুলের প্রাথমিক রূপের বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করেছিল।

খান্তি মহাসাগরের ভূতাত্ত্বিক গুরুত্ব তার গঠন এবং বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে নিহিত। সিলুরিয়ান যুগের শেষভাগে (প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন বছর আগে) যখন সাকমারিয়ান আর্ক (Sakmarian Arc) নামক একটি দ্বীপপুঞ্জ-এর বাঁক বালটিকা প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে মিলিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি প্যালিওজোয়িক যুগের টেকটোনিক পুনর্বিন্যাসের একটি অংশ ছিল। ইউরেশিয়ান কন্টিনেন্টের গঠনে অবদান রেখেছে এই প্রক্রিয়াটি। এই সংঘর্ষের ফলে ভূখণ্ডের চাপে খান্তি মহাসাগরের তলদেশে ভলকানোজেনিক ম্যাসিভ সালফাইড (VMS) -এর স্তর ক্রমশ উপরের দিকে ঠেলে উঠে বর্তমানে রাশিয়ার একটি প্রধান ভূপ্রকৃতি, ইউরাল পর্বতমালার সৃষ্টি করে। আয়রন, জিঙ্ক এবং কপারের মতো খনিজে সমৃদ্ধ এই পলির স্তর আজও উরাল পর্বত এবং সাইবেরিয়ার কিছু অংশে পাওয়া যায়, যা ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য মূল্যবান।

এই প্রাচীন মহাসাগরের তলদেশে বহু হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের উপস্থিতি ছিল। উচ্চ তাপমাত্রায় নির্গত খনিজসমৃদ্ধ তরল ও কেমোসিন্থেটিক ব্যাকটেরিয়া অণুজীবদের জন্য শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করত। এই উষ্ণ এবং কার্বনেট-সমৃদ্ধ পরিবেশে আদীম জীব বৈচিত্রের যে বিকাশ ঘটেছিল তার অনেক নিদর্শন পাওয়া যায় উরালের পার্বত্য এলাকায়। যেমন, প্রিক্যামব্রিয়ান যুগে কেমোলিথোট্রফিক ব্যাকটেরিয়া এবং আর্কিয়া, সিলুরিয়ান যুগে ট্রাইলোবাইট, ব্র্যাকিওপড, গ্র্যাপটোলাইট এবং অ্যানেলিড কীটের মতো প্রাণী, বা অগভীর অঞ্চলে প্রাচীন প্রবাল এবং শেল ব্যাঙ্ক – এই সবই প্রাচীন যুগের জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধি প্রকাশ করে।

যেহেতু এই প্রাচীন মহাসাগর বর্তমানে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত এর সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য এখনও অব্ধি পাওয়া যায়নি। তবে অবশিষ্ট পাথর, সিংহভাগ শিলাবৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক রেকর্ড) নিয়ে গবেষণা চলছে।

তথ্যসূত্রঃ-

সায়ন্তনী ব্যানার্জী

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি। বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল মার্কেটিং পেশায় যুক্ত। কন্টেন্ট রাইটার ও গ্রাফিক ডিজাইনার। পরিবেশ নিয়ে লিখতে ভালবাসেন।