Environment-পরিবেশFree Articles

সুমেরু সাগরের বরফস্তরের আশঙ্কাজনক হ্রাস

melting-ice-caps-of-arctic-region

সমুদ্রে ভাসমান হিমশৈলের গভীরতা নির্ণয় করা হয় সমুদ্রতলের ওপর হিমশৈলের কতটা উঠে আছে সেই উচ্চতার ওপর। সমস্যা হল এই পরিমাপটি নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হয় না কারণ হিমশৈল গঠনকারী বরফরাজি মাঝেমাঝেই সমুদ্রতলের নীচে ডুবে যায়। বিজ্ঞানীরা এই সমস্যার সমাধানের উপায় হিসাবে সুমেরু মহাসাগরে ভাসমান হিমশৈলের গভীরতার একটি মানচিত্র তৈরি করেন। কিন্তু যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই মানচিত্র দ্বারা প্রকাশিত হতে পারে না তাই বিজ্ঞানীদের এই প্রয়াসটি কয়েক দশক আগে বাতিল করা হয়।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা উন্নত কম্পুটার প্রযুক্তির মাধ্যমে পূর্বের মানচিত্রটির কিছু পরিবর্তন করেন। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই মানচিত্রে হিমশৈ্লের গভীরতা সময়ের সাথে সাথে কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তা দেখান হচ্ছে। মানচিত্র বিশ্লেষণ করে দ্য ক্রায়োস্ফীয়ার জার্নালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে মুখ্য উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে হিমশৈলগুলি পূর্ব অনুমানের তুলনায় ৭০% থেকে ১০০% দ্রুত হারে গলে যাচ্ছে।

হিমশৈলের গভীরতার কি এমন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে , কেনই বা হিমশৈলের গভীরতার হ্রাস বৃদ্ধি বিজ্ঞানীদের এত ভাবাচ্ছে – তার প্রকৃত কারণটি বিশ্লেষণ করেন এই গবেষণার মুখ্য বিজ্ঞানী রবি ম্যালেট। তিনি বলেন সুমেরু মহাসাগরের স্বাস্থের এক সংবেদনশীল নির্দেশক হল হিমশৈলের গভীরতা। বরফের পুরু আস্তরণ তাপ নিরোধক মোটা চাদরের মত কাজ করে। এটি একদিকে যেমন শীতকালে সমুদ্রেরে প্রভাবে পরিবেশকে উত্তপ্ত হতে বাধা দেয় তেমনি গ্রীষ্মকালে সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকে সমুদ্রকে রক্ষা করে। গ্রীষ্মকালে সুমেরু মহাসাগরের বরফের পাতলা চাদর অনেক সময়ই গলে যায়।

ইতপূর্বে সমুদ্রে হিমশৈলের গভীরতা নির্ণয় করা হত ২০ বছর আগে প্রস্তুত বরফ মানচিত্রের ভিত্তিতে। যেহেতু বরফরাজি বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে পুঞ্জীভূত হতে হতে হিমশৈল গঠন করে তাই হিমশৈলের একদম উপরিভাগের বরফ সঞ্চিত হওয়ার জন্য খুব বেশী সময় পায় না। রবি ম্যালেট বলেন হিমশৈলের গভীরতা কি হারে কমে যাচ্ছে তা এই প্রথম নির্ণয় করা যাবে।

সহ বিজ্ঞানী প্রফেসর জুলিএন স্ট্রয়েভ (UCL আর্থ সাইন্স) বলেন হিমশৈলের গভীরতা মাপার ক্ষেত্রে নানা রকম অনিশ্চয়তা কাজ করে। তবে উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে্র ভিত্তিতে এবার থেকে নির্ভুল ভাবে হিমশৈলের গভীরতা নির্ণয় করা যাবে বলে জুলিএন স্ট্রয়েভ আশাবাদী। শুধু তাই নয় এই কাজটি সুমেরু অঞ্চলে আবহাওয়া পরিবর্তনের সুদূর প্রসারী প্রভাব কি হতে পারে তারও পূর্বাভাস দেবে। আমরা জানি সমগ্র সুমেরু অঞ্চল জুড়ে কয়েক মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত বরফ পৃথিবীকে ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু চিন্তার ব্যাপার হল সুমেরু অঞ্চল বিশ্ব উষ্নায়নের স্বাভাবিক হারের চেয়ে তিনগুন অধিক হারে উত্তপ্ত হচ্ছে।

