৪৬ বছর পর আবার লাদাখে দেখা গেল লং-বিল্ড বুশ ওয়ারব্লার পাখি

এই বছরের ১৫ জুলাই মাসে, ৩,২০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় লাদাখের সুরু উপত্যকায় ঘন উইলোর ঝোপে লং-বিল্ড বুশ ওয়ারব্লার (লোকাস্টেলা মেজর) পাখির দেখা মিলেছে। পাঁচজন পাখি বিশেষজ্ঞের একটি দল গত ৪৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভারতে লং-বিল্ড বুশ ওয়ারব্লার পাখি দেখতে পেলেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভূপেশ গোয়েল, মঞ্জুলা দেশাই, রিগজিন নুবু, ইরফান জিলানি এবং থাঙ্গারাজের সমন্বয়ে গঠিত এক পাখি প্রেমিক দল দেশের ‘দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে যাওয়া পাখি’ খুঁজে বের করার অভিযানের অংশ হিসেবে লাদাখের সুরু উপত্যকায় ‘বিলুপ্তপ্রায়’ প্রজাতির পাখিটি দেখতে পেয়েছেন। এই খবরটি পাখি প্রেমিকদের নিঃসন্দেহে উৎসাহ যোগাবে।
গত ১২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া অভিযানের তিন দিন পর, ১৫ জুলাই তারা এই প্রজাতিটি দেখতে পান। দলটি প্রথমে ঘন উইলোর ঝোপে পাখিটির স্বতন্ত্র ডাক শুনে সনাক্ত করেন, পরে এটিকে চাক্ষুস দেখতে পেয়ে নিশ্চিত হন। অভিযানের সদস্য হরিশ থাঙ্গারাজ বলেন “ভারতের ৪৬ বছর পর এটি একটি রেকর্ড। হরিশ থাঙ্গারাজ যিনি সম্প্রতি রাজস্থানের জয়সলমীরে আরেকটি বিরল প্রজাতি – সিন্ধ কাঠঠোকরা আবিষ্কার করেছেন। এই দলটি অভিযানে যাত্রা শুরুর আগে অতীতের গবেষণা এবং পরিচিত প্রকাশনাগুলি অনুসন্ধান করার পর, দলটি সুরু উপত্যকায় চলে যান, শেষে যেখানে তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়।
১৯৭৯ সালে সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কার্গিলের সাঙ্কুর কাছে এই প্রজাতির ওয়ারব্লার দেখতে পান। সেটা ছিল প্রজাতিটির ভারতে সর্বশেষ নিশ্চিত হওয়া রেকর্ড। একটা সময় বিশেষ করে ১৯২০ সাল পর্যন্ত দ্রাস এবং সুরু উপত্যকায় এই পাখি প্রচুর সংখ্যায় দেখা যেত। প্রচলিত এই প্রজাতিটি সম্ভবত আবাসস্থলের ক্ষতির কারণে সংখ্যায় কমে যায় কারণ ঝোপঝাড় পরিস্কার করে সেখানে চাসবাস শুরু হয়।
পাখিপ্রেমী শশাঙ্ক দালভি ২০১৫ সালে অল্প সময়ের জন্য এরকম দুটি পাখি দেখতে পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে তিনি ছবি তুলতে পারেননি। গ্রেওয়াল আশা করেন যে বিরল প্রজাতির সন্ধানে নতুন করে আগ্রহ আরও আবিষ্কারের দিকে নিয়ে যাবে। “আগামী বছরগুলিতে আমরা অবশ্যই লাদাখে আরও রেকর্ড দেখতে পাব কারণ আরও পাখিপ্রেমীরা এই ধরণের প্রজাতি খুঁজে পেতে এবং তাদের আবাসস্থল সম্পর্কে আরও আবিষ্কার করার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করবেন।”
মালয়েশিয়া পক্ষীবিদ জেমস ইটন, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তান জুড়ে ওয়ার্বলারের সন্ধান করেছিলেন। ২০২২ সালে গিলগিট-বালতিস্তানের নল্টার উপত্যকায় সাফল্য অর্জন করেছিলেন। এই সাফল্য অন্যান্য পাখিপ্রেমীদের উৎসাহিত করেছিল, যার ফলে ২০২৩, ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে নিয়ন্ত্রণ রেখা থেকে মাত্র ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জায়গাগুলি সহ এই এলাকা জুড়ে একাধিক দেখা গিয়েছিল। পার্শ্ববর্তী গিলগিট-বালতিস্তানের সাম্প্রতিক রেকর্ডের সাথে এই উচ্চতার মিল রয়েছে, যেখানে ২০২২ সাল থেকে এই প্রজাতিটি ৩,০০০-৩,১০০ মিটারের মধ্যে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
ওয়ার্বলার সাধারণত জুনের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে, এলাকা দখল এবং সঙ্গীদের আকর্ষণ করার জন্য তারা আহ্বান করে। এটি এমন একটি পাখি যা পাখিপ্রেমী এবং বিভিন্ন সংস্থা সবসময়ই অধরা ছিল। বার্ডস অফ ইন্ডিয়া (২০১৬) বইয়ের লেখক বিক্রম গ্রেওয়াল বলেন “এই পাখিটি বা এর পরিসর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি।”
আগে লং-বিল্ড গ্রাসহপার ওয়ার্বলার নামে পরিচিত ছিল। এই প্রজাতির বিশ্বব্যাপী পরিসর সীমিত, চীন এবং তাজিকিস্তানে রয়েছে বলে মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন এটিকে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করে।

বিশ্ব রঞ্জন গোস্বামী
বিজ্ঞান লেখক।অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক, পশ্চিম বঙ্গ সরকার সদ্যস, জীব বৈচিত্র সংরক্ষন একাডেমি ,কলকাতা।
