প্যারিকুটিন: ছাই গাদায় আগ্নেয়গিরি

ফেব্রুয়ারি ২০, ১৯৪৩, বিকেল ৪টে নাগাদ মেক্সিকোর মিচোয়াকান (Michoacán) রাজ্যে অবস্থিত, উরুয়াপান (Uruapan) শহরের কাছাকাছি এবং মেক্সিকো সিটি থেকে প্রায় ৩২২ কিলোমিটার (২০০ মাইল) পশ্চিমে প্যারিকুটন (Parícutin) গ্রামের একজন কৃষক ডিওনিসিও পুলিডো (Dionisio Pulido) তাঁর ক্ষেতে গিয়েছিলেন স্তুপ করা আগাছাতে আগুন লাগিয়ে পরিষ্কার করতে ৷ তার পরের ঘটনাটা আসুন শুনি তাঁরই বয়ানে:
At 4 p.m., I left my wife to set fire to a pile of branches when I noticed that a crack, which was situated on one of the knolls of my farm, had opened . . . and I saw that it was a kind of fissure that had a depth of only half a meter. I set about to ignite the branches again when I felt a thunder, the trees trembled, and I turned to speak to Paula; and it was then I saw how, in the hole, the ground swelled and raised itself 2 or 2.5 meters high, and a kind of smoke or fine dust – grey, like ashes – began to rise up in a portion of the crack that I had not previously seen . . . Immediately more smoke began to rise with a hiss or whistle, loud and continuous; and there was a smell of sulfur.
অর্থাৎ উনি যখন ছাই গাদায় আগুন লাগাতে যান তখন তাঁর ক্ষেতের একটা ঢিবির পাশে একটি ফাটল আবিষ্কার করেন। ফাটলটা প্রায় আধ মিটার গভীর হবে। আগাছায় আগুন লাগাতে যাবেন, সেই সময় উনি অনুভব করলেন বজ্রপাতের মত শব্দ, আশেপাশের গাছপালা কাঁপছে। লক্ষ্য করলেন ওই গর্তটার চারপাশের মাটি ফুলে ফেঁপে উঠেছে প্রায় দুই থেকে আড়াই মিটার আর ধোঁয়া আর সূক্ষ ধূলোর মত ছাই বেড়িয়ে আসছে আরেক পাশ থেকে। এরপর হিস হিস আওয়াজ করতে করতে ক্রমশ ধোঁয়ার পরিমান বাড়তে থাকল, সালফারের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল।
পুলিডো প্রথমে তাঁর বলদগুলোকে খুঁজতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু একটাকেও খুঁজে পাননি। তাড়াতাড়ি ঘোড়ায় চড়ে গ্রামের বাড়ি ফিরে আসেন। তাঁকে জীবিত এবং সুস্থ দেখে তা৬র পরিবারের লোকজন খুশি হলেও, তাঁর ক্ষেতের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পরে।
প্যারিকুটিন, মানুষের ইতিহাসে একেবারে সাম্প্রতিক একটা অগ্নুৎপাতের অভিজ্ঞতা যা একটা ভুট্টার ক্ষেতকে ১৯৪৩ থেকে ১৯৫২ সালের ভেতরে আট বছরে একটা ১,৪০০ ফুটের পাহাড়ে পরিনত করেছে ৷ আদায় করে নিয়েছে জনগণ আর বিজ্ঞানী মহলের নজর ৷ আধুনিক বিজ্ঞান একেবারে হাতে গরম সুযোগ পেয়েছে নথিভূক্ত করতে একটা আগ্নেয়গিরির পুরো জীবনচক্র । প্যারিকুটিনের অগ্নুৎপাত চলেছিল ৯ বছর ধরে। এই ৯ বছরে বিজ্ঞানীরা স্কেচ করেছেন, ম্যাপ এঁকেছেন, হাজার হাজার নমুনা পরীক্ষা করেছে্ন, ছবি তুলেছেন এই ঘটনাটিকে নিয়ে৷
১৯৫২ সালের ভেতর অগ্নুৎপাতের ছাই আর লাভা দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রায় ৪২৪ মিটার (১,৪০০ ফুট) একটা ঢিপি, নষ্ট হয়েছে প্রায় ২৩৩ বর্গ-কিলোমিটার এলাকা ৷ তিনজন মারা যান, দুটি ছোট শহরকে পুরোপুরি খালি করতে হয়েছিল; যেগুলো পড়ে চাপা পড়ে গিয়েছিল ছাই আর লাভাতে। আরও তিনটে ছোট শহর ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ।