হিমশৈলের গভীরতা নির্ণয়নের জন্য গবেষকরা এবার ইউরপীয়ান স্পেস এজেন্সী্র উপগ্রহ ক্রায়োস্যাট-২এর রাডার ব্যবহার করবেন। রাডার তরঙ্গ হিমশৈলের তলদেশে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে যে সময় নেবে তার থেকেই নির্ভুল ভাবে নির্ণয় করা হবে হিমশৈলের গভীরতা।

রাডার তথ্য ছাড়াও গবেষকরা ‘স্নো মডেল-এল জি’ নামের একটি আদর্শ মডেলের সাহায্য নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে বাতাসের উষ্ণতা, তুষারপাত সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়কে বিবেচনা করে বরফের গভীরতা ও ঘনত্ব নির্ণয় করা যাবে। এর পর এই ‘স্নো মডেল’ ও রাডারের প্রাপ্ত তথ্যকে একত্রিত করে সুমেরু সাগরে হিমশৈলের গভীরতা হ্রাসের সামগ্রিক সঠিক পরিমাপটি পাওয়া যাবে। বরফের ঘনত্ব কিভাবে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে তারও একটা সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

সুমেরু সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলে হিমশৈলের গভীরতা আধ থেকে দুই মিটারের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। কিন্তু গ্রীষ্মে খুব দ্রুত হারে এই বরফ গলতে থাকে। ম্যালেট বলেন মানুষের বিভিন্ন ধরণের কার্যকলাপই এর জন্য দায়ী।
যেমন বিশ্বের পণ্যবাহী জাহাজগুলি প্রধানত সাইবেরিয়ার রুট ধরে যায়। এই সময় জাহাজগুলি প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ধোঁয়া নিঃসরণ করে। শুধু তাই নয় পণ্যবাহী জাহাজগুলি থেকে জ্বালানি চুঁয়ে চুঁয়ে বেরিয়ে সুমেরু সাগরের জলে মিশে গিয়ে সমুদ্রের দূষণ করে। সমুদ্রের তলদেশ থেকে নিয়মিত ভাবে তেল, গ্যাস, এবং খনিজ নিষ্কাশনও সমুদ্রের দূষণের অন্যতম কারণ।

এই দূষণের ফলে সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাচ্ছে। এর পরিণামে ওই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষগুলি সমুদ্রের চরম আবহাওয়ার শিকার হবে। তাই সমুদ্র তথা পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখতে জাহাজগুলির চলাচল নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। জাহাজগুলিকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে বিশেষ করে এগুলি যখন চীন ও ইউরোপের মত অত্যধিক দূষণযুক্ত অঞ্চলের ওপর দিয়ে যাবে।

ইউ কের ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ কাউন্সিল, ইউরপীয়া্ন স্পেস কাউন্সিল , ও ন্যাশানাল এরোনটিক্স এণ্ড স্পেস আ্যাডমিনিস্ট্রেশানের আর্থিক সাহায্যের একটি প্রজেক্টে বিজ্ঞানী ম্যালেট, প্রফেসর স্ট্রোয়েভ, মাইকেল সামাডস জার্মান রিসার্চ ভেসেল ‘পোলারস্টার্নে’ চেপে ২০১৯ থেকে ২০২০ সালে সুমেরু সাগরের হিমশৈলের ওপর এই সুবিস্তৃত গবেষণাটি চালান।


অরুন্ধতী চৌধুরী

স্নাতক স্তরে প্রাণীবিদ্যায় অনার্স
স্নাতকোত্তর স্তরে পরিবেশ বিজ্ঞান
ডকুমেন্টারি ফিল্মের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয় সম্পর্কিত স্ক্রিপ্ট লিখেছেন। থিয়েটার মুভমেন্ট থেরাপি নিয়ে কাজ করেন।