প্যারিকুটিনের যে ধরণের আগ্নেয়গিরি সেটির পক্ষে ৯ বছর ধরে অগ্নুৎপাতের সময়টা বেশ লম্বাি বলতে হবে। অগ্নুৎপাত হয়েওছিল বেশ কয়েকটি পর্যায়ে ৷
প্যারিকুটিনে অগ্নুৎপাত হয়েছিল ৪ দফায়। প্রথম দফায় ১৯৪৩-এর ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ অক্টোবর ৷ প্রথম দফার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ওখানকার মানুষ ঝড়ের মতো শব্দ শুনেছিলেন, অথচ আকাশে মেঘও ছিল না ৷ শব্দটা আসলে পৃথিবীর গভীরে ম্যাগমার চলাফেরা থেকে উৎপন্ন ভূ-কম্পনের ৷ পরে, দেখা ঙ্গিয়েছিল অগ্নুৎপাত শুরুর আগের ৫ সপ্তাহে ২১ বার ৩.২ মাত্রার ভূ-কম্পন হয়েছে ওই অঞ্চলে। অগ্নুৎপতের আগের সপ্তাহে হয়েছে ২৫-৩০ বার আর ঐ দিনে ৩০০ বার ।
পরের বছর, ১৯৪৪ সালে, মার্চের অগ্নুৎপাত আরও জোরালো ছিল। বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়েছিল বেশ কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ৷ এই কয়েক মাসে ছাই আর ম্যগমার টিলা ২০০ মিটার মাথা তোলে, আর ৮ মাসের মাথায় ৩৬৫ মিটার। প্যারকুটিন গ্রামটি পুরোপুরি লাভা আর ছাইতে ঢেকে যায়, ওখানকা চার্চের চুড়াটা শুধু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। দ্বিতীয় দফা চলেছিল ১৮ অক্টোবর থেকে ৮ জানুয়ারি ১৯৪৪।
প্রথম দুটো দফা চলে মোটামুটি এক বছর। মোট অগ্নুৎপাতের ৯০% এ সময়েই হয়ে যায়। টিলার উচ্চতা দাঁড়ায় ৪২৪ মিটার ৷
তৃতীয় দফা ৮ জানুয়ারি ১৯৪৪ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৯৪৫ পর্যন্ত চলে। এই সময়ে অনেক ফাটল তৈরি হয় টিলার দক্ষিণ দিকে। পরের সাত বছর আগ্নেয়গিরিতে বিশেষ সাড়া ছিল না, শুধু কিছুটা ছাই ছড়িয়েছিল ৷ শেষ অগ্নুৎপাত হয়ছিল ১৯৫২ সালের জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাসে। বেশ কয়েক দফার অগ্নুৎপত হয় তখন। কয়েকটার বেলায় তিন-কিলোমিটারের ধোঁয়ার স্তম্ভ তৈরি হয়েছিল ৷

তখন, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত খবরের কাগজের সাংবাদিক ওখানে পৌঁছেছিলেন আগ্নেয়গিরির জন্মের ‘লাইভ’ বা ‘স্বচক্ষে দেখা’ খবর পরিবেশন করতে। ঐ এলাকা দিয়ে উড়ে যাওয়া এরোপ্লেন, আলাদা করে জায়গাটা দেখাত ৷ হলিউড থেকে একটা সিনেমা ছবি এখানে তোলা হয়েছিল, ‘ক্যাপটেন ফ্রম ক্যাসটাইল’ ; সে সিনেমার একটা দৃশ্যের সময় পেছনে অগ্নুৎপাতের চলচ্ছবি দেখানো হয়েছিল ৷ সে সিনেমায় সহশিল্পী হিসেবে স্থানীয় লোকেদের ব্যবহার করা হয়েছিল ৷ মেক্সিকোর অনেক শিল্পী তাঁদের কাজে অগ্নুৎপাতের প্রেক্ষাপট বা ভাবও ব্যবহার করেছিলেন।
প্যারিকুটিন আগ্নেয়গিরিটি আসলে মেক্সিকোর আগ্নেয় অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত, কেতাবি ভাষায় যাকে বলে ‘ট্রান্স-মেক্সিকান ভলক্যানিক বেল্ট’। এই আগ্নেয় বলয়টি মেক্সিকোর মধ্যভাগ জুড়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৯০০ কিলোমিটার (৫৬০ মাইল) বিস্তৃত। এই চত্তরে প্রচুর ছাই-চুড়োর মতো কয়েক হাজার টিলা আজও দেখা যায়, যার মধ্যে সিয়েরা নেভেদার পার্বত্য অঞ্চলও আছে ; আসলে মধ্য-মক্সিকোর মালভূমি পুরোটাই গড়ে উঠেছে ১.৮ কিলোমটার পুরু আগ্নেয়শিলা দিয়ে, তাই এর মাটি এতটা উর্বর ৷
এখানকার আগ্নেয় কার্যকলাপের মূল কারণ হলো মিডল আমেরিকা ট্রেঞ্চ বরাবর রিভেরা প্লেট (Rivera) এবং কোকোস প্লেট (Cocos)-এর অবক্ষেপণ, যাকে ভূ-বিজ্ঞানের ভাষায় অধোগামি অঞ্চল বা সাবডাকসান জোন বলে। এর অর্থ একটা প্লেট আর একটার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। প্যারাকুটিনের এই আগ্নেয়গিরিটি, ৪০,০০০ বর্গকিলোমিটার (১৫,০০০ বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত একটি ব্যাসল্ট মালভূমি মিচোয়াকান-গুয়ানজুটো (Michoacán-Guanajuato volcanic field) আগ্নেয় এলাকার প্রায় ১,৪০০টি আগ্নেয় ছিদ্র (volcanic vents)-এর কনিষ্ঠতম সদস্য ৷
এই নবীন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের গুরুত্ব হল যে এই প্রথম আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞরা একটা অগ্নুৎপাতের পুরো চক্রের (জেগে ওঠা থেকে সুপ্তাস্থায় চলে যাওয়া পর্যন্ত) সমস্ত ছোট ছোট ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ আর লিপিবদ্ধ করতে পেরেছেন ৷ এখানকার ঘটনা , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলতে থাকা সত্ত্বেও সারা পৃথিবীর বিশেষজ্ঞ ভূ-বিজ্ঞানীদের টেনে নিয়ে এসেছিল ৷ মুখ্য গবেষক ছিলেন স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউে উইলিয়াম এফ. ফোশাগ আর মেক্সিকো সরকারের তরফে ডঃ জেনারো গজালেজ্ রেয়না ; এঁরা প্রথম অগ্নুৎপাতের এ সপ্তাহের ভেতর এখানে পৌঁছে গেছলেন আর প্রায় পুরো সময়কাল ছিলেন ৷ ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৮ সালের ভেতর প্রায় ৫০টা বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় জার্নালে ; এই সময়ের পর লেখা হয়েছে আরও বেশি সংখ্যায় ৷ প্যারিকুটিন আমাদের বৈজ্ঞানিক মহলকে , বিশেষ করে অগ্নুৎপাতের ফলে উৎপন্ন ঢিবি সম্বন্দে বিশদভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে ৷ প্যারিকুটিনের ঘটনা নিয়ে ছোটদের জন্যে একটা বইও লিখেছেন টমাস পি. লুইস ; নাম হিল অফ ফায়ার বা ‘আগুনের পাহাড়’ ৷
অগ্নুৎপাত শান্ত হয়ে গেছে ১৯৫২ সালে , ফেলে গেছে একটা টিলা আর ২৩৩ বর্গ কিলোমিটার ঝলসানো বসতি ; আশেপাশের সমস্ত সবুজ একেবারে শেষ হয়ে গেছল ৷ আগ্নেয়গিরির লাভা ছড়িয়ে পড়েছিল ২৬ বর্গ কিলোমিটার আর বালি ৫২ বর্গ কিমি. এলকায় ৷ একটি ৭৩৩ জন বসতির সমৃদ্ধ গ্রাম, প্যারিকুটিন, হয়ে গেছে বসবাসের পক্ষে সম্পূর্ণ অযোগ্য ৷ কাছের শহর, সান জুয়ান প্যারানগ্রিকুটিরোতে (আগে বাস করত ১,৮৯৫ জন) এখন দাঁড়িয়ে আছে শুধু আর্ধেক পোড়া চার্চের অংশটুকু ৷ এখানকার কৃষিজীবি সমাজের অর্থনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে পর্যটনের ওপর ৷

তপন কুমার গঙ্গোপাধ্যায়
বিজ্ঞান লেখক। অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার সদ্যস, জীব বৈচিত্র সংরক্ষন একাডেমি ,কলকাতা।
